যে ‘দিদি’ এবং ‘ভাই’ আমাদের ভাবায়

জয়দেবপুর রেল জংশন থেকে সেই সুনামগঞ্জ কতটা পথ! সড়ক যোগাযোগের কথা বাদ দেয়া যাক। সরাসরি রেলপথেও সেখানে যাওয়ার সুযোগ কম। তবু শয়নে-স্বপনে নয়, যাপিত জীবনেই এমন কিছু ঘটনা ঘটে যায়, যা জয়দেবপুর ও সুনামগঞ্জের ভৌগোলিক সীমারেখা এক করে দেয়। আর অদ্ভুতভাবে দুটি ঘটনাই ঘটেছে ফুটপাতে। প্রথমোক্ত ঘটনাটি মাত্র সপ্তাহখানেক আগের। ইতিহাসের অনার্স প্রোগ্রামের ক্লাস নিয়ে বাউবির ঢাকা কেন্দ্র থেকে জয়দেবপুর ফিরছি ক্লান্ত হয়ে। বাস-বাইক-রেল তিন ধরনের বাহনে যাতায়াত করে অনেকটাই ত্রিশঙ্কুতে পড়েছি। দ্রুত বাসায় ফেরার তাড়া থাকায় থানা রোডের মুখের যানজট এড়িয়ে মন্দিরের ভেতর দিয়ে হাঁটতে থাকি। অনেকটা অস্বাভাবিকভাবে জনৈক ফল বিক্রেতাকে ঘিরে একটা ছোট্ট জটলা, যেখানে অদ্ভুত একটা বিষয় আমার দৃষ্টিতে পড়ে।

একজন মাঝবয়সী লোক বেশ আগ্রহ নিয়ে বেল কেনার জন্য দরদাম করছিলেন। বেছে বেছে তিনটা বেল নিয়ে তিনি তার দাম ঠিক করেছেন ১৪০ টাকা। পকেটে হাত দিয়ে টাকা বের করে বিক্রেতাকে দিতে যাবেন। এ মুহূর্তে পথের পাশে পাজেরো জিপ থামিয়ে নামলেন জনৈক ভদ্রলোক। পোশাক-আশাক ও চালচলনে পুরোপুরি আভিজাত্য আর অর্থের দাপট স্পষ্ট। তিনি সোজা গিয়ে ফল বিক্রেতার সামনে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে থাকা সাগরেদ ইঙ্গিত দিলেন চটপট পাঁচটা বেল উঠিয়ে নিতে। ফল বিক্রেতা জানালেন, তিনটা বেল তিনি বিক্রি করেছেন এরই মধ্যে। এবার ওই ভদ্রলোকের মধ্যে কেমন একটা বেপরোয়া ভাব লক্ষ করলাম। তিনি অনেকটা আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে জলদগম্ভীর স্বরে আদেশ দিলেন পাঁচটা বেল তুলে নেয়ার জন্য। তারপর পকেট থেকে একটা ১ হাজার টাকার নোট বের করে ফল বিক্রেতার দিকে ছুড়ে দিলেন। বিরক্ত, বিব্রত ফল বিক্রেতা তবু রাজি হলেন না। বললেন, এটা আগে থেকেই বিক্রি হয়ে গেছে। নাছোড়বান্দার মতো ওই ভদ্রলোক জানালেন, তিনি প্রতিটি বেলের দাম দ্বিগুণ দিতেও রাজি আছেন।

দীর্ঘক্ষণ ধরে আরো অনেকের মতো চুপচাপ দরদাম দেখতে থাকা ওই ভদ্রলোক এতক্ষণ পর মুখ খুললেন। তিনি ফল বিক্রেতাকে বললেন বেলগুলো বিক্রি করে দিতে। পাশাপাশি জানালেন, এ ভদ্রলোক নাকি তার ভাই হন। অনেক থমথমে পরিবেশ অল্প সময়ের ব্যবধানে স্বাভাবিক হতে গিয়েও হয়নি। অচেনা এক মানুষ হঠাৎ ভাই বলে কিনে নেয়া বেলের স্বত্ব ত্যাগ করায় অবাক হলেন ধনী ভদ্রলোক। তিনি কুিসত ভঙ্গিমায় দাঁত বের করে জানতে চাইলেন, তাকে ভাই ডাকার হেতু কী? তিনি কেন আগে থেকে কেনা বেলের ওপর থেকে স্বত্ব ত্যাগ করেছেন। এবার আমিসহ সবার অবাক হওয়ার পালা। কারণ এতক্ষণের নিশ্চুপ থাকা ভদ্রলোক মুখ খুলেছেন তার বেল ক্রেতা ভাইয়ের পরিচয় স্পষ্ট করার জন্য। তবে এ ভাই কোনো চাচাতো, মামাতো, খালাতো কিংবা ফুফাতো ভাই নয়। আবার বাংলা সিনেমার গল্পের মতো পিচ্চিবেলায় মেলায় হারিয়ে যাওয়া ছোট ভাইও নয়। আমরা স্পষ্ট শুনলাম ওই ভদ্রলোক যে বিশেষ ভাইয়ের কথা বললেন, তার প্রথমে ‘চ’ বর্গের প্রথম বর্ণটি যুক্ত। সব ধরনের রাগ-ক্ষোভবিবর্জিত স্পষ্ট উচ্চারণে তিনি এই বিশেষ ভাইয়ের কথা যখন বললেন, আশপাশের সবার বাকরুদ্ধ হওয়ার পালা।

মনে পড়ে গেল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের গল্প। ক্যাম্পাস থেকে জনৈক বন্ধুর সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। যথারীতি দুপুরে খাওয়ার সময় কাঁটাবনে মামার দোকানে যেতে হয়েছিল। খাওয়া শেষ করে পকেট থেকে টাকা বের করলাম বিল দেয়ার জন্য। ওই বন্ধু ধমক দিয়ে বলল, ‘টাকা ভেতরে রাখ।’ মনে মনে ভাবলাম জাহাঙ্গীরনগর বেড়াতে গেলে আমরা যেমন আতিথেয়তা দেখিয়েছি, এ হয়তো তারই প্রতিদান। কিন্তু সেটা ভেবে শেষ করার আগেই বিল প্রার্থী ওয়েটারকে কষে একটা ধমক দিল আমার ওই বন্ধু। বিল না দিয়ে সে জানাল অমুক ভাইয়ের কথা। তারপর বিরক্ত, বিব্রত শুকনো মুখে ওই ওয়েটারকে ফিরে যেতে দেখে ডেকে ফেরালাম। তাকে সবার খাওয়ার বিল বুঝিয়ে দিয়ে উঠে পড়েছিলাম। আমি বিরক্ত হয়ে ওই বন্ধু ও তার সাঙ্গোপাঙ্গদের সঙ্গ ছেড়ে নীলক্ষেতের দিকে বই দেখতে যাচ্ছিলাম। এ সময় খেয়াল করলাম, তারা গাউসুল আযম মার্কেটের নিচ থেকে এক দোকানদারকে ওই বিশেষ ভাইয়ের নাম উচ্চারণ করে ধমক দিল। তারপর অবলীলায় প্যাকেট থেকে সিগারেট ধরিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিতে থাকল। আমি নিশ্চিত হওয়ার জন্য ওই দোকানদারকেও প্রশ্ন করেছিলাম। জেনেছি তার ক্ষুদ্র চা-বিড়ির দোকানে ওই বিশেষ ভাই ও তার চ্যালাচামুণ্ডাদের ৬০ হাজার টাকার মতো বাকি। আমি জানতে চাইলাম, এ টাকা কবে নাগাদ পাবেন? উত্তরে বুঝলাম, এক টাকাও পাওয়া সম্ভব নয় তার পক্ষে।

একবার সিলেটে গিয়ে বিপদে পড়েছিলাম। চাঁদাবাজদের দলকে মুখ ফসকে বলে দিয়েছিলাম, ‘আমরা ভাইয়ের লোক।’ তারা কী বুঝল জানি না, একটু পর রাস্তাই শুধু ছেড়ে দেয়নি, মাইক্রোবাসের জানালা দিয়ে গুনে গুনে পাঁচ বোতল মাউন্টেন ডিউও ভেতরে পাঠিয়ে দেয়। আবার ঈদের সময় বাসের টিকিট করতে গিয়ে অনেকবার মজা নিয়েছি। ঈদের ঠিক আগে গিয়ে কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, ভাই পাঠিয়েছেন। প্রথমবার কোনো প্রশ্ন না করে টিকিট দিয়ে দিয়েছিল তারা। তবে পরেরবার জানতে চাইল, ‘কোন ভাই?’ আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘সারোয়ার ভাই, কেন উনাকে চেনেন না’—বলে ফোন এগিয়ে দিতে গেলাম। কী অদ্ভুত ব্যাপার, ওরা আর জানতে চাইল না, টিকিট দিয়ে দিল। আদতে আমার বড় চাচার বড় ছেলের নাম সারোয়ার। তিনিই আমাকে ঈদের টিকিট করতে পাঠিয়েছিলেন। আমি বিন্দুমাত্র মিথ্যাচার না করে সরাসরি তার নাম বলাতেই তারা আমাকে ঈদের টিকিট দিয়ে দিয়েছিল।

এতজন ভাই, শুধু কি তাই? এসবের ভিড়ে দিদিরাও আছেন। অনেকের দ্বিমত উপেক্ষা করে কেউ কেউ নির্লজ্জের মতো সহমতও জানাচ্ছেন একটি অঘটনে। বরাবরের মতো এবারো অনলাইন দৈনিকের চটকদার শিরোনাম—‘দিদি ডাকায় মাছ ব্যবসায়ীর ঝুড়িতে এসি ল্যান্ডের লাথি’। এ সংবাদকে সাধারণ জনতার কাছে আরো আবেদনময় করে তুলতে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তিনি অর্থাৎ সহকারী কমিশনার (ভূমি) সঞ্চিতা কর্মকার ওই মাছ ব্যবসায়ীকে ইংরেজিতে গালি দেন এবং মাছের ঝুড়িতে লাথি মেরে বসলে ঝুড়িটি পাশের ড্রেনে পড়ে যায়।’ ঘটনাটি ঘটেছে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের পূর্ব বাজার ডাকবাংলোর সামনে। সুশীল ও সুধীজন অনেকে বলতে পারেন, সরকারি ডাকবাংলোর সামনে বাজার বসানোর নিয়ম নেই। কিন্তু যা-ই হোক, ওই ভুক্তভোগী মাছ ব্যবসায়ী লায়েক আহমেদের ঝুড়িতে লাথি মারার দায়িত্বটা রাষ্ট্র কিংবা জনপ্রশাসন সঞ্চিতা কর্মকার নামের সহকারী কমিশনারকে দেয়নি। সংবাদ প্রচারে সস্তা বাঙালি আবেগ কাজে লাগানোর জন্য ‘তিনি ইংরেজিতে গালি দেন’ কথাটি যুক্ত করা থেকে অনেক প্রশ্ন জন্ম নিতে পারে। কিন্তু তাই বলে গণপ্রজাতন্ত্রী একটি দেশের সাধারণ একজন নাগরিক সহকারী কমিশনারকে সাংবিধানিকভাবে ‘স্যার’ কিংবা ‘ম্যাডাম’ ডাকতে বাধ্য, এমন কোনো আইন আছে বলে আমার জানা নেই। পক্ষান্তরে যারা শিক্ষাদানের সঙ্গে জড়িত, তারা এ স্যার কথাটির আরো অসুস্থ প্রয়োগ করে থাকেন; যা ভিন্ন প্রসঙ্গ। অনেকে আবার তাকে স্যারের বদলে ভাই সম্বোধন করলে এমনভাবে মুখ বিকৃত করে দৃষ্টি দেন, মনে হয় কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা তাকে কয়েক যুগ ধরে ভোগাচ্ছে।

মাছ ব্যবসায়ী সমিতির পরপর কয়েকটি বৈঠক, মানববন্ধন কিংবা অনেক অ্যাক্টিভিস্টের ফেসবুক পোস্ট মাছ বিক্রেতার ঝুড়িতে লাথি মারার ঘটনাকে কিছুদিন হয়তো আলোচনায় রাখবে, চায়ের টেবিলে ঝড় তুলবে। তারপর এমনই ঘটন-অঘটন-দুর্ঘটনার নতুন কিছু একটা আলোচনায় জায়গা করে নেবে। মানুষ যেখানে পেটে লাথি মারার ঘটনাই মনে রাখে না, সেখানে মাছের ঝুড়িতে লাথি নিতান্তই মামুলি ব্যাপার। বলা বাহুল্য, ওই সহকারী কমিশনারের ব্যাচমেটদের অনেকে তার পক্ষাবলম্বন করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তারা বেমালুম ভুলে যাচ্ছেন, বাজে পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে একজন সহকারী কমিশনার চাইলেই পুলিশের সহায়তা নিতে পারেন। আসলে আমরা এখন এমন একটা সময়ে এসে উপস্থিত হয়েছি, যখন কেউ নিজের কাজ করে না। এই যেমন আমি নিজে ইতিহাস-প্রত্নতত্ত্বের গবেষক ও শিক্ষক। কিন্তু নিজের শিক্ষকতা ও গবেষণা ভুলে মাছ ব্যবসায়ীর লাথি খাওয়ার বিচার চেয়ে বেড়াচ্ছি। ঠিক তেমনি সঞ্চিতা কর্মকার লাথি মারার কর্মটা কার হয়ে করেছেন, সেটা নিয়েই প্রশ্ন থাকছে দেদার। তাই তো এমনই নানা বিশেষণে সিক্ত-সম্মানিত ‘ভাই’ ও ‘দিদি’দের এসব কর্মকাণ্ড আমাদের বেকার সময়ের আলোচনায় অনেক ভাবায়। তবে এত চিন্তা-চেতনা অনেক পরের কথা। এর সহজ উত্তর তো দিয়ে গেছেন খোদ রবি ঠাকুর। কুটুম্বিতা-বিচার শীর্ষক কবিতায় কণিকাতে তিনি লিখে গেছেন, ‘কেরোসিন-শিখা বলে মাটির প্রদীপে,/ ভাই ব’লে ডাক যদি দেব গলা টিপে।/ হেনকালে গগনেতে উঠিলেন চাঁদা/ কেরোসিন বলি উঠে, এসো মোর দাদা!’ তাই তো ‘ভাই’ কিংবা ‘দিদি’ ডাকার অপরাধে যারা এতটা রেগে-ক্ষেপে ওঠেন, তারাই যখন এক স্তর উপরের পদস্থ কোনো কর্মকর্তার সম্মুখ সাক্ষাৎ দূরে থাক, অন্তত ফোনকলে যেভাবে ‘স্যার স্যার স্যার স্যা… ’ করতে থাকেন, মনে হয়ে কোনো দৈত্য-দানব তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে আছে, কিছুতেই ছাড়ছে না

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!