তোমরা যারা ডেথ রেস খেলো

১.
কিছুদিন আগে আমার সাথে দুইজন ছাত্রী দেখা করতে এসেছে। রাগে দুঃখে ক্ষোভে তাদের হাউমাউ করে কাঁদার মত অবস্থা, কিন্তু বড় হয়ে গেছে বলে সেটি করতে পারছে না। তারা দুজনেই খুবই ভালো ছাত্রী, তারা ঢাকায় থাকে এবং প্রতিদিন মহাসড়কে দীর্ঘপথ জার্নি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়। যারা বয়সে তরুণ এবং মেধাবী তাদের নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়াটা এক অর্থে বাধ্যতামূলক। সবুজ ক্যাম্পাস নিয়ে তাদের একটা স্বপ্নও থাকে। কিন্তু কি ভয়ানক ব্যাপার, আমি সেটা ভেবে এক্কেবারে শিউরে উঠলাম। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য কত ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়। তারা সেই শৈশব থেকেই কত সংগ্রাম করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এসেছে। সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মৌলবাদীদের চোখে ধুলো দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায় পা রাখা চাট্টিখানা কথা।

আমার খুব প্রিয় এই দুই শিক্ষার্থীর চোখে জল দেখে আমি নিজেকে আর সামলে রাখতে পারিনি। তারা বলছিলো গণপরিবহনের নৈরাজ্যের কথা। অসভ্য আনাড়ি ড্রাইভাররা দানবের মত গাড়ি টানে। তারা নিজেদের মধ্যে পাল্লা দেয়। গাড়িতে বসে বসে অনেকে ধুমপান করে। কোমলমতি মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাওয়ার সময় সেই ধোঁয়া ফুসফুসে নিয়ে এখন শ্বাসকষ্টে ভুগছে। তারা শুধু মেয়ে হওয়ার কারণেই এতো প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। এই যে সকালে তাদের হুড়োহুড়ি করে গাড়িতে উঠতে হয়। তারপর বসার আসন না পেলে হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা লাগে। হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকলে অসভ্য লোকজন তাদের বুকের দিকে তাকিয়ে থাকে, জন্তু জানোয়ার প্রকৃতির অনেকে সুযোগে তাদের ফিজিক্যালী হ্যারাজও করে। তারা এই বিষয়গুলো আমাকে জানালো, পাশাপাশি তারা তারা এটাও বললো যেন কোনোভাবেই এই চাপাকষ্টগুলো বাইরের কেউ জানতে না পারে।

২.
আমি অনেক কষ্ট নিয়ে নিজের মেয়ের কথা ভাবছিলাম। অসভ্য একটা দেশকে সুসভ্য করার জন্য আমি সৃজনশীল পদ্ধতির আবির্ভাব ঘটিয়েছিলাম। কিন্তু তার সৃজনশীলতায় আস্থা রাখতে না পেরে নিজের মেয়েকে অনেক আগেই বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছি। কিন্তু কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে আমার মেয়ের পার্সনাল গাড়ি আছে, সে তো আর এভাবে হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে ঝুলতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় না। শুধু নিরাপদ যাতায়াতের জন্য এই মেয়েগুলো যে এখন দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে, তাতেও তাদের কোনো লাভ হয়নি। কেনো যে নীতিনির্ধারক মহল এখনও নিশ্চুপ সেটা ভেবেই আমার হড় হড় করে বমি চলে আসছে।

৩.
আমি তাদেরকে কী বলে শান্তনা দেব বুঝতে পারিনি, তাদের কথা শুনে বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাতায়াত ব্যবস্থা বহুদিন থেকে দেখে আসছি। একটা নামমাত্র গাড়ি থাকে শিক্ষার্থীরা বানর, উল্লুক কিংবা বেবুনের মত ঝুলতে ঝুলতে যাতায়াত করে। আমি তাদের প্রতিদিনের কষ্টগুলো এতোবার দেখেছি, এতোভাবে দেখেছি যে মাঝে মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে নিজের উপরই ঘেন্না ধরে যায়। মনে হয় প্রতিদিন সকাল বিকাল হড় হড় করে বমি করে দেই। কিন্তু কি আর বলবো বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম কানুনগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে একজন ছেলে কিংবা মেয়ে চাইলেও প্রাইভেট ট্রান্সপোর্ট ব্যবহারের বিকল্প খুঁজতে পারছে না। আর সেই সুযোগে একজন বেপরোয়া কিংবা অনভিজ্ঞ চালক ও হেল্পার চাইলেই একজন ছাত্র বা ছাত্রীর পুরো জীবনটা ধ্বংস করে দিতে পারে। কিছুদিন আগে আমার শিক্ষার্থীদের কাছে শুনেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পড়ুয়া একটা ছেলের হাত কাটা যায়, পরে সে মারাও গিয়েছিলো। আমি তখন এতোটা কান্নাকাটি করেছিলাম যে প্রায় ৫-৬ বক্স টিস্যু পেপার শেষ হয়ে গিয়েছিলো। পরে ইয়াসমিন সিলেট শহর থেকে আরও কয়েক সফট ফে টিস্যু আনিয়ে রেখেছিলো। এইসব সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আমার অশ্রু শুকিয়ে গেছে। তাই গত রবিবার যখন দুজন দুধের শিশু মারা গেলো, আমি কম্বল মুড়ি দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছি।

৪.
একজন বাসযাত্রী ছাত্র বা ছাত্রীর জন্যে সবচেয়ে ভয়ংকর বাক্যটি হচ্ছে যখন কোনো ড্রাইভার আরেক বাসের ড্রাইভারকে বলে তুমি কিভাবে আমার সামনে দিয়ে যাও, আমাকে ওভারটেক করো তোমাকে আমি দেখে নিব। এবং তারা গাড়ি ছাড়ার শুরুতে একথা বলে এবং শেষ পর্যন্ত দেখে নেয়ও। হায় নিয়তি এভাবেই প্রতিনিয়ত সড়ক-মহাসড়কে চলছে মৃত্যুর খেলা। প্রতিযোগী ড্রাইভার হেল্পারদের সম্মিত ফিরবে কবে সে ব্যাপারটা জানা নেই।

৫.
সিগারেটের প্যাকেটে “সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ” থাকে। সেখানে সিগারেট খেলে কী কী রোগ বালাই হতে পারে তার ভয়াবহ বর্ণনা থাকে–এর পরেও কেউ যদি সিগারেট খেতে চায় তাকে সেটা নিজের দায়িত্বে খেতে হয়। আমি রাস্তার আশেপাশে অনেক সাইনবোর্ড দেখি। সেখানে লেখা থাকে নির্দিষ্ট স্পিডের উপরে গাড়ি না চালানোর কথা। তবে কে শোনে কার কথা, তারা সেখানে অন্যায়ভাবে গাড়ি চালায় এবং দুর্ঘটনা ঘটে। তার পরেও শিক্ষার্থীদের অনুরোধে আজকে যে বিষয়টি নিয়ে লিখতে বসেছি আমি মোটেও তার এক্সপার্ট নেই। বিষয়টি কতো গুরুতর সেটি একটি কথাতেই বুঝিয়ে দেয়া সম্ভব, সারা বাংলাদেশে যখন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি এবং স্বজন হারানোর শোকে মুহ্যমান তখন পর্যন্ত আমি কোনো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করি নি।

জানি সবাই আমাকে নিয়ে আড়ালে হাসাহাসি করে। করুক! তবে তোমরা যারা নতুন প্রজন্মের ড্রাইভার। তোমরা গরু-ছাগল, হাস-মুরগি চিনতে পারো বলে লাইসেন্স পেয়েছিলে। আজ বাস-ট্রাকের স্ট্রিয়ারিং হাতে পড়ায় তোমাদের দায়িত্ব বেড়ে গেছে বহুগুণে। এখন গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি এবং অন্যসব পশুপক্ষীর পাশাপাশি মানুষও চিনতে শিখো। পাশাপাশি তোমরা যারা মহসড়কে ডেথরেস খেলছো সময় থাকতে সতর্ক হও। নাহলে ইতিহাস তোমাদের ক্ষমা করবে না। তোমরা ভুলে যেও না এমন ডেথরেস একদিন তোমাদের কোনো আত্মীয় স্বজনের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!