ব্রাহ্মণবাড়ির বলির পাঁঠা

ব্রাহ্মবাড়িয়ার জানাজাতাণ্ডব শেষ হলে জানিয়ে রাখি উগান্ডা যেখানে 9,975 রোগীকে টেস্ট করেছে আমরা 21,307 টা টেস্ট করেছি। অবশ্যই এদিক থেকে এগিয়ে থাকায় একটা হাততালি প্রাপ্য। তবে নির্লজ্জের মতো বলতে হয় সংযুক্ত আরব আমিরাত 767,000 জন রোগীর টেস্ট করে আক্রান্ত হতে দেখছে 6,302 জনকে। আর্থিকভাবে প্রায় দেউলিয়া হতে বসা ভেনিজুয়েলা তার মাত্র 227 জন রোগীকে খুঁজে নিতে টেস্ট করেছে 299,714 জনের। ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ ভিয়েতনাম 206,253 রোগীর টেস্ট করে মাত্র 268 জনের দেহে সংক্রমণ পেয়েছে যেখানে একজনও আলু কিংবা পটল কিচ্ছু তোলে নাই উপরন্তু সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছে 201 জন।

ব্রাহ্মনবাড়িয়ায় টেঁটা দিয়ে মারামরি, আহার সংকটের ভয়ে গার্মেন্টস কর্মীদের ঝাঁকে ঝাঁকে গ্রামে ফেরা, মোবাইল অ্যাপসে লূডুস্টার গেমস খেলা নিয়ে ঠ্যাং কেটে মিছিল বের করা, তাবলীগের লোকের মসজিদ যাপন, জুম্মার নামায আদায় কিংবা আজকে আনসারি হুজুরের জানাজা এগুলো নিয়ে চিৎকার দিয়ে ফেসবুক ভেঙ্গে ফেলার আগে এ বিষয়গুলোও আমলে নেয়া জরুরি। অন্তত চরম অব্যবস্থাপনার মধ্যে থাকা একটি সিস্টেমের সুযোগ নিয়ে আরও জঘন্য কাজ করলে কি হয় সেটার নির্লজ্জ একটা উদাহরন তৈরি হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে। শুধু বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া নয় বিশ্বের আরও অনেক জায়গাতেই এমন জমায়েত হয়। রাষ্ট্র আগে থেকে সতর্ক থাকলে খুব সহজেই প্রতিরোধ করা যায় যার উদাহরণ বাংলাদেশেই আছে।

আমি মনের দু:খে স্ট্যাটাস দিয়ে জানতে চেয়েছিলাম ‘আনসারি হুজুরের জানাজায় সমবেত লাখলাখ মানুষের প্রত্যেকের জানাজায় কতজন লোক হবে?’ উত্তরে অর্ণব মামুন লিখেছেন ‘এই প্রশ্নের জবাবে শুধু জহির রায়হানের হাজার বছর ধরে’র কলেরার মড়ার কথা মনে পড়ে,লাঠি দিয়ে ঠেলে ঠেলে খানাখন্দ ডোবা নালায় ফেলার গল্প সামনে চলে আসে।’ কথাটা অবিশ্বাস করতে পারিনি। তার বিপরীতে Islam Taniya জানালেন ‘খাটিয়া দিবে না- লিখে রাখো’।মনের ক্ষোভ মেটাতে সুলেখক Shams Said বলেছেন ‘তাদের জানাজা হবে না। কবরস্থানে তিনজন দাড়াবে।ভাই আমরা পারিনি। হেরে গেছি। আমাদের জনগণ যেমন প্রশাসন তার থেকেও কম চতুর। আনসারী সাহেব জনপ্রিয় মানুষ। কাল রাতেই তাকে কবরস্থ করা উচিত। সেটা তারা পারেনি। আপনি দেখেন হোমনায় ইমাম সাহেব জানাজা দিতে যায়নি। খাটিয়া দেয়নি এলাকাবসী লাশ রাখতে। সেই হোমানার পাশের এলাকায় লাখো মানুষ নেমে এসেছে একজন মানুষের জানাজায়। কিছু বলার নাই। তবে শেষ কথা আগাছার থেকে পৃথিবী খালি থাকা ভালো।’ উপরের তিনটি মন্তব্যে নিহিত আছে বাস্তবতা যার সম্মুখীন হতে যাচ্ছি আমরা।

শুশীলদের মতো ভদ্র কথা বলে পেট চালানোর ধান্দা নেই, তাই আমি ল্যাঙ্গুয়েজ হাইজিনে বিশ্বাস করি না। আমি প্রায়ই বলি প্রতিটি দেশের জনগণ তাদের মতো করে স্বাধীনভাবে নিজের খেয়ালখুশি চলার চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক। আর সেজন্য প্রত্যেকটি রাষ্ট্র তাদের আইন ও সংবিধান তৈরি করে, মোটা অঙ্কের বেতন দিয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিপালন করে জনগণের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তার যথাযথ বাস্তবায়নের উপরেই নির্ভর করে ঐ রাষ্ট্রের সফলতা।

করোনা মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ন্ত্রণ করায় ঐ রাষ্ট্রকেই সবথেকে সফল হতে দেখা গেছে যারা সময় মতো সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি আইনের প্রয়োগ যথাযথ করতে পেরেছে। সুতরাং আইন শৃঙ্খলা বাহিনী আগে থেকে সাবধান থাকলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এতবড় জমায়েত ঘটতে পারতো না। সবথেকে বড় কথা লকডাউন উপেক্ষা করে যখন ঝাঁকে ঝাঁকে পালে পালে মানুষ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে রওনা দিয়েছে তাদের প্রতিটি স্পটে মার খাওয়ার কথা। লক ডাউন ভাঙ্গার অপরাধে সাধারণ রিকশাঅলা কিংবা সবজিবিক্রেতারা শাস্তি পেলেও এইসব শর্টকাট জান্নাতের ঠিকানা খোঁজা মানুষগুলো বেঁচে গেল কিভাবে?

মহামারী হিসেবে করোনা বিস্তৃত হওয়ার পর যেসব দেশ মহামারীর সংক্রমণ নিয়ে একেবারে গা ছাড়া ভাব দেখিয়েছে তাদের করুণ পরিণতি এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। তারা শুরুতে ‘হার্ড ইম্যুনিটির’ ধুয়ো তুললেও প্রায় প্রত্যেকেই করোনা মহামারী প্রতিরোধের সব সেক্টরে ব্যর্থ হয়ে অশ্রুভেজা চোখে রুমাল চেপে শামিল হয়েছে লাশের মিছিলে। অন্যদিকে করোনা সংক্রমিত দেশগুলোর একটি অসুস্থ প্রবণতা হিসেবে দেখা গিয়েছে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দায় জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়ার পাশাপাশি ‘স্কেপগোট’ তথা ‘বলির পাঁঠা’ অনুসন্ধান করা। যদি সেটাই হয় তবে বাংলাদেশের জন্য এটা নিতান্ত লজ্জাজনক এবং অনেক দু:খের কারণও বটে।

ফরজে কিফায়া ‘নামাযে জানাজার’ উদ্দেশ্যে যারা এত লাখ লাখ মানুষের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিল তাদের ইসলামিক জ্ঞান ও বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করতেও লজ্জা হয়। প্রশ্ছে শর্টকাট রাস্তায় ভাগ্যে থাকলে উনারা হয়তো জান্নাতে যেতে পারবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে উনারা জান্নাতে যাওয়ার আগে সঙ্গে আরও অনেক মানুষকে টান দিয়ে দুনিয়ার ওপারে নিয়ে যাচ্ছেন যারা জান্নাত না জাহান্নাম কোথায় যাবে সেটা নিয়ে এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। আর ঐসব মানুষকে অনিশ্চিত জীবনের দিকে ঠেলে দেয়ায় তাদের শাাস্তি এবং জরিমানার সম্মুখীন করা উচিত। তাদের এই জনবিরোধী কুকর্মের বিচার না হলে এ ধরণের গণবিরোধী অপকর্ম চলতেই থাকবে।

আর তার বদলে পত্রিকার পাতায় শিরোনাম হবে এসব………

(Visited 35 times, 1 visits today)

2 thoughts on “ব্রাহ্মণবাড়ির বলির পাঁঠা

  1. বাহ। নিজের ডোমেইনে সাইট চালু করেছেন দেখে ভালোই লাগল। আগে জানলে মাঝে মধ্যে ঢুঁ দেয়া যাইতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *