বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার দুই কর্ণধার শাবিপ্রবির জাফর ইকবাল স্যার এবং বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার। কম্পিউটার বিজ্ঞানের শিক্ষক হলেও জাফর স্যারের পরিচিতি যেমন একজন সায়েন্স ফিকশন অনুবাদক হিসেবে তেমনি সায়ীদ স্যার ষাটের দশকে একজন প্রতিশ্রুতিময় কবি হিসেবে পরিচিতি পান। আলোচ্য বিষয় হিসেবে সায়ীদ স্যারের ‌’শাড়ি’ শীর্ষক নিবন্ধ এবং জাফর স্যারের ফুটবল বিশ্বকাপ বিষয়ক লেখার কথা উল্লেখ করতেই হয়। আমি উনাদের লেখা প্রকাশের পর নিজ বক্তব্যসহ স্ট্যাটাস দিয়ে প্রায় বিপাকে পড়ে গিয়েছিলাম। উনাদের প্রতি আমার ক্ষোভটা এজন্য ছিলো যে একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী যিনি কিনা সবার আইডল তিনি কেনো ফালতু ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে লিখবেন। একইভাবে ইতিহাসের সূত্রগুলোকে বাদ দিয়ে গালগল্প ফেঁদে সায়ীদ স্যার কেনো অমন বর্ণবাদী লেখা লিখতে গেলেন। যদিও ইতিহাস বিষয়ের ধার না ধেরে কল্পকথায় আশ্রয়ী অবিশ্বাসান্ধ হুমায়ুন আজাদ এ ধরণের  আবর্জনা লিখে গেছেন শতশত। সায়ীদ স্যারের বক্তব্য বিশ্লেষণের আগে জাফর স্যারের ফুটবল বিষয়ক লেখা নিয়ে আলোচনা জরুরী। অন্তত ফিফা র‍্যাংকিং এ ১৯৪ নম্বরে থাকা দেশ হলেও এখানে ফুটবল নিয়ে লেখার জন্য অন্তত কয়েক হাজার ক্রীড়া সাংবাদিক রয়েছেন। এখানে তাঁর ফুটবল বিষয়ক লেখা প্রকাশ করার অর্থই হচ্ছে পান্তাঘাতে ঘি খাওয়ার মত অবস্থা। বিশেষ করে আমার মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গিয়েছিলো ব্রিল থেকে শুরু করে নানা স্থানে সার্চ দিয়ে যখন স্যারের নাম পর্যন্ত পাচ্ছিলাম না। গুগল স্কলার, অ্যাকাডেমিয়া ডট এডু কিংবা রিচার্সগেইট কোথাও স্যারের আইডি পাইনি, নানা তর্ক হলেও তাঁর আইডির লিংক এখন পর্যন্ত আমার বন্ধুদের কেউ খুঁজে দিতে পারেনি। কিন্তু লজ্জার মাথা খেয়ে বলতে বাধা নাই আমি প্রথম দিকে স্যারের আইডি নয় কম্পিউটার বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর সাইটেশন কত সেটা দেখার চেষ্টা করছি বারংবার।

অসহ্য ব্যাপার হলেও সত্য বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে এক ভয়ানক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে বাংলাদেশ। এমনি সময়েই একদিন হাতে নিয়েছিলাম পাওলো ফিয়েরির (Paulo Freire) অজর গ্রন্থ (Pedagogia do Oprimido) তথা ইংরেজি অনুবাদে (Pedagogy of the Oppressed)। আজ বহু বছর আগে লেখা বইটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশ্রিভাবে বাস্তব হয়ে উঠেছে সেটা গতকাল ঐ স্ট্যাটাস না দিলে বোঝাই যেতো না। একটা জনপদের মানুষ বৃদ্ধিবৃত্তিকভাবে শূন্য হয়ে উঠলে যুক্ততর্কের ধার ধারে না। তারা বিপন্ন জনপদে টিকে থাকতে মনের আনন্দে বেছে নেয় বিভাজন নীতি। তারপর এই বিভাজনের মধ্যে গণতন্ত্রের নামে পপুলিজমের প্রয়োগ হয় সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ ভাবখানা এমন যে যার দলে লোক বেশি তার কোনো অপরাধ নাই। যে বেশি লোকের সমর্থন নিয়ে অন্যায় করবে ক্ষেত্রসাপেক্ষে তার অন্যায় ন্যায়ে রূপ নেবে।

জাফর ইকবাল স্যারের ফুটবল কেন্দ্রিক লেখাটা দেখার পর আমার বারংবার মনে হয়েছে তিনি কিভাবে দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বে আসীন হয়েছেন। তাকে লক্ষকোটি মানুষ কিভাবে অনুসরণ করছেন। সেখানে ফিয়েরির যুক্ত অন্যরকম, এটা তার হিসেবে—“Leaders who do not act dialogically, but insist on imposing their decisions, do not organize the people–they manipulate them. They do not liberate, nor are they liberated: they oppress.”। আমি ক্রিটিক করতে গিয়েছিলাম ডায়ালজিক্যাল অবস্থান থেকে। কিন্তু একটু পর আবিষ্কার করলাম ডায়ালজিক অনেক পরের কথা, এখানে ডায়লগের মানসিকতাই কারো নাই। সবাই সুন্দরভাবে বিভাজন ঘটাচ্ছেন তারপর সেখানে ব্লেম গেইমে লিপ্ত হচ্ছেন নিজ নিজ অবস্থান অনুযায়ী।

মুক্তিযুদ্ধের পর এতোগুলো দশক পেরিয়েও বাংলাদেশ বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের মুখ দেখেনি এই বিভাজনের নীতির কারণেই। পাশাপাশি ট্যাগসন্ত্রাস এদেশের জন্য সবচেয়ে সর্বনাশের কারণ হয়ে গেছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে ক্যাম্পাসের সেরা ছাত্রটি যখন উল্টোপাল্টা কাজের বিরুদ্ধে কথা বলবে, রাজনীতি কিংবা পারিবারিক শক্তির ছত্রছায়ায় থাকা শিক্ষক নামের কুলাঙ্গারগারদের বিরুদ্ধে মুখ খুলবে তখন তার তকমা হবে বেয়াদপ। একইভাবে সমাজে কেউ বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ভিন্নচিন্তার হলে ধর্মের লেবাছে তাকে ট্যাগ মারা হবে নাস্তিক। একইভাবে কোনো ছেলেমেয়ে পরীক্ষায় খুব ভালো ফল অর্জন করেছে। তাকে উন্নতস্তরের চাকরি থেকে বাদ দিতে নতুন ঢং শুরু হয়েছে ইদানিং, আর সেখানে বলা হচ্ছে সে মাদ্রাসার ছাত্র, গ্রামের ছাত্র বাংলার অজ পাড়াগাঁঁয়ের ছাত্রছাত্রী। কেউ কেউ ঘেউ ঘেউ করছে এই বলে যে সে নাকি ইংরেজি জানে না।

গাঁও গ্রামের ভাঙ্গাচোরা স্কুলে পড়তাম, ক্লাস ফোর থেকে লুঙ্গি পরা আর রাখালদের মত বৃষ্টিকাদায় দৌড়াদৌড়ির অভ্যাস। ফলে ঢাকা-খুলনাবাসী কাজিদের সামনে টেকা আমার জন্য কঠিন ছিলো শৈশবে। তারপর আস্তে আস্তে উচ্চশিক্ষায় গিয়ে অন্য ছেলেমেয়েদের জন্যও এমন বৈষম্য অনুভব করছি হাড়েহাড়ে। বলতে গেলে সমস্যা এখানেই, আর সব সমস্যার শেকড় বিভাজনে। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য তারা লেখক হিসেবে কাউকে দেখেনি, শিক্ষক হিসেবে কাউকে দেখেনি; দেখেছে কে আস্তিক কে নাস্তিক কিংবা কে হুজুর, কে সমাজতান্ত্রিক, কে মাওবাদী কে মার্ক্সবাদী সেদিক থেকে। ফলে লেখক হুমায়ুন আজাদের বিশ্লেষণ করার সুযোগ হয়নি, সে নাস্তিক ট্যাগ খেয়ে রাতারাতি হিরো বনে গেছে। সালমান রুশদীর মত গুণী লেখক এদেশে ভাত পায়নি তাকে হতে হয়েছে নির্বাসিত। তসলিমা নাসরিনের মত তৃতীয় শ্রেণীর লেখিকা শুধু হুজুরদের ট্যাগিং আর নির্বাসনের খেতাব পেয়ে বিখ্যাত হয়েছেন রাতারাতি। একইভাবে মাদ্রাসায় পড়ানো অনেক হুজুর দুর্দান্ত লিখেন, উনারা ইংরেজির পাশাপাশি আরবি-ফারসি থেকে অনন্য সাধারণ বাংলায় অনুবাদ করেন সেগুলো মেইনস্ট্রিমের কেউ জানে না।

বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে জাগ্রত হুজুরদের লেখা শুধু তাঁরা ধার্মিক এই পরিচয়ের আড়ালে চাপা পড়ে থাকছে বাংলা বাজারের ইসলামী টাওয়ারে আন্ডারগ্রাউন্ডে। একইভাবে নাস্তিক ট্যাগ লাগায় শাহবাগ আজিজ মার্কেটের কোনো বই হাতে নিতে ভয় পাচ্ছেন দাড়িটুপি পরা কথিত ধার্মিক মানুষগুলো। বলতে গেলে বুদ্ধিবৃত্তিক এ বৈষম্যই আমাদের উন্নয়নকে পেছন থেকে টানছে। আজ যদি আস্তিক নাস্তিক বাদ দিয়ে যাচাই করা হতো হুমায়ুন আজাদ বাংলা সাহিত্যকে কি দিয়েছেন কিংবা তিনি কার লেখা বই নিজের নামে চেলে দিয়েছেন এমন অভিযোগও যাচাই করা যেতো তবে বিকাশ ঘটতো সাহিত্যসত্তার। তবে সেটা করা হয়নি শুরুতেই হয়েছে বিভাজন, গ্রহণ বর্জনের ঔদার্যে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির যে স্বরূপ সেটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে শুরুতেই। এই বাংলাতেই সুলতানি আমলের কাজি রুকনউদ্দিন যেখানে ভোজার ব্রাহ্মণের অমৃতকুণ্ড অনুবাদ করেছিলেন মাদ্রাসা ছাত্রদের পড়ার জন্য, সেখানে আজও দেখে অনেক হুজুর বেকুবের মত ফতোয়া দেয় ইংরেজি বই পড়া হারাম, শুধু ঢিলা কুলুপেই আরাম। জনৈক বেকুব তো প্রকাশ্যেই মেয়েদের শিক্ষার বিরুদ্ধে কথা বলেছে বারংবার। কিন্তু সে গাধা কি জানে না ইসলাম নারী পুরুষ প্রত্যেকের জন্য শিক্ষাকে করেছে ফরজ!

মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতার দায়টা একাধারে দুই শ্রেণির উপর বর্তায়। আহমেদ শরীফের নেতৃত্বাধীন একটা শ্রেণি যেমন ধর্মীয় শিক্ষাকে তুচ্ছজ্ঞান করেছে, তেমনি তাদের বিরোধী ধার্মিক শ্রেণি তাদেরকেও সমাজ থেকে বহিষ্কার করেছে। ফলে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে ধর্ম-বিজ্ঞানের যোগসূত্র কিংবা একটা উইন উইন সিচুয়েশন থাকার কথা হলেও দিনের পর দিন বেড়েছে বৈষম্য, প্রণোদিত হয়েছে সংঘাতের রাজনীতি। অনেক ভালো রেজাল্ট নিয়ে আজকের বিপন্নপ্রায় ট্যাগ খাওয়া মাদ্রাসাছাত্রদের চাকরিপ্রাপ্তিতে বাধার পাশাপাশি জাফর স্যারদের মত মানুষের নাস্তিক ট্যাগ খাওয়া একই সূত্রে গাঁথা। দেশের কথিত ধর্মীয় নেতাদের পাশাপাশি আহমেদ শরীফের মত বিভাজনের রাজনীতিতে নেতৃত্বদানকারী কথিত জ্ঞানী মানুষগুলোও এর দায় এড়াতে পারেন না। গতকাল স্ট্যাটাস দেয়ার পর থেকে আমি ত্যক্ত-বিরক্ত-বিব্রত, তাই এতোগুলো কথা আবার বলতে হলো। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক। সবার চেষ্টাতেই একটা সুন্দর, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। নচেৎ বিভাজন আর হানাহানির রাজনীতি বারবার কোরবানির হাট থেকে ফেরা গরুর মত লেজ ধরে বাংলাদেশকে শুধু পেছনেই টানতে থাকবে।

আমি এক্ষেত্রে উদ্ধৃতি হিসেবে দিতে চাই ফ্রাঞ্জ ফ্যানোনকে (Frantz Fanon, The Wretched of the Earth (New York, 1968), p. 52. )। তিনি খুব স্পষ্টই বলেছেন [The colonized man will first manifest this aggressiveness which has been deposited in his bones against his own people. This is the period when the niggers beat each other up, and the police and magistrates do not know which way to turn when faced with the astonishing waves of crime in North Africa. . . . While the settler or the policeman has the right the livelong day to strike the native, to insult him and to make him crawl to them, you will see the native reaching for his knife at the slightest hostile or aggressive glance cast on him by  another native; for the last resort of the native is to defend his personality vis-a-vis his brother.]।

এই বিষয় নিয়ে স্পষ্ট বোঝার জন্য আমার বক্তব্যের নিচে কপি পেস্ট করে রাখছি হাসিনুল ইসলামের( Hasinul Islam) বক্তব্যগুলো। পওলো ফ্রেইরির নির্যাতিতের শিক্ষাবিজ্ঞান: এক বিরুদ্ধস্রোত শিরোনামে উনি লিখেছেন—

তাকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়েছে: বিংশ শতাব্দির রুশো, বর্তমান যুগের জন ডিউই বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাবিদ। তার লেখা Pedagogy of the Oppressed বা নির্যাতিতের শিক্ষাবিজ্ঞান নামের বইটি মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র খোদ আমেরিকাতেই বহুল পঠিত। পওলো ফ্রেইরির এই বইটি পর্তুগিজ ভাষায় ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হয় এবং মিরা র্যা মোস এটি ১৯৭০ সালে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। এরপর সেটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে ‘ক্রিটিকাল পেডাগজি’ বলতে যা বুঝি সে সম্পর্কিত ধারণার প্রসারে এই বইয়ের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। ফ্রেইরি বইটির ভূমিকায় বলছেন যে ব্রাজিলে তার শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক নির্বাসনে থাকাকালীন চিন্তাভাবনার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি বইটি লিখেছেন। তার মতে, শিক্ষকতার সময় তিনি লক্ষ্য করেছেন যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘সমালোচনামূলক চেতনা’ সৃষ্টি করার সময় এক ভীতির ছায়া দেখতে পেয়েছেন। ‘সমালোচনামূলক চেতনা’ সৃষ্টির সময় তিনি অনুধাবন করেন যে শিক্ষার্থীদের মাঝে ‘আজাদির ভীতি’ রয়েছে।

তিনি অবশ্য বলেন যে এই ‘আজাদির ভীতি’ আসলে স্বাধীনতার প্রতি ভীতি না, বরং আজাদির সাথে যে ঝুঁকি আসে সে সম্পর্কিত ভীতি। ফ্রেইরি সতর্ক করে বলছেন যে তার তত্ত্বকে অতি আদর্শবাদী বা প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে। তিনি পুরোপুরি সাম্প্রদায়িকতা ও গোষ্টীতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে – যে তন্ত্র বা বিশ্বাস মানুষের পরিবর্তনে বিশ্বাসী না। অপরপক্ষে তিনি আমুল সংস্কারে বিশ্বাসী যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিবর্তন ও মানুষের আজাদি ঘটে। ফ্রেইরির মতে, তার প্রস্তাবিত শিক্ষা মডেল তখনই বাস্তবে সফল হবে যখন ব্যক্তি আমূল সংস্কারবাদী হবে। তিনি আরো বলছেন যে তার এই কর্মে অসম্পূর্ণতা রয়েছে এবং সে কারণে পাঠকেরা তাদের ভাবনায় যাকিছু নতুন যোগ করতে পারে। এই বইয়ে ফ্রেইরি প্রথাগত শিক্ষা পদ্ধতিকে “শিক্ষায় ব্যাংকিং মডেল” হিসেবে অভিহিত করেছেন কারণ এখানে শিক্ষার্থীকে একটি শূন্য মাটির ব্যাংকের মতো ভাবা হয় ও সে অনুযায়ী তার ভেতর জ্ঞান ঢেলে দেওয়া হয়। অপরপক্ষে তার শিক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী জ্ঞানের সহ-স্রষ্টা হিসেবে কাজ করে। বইটিতে ফ্রান্জ ফ্যানন ও কার্ল মার্ক্স এর প্রভাব আছে বলে মনে করা হয়। শিক্ষা সম্পর্কে তার একটি মতামত হলো: “দুনিয়ায় এমন কোনো শিক্ষা পদ্ধতি ছিল না, বা এখনও নেই যা কেবলমাত্র বিমূর্ত, স্পর্শাতীত ধারণার প্রতিই সমর্পিত বলে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। “

৯টি উদ্ধৃতি
———

“নির্যাতিতরা আজাদির জন্য প্রচেষ্টা চালানোর পরিবর্তে নিজেরাই অত্যাচারী হওয়ার চেষ্টা চালায়।”

“আজাদি প্রসবযাতনার সমতুল, আর তাই কষ্টের বিষয়।”

“নির্যাতিতরা যেকোনো উপায়ে নিজেদেরকে অত্যাচারীর মতো দাঁড় করাতে চায়।”

“নির্যাতিতকে আত্মানুসন্ধানমূলক অংশগ্রহণের সুযোগ না দিয়ে তাদেরকে আজাদ করার প্রচেষ্টা আসলে কোনো আগুন লাগা ভবন থেকে কোনো বস্তু উদ্ধারের মতো কাজ।”

“প্রচলিত ব্যাংকিং পদ্ধতির শিক্ষায় মানুষ ও দুনিয়ার সম্পর্কটি এমন: ব্যক্তি যেনতেন ভাবে দুনিয়ায় অবস্থান করছে, দুনিয়ার সাথে বা অন্যদের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই; ব্যক্তি কেবল এক দর্শক, সহ-স্রষ্টা নয়।”

“সমস্যা-তুলে ধরার মাধ্যমে শিক্ষা নারী ও পুরুষকে তার পরিপূর্ণতার পথে নিয়ে যায়।”

“সত্য কথা বলার অর্থ জগতকে রুপান্তরিত করা।”

“নিয়ন্ত্রনের উপায় হিসেবে যেসব ওয়েলফেয়ার প্রোগ্রাম পরিচালিত হয় সেগুলি অনুভূতিনাশক হিসেবে কাজ করে, যার ফলে নির্যাতিতরা তাদের সমস্যার শেকড় থেকে দূরে সরে যায় ও সমস্যার প্রকৃত সমাধান খুঁজে পায় না।”

“যেসব নেতৃত্ব ডায়ালগ এর মাধ্যমে কার্য পরিচালনা করে না বরং তাদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায়, তারা আসলে জনগণকে সংগঠিত করে না বরং নিজ স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তারা আজাদি এনে দেয় না, তারা নিজেরাও আজাদ নয়: তারা অত্যাচারী।”

কে এই পওলো ফ্রেইরি?
———————-
পওলো ফ্রেইরির জন্ম ১৯২১ সালে ব্রাজিলের রেসিফে। ১৯৪৭ সালে তিনি বয়স্ক নিরক্ষতা দূরীকরণে কাজ শুরু করেন এবং এক সময় conscientization নামের পদ্ধতির প্রয়োগ করে শিক্ষা পরীক্ষণ করেন। ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি রেসিফ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস ও দর্শনের প্রফেসর হিসেবে কাজ করেন এবং ১৯৬০ এর দশকে তিনি গণ নিরক্ষতা দূরীকরণে কাজ করেন। ১৯৬২ সাল থেকে তার পদ্ধতির ব্যাপক পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হয় এবং সে সময় ফেডারেল সরকারের সহায়তাও তিনি পান। এরপরের কয়েক বছরে প্রতিটি রাজ্যে কোঅর্ডিনেটরদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং 2,000,000 নিরক্ষরকে ২,০০০ সাংস্কৃতিক দলে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়। তবে ১৯৬৪ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর ফ্রেইরিকে কারাবন্দী হতে হয় কারণ সামরিক শাসক ভেবেছিল তার শিক্ষাদান পদ্ধতির মধ্যে বিদ্রোহী মনোভাব তৈরির অনুষঙ্গ ছিল। এরপর চিলিতে নির্বাসনে থাকার সময় তিনি আরো পরীক্ষা নিরীক্ষা চালান। ১৯৬৯-৭০ এর সময়ে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডিভলপমেন্ট এ ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখান থেকে তিনি জেনেভায় ওয়ার্ল্ড কাউন্সিল অব চার্চেস এ বিশেষ পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৯ সালে ব্রাজিলে ফিরে সাও পাওলোর ওয়ার্কার্স পার্টিতে যোগ দিয়ে বয়স্কদের স্বাক্ষরতার জন্য ছয় বছরের একটি প্রকল্প পরিচালনা করেন। এরপর ১৯৮৮ সালে তিনি সাও পাওলোর সেক্রেটারি অব এডুকেশন এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

বইয়ের চার অধ্যায়

১ম অধ্যায়ে যা আছে সেটি হলো: বিশ্বে জুলুম এর পক্ষে কিভাবে ন্যায্যতার যুক্তিপ্রমাণ হাজির করা হয়ে থাকে এবং এখানে “অত্যাচারী” ও “নির্যাতিত” এর পারস্পরিক সম্পর্কটি কেমন তা দেখানো হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসক ও শোষিত, এই দুয়ের মাঝে ক্ষমতার ভারসাম্য যে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, এ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে ফ্রেইরি বলছেন যে সমাজে যারা ক্ষমতাহীন তারা স্বাধীনতার বিষয়ে ভীত বোধ করে। তিনি বলছেন, “আজাদিকে জিতে নিয়ে আসতে হয়, দান হিসেবে নয়। একে অবশ্যই প্রতিটি মুহূর্ত তাড়া করে চলতে হয় এবং সেটি দায়িত্বশীলতার সাথে সম্পাদন করতে হয়। স্বাধীনতা মানুষের বহিঃস্থ কোনো আদর্শ নয়; এটি তেমন কোনো ধারণাও না যা মিথে পরিণত হতে পারে। এটি বরং মানুষের পরিপূর্ণতার খোঁজে এক আবশ্যকীয় অবস্থা।” ফ্রেইরির মতে, প্র্যাক্সিস – বা জ্ঞাত হয়ে কার্য – এর ফলাফল হিসেবে তত্ত্ব ও চর্চ্চার যুগপৎ প্রয়োগে আজাদি পাওয়া যায়।

২য় অধ্যায়ে ফ্রেইরি তার শিক্ষাপদ্ধতির “ব্যাংকিং” ধারণার ব্যাখ্যা দেন। এটি আসলে একটি রূপক যেখানে শিক্ষার্থীদেরকে মাটির ব্যাংকের মতো শূন্য পাত্র হিসেবে মনে করা হয় ও শিক্ষাকে জ্ঞানী ব্যক্তির দেওয়া দান হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এখানে শিক্ষক যেন ব্যাংকে শিক্ষা আমানত রাখেন। ফ্রেইরি এই মডেলকে বাতিল করেন কারণ তার মতে এই পদ্ধতি অমানবিক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়ের জন্যই। এছাড়াও, তার মতে ব্যাংকিং মডেল সমাজে অত্যাচারী মনোভাব ও চর্চ্চার বিস্তার ঘটায়। এই প্রেক্ষিতে তিনি দুনিয়াবি ও পারস্পরিক লেনদেন নির্ভর শিক্ষাপদ্ধতির কথা বলেন। এতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের নিজেদের মাঝে জ্ঞান সহ-সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি হয়। তার মতে, শিক্ষা এমন পদ্ধতিতে হতে হবে যেন মানুষ তার অসম্পূর্ণতা সম্বন্ধে সচেতন হতে পারে এবং সেই প্রেক্ষিতে আরো পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার প্রচেষ্টা চালাতে পারে। ব্যক্তি ও সমাজকে সচেতনভাবে রূপান্তরিত করার জন্য শিক্ষাকে এভাবে ব্যবহার করাকে তিনি conscientization হিসেবে অভিহিত করেছেন।

৩য় অধ্যায়ে আমরা যে ধারণাটির সাথে পরিচিত হই সেটি হলো: “সত্য কথা বলার অর্থ বিশ্বকে রুপান্তরিত করা।” এখানে তিনি প্র্যাক্সিস এর ধারণাটি তুলে এনেছেন। সমালোচনামূলক সচেতনতা সৃষ্টিতে যে অনুধ্যান ও সক্রিয় কার্য প্রয়োগ করা হয় তাই প্র্যাক্সিস। এর মাধ্যমে নির্যাতিতরা সমালোচনামূলক সচেতনতার অধিকারী হতে পারে। নিজেদের সামাজিক বাস্তবতা বোঝার জন্য কেবল একত্রিত হয়ে ডায়ালগে রত হওয়াই যথেষ্ট না, তাদেরকে অনুধ্যান প্রয়োগ করে সক্রিয়ভাবে কর্মে রত হতে হয়। এখানে তিনি মানবিকতার প্রেক্ষাপটে অনুন্নয়নকে চেতনা সীমাবদ্ধকারী পরিস্থিতি (limit situation) হিসেবে দেখিয়েছেন যা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্র্যাক্সিসের ভূমিকা আছে।

৪র্থ অধ্যায়ে তিনি মানুষকে উপনিবেশ এর মনন থেকে মুক্তি পেতে এক কার্যকরী উপায় হিসেবে ডায়ালগ এর ব্যবহারের কথা বলছেন। এখানে সহযোগিতা, ঐক্য, সংগঠন ও সাংস্কৃতিক সংশ্লেষ কাজ করে এবং এর ফলে সমাজে বিদ্যমান সমস্যা দূরীভূত হয়ে মানুষের আজাদি মিলে। এর বিপরীতে যারা ডায়ালগ এর ব্যবহার নিরুৎসাহিত করে তারা বিজয়, নিয়ন্ত্রণ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং ভাগ করে শাসন করার নীতি প্রয়োগ করে থাকে। ফ্রেইরির মতে জনগণের ডায়ালগ ছাড়া বিপ্লব সম্ভব না এবং ডায়ালগকে নিরুৎসাহিত করার অর্থ মানুষের অবনমন ও স্থিতাবস্থাকে সমর্থন করা। এই বইয়ে এমন বিভাজন ছাড়াও শিক্ষার্থী-শিক্ষক ও শাসক-শোষিত বিভক্তি উপস্থাপিত হয়েছে।

 

সমালোচনা
———-
অনেকে মনে করেন যে, শিক্ষা যে ফ্রেইরির মতানুসারে ‘সমাজের রুপান্তর’ এর জন্যই হতে হবে বা কেবলমাত্র ‘অন্তর্গত মূল্যের’ জন্যই হতে হবে, তা নয়। কেউ কেউ বলেন, ফ্রেইরি যদিও ডায়ালগ ও জ্ঞানের সহ-সৃষ্টির কথা বলছেন, তিনি প্রকৃত অর্থে “কে শাসক ও কে শোষিত” সে বিষয়টির স্পষ্টীকরণ করেন নি। তিনি যেন ধরেই নিয়েছেন এটি এমন খোলামেলা সত্য যার বিশেষ ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই এবং এ বিষয়ে মতানৈক্য হওয়ার কথা না।এছাড়া, ফ্রেইরি অনানুষ্ঠানিক ও ডায়ালগ এর মাধ্যমে শিখন-শিক্ষণের কথা বললেও তিনি পূর্ব-নির্ধারিত পাঠ্যক্রম নির্ভর শিক্ষার কথা নাকচ করেন নি। এটিকে একটি তাত্ত্বিক অসঙ্গতি হিসেবে অনেকে উল্লেখ করে থাকেন। কেউ কেউ এমন অভিযোগ করেন, ফ্রেইরি পশ্চিমা শিক্ষাপদ্ধতির পরশপাথর হিসেবে স্বীকৃত রুশো, জন ডিউই বা মারিয়া মন্টেসরির মতো দার্শনিকের মতবাদকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করেছেন কিন্তু প্রথাগত শিক্ষক প্রশিক্ষণে যেসব উপাদান (যেমন, পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা পদ্ধতি বা বয়স নির্ধারিত শিক্ষণ ইত্যাদি) থাকে সেগুলির তেমন কিছুই তিনি উপস্থাপন করেন নি।

ফ্রেইরির ব্যবহৃত কিছু শব্দবন্ধ ও ধারণা
—————————————
ক্রিটিকাল পেডাগজি: এটি ফ্রেইরির একটি বিশেষ অবদান। এখানে এমন শ্রেণিকক্ষের কথা ভাবা হয়েছে যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী যুগপৎভাবে শেখার কাজ করে। এখানে শিক্ষার্থী পূর্বের চেয়ে বেশি কর্তৃত্ব নিয়ে কথা বলে কারণ তারা নিজেদের পূর্বজ্ঞান থেকে জ্ঞান আহরণের কাজ করে থাকে।

প্র্যাক্সিস: কোনো সংগঠনকে রূপান্তরিত করতে যে অনুধ্যান ও সক্রিয় কার্য প্রয়োগ করা হয় তাই প্র্যাক্সিস। এর মাধ্যমে নির্যাতিতরা সমালোচনামূলক সচেতনতার অধিকারী হতে পারে। নিজেদের সামাজিক বাস্তবতা বোঝার জন্য কেবল একত্রিত হয়ে ডায়ালগে রত হওয়াই যথেষ্ট না, তাদেরকে অনুধ্যান প্রয়োগ করে সক্রিয়ভাবে কর্মে রত হতে হয়।

কনসায়েনটাইজেশন (Conscientization): অনুধ্যান ও সক্রিয় কার্যের মাধ্যমে সমালোচনামূলক সচেতনতা সৃষ্টির প্রক্রিয়াই ‘কনসায়েনটাইজেশন’। এটি সবচেয়ে আবশ্যক শর্ত যেটি ছাড়া বাস্তবতাকে পরিবর্তিত করা সম্ভব না। ফ্রেইরির মতে আমরা অনেক সামাজিক মিথের মাঝে বাস করি এবং এ কারণে সমালোচনামূলক সচেতনতা সৃষ্টি ছাড়া আমরা সমস্যার প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে ব্যর্থ হয়। কনসায়েনটাইজেশন এর মাধ্যমে আমরা সমস্যার প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটন করা ও প্রকৃত চাহিদা বুঝতে সক্ষম হই।

শিক্ষার ব্যাংকিং মডেল: ফ্রেইরি প্রথাগত শিক্ষা পদ্ধতিকে ব্যাংকিং মডেলের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। এখানে শিক্ষার্থীরা যেন একটি পাত্র আর শিক্ষাদাতা হলো অনুগ্রহকারী যিনি শূন্যপাত্রে (মাটির ব্যাংকের মতো) জ্ঞান ঢেলে দেন। এমন শিক্ষাপদ্ধতিতে “জ্ঞান একটি বর যা নিজদেরকে জ্ঞানী মনে করেন এমন ব্যক্তির কাছ থেকে যারা কিছু জানে না বলে মনে করে তাদের উপর আরোপিত হয়।”

ঈস্টার অভিজ্ঞতা বা শ্রেণি-মৃত্যু: ফ্রেইরির মতে যারা সত্যিকার অর্থে জনমানুষের কল্যান চায় তাদের নিজকে প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আমূল সংস্কারবাদীর ভেতরে পরস্পরবিরোধীতা থাকা ঠিক নয়। এ কারণে জনমানুষের কল্যানে নিয়োজিত থাকার অর্থ ব্যক্তির পুনর্জন্ম হওয়া। যারা এই জীবন বেছে নিবে তারা আর ঠিক পূর্বের মানুষটি থাকবে না, তাদেরকে নতুন এক অস্তিত্ব বহন করতে হবে। এটিই ঈস্টার অভিজ্ঞতা বা শ্রেণি-মৃত্যু।

ডায়ালগ: ডায়ালগে রত হওয়া এটিই নির্দেশ করে যে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সমতা রয়েছে। প্রত্যেককে অন্যকে বিশ্বাস করতে হবে। সম্মান ও ভালবাসার (যত্ন ও অঙ্গীকার) বিনিময় থাকতে হবে। প্রত্যেককে নিজ জ্ঞানকে প্রশ্নের সম্মুখে আনতে হবে এবং ডায়ালগে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে হবে।

 

যাঁরা বইটি ডাউনলোড করে পড়তে চান। 

 

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!