ডাক্তার মঈন স্মরণে

উহুদ যুদ্ধে শহীদ বৃদ্ধ সাহাবি আমর ইবনে জুমুহ (রা.) (عمرو بن الجموح) গল্পটা তো কমবেশি অনেকের জানা। ‘আল্লাহুম্মা লা-তারুদ্দুনি ইলা আহলি।’ (অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে আমার গৃহের দিকে যেন প্রত্যাবর্তন করতে না হয়।) দোয়া করে এই সাহাবি যুদ্ধের আগে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন। পরে আল্লাহ তাঁর দোয়া এমনভাবে কবুল করেছিলেন যে এই সাহাবি যুদ্ধে শহীদ হওয়ার পর তার স্ত্রী ও সন্তান যখন শবদেহটি উটের পিঠে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছিলেন উট কোনোভাবেই বাড়ির দিকে হাঁটতে রাজি হয়নি। পরে রাসূল (সা.) অবিস্মরণীয়ভাবে এই বৃদ্ধ শহীদ সাহাবির দোয়া কবুল হওয়ার কথা বলেছিলেন। এমনকি বেহেশতে তাঁর খোড়া নিয়ে নিয়ে চলাচল করার কথাও উল্লেখ করেছেন রাসূল (সা.)।

মসজিদে ঘুরে করোনা ছড়ানোর ব্রত নেয়ার আগে জানা দরকার শহীদ আমর ইবনে জুমুহ (রা.) (عمرو بن الجموح) আদতে কে ছিলেন? পায়ের ত্রুটি নিয়ে স্বাভাবিক চলাচল করতে পারতেন না তিনি। উহুদ যুদ্ধের ঘোষণা হলে লাঠিতে ভর দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে তিনি রাসূল (সা.) এর দরবারে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। প্রথমে তাঁর বয়স, অসুস্থ শরীর এবং পায়ের অবস্থা দেখে সাহাবিরা সবাই তাঁকে যুদ্ধে যাওয়া থেকে নিরস্ত্রকরণের চেষ্টা করেন। তিনি তাঁর চার সন্তানের সঙ্গে তিনি উহুদের যুদ্ধে অংশ নেয়ার আগ্রহ থেকে কিছুতেই পিছু হটতে না চাওয়ায় শেষ পর্যন্ত রাসূল (সা.) এর কাছে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে।রাসূল (সা.) এই বৃদ্ধ সাহাবিকে বোঝাতে গিয়ে তাঁর শারিরীক অপরাগতার কথা তুলে ধরে জানালেন তাঁর যুদ্ধে যাওয়া ফরজ নয়।

রাসূল (সা.) যখন প্রশ্ন করলেন তাঁর যুদ্ধগমনের উপায় নিয়ে তখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই বৃদ্ধ সাহাবি জানালেন ‘হে আল্লাহর রসূল! আমার আকাঙ্খা এই যে, আমি এই খোঁড়া পা নিয়েই জান্নাতে গমন করব।’ রাসূল (সা.) তাঁকে আবারও বললেন ‘বয়স ও শারিরীক দিক থেকে আল্লাহ আপনাকে অক্ষম করেছেন, কাজেই আপনার যোগদান না করাতে এমন কি ক্ষতি আছে?’ আমর ইবনে জুমুহ (রা.) কিছুক্ষণ চুপ থেকে অতি বিনয়ের সাথে তাঁর শহীদ হওয়ার ইচ্ছার কথা পুনরুল্লেখ করলেন। একরকম তাঁর পীড়াপীড়িতে প্রাণিত হয়েই রাসূল (সা.) তাঁকে ‍উহুদের প্রান্তরে যাওয়ার অনুমতি দান করেন।

রাসূল (সা.) এর অনুমতি লাভ করার পর আমর ইবনে জুমুহ (রা.) চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। তিনি লাঠিতে ভর করে তাঁর খোঁড়া পা দ্রুত টেনে টেনে বাকি সাহাবিদের সামনে এসে অশ্রুসিক্ত হয়ে বলতে থাকেন; ‘আমি অনুমতি লাভ করেছি। রাসূল (সা.) বলেছিলেন, যোগদান না করাতে ক্ষতির কি আছে? তোমরা জান, এর উত্তরে আমি কি বলেছিলাম?’ লোকেরা প্রশ্ন করল; ‘আপনি কী জবাব দিয়েছিলেন?’ আমর ইবনে জুমুহ বললেন; ‘আমি বলেছিলাম, হে প্রিয় নবী, সে রাসূল আল্লাহর কসম, আমার বিশ্বাস যে, আমি এই খোঁড়া পা টেনে টেনেই বেহেশতে প্রবেশ করব এবং এরপর আল্লাহর রসূল (সা.) আমকে অনুমতি দান করেন।’

পরদিন সুবহি সাদিকে মদিনা থেকে মুসলিম বাহিনী উহুদের দিকে রওনা হয়েছেন। তখন আমর ইবনে জুমুহ (রা.) বাসস্থান থেকে তাঁর চার সন্তানের সঙ্গে তিনিও সবার আগে লাঠিতে ভর দিয়ে বের হয়ে আসেন। এসময় তাঁর হাতে ছিল লাঠির পরিবর্তে একটি লম্বা হাতলযুক্ত বল্লম। অনেক উৎসাহী ও উৎফুল্ল এই সাহাবির স্ত্রী বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তাঁকে কৌতুক করে বললেন ‘আমার মনে হয় আপনি যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসবেন’। আমর ইবনে জুমুহ তাঁর স্ত্রীর এই কৌতুকে অনেক রেগে গিয়েছিলেন।তিনি আকাশের দিকে চেয়ে কিবলামুখী হয়ে দাঁঁড়িয়ে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলেন ‘আল্লাহুম্মা লা-তারুদ্দুনি ইলা আহলি।’ (অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে আমার গৃহের দিকে যেন প্রত্যাবর্তন করতে না হয়।)।

এরপর যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর বীরত্ব পর্যবেক্ষণের সুযোগ হয়েছিল হযরত আবু তালহা (রা.)। তিনি একটি টিলার ওপর দাঁড়িয়ে যুদ্ধের ময়দানে দৃষ্টি রাখছিলেন। তিনি দেখে বিস্মিত হলেন যে, সেই বয়সের ভারে নুয়ে পড়া বীর সাহাবি তার খোঁড়া পায়ে ভর করে প্রবল বিক্রমে শত্রুদের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছেন। এমনকি এই বৃদ্ধের দীর্ঘ বল্লমের আঘাতে একজন কুরাইশ সৈন্য নিহত হতেও দেখেছেন আবু তালহা (রা.)। তারপর যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হয়েছিলেন আমার ইবনে জুমুহ (রা.)।যুদ্ধ শেষে তাঁর স্ত্রী একটি উটের পিঠে করে স্বামী ও পুত্রের লাশ উঠিয়ে মদিনার দিকে রওনা হন। কিন্তু উটটি মাত্র কয়েক পা চলার পর এগিয়ে না গিয়ে সোজা পথিমধ্যে বসে পড়ে।

অনেক চেষ্টা করেও শহীদ আমর ইবনে জুমুহ (রা.) শবদেহ বহনকারী উটটিকে সামনের দিকে চালানো যায়নি। উপরন্তু সে জোর করে উহুদ প্রান্তরের দিকে দৌড়াতে থাকে। তাঁর স্ত্রী বিস্মিত হয়ে রাসূল (সা.) কাছে উপস্থিত হয়ে জানতে চাইলে রাসূল (সা.) তাকে বললেন; ‘উটের প্রতি এটাই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমর যাওয়ার সময় কি বলেছিলেন? তারপর আমরের (রা.) যখন বলেলেন ‘আল্লাহুম্মা লা-তারুদ্দুনি ইলা আহলি’ শীর্ষক দোায়া করার কথা। রাসূল (সা.) তখন বললেন আল্লাহ তাঁর এই বান্দার দোয়া এভাবে সরাসরি কবুল করেছেন।এরপর হযরত আমর ইবনে জুমুহ (রা.) সরাসরি জান্নাতলাভের সুসংবাদ জানিয়েছিলেন রাসূল (সা.)।

 

আজ ভয়াবহ মহামারী করোনার দিনে বিশ্ব মানবতা ধুঁকছে। অনর্থক গোয়ার্তুমি করে মানুষকে ব্রিবত করার কোনো অর্থ নাই। বরঞ্চ একবার ঐ সাহাবী আমর ইবনে জুমুহ (রা.) কথা ভাবুন। তুলনা করার প্রয়োজন নেই কিন্তু ভাবুন আমাদের শহীদ ডা. মঈনের কথা। ঐ সাহাবি যেমন শারিরীক সক্ষমতা না থাকার পরেও মহান ব্রত নিয়ে ‍যুদ্ধে নেমেছিলেন। আমাদের শহীদ ডা. মঈন পিপিপি (মন্ত্রীর ভাষ্যে) আদতে পিপিই ও জীবনের নিরাপত্তার কথা মাথায় রাখেনিনি। তিনি একজন ডাক্তার হিসেবে তাঁর প্রতি অর্পিত দায়িত্বকে গুরুত্ব দিয়ে মানবতার সেবায় জীবন উৎসর্গ করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ডা. মঈনের এই আত্মত্যাগকে কবুল করেন। সবাই পড়েন আমীন।

পাদটীকা: আপনারা যারা করোনায় মরে জান্নাত যেতে চান তারা আদতে বোকার স্বর্গে বাস করছেন। অনেকেই বিশেষত লকডাউন না মেনে মসজিদমুখী মুসল্লিদের যুক্তি মহামারীতে মারা গেলে তারা শহীদ হয়ে যায়।কিন্তু ঐ মানুষ গুলো কেনো বুঝতে চান না শহীদ হওয়া এতটা সহজ কাজ কিংবা ছেলেখেলা নয়। হাক্কুল্লাহ কিংবা হাক্কুল ইবাদের সবগুলো সেক্টরে ব্যর্থ মানুষগুলো ব্যক্তিজীবনে হয়তো অনেক অসৎ। শেষ পর্যন্ত তাদের ধান্দা ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে শহীদ হয়ে যাওয়ার। শহীদ যদি হতে হয় আপনারা মানুষের জন্য কাজ করুন, ডাক্তার নাঈমের মতো যদি মারা যান তবে এ সুযোগ আপনাদের সামনে আসতেই পারে। কিন্তু সবাইকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে ফাজায়েল আমল হাতে এক মসজিদ থেকে আরেক মসজিদে দৌড়ে বেড়িয়ে যারা মনে করেন করোনায় মরে শহীদ হবে, সহজভাবে বললে আপনারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। অবশ্য এ বোকমি এখন অনেক কমে এসেছে। শুধুমাত্র কাঁচাবাজার এবং ব্যাংকগুলোতে সবাই সতর্ক থাকলে বিপদ আরও কমবে ইনশাআল্লাহ।

(Visited 31 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *