অনন্য উপস্থাপনায় জার্মানবিরোধী গরুর রচনা

লেখকের নাম অনেক সময় বইয়ের নামে হয়। বলতে গেলে কিছু বই এক একজন লেখকের ব্র্যান্ড যেমনটা এরিক মারিয়া রেমার্কের কথা বলা যেতে পারে। বিশ্বযুদ্ধের ইতিকথা, সেই ভয়াল পশ্চিম রণাঙ্গন আর লেখক রেমার্কের কথকতা। একের পর এক লাশের সারি গুণতে গুণতে নীরব পশ্চিম রণাঙ্গন। দলে দলে গিয়ে জমা হচ্ছে রংরুটরা, মরছে কীটপতঙ্গের মত। জোর করে সেনাদল বড় করার সরকারি রীতিও বদলে যাচ্ছে না। এমনি পটভূমিতে লেখা রেমার্কের বিখ্যাত উপন্যাস অল কোয়ায়েট অন দি ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট। যার দাপটে হারিয়ে গেছে লেখক রেমার্কের অন্যকাজগুলো। তবে আমার কাছে প্রথমোক্ত বিশেষ উপন্যাসটিকে বড় একপেশে মনে হয়েছে।

ছাত্রজীবনে হোহেনজোলার্নদের রাজআদেশে সেনাদলে যোদ দিতে বাধ্য হন রেমার্ক। তারপর আহত হয়ে শাপমুক্তি, খুঁড়িয়ে চললেও পরে আর কামান দাগতে হয়নি, বন্দুক হাতে নিয়ে দৌড়া হয়নি তাকে। এরপর হাসাপাতালের বেডে শুয়েই চিন্তা করেছিলেন প্রথম উপন্যাসটি লেখার কথা। এদিক থেকে ধরলে প্রথমোক্ত অল কোয়ায়েট অন ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট বইটি যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধারাবিবরণী, তেমনি দি নাইট ইন লিসবন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত ইউরোপকে পরিচয় করিয়ে দেয়। পুরোপুরি প্রেমে উপন্যাস হলেও সময়ের আবর্তে হয়ে গেছে এক ঐতিহাসিক দলিল। জার্মান ভাষা বুঝিনা, বোঝার চেষ্টা করাটাও অধমের স্বর্গদর্শনের চেষ্টা। তাই সে সাহস না দেখিয়ে র্যািলফ ম্যানহিমকে ভরসাজ্ঞান করলাম। মূল জার্মান থেকে করা তাঁর অনুবাদটাই পড়ে ফেললাম আস্তে আস্তে।

পুরোপুরি প্রেমের উপন্যাস এই দি নাইট ইন লিসবন। তবে বর্ণনার ধারাবাহিকতায় রেমার্কের মুদ্রাদোষ এখানেও বেশ স্পষ্ট। কথায় কথায় জার্মানদের নাম নিয়ে ভেংচি কাটার সে পুরাতন স্বভাবটা রেমার্কের এখানেও যায়নি। প্রথমটিতে তিনি গোষ্ঠী নিপাত করেছেন হোহেনজোলার্ন বংশের রাজাজ্ঞার। আর এবারে বর্ণনার ধাঁচটা সেই একই। প্লটটা গতবারের মত না হয়ে এবার প্রেমের গল্প, আর ঘুরে ফিরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাহিনী বর্ণনা, নামান্তরে জার্মানবিরোধী এক গরুর রচনা। তবে রেমার্কের কৃতিত্ব বর্ণনায়। তিনি দেখাতে চেষ্টা করেছেন প্রতিকূল পরিস্থিতি কিভাবে মানুষকে একটু অন্যরকম করে ভাবার পথ করে দেয়।

সময় পাল্টে যায় পাখির ডানায় ভর করে, পরিস্থিতি মানুষকে ঠিক করে দেয় সে কি করবে। দি নাইট ইন লিসবন তাই এমন একটি প্রেমের উপন্যাস তার কাহিনী ধ্বংসাত্মক, এখানকার রোমান্টিকতাও জিঘাংসার আগুনে দগ্ধ। হেলেন পথ চেয়ে আসে জোসেফের, নিরুত্তাপ জোসেফের মনে অন্য চিন্তা। তারপর ফিরে আসা, হেলেনের প্রশ্ন কোনো এই প্রত্যাবর্তন। আর প্রথম দফায় আবেগে আপ্লুত জোসেফ তেমন কিছুই বলতে পারেনি। একটু দৃষ্টি বিনিময়। তারপর স্থির সদুত্তর। ‘প্রিয়তমা কেনো ফিরে এলাম জানো না, তোমার জন্যই তো, শুধু তোমার জন্য’। আর এই কথাটা কোনমতে বলে জোসেফ গোপন করে ফেলে চরম হতাশা আর নৈরাজ্য। আসলে পাশবিক অহমবোধের বলি হয়ে আরো মানুষ মৃত্যুদ্বারে কড়া নাড়ুক কিংবা একপেশে নি:সঙ্গ জীবনটাকে আর কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি জোসেফ।

হেলেনকে খুশি করার জন্য যাই বলুক জোসেফ বুঝে গেছে কেনো সে ফিরে এলো। কোথায় জাতীয়তাবাদী জজবা, কোথায় শত্রুপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার উন্মাদনা আর কই গেলো যুদ্ধবাজ চেতনা। ঘুরে ফিরে নিরুত্তাপ এক প্রেমিক যুবকের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে আসলে চায়নি জোসেফ, সে চায়নি হেলেনের চোখে চোখ হাতে হাত রেখে নিরুদ্বেগ আটপৌরে জীবন পার করতে। অনেকটা ইচ্ছের সাথে যুদ্ধ করেই টিকতে হয়েছে; পারতে হয়েছে তাকে। আর তারপর ফিরে আসা। প্রিয়ার চোখের চাউনি তার মনের আয়নায় কতটা বিম্বিত হয়েছিলো বোঝা দায়, তবে অন্য ঘটনাগুলো সহজে বোঝা যায়। গুলি, বোমা আর মর্টারের শব্দে একের পর এক নির্ঘুম রাত, জান বাঁচানোর দায়ে এক টুকরো রুটির জন্য কাড়াকাড়ি, তৃষ্ণার্ত অবস্থায় যা সামনে মেলে তাই পান করা আর দিনের পর দিন স্নানহীন থাকাটা কাঁহাতক সহ্য হয়।

তারপর স্বাভাবিক সাংসারিক জীবনের বর্ণনা অনেকটা, সেই বাড়িঘর, একটা পোষা বেড়াল, বন্ধুবান্ধব। আর সেই চিত্রকর শোয়ার্জের মৃত্যু, তার রেখে যাওয়া ড্রইংগুলোর মতই অবুঝ সময়ের সুবোধ বালক হয়ে যেতে হয় জোসেফকে। অভাব অনটনের মধ্যেও হেলেনের জন্য পোশাক কেনা, সেটা পরে পার্টিতে যাওয়া। আর হঠাৎ করেই তার মৃত্যু আরো দুর্বোধ্য করে তুলেছে এ প্রেমের উপন্যাসটিকে। অন্তত আমার মনে হয়েছে লেখকের চোখ থেকে পর্দা সরেনি, তিনি রাতের আঁধারকে দেখেছেন আরো ঘনীভূত আঙ্গিকে। আর লিসবনের রাতটি নিয়ে লেখক যখন গল্প শেষ করতে চেয়েছেন তখনও অনেক রাত, আর অদ্ভুত নীরবতা হেলেনের শীতল মৃত্যুকে ঘিরে।

বুক রিভিউ: The Night in Lisbon
লেখক: Erich Maria Remarque
ইংরেজি অনুবাদ: Ralph Manheim
প্রকাশকাল:June 9, 1998

(Visited 8 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *