বাঙ্গাল বিনোদনে বাতুলতার নৃ-বিজ্ঞান

কুমিরের কান্না শেষ হওয়ার আগে আমাদের কি মনে পড়ে রুবেল এবং হ্যাপির ঘটনা? নিছক ফালতু এবং প্রচলিত ইতরামিগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে এই বিষয়টি আমার কাছে অন্যদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে উদ্ভাবনে অক্ষম বাংলাদেশী আবুল টাইপ নৃবিজ্ঞানীদের সামনে কিছু প্রশ্ন হাজির করার জন্য এটার আবেদন রয়েছে। আফ্রিকান সমাজ, সামোয়া কিংবা নিউগিনির এক মেয়ের বহুবিবাহ নীতি, পাবলিক সেক্স, মাল্টি সেক্স এগুলো নিয়া উত্তেজনাকর কথা বলেন অনেক নৃবিজ্ঞানী। অনেক ক্ষেত্রে তাদের বাক্যবাণে সেমিনার অর্গ্যাজম ঘটার উপক্রম হয় অতি উত্তেজনায়। তাদের অনেকে বলেন অমুক সমাজে নাই, তমুক সমাজ এটা করেনা। সুতরাং বাংলাদেশেও বিয়ে করার প্রয়োজন কোথায়?

ইসলাম ধর্মের হিসেবে নারী-পুরুষের সম্পর্কে আধ্যত্মিক বৈধতা, হিন্দু ধর্মমতে সাত জনমের বন্ধন, খ্রিস্ট কিংবা ইহুদি আচরণ অনুযায়ী যৌনতার বৈধতা যাই বলা হোক না কেনো তাঁরা বিয়েকে ধর্মীয় দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ করেই উপস্থাপন করেছেন। ধর্ষকামী সমাজের হর্ষ বিষাদে তারা তুলতে চাইছেন যৌনতার নতুন ডিসকোর্স। তাদের হিসেবে যৌনতার প্রাথমিক শর্ত দুটি মনের মিল। কিন্তু আমার কাছে তাদের ডিসকোর্স ঐখানেই প্রশ্নবিদ্ধ আর তা সম্কর্কের স্থায়ীত্বে।

একটু খেয়াল করেন। রুবেল-হ্যাপীর সম্পর্কে যেভাবেই হোক মনের মিল থেকেই দৈহিক মিল ঘটেছে। ফলে আশার প্রদীপ আরো বেশি আলোকিত ছিলো বিয়ে পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভবনায়। কিন্তু যতদিন তাদের মিল ছিলো ততোদিন টিকে ছিলো আবালীয় পশ্চিম প্রভাবিত ডিসকোর্স। কিন্তু ওরিয়েন্ট, ব্লাডি সাউথ এশিয়ান ওরিয়েন্ট চেগাইয়া উঠলো হ্যাপির আক্রমণাত্মক ভূমিকায়। সে রুবেলকে মনের বিনিময়ে শরীর দিয়েছে, এবার তার উপযুক্ত বিনিময় চাইছে বিয়ের মাধ্যমে। কারণ যে রুবেল এই অল্প কয়েকদিনেই হ্যাপির দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করছে। তাদের অনাগত সন্তানের দায়িত্ব সে কিছুতেই নেবে না। সে হিসেবে পশ্চিমের পাশবিক মাতৃত্বের সাথে দক্ষিণ এশীয় মাতৃত্বের ভূমিকাকে সাধুবাদ দিতেই হয়।

যা হোক নৃবিজ্ঞানী বলছেন পশ্চিম এবং পশুর কথা। আমি বলবো আমাদের দেশে পশু পাখির যত্ন নিতে যেমন তার মালিক আছে, পশ্চিমের দোপেয়ে পশুদের জন্য তাদের রাষ্ট্রযন্ত্র আছে, যা অন্তত নিশ্চিত নিরাপত্তা দিতে পারে। আমাদের কারো বাড়িতে একটা কোনো ছাগলের বাচ্চা জন্ম নেয়ার সময় ধাড়ি ছাগল মারা গেলেও ঐ বাচ্চার দেখভাল করে তার মালিকেরা। তেমনি পশ্চিমেও অহরহ জন্ম নিচ্ছে কুমারী মায়ের সন্তান। আর দায়িত্ব নিচ্ছে তাদের রাষ্ট্র। তবুও অনেক মৃত ভ্রুণ কিংবা বেওয়ারিশ শিশুকে পড়ে থাকতে দেখা যায় রাস্তার পাশে।

বলে রাখা ভালো পশুদেরও নৈতিকতা আছে, যা মানুষের নাই। আরেকটু ভালোভাবে বলে রাখি চৌরাস্তায় যৌনমিলনে যে কুকুর গর্ভবতী হয় সে মাদী কুকুর ঠিকই তার বাচ্চার দায়িত্ব নেয়ার হ্যাডম রাখে। সে না খেয়ে শুকিয়ে মরতে বসলেও ঠিকই তার অগণিত বাচ্চার বেঁচে থাকার অবলম্বন হতে পারে। কিন্তু প্রগতিশীলতার ধ্বজা ধরে পার্কে গাছের আড়ালে, বন্ধুর বাসায় কিংবা লিটনের ফ্লাটের যৌনমিলনে গর্ভধারণকারী কুমারী মা কিংবা তাদের বাবার ঐ কুকুরটির সমান হ্যাডম নাই। ফলে অনাগত সন্তানকে তারা হত্যা করে কোনো ডাক্তারের সহায়তা নিয়ে।

অবাক রাষ্ট্রযন্ত্র পিতামাতার সম্পদে যেমন সন্তানের অধিকার রেখেছে। তেমনি তাকে জন্মের আগে খুন করার অধিকারও দিয়েছে।

তাইতো বিয়ের বাধ্যবাধকতা এখানেই। অন্তত সেদিক থেকে বিচার করলে ঘৃণায় গা রি রি না করে উঠে হ্যাপিকে সাধুবাদ দিতেই হয়। অন্তত একজন মায়ের অবস্থান থেকে যে রুবেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে অন্যায় কিছু করেনি। তবে সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গিয়ে রুবেলের মিষ্টি কথায় অনাসৃষ্টির আগেও তার ভাবা উচিত ছিলো। আর তখনকার কাণ্ডজ্ঞানহীনতা এখনকার খবরে আসা একে অন্যের পরিপূরক। পাশাপাশি শোবিজের দিকে মানুষ বরাবর যে কারণে তর্জনি তুলে, মাথা নিচু করে থুতু দেয় সেটা আরেকটু দীর্ঘায়িত হলো বটে।

এ ঘটনায় মজা লুটতে থাকা কিংবা ধিক্কার দিতে থাকা গোষ্ঠী আমি কারো সাথেই একমত নই। কাউকে দোষ দিতেও চাইনা। শুধু এটুকু বলবো এ ঘটনা এবারই প্রথম কিছু না। আর এটা নিয়ে এতো মাতামাতি করারও কিছু নাই। শুধু অভিভাবকদের উদ্দেশ্য বলবো আপনার ছেলে মেয়ে কার সাথে মেশে কি করে সেদিকে দৃষ্টি দিন। প্রেমিককূলের উদ্দেশ্যে বলবো কারো সাথে সম্পর্কে জড়ালে আগে তার দায়িত্ব নেয়ার দু:শাহসটুকু দেখান। আর মেয়েদের বলবো শুধুমাত্র মিষ্টি কথা আর প্রলোভনে জীবন চলে না। জীবন চলে বাস্তববাদকে উপলক্ষ্য করে। আর সেদিকে কর্ণপাত না করলে এর পরিণতির জন্য তাদেরকেই দায়ী থাকতে হবে।

আজ হ্যাপির সাহস আছে, চলচিত্রের সাথে সংযুক্তি তার সামাজিক পরিচয় অন্যভাবে তুলে ধরেছে। আর তার সামনে রুবেল ধারাশায়ী। কিন্তু এমনি ঘটনা এই ঢাকাতে আজও কতশত ঘটেছে তার খোঁজ কে রাখে। আর ঐ মেয়েগুলো হয়তো হ্যাপির মত সাহসী না। ঐ ছেলেটাও হয়তো রুবেলের মত বিখ্যাত কেউ না। তাই দেখা গেছে এর পরিণতি হয়েছে একটি গর্ভপাত। একটি অনাগত জীবনকে পৃথিবীর আলো দেখতে না দেয়ায়।  কিন্তু এভাবে তো আর সমাজ চলতে পারেনা। দেশও নয়। তবে এত বাতুলতা কিসের জন্য ? কেনো এই নষ্টামির আয়োজন ?

(Visited 2 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *