ক্লাইভ

Print

সহজ ভাষায় যদি প্রশ্ন করা হয় ‘রবার্ট ক্লাইভ কে ছিলেন?’ উত্তরদাতা ভারতবর্ষের কোনো মানুষ হলে এই প্রশ্নের উত্তর জানার প্রয়োজন থাকে না। বেশিরভাগ মানুষ মুখস্থ বলা শুরু করবেন কিছু নেতিবাচক শব্দ, ঠিক যেমনি নবাব সিরাজউদ্দৌলা সম্পর্কে কোনো কিছু জানার প্রয়োজন করেন না বাংলাদেশ থেকে শুরু করে ভারতের সিংহভাগ মানুষ। একইভাব ইউরোপের তথা ইংরেজদের কাছে পরম শ্রদ্ধার একটি নাম ‘রবার্ট ক্লাইভ’। তার সমরকৌশল এবং উদ্ভাবনী শক্তির জোরে তিনি পরাজিত করেছিলেন নবাব সিরাজের বাহিনীকে। এক্ষেত্রে নবাব সিরাজের সক্ষমতা এবং রবার্ট ক্লাইভের ‘কূট’ কৌশলের তুলনায় ইতিহাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল একটি পট পরিবর্তন। এই পট পরিবর্তনের দ্বৈত চরিত্র হিসেবে না দেখে বাংলার ইতিহাসের জনপ্রিয় বর্ণনাগুলোতে নবাব সিরাজউদ্দৌলা যেখানে মহানায়ক। তার ঠিক বিপরীতে পলাশী যুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে একেবারে খলনায়কূলশিরোমণি হিসেবে দেখা হয় রবার্ট ক্লাইভকে।
ইতিহাস গবেষণায় স্থান, কাল, পাত্র ও প্রেক্ষাপট অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। সময়ের প্রেক্ষিতে একজন মানুষ বিশেষ দেশের জন্য জাতীয় বীর হয়ে ওঠার পাশাপাশি আরেকটি জাতির কাছে আজন্মের খলনায়ক হিসেবেও আবির্ভূত হন। ইতিহাস বর্ণনার আগে রিচার্ড বোলেস্লাভোস্কির পরিচালনায় ১৯৩৫ সালের দিকে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ক্লাইভ অব ইন্ডিয়া’ চলচ্চিত্রের উদহরণ টানা যেতে পারে। এখানে রোনাল্ড কোলম্যান রবার্ট ক্লাইভের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এখানে দেখানো হয়েছে ফরাসি সেনাদলের লঙ্গে লড়াই করে জেতার ক্ষেত্রে রবার্ট ক্লাইভের দুর্ধর্ষ নেতৃত্ব আর যোদ্ধা সত্তার কথা। অনেকেই এ চলচ্চিত্র দেখে মনে করতে পারেন রবার্ট ক্লাইভ না থাকলে ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের অনেক আগেই থেমে যেতে হতো। বিশেষ করে পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজ উদ্দৌলার পক্ষ নিয়ে ফরাসিরা যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু তারা কোন স্বার্থ সামনে রেখে লড়াইয়ের ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছিল তা নিয়ে অনেক চিন্তার অবকাশ রয়েছে।
ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গেলে দেখা যায় রবার্ট ক্লাইভ (২৯ সেপ্টেম্বর ১৭২৫- ২২ নভেম্বর ১৭৭৪ খ্রি.) ইতিহাসে বিখ্যাত হয়েছেন পলাশী যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাদলের নেতৃত্ব প্রদানের মধ্য দিয়ে। তার হাত ধরে পলাশী যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দক্ষিণ এশিয়ার এক বিস্তৃত ভূখ-ের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। বর্তমান বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের সুবিশাল অঞ্চলের উপর ইংরেজদের যে আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার কেন্দ্রে ছিলেন এই রবার্ট ক্লাইভ। পাশাপাশি সুবিশাল ভূখ-ে প্রতিষ্ঠিত ইংরেজ জায়গীর থেকে যে আয় হয়েছিল তার মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে অঢেল সম্পদের মালিকও হয়েছিলেন ক্লাইভ। ওয়ারেন হেস্টিংসের মত তিনিও ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম রূপকার। বিশ্বের নানা স্থানে সম্মুখ সমরে ফরাসিদের সঙ্গে সেভাবে পেরে ওঠেনি ইংরেজরা। তার বিপরীতে ক্লাইভের প্রতিষ্ঠিত দিউয়ানী এবং তারই বসানো পুতুল শাসকদের সহায়তায় ফরাসিরা চরমভাবে প্রতিহত হয় ভারতবর্ষে। ফলে ভারতবর্ষ থেকে দেশে ফেরার পর একটা পর্যায়ে তাকে সম্মানসূচক সদস্য পদও দেয়া হয়েছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টে।
সম্পদের প্রতি মোহ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং খেয়ালখুশি সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতায় ইতিহাসের এক বিতর্কিত চরিত্রে রূপ নিয়েছেন রবার্ট ক্লাইভ। বর্তমানে ক্রিকেট ও ফুটবল যারা খেলেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাঠের কর্মভূমিকায় অনেক প্রশংসিত হলেও ব্যক্তি হিসেবে যাপিতজীবনে অনেক অগোছালো এবং হতশ্রী। এদের খেলার জন্য ভক্তের অভাব না থাকলেও কৃতকর্মের কারণে ধিকৃত করা হয় ‘ব্যাড বয়’ নামে। সহজে বোঝার জন্য অস্ট্রেলিয়ার শেন ওয়ার্ন, ইতালির বালেতোল্লি, আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনা কিংবা পাকিস্তানের শোয়েব আখতারের নাম নেয়া যেতে পারে। আদতে ব্রিটিশদের জন্য অনেক কিছু করেও এমনি কিছু বিশৃঙ্খলা ও অবাঞ্চিত আচরণের জন্য ব্রিটিশদের কাছে সেভাবে সম্মানিত হতে পারেননি ক্লাইভ। তিনি প্রথম দিকে সরাসরি ব্রিটেনের রানীর হয়ে মাঠের লড়াইয়ে যুক্ত হতে পারেননি। কোম্পানির হয়ে কর্মজীবন শুরু করে তার এই অবস্থায় উপনীত হতে অনেক সময় কেটে গিয়েছিল। তার মাধ্যমে ভারতবর্ষে স্বৈরতান্ত্রিকতার বিষবৃক্ষ রোপন, উচ্চ কর আদায় কিংবা কৃষককে নিজের প্রয়োজনীয় বিক্রয়যোগ্য উপদানের বদলে কোম্পানি নির্ধারিত ফসল চাষে বাধ্য করায় একটা পর্যায়ে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা গিয়েছিল। এজন্য অনেক ইতিহাসবিদ তার কঠোর সমালোচনা করেছেন।
সামরিক সাফল্য এবং কূটনৈতিক দক্ষতার মাধ্যমে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার ভিত্তি রচনা করেছিরেন রবার্ট ক্লাইভ। তবে এ অঞ্চল থেকে ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার পর সেখানকার অভিজাত শ্রেণি তাকে তার প্রাপ্য সম্মান দেয়নি। ভারতবর্ষ বিশেষ করে বাংলা থেকে প্রচুর সম্পদের মালিক হয়েছিলেন ক্লাইভ। তিনি চেয়েছিলেন ইংল্যান্ডের শ্রেষ্ঠ অভিজাতরা যেখানে বাস করে সেখানে দম্ভের সঙ্গে বাস করতে। কিন্তু অঢেল সম্পদের মালিক ক্লাইভের ঐ সমাজে ঠাঁই মেলেনি। অর্থবিত্তের মালিক হয়ে উঠলেও সেখানকার অভিজাতশ্রেণি ক্লাইভকে মেনে নিতে পারেনি। তারা অনেক ধনী ক্লাইভকেও একজন অনাহুত ভেবে তুচ্ছজ্ঞান করে। এর পাশাপাশি আরও নানা যন্ত্রণা মুহুর্ত ক্লাইভের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে স্বাভাবিক মৃত্যুর সুযোগ। ২২ নভেম্বর ১৭৭৪ মাত্র ৪৯ বছর বয়সে নিজ বাসাতেই আত্মহননের পথ বেছেনিয়েছিলেন ক্লাইভ। আর জে মিনে যে বর্ণনা দিয়েছেন সেখান থেকে জানা যায় ক্লাইভের মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্যদেরও নানামুখী যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে। তার অর্জিত ও জমা করা অঢেল সম্পদ তিনি যেমন ভোগ করতে পারেননি। তেমনি তার পরিবারের সদস্যদেরও নানাভাবে ঐ সম্পদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল।

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!