সাদাত হোসাইনের ‘‌ছদ্মবেশ’

‘জীবন কখনো কখনো প্রিয়তম মানুষদের মধ্যেও অদ্ভুত অভিমানের দেয়াল তুলে দেয়। ভালোবেসে কাছে এসে সেই দেয়াল ভাঙা হয় না বলে তা ক্রমশই মহাপ্রাচীর হয়ে উঠতে থাকে। এক সময় হয়ে ওঠে অলঙ্ঘনীয়।’ কংক্রিটের জঙ্গলঘেরা আমাদের যে আটপৌরে জীবন তা নিয়ে এই কথাগুলো পেয়েছি নতুন একটা উপন্যাসে, নাম ‘ছদ্মবেশ’। উপন্যাসের শুরুতে লেখক সাদাত হোসাইন এমন বর্ণনা দেন—“বাড়ির নাম ‘অপেক্ষা’। অপেক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন অধ্যাপক লতিফুর রহমান। তিনি এই বাড়ির মালিক। তার চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। চশমা ছাড়া তিনি খুব একটা ভালো দেখতে পান না, তারপরও চশমার ফাঁক দিয়েই তিনি তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে শেষ মুহূর্তে বাড়ির নামটা আরেকবার দেখে নিলেন। তারপর সন্তুষ্ট গলায় বললেন, ‘এবার ঠিক আছে’।”

এই ঠিক বেঠিকের দোলাচলেই এগিয়ে যায় পুরো উপন্যাস। আমরা যারা কমবেশি আগাথা ক্রিস্টি কিংবা জেমস রলিংসের লেখা পড়ে অভ্যস্থ তাদের কাছে গল্পটি সাদামাটা লাগতে পারে। তবে পুরো উপন্যাস যখন শেষ করেছি তখন এর পরিণত গল্প ও শৈলী অনেক আনন্দ দিয়েছে। সাদাত হোসাইনের কাহিনীর পরিণতি, বিন্যাস, শব্দচয়ন আর রহস্যের জাল বোনার যে দক্ষতা তা নিঃসন্দেহে প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। বইটি পড়তে পড়তে পাঠক নিশ্চয়ই খেয়াল রাখবেন যে, গল্পটি ঘুরেফিরে আমাদের আটপৌরে জীবনের নানা চিত্রই ফুটো উঠেছে। রহস্য খোঁজা বাদ দিয়ে কেউ কেউ নিজেকেও খুঁজে ফিরতে পারেন। আবার একটু পড়া যাক—“আকাশে মস্ত চাঁদ উঠেছে। খোলা জানালায় সেই চাঁদ দেখে লতিফুর রহমানের মন খারাপ হয়ে গেলো। এতো বড় বাড়ি বানালেন, কিন্তু সেই বাড়ির ছাদে বসে চাঁদ দেখার উপায় নেই।” নিজের বাসার ছাদে উঠে চাঁদ দেখতে পারেন এমন সৌভাগ্য আমাদের ক’জনের হয়, একটু বলবেন?

তারপর একটি পর্যায়ে এসে লেখক বলছেন—“লতিফুর রহমান ঘরের তালা খুলতে গিয়ে সমস্যায় পড়লেন। নতুন তালা লাগিয়েছিলেন প্রতিটি দরজায়। সেই তালা প্রায় আট-দশ দিন খোলা হয়নি বলে শক্ত হয়ে আটকে আছে। অনেক কসরত করে খুলতে হলো তালাগুলো। কিন্তু ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই বিকট দুর্গন্ধে লতিফুর রহমানের পেট গুলিয়ে উঠলো। পাকস্থলী যেন উল্টে বের হয়ে আসতে চাইছে।”… “তিনি তীব্র আতঙ্ক নিয়ে আরো একবার চোখ মেলে তাকালেন। বাথরুমের মেঝেতে কাঁত হয়ে পড়ে আছে একটা লাশ। লাশটার গলা থেকে মাথাটা প্রায় ছুটে এসে বিভৎসভাবে ঝুলে আছে বুকের ওপর। পচে যাওয়া লাশটার শরীর বেয়ে ভনভন করে উড়ছে মাছি।”

এমন ঘটনা আমরা সচরাচর প্রায় সব রহস্য উপন্যাসে পেয়ে থাকি। তাহলে প্রশ্ন থাকছে অন্য লেখায়ও যা আছে এখানেও তা আছে। সেক্ষেত্রে নতুন উপন্যাস হিসেবে ‘ছদ্মবেশ’ থেকে পাঠক কী পাচ্ছেন? অধ্যাপক লতিফুর রহমান চেষ্টা করছেন লাশ গুম করতে। সবক্ষেত্রে যা হয় এখানে তেমনটা হয়নি। তিনি হাতে দস্তানা পরে লাশ গুম করছেন অনেক কষ্টে। গন্ধে গা গুলিয়ে আসে। তবুও তিনি গ্রিল কেটে উপর থেকে লাশটাকে নাইলনের দড়ি বেঁধে নামিয়ে দিলেন নিচে। তারপর বৃষ্টি উপেক্ষা করে রেইনকোট পরে গুম করতে যান স্বয়ং।

মানুষ বিপদে পড়লে কিভাবে যন্ত্রতাড়িতের মতো কাজ করে এরপর সেই বর্ণনা। ফেরিওয়ালারা যেভাবে বাঁকে করে মাল টানে বয়সের ভারে ক্লান্ত অধ্যাপক ওইভাবেই কাজ করছেন। বৃষ্টির মধ্যে কাজ করতে গিয়ে ঘেমে-নেয়ে একাকার। বিপদে পড়লে মানুষের ষষ্ঠইন্দ্রিয় কিভাবে কাজ করে তার বর্ণনা আছে এখানে। বিশেষ করে দারোয়ানকে ঘুমিয়ে পড়তে দিয়ে অধ্যাপক কিভাবে লাশ গুম করেছেন সেই বর্ণনাটা বেশ চমকপ্রদ। তবে সবথেকে অবাক কাণ্ড অধ্যাপক সাহেব শেষপর্যন্ত ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছেন না তার বাসায় তালাবদ্ধ ঘরে কিভাবে ঐ লাশটি এসেছে। একে একে পরিণতি পেয়েছে অনেকগুলো চরিত্র—রেজা, শরিফুল, চুন্নুসহ আরও অনেকে। কোনো কোনো চরিত্র ঠিকঠাক পরিণতি পেলেও অনেকগুলো চরিত্র গল্পের প্রয়োজনে এসে হারিয়েও গেছে সবার দৃষ্টিসীমার বাইরে।

অধ্যাপকের বাসার সামনে থেকে টু-লেট লেখা প্লেটটি সরানো দেখে হঠাৎ সন্দেহ জাগে রেজার। তার প্রশ্ন এই বাড়ি পুরো তৈরি করার ক্ষমতাও যেখানে অধ্যাপকের নাই সেখানে নতুন ভাড়াটিয়া আনা বন্ধ করলেন কেনো? চুন্নু মিয়া চটে গিয়ে দাবি করে তার ভাগ্নেকে খুন করেছেন গোলাম মাওলা। তারপর তার লাশ সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু লেখকের কলমে গোলাম মাওলা হয়ে উঠেছেন অন্যরকম এক চরিত্র। নিচের কয়েকটা লাইন পড়লে অজান্তেই পাঠকের মনে ঠাঁই নিতে শুরু করবেন গোলাম মাওলা: “গোলাম মাওলা ধীর স্থির মানুষ। কঠিন বিপদেও মেজাজ হারান না। শান্ত গলায়, হাসিমুখে কথা বলেন। এই কারণেই খুব দ্রুত তিনি সাধারণ মানুষের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছেন। তিনি যে রাজনীতির সাথে খুব বেশিদিন যুক্ত, তাও না। বরং তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে ইতালিতে। খুব অল্প বয়সেই শ্রমিক হিসেবে ইতালিতে চলে গিয়েছিলেন। ফিরেছেন প্রায় বছর কুড়ি পর। এই কুড়ি বছরে তিনি তার ভাগ্য ফিরিয়েছেন। ইতালিতে নিজের একাধিক রেস্টুরেন্ট হয়েছে তার। হয়েছে নানান ধরনের ব্যবসাও। এই ব্যবসা দেখাশোনার জন্য একে একে ছোট তিন ভাইকেও তিনি ইতালি নিয়ে গেছেন। তারা ব্যবসাটা বুঝে উঠতেই বেশ ক’বছর হয় দেশে ফিরে এসেছেন গোলাম মাওলা। এসে ইট-বালির ব্যবসা শুরু করেছেন গ্রামে। যদিও অর্থ তার যথেষ্টই হয়েছে, এখন দরকার সামাজিক সম্মান, পরিচিতি। সেই লক্ষ্যেই রাজনীতিতে নেমেছিলেন তিনি। দুহাতে টাকাও খরচ করেছেন।”

এখন চুন্নু মিয়া সন্দেহের তীর যখন এই গোলাম মাওলার দিকেই তুলেছেন সেখানে পাঠকের আগ্রহ থাকাটা তো স্বাভাবিক। শেষ পর্যন্ত কী হতে যাচ্ছে? তবে কি চুন্নু মিয়া নির্বাচনের ফিল্ড নিজের দিকে নিতে লোক দিয়ে আপন ভাগ্নেকে খুন করিয়েছেন? এটা যদি আমি বলে দেই তাহলে পাঠকের পড়ার জন্য থাকলো কী? বাকিটা জানতে পড়ে দেখতে পারেন সাদাত হোসাইনের রহস্য উপন্যাস ‘ছদ্মবেশ’। আমি নিজেও লিখেছিলাম গুপ্তগোষ্ঠী ফ্রিম্যাসনারিদের নিয়ে। রাজমিস্ত্রীরা কি শুধুই ঘর বানায়। নাকি তাদের অন্যদিকেও চোখ থাকে? একজন রাজমিস্ত্রির নেতা কিভাবে জুতাসেলাই থেকে শুরু করে চণ্ডিপাঠ তথা ব্যাংক ডাকাতি পর্যন্ত করতে পারে তারই এক রুদ্ধশ্বাস রহস্য উপন্যাস সাদাত হোসাইনের ছদ্মবেশ। আগ্রহী পাঠক পুরোটা পড়ে দেখলেই বুঝবেন আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুটা কোথায় নিবিষ্ট হয়।

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!