অসহিষ্ণু ধার্মিক, অবোধ নাস্তিক আর আমাদের অসময়

অনেক বলার থাকলেও কিছু বিষয় নিয়ে বলতে বা লিখতে বিরক্তি লাগে। সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘটে যাওয়া জানাজাকাণ্ডের পর থেকে তা আবার নতুন করে আসছে। আসলে আমি আস্তিক কিংবা নাস্তিক তথা বিশ্বাসী-অবিশ্বাসীর বাইরে সব অবাস্তব বিষয়গুলোর অনুরণন খুঁজে পাই বাংলার সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস থেকে। আমি বর্ণবাদী জাতি সংকরায়নের তত্ত্বকে পুরোপুরি অস্বীকার করলেও দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। ফলে প্রতিটি পদে পদে অনুভব করি, অন্য দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা বাংলাদেশের থেকে পুরোটা ভিন্ন। এখানে আস্তিক, নাস্তিক, হিন্দু, মুসলিম, বরিশাইল্যা, নোয়াখাইল্যা, মফিজ, হাফিজ কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ান বড় কথা নয়। এখানে বড় কথা বাংলার সংস্কৃতি। আর সে বৈচিত্র্য নিয়ে সম্প্রতি কথা হয় আমার প্রিয় লেখক মো. Abdul Hamid  স্যারের সঙ্গে।ফেইলর ইন সেলস শীর্ষক বইটি পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ায় তিনি নতুন একটি বইয়ের কাজ করছেন। অফ দা রেকর্ড তিনি অনেক মজার মজার পরিস্থিতি শেয়ার করলেন। দীর্ঘক্ষণ আলাপনে তিনি বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থা নিয়ে কিছু অস্বাভাবিক প্রবণতার কথা বললেন যা মার্কেটিং এর তত্ত্বায়নের ক্ষেত্রেও এক অবাস্তব পরিস্থিতির সম্মুখীন করে। ফলে বিশ্বের অন্য দেশের জন্য মার্কেটিং পলিসি যাই হোক বাংলাদেশের সঙ্গে তার মিল থাকার সুযোগ কম।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জানাকাণ্ডের পর প্রসঙ্গক্রমে হামিদ স্যারের দুটি লেখার প্রসঙ্গ চলে আসে। ‘রঙ্গভরা বঙ্গদেশ’ শীর্ষক একটি লেখার শুরুতে স্যারের প্রশ্ন, হঠাৎ যদি জানতে পারেন, আপনার খুব কাছের মানুষটি কৌতূহলবশত মাত্র একবার শুকরের মাংস খেয়েছে, আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? আমি একজনের ব্যাপারে জানি, যার মা এ তথ্য জানার পরে (বিধর্মী হয়েছে বলে) ছেলের সঙ্গে আমৃত্যু কথা পর্যন্ত বলেননি। মজার বিষয় হলো, যে ধর্ম শুকরের মাংস খেতে নিষেধ করেছে, সেই ধর্মই কিন্তু সুদ খাওয়াকে অধিকতর জঘন্য কাজ বলে ঘোষণা করেছে। অথচ আমরা ব্যাংক বা অন্যান্য খাত থেকে নিয়মিত সুদ গ্রহণ করি, তা মোটেই খারাপ লাগে না! আবার স্বল্পতম সময়ে খাওয়ার কাজটি সম্পন্ন করার জন্য উদ্ভব হয়েছিল যে ‘ফাস্টফুড’ আইটেমগুলোর, এখনকার তরুণরা পরিকল্পনা করে একবেলা সময় বরাদ্দ রেখে সেগুলো খেতে যায়! খাবার অর্ডার দিয়ে দীর্ঘ সময় বসে আড্ডা দেয়, কোনো তাড়াহুড়ো থাকে না। এতই যদি অবসর সময় থাকে তাহলে ফাস্টফুড কেন, স্লোফুড খেতে সমস্যা কোথায়? অন্যদিকে খেয়াল করলে দেখা যায়, ধুলোবালিতে ব্যবহারের জন্য তৈরি হওয়া জুতা-স্যান্ডেল বিক্রি হয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে অথচ শাকসবজির মতো খাদ্যবস্তু বিক্রি হয় রাস্তায় ধুলার মধ্যে! আমাদের এরূপ অসংখ্য আচরণ প্রত্যক্ষ করেই হয়তো কেউ বলেছে, ‘রঙ্গভরা বঙ্গদেশ’ অথবা ‘সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ’; আবার কারো মতে, ‘হায় সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!’

সেদিন আমাদের ছোট্ট ছেলেটিকে ‘এই করিনু পণ’ ছড়াটি পড়ে শোনাচ্ছিলাম। তার মা কাছে এসে বলল, ‘পণ’ বোঝার মতো বয়স কি ওর হয়েছে? জবাবে জানতে চাইলাম, তাহলে কোনটা শোনাব? তখন বলল, হাট্টিমা টিম টিম। আমি সবিনয়ে জানতে চাইলাম, ওর মায়েরও কি ‘হাট্টিমা টিম টিম’ বস্তুটা কী তা বোঝার বয়স হয়েছে? উত্তর সহজেই অনুমেয়। তাহলে যে জিনিস সারা জীবনেও দেখবে না, চিনবে না কিংবা বুঝতে পারবে না, শিশুদের পাঠ কেন সে রকম জিনিস দিয়েই শুরু করতে হবে? এর জবাব নেই বলেই হয়তো শিশুদের স্কুলে ভর্তি করার ক্ষেত্রে লটারির মতো ‘জবর-আজব পদ্ধতি’র উদ্ভাবক আমরা! হয়তো সে কারণেই দেশের সর্বোচ্চ স্তরের চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে কোটার (৫৬ শতাংশ) প্রাধান্য বেশি! জানি না এসব কারণেই কিনা বঙ্গদেশে শিক্ষিতরা বছরের পর বছর বেকার থাকে। অথচ স্বল্প বা অশিক্ষিতদের শিডিউল পাওয়া যায় না! অধিকাংশ দর্জি, রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান, ড্রাইভার, কাজের বুয়া হয়তো প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডিই ভালোভাবে পার হয়নি কিন্তু তাদের কখনো কাজের অভাব হয় না! অনেক ক্ষেত্রে লেখাপড়া জানা মানুষগুলো রীতিমতো তাদের দয়ার ওপর নির্ভরশীল।

ছোটবেলা পড়েছি সফদার ডাক্তার নাকি পানি খায় চিবিয়ে। আবার পণ্ডশ্রম কবিতায় জেনেছি, চিলে কান নেয়ার কথা শুনেই আমরা কীভাবে ছুটি চিলের পেছনে। এই হুজুগে স্বভাব বুঝেই কিছু কোম্পানি আমাদের পকেট উজাড় করার মোক্ষম সব দাওয়াই নিয়ে হাজির হয়। যেমন— লম্বা, তীক্ষ, বুদ্ধিমান আর শক্তিশালীরূপে শিশুর তরতর করে বৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য যেসব বস্তু আমরা তাদের খাওয়াই, বিশ্বের অনেক দেশেই সেগুলোর প্রচার ও বিক্রি নিষিদ্ধ রয়েছে। আবার অনেকেই বুঝে যে, তথাকথিত রঙ ফর্সাকারী ক্রিমগুলো দীর্ঘদিন মাখলেও বিশেষ কারো ‘নজর কাড়া’ সম্ভব হবে না, তবুও বছরের পর বছর (অপ) চেষ্টা করে যাচ্ছে কিছু মানুষ; কোম্পানিগুলোরও পোয়াবারো। অন্যদিকে বিশ্বায়নের এ যুগেও (সম্ভবত বাংলাদেশী পণ্যের প্রচার ঠেকাতে) যারা আমাদের স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো সম্প্রচার করে না, আমরা তাদের অনুষ্ঠানগুলো গোগ্রাসে গিলছি। শুধু তা-ই নয়, সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নামে তাদের সিনেমা নিজেদের প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের সুবন্দোবস্ত করে দিচ্ছি! আজব এই দেশে ছাত্রনেতারা যেমন সাধারণ ছাত্রদের সমস্যা নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে তেমন একটা দরকষাকষি করেন না, ঠিক তেমনিভাবে শ্রমিক নেতারা তাদের সহকর্মীদের স্বার্থের চেয়ে মালিকদের স্বার্থরক্ষায় থাকেন অনেক বেশি তৎপর!

বড় ডকুমেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে (অফিশিয়াল রিপোর্ট, থিসিস, সেমিনার পেপার ইত্যাদি) কম্পিউটার কম্পোজ করে অফসেট পেপারের এক পৃষ্ঠায় প্রিন্ট করার হুকুম দেশের সর্বত্র জারি আছে। বুঝলাম, একসময় ফাউন্টেন পেন ব্যবহার করে দুর্বল মানের কাগজের দুই পৃষ্ঠায় লিখলে পাঠের অযোগ্য হয়ে পড়ত বলে এক পৃষ্ঠায় লেখার নিয়ম চালু হয়েছিল। কিন্তু ছাপা-সংক্রান্ত প্রযুক্তির এত উন্নতির পরেও আমরা সেই নিয়ম বদলাতে পারছি না। অথচ বই ছাপার ক্ষেত্রে নিম্নমানের কাগজেও উভয় পৃষ্ঠায় মুদ্রণ হচ্ছে! সব ডকুমেন্ট উভয় পৃষ্ঠায় প্রিন্ট বাধ্যতামূলক করলে বছরে লাখ লাখ কপি কাগজ অপচয় রোধ করা যেত। ওই কাগজ উত্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গাছ কাটতে হতো না, বিদ্যুৎ, পানি, রঙ, শ্রম প্রভৃতি বেঁচে যেত। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? তেমনিভাবে ফটোকপি করা কাগজপত্র সত্যায়িত করার জ্বালা অনেকটা কমেছে, কিন্তু ফটোকপি জমা দেয়ার প্রবণতা এখনো অনেক ক্ষেত্রেই রয়ে গেছে। চূড়ান্তভাবে ভর্তি, নিয়োগ কিংবা সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যেহেতু সনদের মূল কপি যাচাই করা হবেই, সেহেতু এত ফটোকপি নেয়ার যৌক্তিকতা আমার এই ক্ষুদ্রজ্ঞানে ধরা পড়ে না। যেমনটা বাসার স্কুলগামী শিশু বুঝতে পারে না, যারা তাদের দিন-রাত পড়তে বলে, তারা নিজেরা কেন সেটা করে না! বারবার আমরা (মা-বাবা, শিক্ষক) তাদের পড়তে বলি কিন্তু ভুলেও নিজেরা একটা বই হাতে নিই না। সুযোগ থাকলে হয়তো তারা বলত— পড়া যদি এতই ভালো কাজ হবে, তোমরা কেন সেটা করো না?

একজন ঘুষখোর ব্যক্তি তার অসদুপায়ে অর্জিত খাবার খেয়ে স্ফীত করা উদর দেখাতে মোটেই লজ্জা পায় না। অথচ মানবজাতির বংশরক্ষার মহান দায়িত্বপালনকারী একজন গর্ভবতী মা এ দেশে তার উঁচু পেট নিয়ে বাইরে যেতে বিব্রত বোধ করেন! কার লজ্জা পাওয়া উচিত ছিল আর কে লজ্জা পাচ্ছে! আবার বাসায় টয়লেট ঝকঝকে-তকতকে রাখতে যারা সদা সচেষ্ট থাকি, তারাও পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের সময় ন্যূনতম পরিষ্কার রাখার প্রয়োজন অনুভব করি না। ফলে পাবলিক প্লেসের খুব কম টয়লেটই ব্যবহার উপযোগী থাকে। অন্যদিকে হাইকমোড ব্যবহারের ক্ষেত্রে টয়লেট টিস্যু ও ফ্ল্যাশ সচল থাকা অপরিহার্য। অথচ আমাদের দেশে এগুলোর বন্দোবস্ত না রেখেই গণহারে (শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস, সিনেমা হল প্রভৃতি জায়গায়) হাইকমোড বসানো হচ্ছে। ফলে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সেগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। প্রচলিত টয়লেট অপরিষ্কার থাকলেও কোনোমতে ব্যবহার করা যায়; কিন্তু ওগুলো অব্যবহূত থাকছে এবং পরিবেশ নষ্ট করছে। অন্যদিকে উন্নত দেশগুলো আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার পরেও যতটা সম্ভব সূর্যের আলো ব্যবহারে সচেষ্ট হয়। অথচ আমরা প্রথমে ভারী পর্দা দিয়ে অফিস-আদালত অন্ধকার করি, তার পর সারা দিন পাওয়ারফুল লাইট জ্বালিয়ে কাজ করি! ঠিক তেমনিভাবে বাজার করতে বা অন্য কোনো কাজে সামান্য দূরে যেতেও দুই কদম হাঁটতে চাই না, রিকশা বা অন্য কোনো যানবাহন খুঁজি। অথচ সেই মানুষই আলাদা সময় বের করে (সকাল বা সন্ধ্যায়) হাঁটতে বের হই। বিষয়টা অনেকটা এ রকম— বাসায় খড় ভেঙে দুই খণ্ড করে না অথচ অনেক টাকা ফি দিয়ে জিমে যায় শরীরচর্চা করতে!

জন্মের পর থেকে যে ভাষা শুনছি, সবসময় কথা বলছি, তাতে ভুল করতে আমরা মোটেও সংকোচ বোধ করি না। অথচ ইংরেজির মতো বিদেশী ভাষা বলতে গিয়ে সামান্য ভুল হলে নিজেরাও লজ্জিত হই, অন্যরাও সমালোচনা করে। অথচ ভুল হওয়াটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? অন্যদিকে বায়ান্ন সাল নিয়ে আমরা যৌক্তিক কারণেই অত্যন্ত গর্ব বোধ করি। বাংলাদেশ বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্র, যার জনগণ মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় অকাতরে জীবন উত্সর্গ করেছে। অথচ স্নাতক পর্যায়ে অধ্যয়নরত ১০০ শিক্ষার্থীকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় এখন বাংলা ‘কত সাল’ চলছে, সঠিক উত্তর কতজন দিতে পারবে বলে মনে হয়? কোন মাস চলছে বা আজ কত তারিখ বললে তো হতাশার সাগরে ডুবতে হবে। যে সম্পদ নিয়ে আমরা সত্যিই গর্ববোধ করি, সেটা কি সযত্নে রক্ষা করি না? বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে কি তা হচ্ছে? উত্তর অজানা নয়। অন্যক্ষেত্রেও এমন উন্নাসিকতা লক্ষণীয়। গত মাসে যখন বন্যার প্রবল তোড়ে লাখ লাখ মানুষ দিশেহারা, প্রচণ্ড সংকট চলছিল খাদ্য ও পানীয় জলের, তখন তাদের পরিত্রাণের চেয়ে আমাদের ঢের বেশি আগ্রহ ছিল জনাব ‘বঙ্গ বাহাদুর’ বিষয়ে। আবারো প্রমাণ হলো, ‘হাতি বাঁচলেও লাখ টাকা, মরলেও লাখ টাকা’! বিস্ময়করভাবে অনেক সংবাদপত্র এখনো ‘হাতি’-বিষয়ক ঘটনা দুনিয়ার যেখানেই ঘটুক, তা প্রচার করে চলেছে অথচ বন্যার কবলে পড়ে নিঃস্ব হওয়া মানুষগুলোর পুনর্বাসন বিষয়ে তাদের উদাসীনতা লক্ষণীয়।

কয়েকদিন আগে রাজশাহীর সাহেব বাজারে দেখলাম দেদার বিক্রি হচ্ছে ‘মরিচ চা’, তাও আবার উচ্চমূল্যে! ফুটপাতে লেবু চা ৬ টাকা হলেও মরিচ দিয়ে বিশেষভাবে বানানো চা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কাপ ১০ টাকায়; ভোক্তা সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। চায়ের এই রূপ দেখেই আমার বিষম খাওয়ার অবস্থা। খাবার প্রসঙ্গে মনে পড়ল, নামকরা রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে দাম জিজ্ঞেস করতেও আমাদের প্রেস্টিজে বাধে। দুজন মানুষ খাবার খেয়ে ভ্যাটসহ ২ হাজার টাকার ওপর বিল দিয়ে হাসিমুখে বিদায় নিই। অথচ ফেরার সময় রিকশাওয়ালা ১০ টাকা ভাড়ার সঙ্গে ২ টাকা অতিরিক্ত আবদার করলে দিতে অস্বীকার করি। মাঝে মধ্যে ঝগড়ায় লিপ্ত হই, কথা কাটাকাটি থেকে চড়-থাপ্পড় পর্যন্ত অগ্রসর হই! বাঙালি বাবুদের দৈনন্দিন জীবনে এমন হাজারো বিপরীতমুখী আচরণের উদাহরণ রয়েছে। আর্থসামাজিক নানা মাপকাঠিতে আমরা ক্রমে এগোচ্ছি। জাতি হিসেবে গর্বের জায়গাগুলো অনেক বেশি স্পষ্ট হচ্ছে। চারপাশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহার কিংবা ক্রমবর্ধমান শিক্ষার হার থেকে সর্বোচ্চ কল্যাণ পেতে আমাদের চিন্তা ও কর্মে আরো বেশি যুক্তিনির্ভর হওয়া দরকার।

হ-য-ব-র-ল ভাবনা শীর্ষক লেখাতেও স্যার শুরু করেছেন একটা প্রশ্ন দিয়ে। আমরা যখন কাউকে সালাম দিই— কথাগুলো কি বুঝে বলি, নাকি নিতান্তই ‘কথার কথা’ বলে থাকি? সালামের বাণীগুলো সত্যিই হূদয়ঙ্গম করতে পারলে আমরা কি পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের বারবার সালাম দেয়ার অজুহাত খুঁজতাম না? ক্ষমতাধর ও উচ্চপদে আসীন ব্যক্তিদের উঠতে-বসতে সালাম দিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলি, অথচ সন্তান মাকে সালাম দিতে দেখলে (অনেকেরই) হাসি পায়! এ বিষয়ে ভাবতে গিয়ে মনে হলো, যে ধর্মের মানুষ পারস্পরিক সাক্ষাতে (এমনকি অচেনা হলেও) ‘শান্তি’ কামনা করে, বিশ্বব্যাপী তারাই আজ ‘সন্ত্রাসী’ বলে গণ্য! অন্যদিকে ট্রাম্প-পুতিনরা ‘যুদ্ধ করে’ এমনই শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন যে, মাঝে মাঝে ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার’ পর্যন্ত জুটে যায়!

ছোটবেলা থেকে শুনছি (অনেকটা বিশ্বাসও করি), ‘প্র্যাকটিস মেকস এ ম্যান পারফেক্ট।’ কিন্তু যখন বড় ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশন সামনে আসে, হিসাবটা একেবারে মেলে না! তারা যুগের পর যুগ দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা লিখছেন অথচ পারফেক্ট তো দূরের কথা, পাঠোদ্ধার করতেই ঘাম ছুটে যায়! আবার আমাদের দেশে সবাই জানে, রান্না মূলত নারীদের কাজ। অথচ আজ পর্যন্ত (বিয়ে, পিকনিক, কুলখানির মতো) বড় কোনো অনুষ্ঠানে রান্নার দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো ‘মহিলা বাবুর্চির সাক্ষাৎ পেলাম না! এমনকি মফস্বলের হোটেল থেকে শুরু করে টমি মিয়া পর্যন্ত সব শেফও পুরুষ মানুষ— আজব না ব্যাপারটা?

ঠিক তেমনিভাবে প্রতিষ্ঠিত এক ধারণা হলো, আমাদের সমাজ ‘পুরুষশাসিত। অথচ রাষ্ট্রপতি ব্যতীত প্রায় তিন দশক ধরে আমাদের নির্বাচিত সব বড় পদে (বর্তমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার) নারীরা কৃতিত্বের সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করছেন! অন্যদিকে জেন্ডার ইকুয়ালিটির তথাকথিত স্বর্গরাজ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজো কিন্তু একজন নারীকে সরকারপ্রধান হিসেবে স্বাগত জানাতে পারেনি! সিংহভাগ মানুষের বিশ্বাস— ডেমোক্র্যাট প্রার্থী একজন পুরুষ হলেই ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হতে পারতেন না! হিলারি ক্লিনটনের মতো একজন যোগ্য নারী প্রার্থী তারা আগামী কয়েকশ বছরে পাবে কিনা জানি না। তবে আমরা কিন্তু আড়াইশ বছর আগেই (১৭৪৮ সালে) নাটোরের রানী ভবানীকে সর্বোচ্চ আসনে বসিয়ে প্রমাণ করেছি, যোগ্য নারীদের মর্যাদার আসনে বসাতে আমরা তাদের চেয়ে ঢের এগিয়ে।

গত রাতে পড়ার ঘরে বসেই স্থানীয় এক ওয়াজ মাহফিল শুনতে পাচ্ছিলাম। এক বক্তা হঠাৎ ইহুদি প্রসঙ্গ টেনে এনে ওই জনগোষ্ঠীর কঠোর সমালোচনা করলেন। তখন মনে হলো, আচ্ছা, বিশ্বের মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ মানুষ যা চায়, তা-ই হয়। অথচ আমরা সংখ্যায় দেড়শ কোটির বেশি হয়েও (২৪.১%) এক ‘প্রার্থনা’ ছাড়া কিছুই করতে পারি না— কেন এমনটা হয়? সামনে ফেসবুক খোলা ছিল, হঠাৎ করেই সূত্রটা মিলে গেল! ভাবলাম— এমন অসংখ্য রজনীর ওয়াজ বনাম জাকারবার্গের একটা সৃষ্টি! মানুষকে কল্যাণের পথে ডাকার এত আয়োজন, তেমন কাজ হচ্ছে না; অথচ সে কাউকে ডাকছে না, তবু মানুষ পঙ্গপালের মতো ছুটছে! তখন বুঝলাম, লাখো কথার চেয়েও জুতসই একটা ‘কাজ’ কত বেশি কার্যকর!

ফেসবুক প্রসঙ্গে মনে পড়ল ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়া বইমেলার কথা। এ মেলাকে মাঝেমধ্যে ফেসবুকের ‘বাংলাদেশ সংস্করণ’ মনে হয়। অর্থাৎ লেখকই যার পাঠক, পাঠকই যার লেখক! ফেব্রুয়ারির কোনো একদিন ‘লেখকমুক্ত দিবস’ ঘোষণা করলে বোঝা যেত মেলায় প্রকৃত দর্শনার্থীর সংখ্যা কত? অন্যদিকে ফেসবুকে মাঝেমধ্যেই অনেকের স্মার্টফোনের স্ক্রিনশট নজরে আসে। হঠাৎ খেয়াল করলাম, সবার (বিশেষত তরুণদের) ফোনের চার্জ ৩০ শতাংশের চেয়েও কম! আরেকটু যাচাই করে দেখলাম, ঘটনাটা কাকতালীয় নয়। গল্পচ্ছলে এক বন্ধুর সঙ্গে বিষয়টা শেয়ার করায় সে বিরক্ত হয়ে বলল, ‘স্মার্টফোন জিনিসটা তরুণদেরই (বড় একটা অংশের) চার্জ ডাউন করে দিচ্ছে, আর তুমি ভাবছ ফোনের চার্জ নিয়া!’

ইউরোপ-আমেরিকায় গায়ের রঙ একটু বাদামি করার আশায় অনেকে সমুদ্রসৈকতে সারা দিন ‘স্কিন বার্ন’ করে। আমাদের দেশে পরিস্থিতি ঠিক তার উল্টোটা। গাছের ছায়ায়ও অনেকের ছাতা খোলা থাকে, রোদ যেন কোনোভাবেই চামড়া পর্যন্ত ঘেঁষতে না পারে! সম্ভবত এ বিষয়টাকে পুঁজি করে এক কোম্পানি তাদের পণ্য বেচার জন্য দাবি করে— দুবাই, সিঙ্গাপুর আর জাপানের ক্রিমকে হারিয়ে তাদের ব্র্যান্ডটি সেরা হয়েছে! আচ্ছা, কারা ওই প্রতিযোগিতার আয়োজক ছিলেন? বিচারক ছিলেন কারা, অংশ নিয়েছিল কোন দেশের কতটা ব্র্যান্ড? তাছাড়া এমন একটা ‘চ্যাম্পিয়ন ক্রিম’ ধনী দেশগুলোর ক্রেতাদের টার্গেট না করে আমাদের বস্ত্রবালিকা জরিনা, সখিনা, আম্বিয়াদের গায়ের রঙ ফর্সা করার জন্য উঠেপড়ে লাগল কেন; যাদের (অনেকেরই) কিনা আয় দিনে ১ ডলারেরও কম!

দিনবদলের হাওয়ায় আমাদের তরুণ-তরুণীরাও ‘স্বাধীন’ হচ্ছে। তারা কথায় কথায় মা-বাবাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, সে এখন বড় হয়েছে। অর্থাৎ সে কী করবে না-করবে, কখন কীভাবে করবে— এসব বিষয়ে তার ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা’য় হস্তক্ষেপ করা যাবে না। সম্ভবত ইউরোপ-আমেরিকায় এমনটা হয় বলে শুনেছে, তাই নিজেরাও সেটা ভোগ করতে উদ্যত। কিন্তু একটা বিষয় তারা মোটেই খেয়াল করে না, ওইসব দেশে মা-বাবার যত ধন-সম্পদই থাকুক না কেন, তরুণ-তরুণীরা ১৬ বছর বয়স হলেই কাজ খুঁজতে শুরু করে।

স্বপ্ন দেখতে থাকে, যেদিন ১৮ বছর পূর্ণ হবে, সেদিনই নতুন বাসায় উঠবে; বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে সেখানে নিজের মতো বসবাস করবে। সেজন্য কাজ খুঁজতে তারা ক্রমেই মরিয়া হয়ে ওঠে। সেটা ড্রাইভিং, শপিংমলের সেলসম্যানশিপ, রেস্টুরেন্টের বেয়ারাগিরি, এমনকি ট্রেন-বাসে গান শুনিয়ে, জাদু দেখিয়ে— যেকোনো উপায়ে অর্থ উপার্জন করতে তত্পর থাকে। বয়স ১৮ বছর হওয়ার পরে প্রায় সবাই সেটা করেও থাকে। অথচ আমাদের সন্তানরা স্বাধীন হতে চায় মা-বাবার পয়সায়! একই আকাঙ্ক্ষা শিল্পোন্নত দেশে তাদের কর্মঠ করে তুলছে আর আমাদের বানাচ্ছে অলস-কুঁড়ে, তাই না?

শোবিজের মডেলরা ‘তারুণ্য’ ধরে রাখতে নিঃসন্দেহে কঠোর পরিশ্রম করেন। পেশার চাহিদা মোতাবেক সেটা করাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মাঝেমধ্যে অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করি, টিভি বিজ্ঞাপনে মডেলের গেটআপ একজন তরুণীর, অথচ শিশুখাদ্যের বিজ্ঞাপনে ক্লাস ফোর/ফাইভে পড়া শিশুর মায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে! দেখে ভাবি, খুব সম্ভবত মেয়েটার বাল্যবিবাহ হয়েছে, নইলে এ বয়সে এত বড় সন্তানের মা হয় কী করে! অভিনয়শিল্পীরা হয়তো সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না বলে যেকোনো কাজ করতে রাজি হন কিন্তু নির্মাতাদের চোখেও কি বিষয়টা ‘অস্বাভাবিক’ লাগে না?

এ প্রসঙ্গে মনে পড়ল, স্কুল থেকে চার-পাঁচ বছর বয়সী শিশুর ডায়েরিতে প্রতিদিন লিখে দেয়া হয়— বাসায় শিখবে! যদি বাসায় শেখাই নিয়ম, তবে স্কুলে তারা কী শিখছে? পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় বই-খাতা বাসায় নেয়া নিষিদ্ধ; কোমলমতি শিশুদের লিখিত কোনো পরীক্ষাও হয় না! আমার জানামতে, কোপেনহেগেনে বসবাসকারী এক বাংলাদেশী অভিভাবক চেষ্টা করেছিলেন সন্তানের বইয়ের এক সেট ফটোকপি ম্যানেজ করতে। কর্তৃপক্ষ জানার পরে সতর্ক করে বলেছে, বাসায় শিশুকে পড়ার জন্য চাপ দিলে তারা পুলিশকে অবগত করতে বাধ্য হবে! অর্থাৎ ওই বয়সে যা শেখা দরকার, তার জন্য স্কুলই যথেষ্ট। অথচ আমরা? অবুঝ শিশুদের বিদ্যাসাগর বানাতে ‘দুর্বহ’ সব বিষয়বস্তু তাদের ঘাড়ে চাপাচ্ছি। হয়তো সে কারণেই এক যুগের বেশি সময় বাধ্যতামূলকভাবে পড়ার পরেও (অধিকাংশ শিক্ষার্থী) দুই লাইন ঠিকমতো ইংরেজি বলতেও পারে না, লিখতেও কষ্ট হয়!

অন্যদিকে উৎপাদন, মজুদ ও বণ্টনের প্রতিটি ধাপে খাদ্যদ্রব্যে বিষাক্ত সব বস্তু মিশিয়ে আমরা যেন পুরো জাতি আত্মাহুতি দেয়ার পণ করেছি। যে চীন সব ধরনের পণ্য উৎপাদনে দুই নম্বরির ওস্তাদ, তারাও খাদ্যে ভেজাল দেয়াকে ‘প্রিন্সিপাল ক্রাইম’ হিসেবে গণ্য করে এ-জাতীয় অপরাধে জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছে। অথচ আমরা? চাল-ডাল, মাছ-মাংস, ফল-সবজি, ডিম-দুধ সবকিছুতে নির্বিকারভাবে ক্ষতিকর পদার্থ গ্রহণ করছি। ফলে নানা জটিল রোগে ভুগছি, মানবসম্পদের উৎপাদনশীলতা হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত। চিকিৎসার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে— সবকিছুকে নিয়তি বলে মেনে নিচ্ছি। এ মরণ খেলা সহসা থামবে বলে আশাও করতে পারছি না। কারণ রাশ টানার নেই কোনো কার্যকর উদ্যোগ!

আমাদের দেশে একজন মানুষের বয়স ৬০ বছর হলেই তাকে রেগুলার কাজকর্মের অনুপযোগী ভাবা হয়। তাই শারীরিকভাবে সুস্থ-সবল থাকা সত্ত্বেও তাদের অবসরে পাঠানো হয়। অথচ বিস্ময়করভাবে সেই মানুষটাই রাজনীতির মাঠে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে পুরোপুরি ফিট হয়ে যান! ছোট্ট একটা দপ্তর বা সেকশনের দায়িত্বও সুষ্ঠুভাবে নির্বাহ করতে পারবেন না বলে যাকে বাড়িতে পাঠানো হলো, সেই মানুষটাই দেশের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দাপটের সঙ্গে পালন করার সক্ষমতা দেখান! তাহলে কি ‘অবসরের বয়সসীমা’ পুনর্বিবেচনা জরুরি হয়ে পড়েছে, নাকি অন্য কিছু?

ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি কৃষকের সন্তান কিংবা স্টিভ জবস তরুণ বয়সে অর্থাভাবে দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতেন, বন্ধুর বাবার পরিত্যক্ত গ্যারেজে রাত কাটাতেন— এমন তথ্য আমাদের অনেককেই বেশ আন্দোলিত করে। খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ি, অন্যদের সঙ্গে গল্প করি, সংশ্লিষ্ট লিংক আবেগভরা মন্তব্যসহ শেয়ার দিই। অথচ আমাদেরই কোনো এক সহকর্মী বা সহপাঠী এমন সংগ্রাম করে ভালো কিছু করছে জানামাত্রই বলে উঠি— জানতাম তো, সে একটা ছোটলোক/চাষার বাচ্চা! যে ব্যক্তি আবেগতাড়িত হয়ে প্রায়ই দেশ-বিদেশের এমন উদাহরণ দেন, মেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রে এমন একটা ছেলের পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসায় তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন! হয়তো বাংলা সিনেমার স্টাইলে বলেও বসেন— ফকিন্নির পুতের সাহস কত, আমার মাইয়ার দিকে চোখ তুইলা চায়!

শোনা যায়, পৃথিবীর অন্য ভাষায় ‘পরশ্রীকাতরতার সমার্থক কোনো শব্দ নেই। এ দাবি কতটা সঠিক তা জানি না; তবে উচ্চপদে চাকরি, লটারিতে বড় পুরস্কার কিংবা যোগ্য পাত্র-পাত্রীর সঙ্গে বিয়ের মতো ঘটনা অপরিচিত কারো জীবনে ঘটলে আমাদের মোটেই ‘খারাপ’ লাগে না। কিন্তু সেই সফলতা যদি পরিচিত কেউ পায়, তখন ‘মানতে খুব কষ্ট হয়!’ এমনকি তার সম্পর্কে দু-চারটা নেতিবাচক তথ্য শেয়ার করে সে যে এ অর্জনের জন্য মোটেও যোগ্য নয়, তা প্রমাণেও হয়ে উঠি তত্পর। আমার পরিচিত কেউ সফল হয়েছে, বড় কিছু অর্জন করেছে, তাতে আমারই তো সবচেয়ে বেশি খুশি হওয়া উচিত ছিল, তাই না? হয়তো এ রকম হাজারো বৈপরীত্য দেখেই আলেকজান্ডার তার সেনাপতিকে বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘সত্যিই সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!’

তাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘটতে থাকা ধারাবাহিক ঘটনা নিয়ে আঞ্চলিকভাবে তাদের বিষেদগার করাটা পুরোপুরি সাম্প্রদায়িক একটা চিন্তা। অন্যদিকে যারা শুধুমাত্র জানাজাকাণ্ডকে সামনে রেখে ইসলামধর্মের বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তাদের খেয়াল করার কথা ভারতে গরুর শেষকৃত্যে কিভাবে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছে। একইভাবে জনৈক ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতার বাবার জানাজাতেও জড়ো হয়েছিল অগণিত মানুষ। সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তিদিনেও শাহবাগে জড়ো হয়েছিলেন অগণিত মানুষ। সবথেকে বড় কথা এই জড়ো হওয়ার প্রবণতাকে বাংলা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে দেখা উচিত। আর সেটা বিশ্লেষণ করতে গেলে বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস সম্পর্কে ধারণার পাশাপাশি চারপাশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য দেখার মতো চোখ থাকতে হবে।

সম্প্রতি আমার ছোট ভাই জনৈক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে কথা হয়। সে জানালো তারা যখন কোনও জায়গায় জটলার খবর পেয়ে রেইড দিতে যায় অনেক মানুষের সঙ্গে তাদের দেখা হয় যারা কেবলমাত্র ম্যাজিস্ট্রেটের রেইড দেখার জন্য হাজির হয়। ফলে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্য দেখা থেকে শুরু করে পাশের বাড়ির দাম্পত্য কলহ শোনা এটাও ঐতিহ্যের বাইরে নয়।তাইতো ক্যাটারপিলার এক্সাভেটর দিয়ে রাস্তা খনন কিংবা বিদ্যুত্বের খাম্বা পোঁতা এগুলো দেখতেও এদেশে জটলা হয়। কোনো ব্যক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা বোঝার জন্যও বিকল্প নাই জন সমাগমের। এক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতা কিংবা ওয়াজী হুজুর থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দোকানে বাকি খাওয়া ছ্যাঁচড়া নেতা সবার পরিস্থিতি অভিন্ন।

আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি তাদের ক্ষেত্রেও পেছনে ছাত্র-ছাত্রী ঘুরঘুর করানোর একটা গুরুত্ব আছে। যেমন, আমাদের জনৈক শিক্ষক ফালতু সহজ বিষয়গুলোকে অপেক্ষাকৃত কঠিন করে পড়ানোর চেষ্টা করতেন, পাশাপাশি জোর করে জ্ঞানী সাজার তাঁর কি চেষ্টা। একইভাবে লুঙ্গি কাছা দিয়ে তার উপর প্যান্ট পরা, দিনের পর দিন গোল না করা, মাথা ন্যাঁড়া করা কিংবা ছাত্রদের নিয়ে বিঁড়ি ফোঁকার মতো কাজ তিনি করতেন শুধুই দৃষ্টি আকর্ষণ করে জনসমাগম করার জন্য। এর বিপরীতে তাঁরই ক্লাসমেট আমাদের আরেক শিক্ষক ক্লাসের মধ্যে বলে বসতেন ‘আমি ঢাকার ছেলে। আমি কি লুঙ্গি কাছা দিয়ে বরিশাল থেকে লঞ্চে ঝুলতে আসছি নাকি’। এই বিষয়গুলো বুঝলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিষয়ের সঙ্গে ধর্মকে যুক্ত করে অহেতুক বক্তব্য রাখার কোনো সুযোগ নাই। এগুলোকে বাংলা ও বাঙালির আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় খুবই সাধারণ ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে হবে। তবে ইসলামোফোবিয়া যাদের সম্বল সে সব স্থূলবুদ্ধিবৃত্তির মানুষের কাছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা নিশ্চিত করে তুরুপের তাস হয়ে গেছে নি:সন্দেহে। কারণ তারা কোনো লেখাপড়া না করেও শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষকে বুলিং এর মাধ্যমে বছরের পর বছর তাদের অবিশ্বাসের ব্যবসা চালিয়ে নিতে পারবে। যাই হোক সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক। আমরা সংঘাত ও গালাগাল নয়, বরং শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ চাই।

(Visited 31 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *