গিরিশচন্দ্র সেন কুরআনের প্রথম বঙ্গানুবাদকারী নন?!?

বাংলাদেশে ইসলামের আগমনের ইতিহাস নিয়ে যে জটিলতা তার সঙ্গে আল কুরআন বঙ্গানুবাদের মিথ ও বাস্তবতার যোগসূত্র রয়েছে। মধ্যযুগের কবি শাহ মুহম্মদ সগীর সর্বপ্রথম কোরআনের সুরা কাব্যভাষায় অনুবাদ করেছিলেন বলে গবেষক মোহাম্মদ হান্নান দাবি করেছেন। যদিও জনপ্রিয় ইতিহাসে উনিশ শতকের গিরিশচন্দ্র সেনকে প্রথম কুরআন অনুবাদক বলে প্রচার করা হচ্ছে, এখানে হারিয় গেছে ইতিহাসের মূল বাস্তবতা। একজন অমুসলিম হিসেবে তাঁর এই কাজকে অনেক গুরুত্ব দিয়ে প্রচারের অন্তরালে হারিয়ে গেছে পাদ্রি তারাচরণ মিত্রের নাম। হিন্দু থেকে খ্রিস্টান হওয়া এই পাদ্রি তারাচরণ মিত্র ভাই গিরিশের অনেক আগেই প্রায় ১২ পারা কুরআন অনুবাদ করেছিলেন। তবে আংশিক অনুবাদ যদি ধরতে হয় তবে প্রথম অনুবাদক ১৩৮৯ সালের কবি শাহ মুহম্মদ সগীর যিনি কাব্যভাষায় এটির অংশবিশেষ অনুবাদ করেছিলেন। তবে তার অনুবাদের অস্পষ্টতার কারণে যদি অন্য কাউকে নিতে হয় তবে অবশ্যই তিনি মাওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়া, যিনি ১৮০৮ সালে কুরআন বঙ্গানুবাদ করেছিলেন। এরপর ১৮৩৬ সালে আল কুরআনের  পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ করেনছিলেন মাওলানা নাঈমুদ্দীন

শাহ মুহাম্মদ সগীরের যুগপৎ বাংলা পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে কুরআন অনুবাদ করার পরে যদি পূর্ণাঙ্গ কুরআন অনুবাদের কৃতিত্ব কারও উপরে যায় তবে তিনি ১৮০৮ সালের অনুবাদক আমির উদ্দিন বসুনিয়া। আমরা মোহাম্মদ হাননানের গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে ধারাবাহিকভাবে কুরআন অনুবাদের ইতিহাস জেনে নেই। মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহর আলোচনায় প্রথম এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার সুযোগ হয়েছে। অনেকে উনার রেফারেন্সে এই বিষয়টি নিয়ে লিখছেন। ইতিহাসের সত্য উদঘাটনের স্বার্থে বিষয়টি আলোচনা হওয়া জরুরি মনে করছি। আগ্রহীরা সময়কাল মিলিয়ে নেন– কারও দ্বিমত থাকলে অবশ্যই মন্তব্যের ঘরে জানাবেন। উপযুক্ত তথ্য থাকলে সেটিও প্রদানের অনুরোধ করছি। প্রকাশক ভাই গিরিশ চন্দের কুরআন বঙ্গানুবাদের যে মিথ তার থেকে উত্তরণ জরুরি।

১৩৮৯ : শাহ মুহম্মদ সগীর। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম ঐতিহাসিক কবি ছিলেন শাহ মুহম্মদ সগীর। তিনিই বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম পবিত্র কোরআনের সুরা অনুবাদ করেন। সগীর যুগপৎ বাংলা পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে কুরআন অনুবাদ করেছেন। পবিত্র কুরআন এমনিতে আরবি ভাষার কাব্য মাধ্যমে ছন্দোবন্ধে প্রকাশিত। আর উনিশ শতকে যখন বাংলা ভাষায় কুরআন অনুবাদ হতে শুরু করেছিল, তখন বেশির ভাগই কাব্য আকারে তা অনূদিত হয়েছে। (ড. মোহাম্মাদ হাননানের বিশেষ গবেষণাসূত্রে প্রাপ্ত তথ্য)

১৬২০ : আবদুল হাকিম (১৬২০-১৬৯০)। মধ্যযুগের বাঙালি কবিদের মধ্যে কট্টর ভাষাপ্রেমী ছিলেন আবদুল হাকিম। তাঁর ‘নূরনামা’ কাব্যে বাংলা ভাষায় কুরআন অনুবাদের বিশেষ তাগিদ প্রকাশিত হয়েছে।

১৮০৮ : আমির উদ্দিন বসুনিয়া। রংপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন আমির উদ্দিন বসুনিয়া। স্পষ্ট বাংলায় তিনিই সবার আগে পবিত্র কুরআন অনুবাদ করেন। (মুহম্মদ মুজিবুর রহমান : বাংলা ভাষায় কুরআন চর্চা, ঢাকা, ১৯৮৬) কিন্তু বাংলা ভাষায় কুরআন অনুবাদের ইতিহাসবিষয়ক অন্য এক গবেষক বলেছেন, বসুনিয়ার ‘অনুবাদটি ছিল বাংলা পুঁথি সাহিত্যের ভাষায় আমপারার কাব্যানুবাদ।’ (ড. মোহাম্মদ আবদুল অদুদ : বাংলা ভাষায় কুরআন চর্চা : উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, আল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ একাডেমি, ঢাকা, ২০০৯, পৃষ্ঠা ৯৫) আমির উদ্দিন বসুনিয়ার অনুবাদটি ছিল খণ্ডিত। প্রথম যুগের অন্যান্যের মধ্যে তিনিও পবিত্র কোরআনের ৩০তম পারা আমপারা বাংলা পয়ার ছন্দে অনুবাদ করেন।

১৮৬৮ : আকবর আলী। কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন আকবর আলী। তিনি ‘তরজমা আমছেপারা’ নাম দিয়ে পবিত্র কুরআন অনুবাদ করেন এবং ১৮৬৮ সালে কলকাতা থেকেই তা প্রকাশ করেন। পবিত্র কোরআনের বাংলা অনুবাদের বিশিষ্ট গবেষক মোফাখখার হুসেইন খান সরাসরি মন্তব্য না করলেও আকবর আলীকেই বাংলা ভাষায় প্রথম কুরআন অনুবাদক সাব্যস্ত করেছেন।

১৮৭৩ : পাদ্রি তারাচরণ মিত্র। হিন্দু থেকে খ্রিস্টান হয়েছিলেন তারাচরণ মিত্র। পবিত্র কোরআনের প্রথম ১২ পারা তিনি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন এবং ১৮৭৩ সাল থেকে কলকাতার বঙ্গমিহির নামক একটি পত্রিকায় তা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করতে থাকেন। পরে ১৮৮২ সালে পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করেন।

১৮৮১ : গিরিশচন্দ্র সেন (১৮৩৫-১৯১০)। তৎকালীন পূর্ব বাংলার বৃহত্তর ঢাকার বর্তমান নরসিংদী জেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন গিরিশচন্দ্র সেন। তিনি প্রথমে ছিলেন হিন্দু, পরে ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী হন। বাংলা ভাষায় পবিত্র কোরআনের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ প্রথম তিনিই প্রকাশ করতে সমর্থ হন। ১৮৮১ সালে তাঁর অনূদিত পবিত্র কোরআনের প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। ১৮৮৫ সালের মধ্যে কুরআন অনুবাদের সব খণ্ড প্রকাশিত হয়। তাঁর অনুবাদে সংস্কৃতজাত বাংলা শব্দের প্রাবল্যের কারণে তৎকালীন মুসলিমসমাজে তা জনপ্রিয়তা লাভ করেনি।

১৮৮৭ : মাওলানা নঈম উদ্দিন (রহ.) (১৮৩২-১৯০৮)। গিরিশচন্দ্র সেনের কুরআন অনুবাদের ঘটনা যে মুসলিমসমাজে বেশ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় পবিত্র কুরআন বাংলা ভাষায় অনুবাদে বাঙালি মুসলিম আলেমদের তাৎক্ষণিক আগমনের ঘটনায়। বাঙালি আলেমসমাজ এর আগে কুরআন বঙ্গানুবাদের বিষয়টিতে ততটা গুরুত্ব দেয়নি, কারণ সে সময় পবিত্র কোরআনের আরবি, ফারসি ও উর্দু অনুবাদ শিক্ষিতসমাজে সুলভ ছিল। সে সময় উচ্চশ্রেণির হিন্দু-মুসলিম এবং শিক্ষিত মুসলিম সমাজে ফারসি ও উর্দু ভাষা ভালোভাবেই প্রচলিত ছিল। এ প্রেক্ষাপটেই মাওলানা নঈম উদ্দিন সেই উষাকালে বঙ্গভাষায় পবিত্র কুরআন অনুবাদে এগিয়ে এসেছিলেন।

১৮৮৯ : আকবর উদ্দিন। তিনি উত্তর বাংলার দিনাজপুর থেকে ১৮৮৯ সালে পবিত্র কোরআনের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেন। অনুবাদ গ্রন্থটি পাওয়া না গেলেও বাংলা ভাষায় মুসলিম লেখক গ্রন্থপঞ্জিতে (মো. আবদুর রাজ্জাক, রাজশাহী : ১৯৮৮ প্রণীত) এই অনুবাদের কথা উল্লিখিত হয়েছে। তিনি তাঁর অনুবাদের নাম দিয়েছিলেন ‘কুরআন’।

১৮৯১ : ফিলিপ বিশ্বাস। বাঙালি (দেশীয়) খ্রিস্টানের হাতে এই প্রথম পবিত্র কুরআন অনূদিত হয়। কলকাতা থেকে ১৮৯১ সালে প্রকাশিত এই অনুবাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম ধর্মকে হেয় করা। আর এ জন্য তা বিনা মূল্যে বিতরণ করা হতো। পরে মুসলিমদের আপত্তির কারণে ব্রিটিশ সরকার অনুবাদটি বাজেয়াপ্ত করে। ১৮৯১ থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭ বছর এভাবে পত্রপত্রিকায় তাঁর অনূদিত পবিত্র কুরআন প্রকাশ অব্যাহত থাকে। ১৯০৭ সালে ২৯ সংখ্যক পারা সুরা তাবারাকাল্লাজি গ্রন্থাকারে কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন। এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ১০১।

১৯০৫ : মাওলানা আব্বাছ আলী (১৮৫৯-১৯৩২)। গবেষকদের মতে, মাওলানা আব্বাছ আলী হলেন বাংলা ভাষায় কোরআনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুসলমান অনুবাদক। এর আগে মাওলানা মঈনুদ্দীন কুরআন অনুবাদের যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তা পূর্ণাঙ্গভাবে সফল হয়েছিল তাঁর সন্তানদের দ্বারা। কিন্তু মাওলানা আব্বাছ আলী নিজে পবিত্র কোরআনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ সমাপ্ত করতে সমর্থ হন।

১৯০৫: মওলানা আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮)। বাঙালি মুসলিম আলেমদের মধ্যে মওলানা আকরম খাঁ পবিত্র কুরআন অনুবাদের সঙ্গে নানাভাবে জড়িত ছিলেন। প্রথমত, গিরিশচন্দ্র সেনের অনুবাদকে অভিনন্দিত করে তিনি প্রথম এ বিষয়ে আলোচনায় আসেন। পরে মাওলানা আব্বাছ আলীর সঙ্গে যৌথভাবে ১৯০৫ সালে কুরআন অনুবাদে অংশগ্রহণ করেন। যৌথ অনুবাদটি ছিল তিন ভাষায় সমন্বিত। আরবি, বাংলা ও উর্দু ভাষায় এই কুরআন অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল।

১৯০৮ : রেভারেন্ড উইলিয়াম গোল্ডস্যাক (১৮৬১-১৯৫০)। সাউথ অস্ট্রেলিয়ান ব্যাপ্টিস্ট মিশনের পক্ষ থেকে রেভারেন্ড গোল্ডস্যাক ১৯০৮ সালে অপপ্রচারের উদ্দেশ্যে পবিত্র কুরআন অনুবাদ করে ফরিদপুর থেকে প্রকাশ করেন। মোট ১২ খণ্ডে তিনি পুরো কুরআন অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলেন। এ জন্য তাঁর সময় লেগেছিল মোট ১২ বছর।

১৯১০: শ্রী কিরণ গোপাল সিংহ (১৮৮৫-১৯৪২)। ভাই গিরীশ চন্দ্র সিংহ ছিলেন ব্রাহ্ম। ফলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে একমাত্র কিরণ গোপাল সিংহই পবিত্র কুরআন অনুবাদে এগিয়ে এসেছিলেন। ইসলাম ধর্মের প্রতি অনুরাগ থেকেই কিরণ গোপাল সিংহ পবিত্র কুরআন বাংলা ভাষায় অনুবাদে হাত দিয়েছিলেন।

১৯১১ : মুহাম্মদ মেহেরুল্লাহ সানী (১৮৫৬-১৯১৮)। সিরাজগঞ্জ জেলার সমাজকর্মী ও সাহিত্যিক মেহেরুল্লাহ সানী পবিত্র কুরআন বাংলায় অনুবাদ করেন এবং এর নাম দেন বাংলা কুরআন শরিফ। আলেমসমাজ কুরআন অনুবাদের এ রকম নাম গ্রহণ করেনি, কারণ ‘আরবি কুরআন’, ‘বাংলা কুরআন’—এ রকম কোরআনের নাম হতে পারে না। উলামা-হজরতরা বলেন, ‘পবিত্র কোরআনের বাংলা অনুবাদ’—এমন করে নামকরণে এই কার্যক্রম সহিহ হতে পারে।

১৯১৩ : আলাউদ্দীন আহমদ (১৮৫১-১৯১৫) ও হাফেজ মাহমুদ শাহ। সুসাহিত্যিক আলাউদ্দীন আহমদ সিরাজগঞ্জে পবিত্র কুরআন অনুবাদে হাত দেন। পরে তিনি হাফেজ মাহমুদ শাহর সাহায্য গ্রহণ করেন এবং যুগ্ম নামে এই অনুবাদ ১৯১৩ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন। বাংলা ভাষায় মুসলিম লেখক গ্রন্থপঞ্জি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৬-৩৭ (মো. আবদুর রাজ্জাক প্রণীত)-এ তাঁর নাম কুরআন অনুবাদক হিসেবে উল্লিখিত আছে। তাঁর গ্রন্থের পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ৬৬। বলা হয়েছে, তাফসির রুহুল বয়ান থেকে তিনি সুরা আল কদরের বঙ্গানুবাদ করেছিলেন। (ড. মোহাম্মদ আবদুল অদুদ : বাংলা ভাষায়  কুরআন চর্চা : উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ১৬৭)

১৯১৪ : মাওলানা খোন্দকার আবুল ফজল আবদুল করিম (১৮৭৬-১৯৪৭)। টাঙ্গাইলে জন্মগ্রহণকারী খোন্দকার আবদুল করিম ১৯১৪ সালে ‘কুরআন’ নামে বাংলা ভাষায় পবিত্র কুরআন অনুবাদ করেন এবং টাঙ্গাইল থেকে মুদ্রণ করে প্রকাশ করেন। কোরআনের আমপারার অংশ তিনি কাব্যানুবাদও করেছিলেন। পরে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় কুরআন শরিফ প্রথম খণ্ড। পরে তাঁর অন্য খণ্ডগুলো কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।

১৯১৬ : মুন্সী করিম বখশ। কলকাতার অধিবাসী মুন্সী করিম বখশ ১৯১৬ সালে পবিত্র কোরআনের প্রথম ও শেষ পারার বাংলা অনুবাদ কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন। বাংলা ভাষায় পবিত্র কোরআনের মূল আরবির বাংলা উচ্চারণের প্রথা তিনিই প্রথম চালু করেন। শুধু তা-ই নয়, তাঁর অনুবাদে প্রথম আরবি, পরে আরবির বাংলা উচ্চারণ এবং তারপর বাংলা অনুবাদ পর পর প্রদত্ত হয়েছে। যদিও আরবির বাংলা উচ্চারণ প্রদানকে আলেমসমাজ যথার্থ মনে করেন না, তার পরও আরবিতে অনভিজ্ঞ মুসলমানদের জন্য তা কার্যকর মনে করা হয়েছিল। এই ধারা তখন থেকে বাংলা সমাজে এখনো প্রচলিত আছে।

১৯০৭ : আবদুল ছাত্তার সুফী। কলকাতা থেকে ১৯০৭ সালে পবিত্র কোরআনের আয়াত কাব্য আকারে অনুবাদ করে প্রকাশ করেন তিনি। বাংলা কবিতার ত্রিপদী ছন্দে কুরআন অনুবাদে ছিলেন তিনিই প্রথম।

১৯১৭ : মাওলানা মুহাম্মদ রুহুল আমিন (১৮৭৫-১৯৪৫)। পশ্চিম বাংলার চব্বিশ পরগনায় জন্মগ্রহণকারী মাওলানা রুহুল আমিন ১৯১৭ সালে পবিত্র কুরআন অনুবাদ করেন। কলকাতা আলিয়া মাদরাসা থেকে পাস করা আলেম হওয়ায় তাঁর অনুবাদের প্রতি তৎকালীন মুসলিমসমাজের আগ্রহ দেখা যায়।

১৯২০ : মাওলানা এয়ার আহমদ এলটি (-১৯৪৪)। ফেনী জেলায় জন্মগ্রহণকারী মাওলানা এয়ার আহমদ ‘আমপারা বাঙ্গালা তফছির’ নামে কুরআন অনুবাদ করে ১৯২০ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশ করেন।

১৯২২ : মোহাম্মদ আবদুল হাকিম (১৮৮৭-১৯৫৭) ও মোহাম্মদ আলী হাসান। গোপালগঞ্জ নিবাসী মোহাম্মদ আবদুল হাকিম এবং মানিকগঞ্জ নিবাসী মোহাম্মদ আলী হাসান ‘কুরআন শরিফ’ নাম দিয়ে পবিত্র কোরআনের অনুবাদ যৌথভাবে সম্পাদন করেন এবং কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন। এর সঙ্গে তাঁরা তাফসিরও বর্ণনা করেছেন। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক থেকে শুরু করে অনেক মুসলমান নেতাই তাঁদের অনুবাদের প্রশংসা করে সনদ দিয়েছিলেন।

১৯২৩ : মাওলানা শেখ ইদ্রিস আহমদ। বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ১৮৯২ সালে মাওলানা শেখ ইদ্রিস আহমদ জন্মগ্রহণ করেন। ‘কোরআনের মহাশিক্ষা’ নামে তাঁর অনূদিত পবিত্র কুরআন ১৯২৩, ১৯২৭ ও ১৯৩৪ সালে মোট তিন খণ্ডে বিভক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়।

১৯২৪ : মাওলানা ফাজেল মকিমী। কলকাতার অধিবাসী মাওলানা ফাজেল মকিমী ১৯২৪ সালে পবিত্র কোরআনের দু-তিন পারা অনুবাদ করেছিলেন। কিন্তু গবেষকরা তাঁর অনুবাদের কোনো নমুনা বা কপির সন্ধান পাননি। (ড. মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান : বাংলা ভাষায় কুরআন চর্চা, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৭৪)

১৯২৫ : ফয়জুদ্দীন আহমেদ (১৮৯৯-১৯৩৫)। বরিশালে জন্মগ্রহণকারী ফয়জুদ্দীন আহমেদ সুরা ফাতিহা ও এর তাফসির অনুবাদ করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকা থেকে ১৯২৫ সালে তা প্রকাশ করেন। সুরা ফাতিহার অনুবাদ ও তাফসিরের এই খণ্ডটি ছিল ১৫৭ পৃষ্ঠার।

১৯২৬ : ফজলুর রহীম চৌধুরী (১৮৯৬-১৯২৯)। বরিশাল জেলায় জন্মগ্রহণকারী এবং শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের জামাতা ফজলুর রহীম চৌধুরী প্রথমে ‘কোরআনের সুবর্ণ পঞ্জিকা’ নামে বিশেষ বিশেষ সুরা ও সুরাংশ অনুবাদ করে ১৯২৬ সালে প্রকাশ করেন। পরে ‘কুরআন শরিফ’ নামে পবিত্র কুরআন অনুবাদ করেন, যা তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৩০ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়।

১৯২৬: মাওলানা খন্দকার গোলাম রসুল। ঝিনাইদহ জেলার আলেম ‘বাঙ্গালা পাঞ্জ সুরাহ’ নাম দিয়ে পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন সুরা অনুবাদ করেন। ১৯২৬ সালে তা নদিয়া থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলা ভাষায় মুসলিম লেখক গ্রন্থপঞ্জিতে (মো. আবদুর রাজ্জাক প্রণীত, রাজশাহী ১৯৮৮) তাঁর নাম পবিত্র কোরআনের একজন অনুবাদক হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে।

১৯২৭ : মোহাম্মদ আবদুর রশিদ ছিদ্দিকী। কক্সবাজার জেলায় জন্মগ্রহণকারী মোহাম্মদ আবদুর রশিদ ছিদ্দিকী ‘মহা কুরআন কাব্য’ নাম দিয়ে ১৯২৭ সালে পবিত্র কুরআন অনুবাদ করে কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন। গদ্য ও পদ্য—দুই রীতিতে তাঁর কুরআন অনূদিত হয়েছিল, আর এটা ছিল বঙ্গ ভাষায় কুরআন অনুবাদের একটি ব্যতিক্রম রীতি।

১৯২৮ : মাওলানা ওসমান গনি। পশ্চিম বাংলার বর্ধমান জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতা আলিয়া মাদরাসা থেকে ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯১৪ সালে পাঞ্জ সুরা অনুবাদ করেন এবং এর নাম দেন ‘পঞ্চমণি’। কিন্তু এটি প্রকাশিত হয় ১৯২৮ সালে কলকাতা থেকে। পরে ‘পবিত্র কুরআন’ শিরোনামে কুরআন অনুবাদ করেন এবং ১৯৪৭ সালে তা প্রকাশিত হয়। তিনি এই অনুবাদে আরবি উচ্চারণের বাংলা অনুলিখন (প্রতিবর্ণায়ন) সংযোজন করেন।

১৯২৮: মাওলানা আহমদ আলী (১৮৯৮-১৯৫৯)। যশোর জেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং কলকাতা আলিয়া মাদরাসা থেকে দ্বিনি শিক্ষার প্রাথমিক ভিত গড়ে তোলেন। ১৯২৮ সালে সুরা ইয়াসিন অনুবাদ করে প্রকাশ করেন।

১৯২৯ : মাওলানা কফিলউদ্দিন আস সিদ্দিকী। টাঙ্গাইল জেলার অধিবাসী মাওলানা কফিলউদ্দিন ১৯২৯ সালে ‘তরজমা পাঞ্জে সুরা’ নাম দিয়ে পবিত্র কোরআনের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি সুরা অনুবাদ করেন। এটি প্রকাশিত হয় কলকাতা থেকে। তবে তাঁর অনূদিত এই তরজমা পাওয়া যায়নি। অধ্যাপক আলী আহমদ লিখিত বাংলা মুসলিম গ্রন্থপঞ্জিতে (বাংলা একাডেমি, ঢাকা ১৯৮৫) মাওলানা কফিলউদ্দিন আস সিদ্দিকী (রহ.)-কে একজন কুরআন অনুবাদক হিসেবে দেখানো হয়েছে। (পৃষ্ঠা ৩৪৬)

১৯৩০ : মোরশেদ আলী। ‘কুরআন দর্পণ’ নামে পবিত্র কোরআনের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেন মোরশেদ আলী ১৯৩০ সালে। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ঢাকা থেকে। অধ্যাপক আলী আহমদ লিখিত বাংলা মুসলিম গ্রন্থপঞ্জিতে কুরআন অনুবাদক হিসেবে তাঁকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তিনি তাঁর অনূদিত গ্রন্থের নাম দিয়েছিলেন ‘কুরআন দর্পণ’। এর প্রথম খণ্ডে ১৭টি সুরার বঙ্গানুবাদ স্থান পেয়েছিল।

১৯৩০: মীর ফজলে আলী (১৮৯৮-১৯৩৯)। বরগুনা জেলার সন্তান মীর ফজলে আলী ১৯৩০ সালে ‘কুরআন কণিকা’ শিরোনামে পবিত্র কোরআনের অংশবিশেষ অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। এটি প্রকাশিত হয় কলকাতা থেকে। ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এই অনুবাদের ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন।

১৯৩১ : মুহাম্মদ আজহার উদ্দীন। রাজবাড়ী জেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন মুহাম্মদ আজহার উদ্দীন। ‘কোরআনের আলো’ শিরোনামে পবিত্র কোরআনের দীর্ঘ সুরাগুলো অনুবাদ করে ১৯৩১ সালে তিনি কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন।

১৯৩২ : আবদুল আযীয হিন্দি (১৮৬৭-১৯২৬)। কুমিল্লা জেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন আবদুল আযীয হিন্দি। ‘কুরআন শরিফ’ শিরোনামকৃত তাঁর অনূদিত পবিত্র কুরআন নোয়াখালী থেকে ১৯৩২ সালে প্রকাশিত হয়।

১৯৩৩ : কাজী নজরুল ইসলাম। পশ্চিম বাংলার বর্ধমান জেলায় জন্মগ্রহণকারী বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি বলে পরিচিত কাজী নজরুল ইসলাম পবিত্র কোরআনের আমপারা অংশ কাব্যাকারে অনুবাদ করেন। তা ‘কাব্য আমপারা’ নামে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৩৩ সালে। কবি নজরুলের অনুবাদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি কাব্যানুবাদ শেষে মার্জিনের নিচে আরবি সুরার বাংলা অর্থ পরিবেশন করেছেন। ১৯২০ সালে ‘আমপারা’ শীর্ষক অংশে পবিত্র কোরআনের অনুবাদের খণ্ডাংশ কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন। গদ্য ও কাব্য—এ দুই-ই বিচ্ছিন্নভাবে অনুবাদে তিনি কাজে লাগান।

১৯৩৪ : সৈয়দ আবুল খায়ের তাজুল আউলিয়া জাহাঙ্গীর। টাঙ্গাইল থেকে ১৯৩৪ সালে ‘বাংলা কুরআন শরিফ’ নাম দিয়ে পবিত্র কোরআনের অনুবাদ প্রকাশ করেন। তবে তা ছিল শুধু প্রথম পারার অনুবাদ।

১৯৩৫ : সৈয়দ আবুল মনসুর। সিলেটের অধিবাসী ছিলেন সৈয়দ আবুল মনসুর। কলকাতা থেকে ১৯৩৫ সালে ‘কুরআন কুসুমাঞ্জলি’ নামে পবিত্র কুরআন অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। পরে ‘কুরআন মঞ্জরি’, ‘কুরআন মঙ্গল’ ইত্যাদি নামে আরো কিছু সুরার অনুবাদ প্রকাশিত হয়। মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমিত্রাক্ষর ছন্দের অনুসরণ করে তিনি কোরআনের কাব্যানুবাদের অনুশীলন করেছিলেন।

১৯৩৬ : আইয়ুব আলী চৌধুরী (১৮৭৭-১৯৩৬)। বাংলা পয়ার ছন্দে সুরা ফাতিহার কাব্যানুবাদ করে আইয়ুব আলী চৌধুরী ১৯৩৬ সালে কলকাতা থেকে তা প্রকাশ করেন। এর নাম দেন তিনি ‘স্বর্গীয় কানন’। কাব্যানুবাদে সুরা ফাতিহা বিষয়ে তাঁর মনগড়া অনেক শব্দও তিনি এতে প্রয়োগ করেন।

১৯৩৬: মাওলানা মুহাম্মদ গোলাম আকবর (১৮৯২-১৯৫৬)। যশোর থেকে ১৯৩৬ সালে ‘আমপারার তফসির’ নাম দিয়ে তাঁর কুরআন অনুবাদের খণ্ড প্রকাশ করেন।

১৯৩৭ : বসন্তকুমার মুখোপাধ্যায়। হিন্দু ব্রাহ্মণদের মধ্যে বসন্তকুমার মুখোপাধ্যায়ই প্রথম কুরআন অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলেন। ‘পবিত্র কুরআন প্রবেশ’ নামে তাঁর অনুবাদ ১৯৩৭ সালে নারায়ণগঞ্জ থেকে মুদ্রিত হয়ে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে বলে গ্রন্থটিতে উল্লিখিত হয়।

১৯৩৯ : মুহাম্মদ ইসমাইল। চাঁদপুরে জন্মগ্রহণকারী মুহাম্মদ ইসমাইল পবিত্র কোরআনের ৩০তম পারা অনুবাদ করে ১৯৩৯ সালে ত্রিপুরা থেকে প্রকাশ করেন। তিনি এর নাম দেন ‘আমপারার তরজমা’।

১৯৪০ : মুহাম্মদ শামসুল হুদা। গিরিশচন্দ্র সেনের পর নরসিংদীতে জন্মগ্রহণকারী মুহাম্মদ শামসুল হুদা নামের আরেক নরসিংদীবাসী কুরআন অনুবাদে এগিয়ে আসেন। ১৯৪০ সালে ‘নেয়ামুল কুরআন’ নামে পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন সুরার অনুবাদ, ফজিলতসহ তাঁর অনুবাদ প্রকাশিত হয় ঢাকা থেকে।

১৯৪১ : খানবাহাদুর আহসানউল্লা (১৮৭৩-১৯৬৫)। সাতক্ষীরায় জন্মগ্রহণকারী খানবাহাদুর আহসানউল্লা পবিত্র কোরআনের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি সুরা অনুবাদ করে ১৯৪০ সালে (মতান্তরে ১৯৪০-১৯৪৭-এর কোনো সময়ে) কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন। এর নাম দেন তিনি ‘পাঁচ ছুরা’। এর আগে এ রকম অন্যান্য অনুবাদে আমরা নাম পেয়েছি ‘পোঞ্জু সুরা’, তিনিই প্রথম ‘পোঞ্জু’র বাংলা করেন ‘পাঁচ’।

১৯৪৪ : মীজানুর রহমান। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অধিবাসী মীজানুর রহমান তাঁর মায়ের নির্দেশে পবিত্র কুরআন অনুবাদ করে ‘নূরের ঝলক’ বা ‘কোরআনের আলো’ নাম দিয়ে ১৯৪৪ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন।

১৯৪৫ : মাওলানা যুলফিকার আলী। ফেনী জেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। পবিত্র কোরআনের আমপারার অংশ অনুবাদ করে ১৯৪৫ সালে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশ করেন। তাঁর অনুবাদের বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি আরবি অক্ষরে বাংলা অনুবাদ করেন। পবিত্র কুরআন অনুবাদে এই রীতিতে তিনিই প্রথম। তবে এই ধারার আর বেশি চর্চা হয়নি।

১৯৪৬ : ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯)। পশ্চিম বাংলার চব্বিশ পরগনা জেলায় জন্মগ্রহণকারী বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ থেকেও বাংলাভাষী মানুষ পবিত্র কোরআনের অনুবাদ লাভ করেছে। ‘মহাবাণী’ শিরোনামে তাঁর অনূদিত কুরআন প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৬ সালে বগুড়া থেকে। এতে সুরা ফাতিহা থেকে সুরা ফিল পর্যন্ত অনূদিত হয়েছিল। এ ছাড়া তিনি সুরা বাকারাও অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর অনুবাদে সংস্কৃতজাত শব্দের অগ্রাধিকার ছিল। ‘ইমাম’কে ‘আচার্য’ ও ‘ধর্মাচার্য’, ‘মুক্তাদি’কে ‘অনুবর্তী’, ‘আয়াত’কে  ‘প্রবচন’, ‘নবী’কে ‘সংবাদবাহক’, ‘নবুয়ত’কে ‘প্রেরিতত্ব’ শব্দ দ্বারা ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।

১৯৪৭ : মাওলানা মুনীর উদ্দীন আহমদ। রংপুর নিবাসী মাওলানা মুনীর উদ্দীন আহমদ ‘হাফিজিল কাদেরী’ নামে তাফসিরসহ পবিত্র কোরআনের অনুবাদ করেন ১৯৪৭ সালে। এটি রংপুর থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল।

১৯৬২ : ‘তাফসিরে আশরাফী’, এমদাদিয়া লাইব্রেরি। উর্দু বয়ানুল কোরআনের অনুবাদ। মূল : আল্লামা আশরাফ আলী থানভি (রহ.)।

১৯৬৩ : ‘সহজ পাক তফসির’, খন্দকার মোহাম্মদ হুছাইন। পাকুল্লা, টাঙ্গাইল, তফসির মঞ্জিল।

১৯৬৬-৬৭ : ‘পবিত্র কোরান’, কাজী আব্দুল ওদুদ। ফরিদপুর, পরে কলকাতা।

১৯৬৭ : ‘কুরআন শরিফ’, ঝিনুক প্রকাশনী, আলী হায়দার চৌধুরী। ‘কোরআনুল করিম’, ইসলামিক একাডেমি, ঢাকা (বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অনুবাদক : শামসুল ওলামা বেলায়েত হোসেন ও অন্যান্য।

১৯৬৮ : ‘কোরআনের মুক্তাহার’, মাওলানা মোহাম্মদ ছায়ীদ ইব্রাহিমপুরী। ইব্রাহিমপুর, চাঁদপুর।

১৯৬৯ : ‘কুরআন শরিফ’, হাকিম আব্দুল মান্নান। সহজ-সরল কথা, ভাষায় প্রথম ও মূলানুগ অনুবাদ। তাজ কম্পানি, ঢাকা।

১৯৭০ : ‘তাফাসরুল কুরআন’। শব্দসহ তাফসির। মুহা. নূরুল ইসলাম, বগুড়া।

১৯৭০-৭২ : ‘আল-কুরআন : তরজমা ও তাফসির’। পাঁচ খণ্ড, অধ্যাপক মাওলানা মুহাম্মাদ তাহের, কলকাতা আলিয়া মাদরাসা।

১৯৭৪ : ‘তাফসিরে বয়ানুল কোরান’-এর বঙ্গানুবাদ, মাওলানা নূরুর রহমান, ১৯০৯, এমদাদিয়া লাইব্রেরি।মূল : আল্লামা আশরাফ আলী থানভি (রহ.)। ‘কুরআন শরিফ’, টীকাসহ গোটা কুরআন শরিফের বঙ্গানুবাদ, মোবারক করিম জওহর। কলি. হরফ, প্রকাশনী।

 

আলোচনা ও বিশ্লেষণঃ

অনুবাদ যে যখন আগ্রহ পেয়েছেন করতে পারেন। কিন্তু তাই বলে যিনি প্রথম অনুবাদক নন তাঁকে নিয়ে প্রচার প্রসার চলতে থাকলে সেটা লজ্জাজনক। সবথেকে বড় কথা ভাই গিরীশ চন্দ্র সেনকে হিন্দু হিসেবে প্রচার করা হলেও তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম। আরেকটু ভাল করে বললে ‘ব্রাহ্ম’ ব্রাহ্মণ নন। ফলে এই অনুবাদ নিয়ে ধর্মীয়ভাবে উন্মাদনা ছড়ানোর সুযোগও নাই। এখন অবধি প্রাপ্ত ইতিহাসের সূত্র থেকে বলা যায় ‘মাওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়া ১৮০৮ সালে সর্বপ্রথম সরাসরি বাংলা ভাষায় কুরআন শরীফের আংশিক অনুবাদ করেন। শাহ মুহাম্মদ সগীরের কাব্যভাষায় যুগপৎ বাংলা পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে যে রচনা সেগুলো নিয়ে অবশ্য অনেক বিচার বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।এরপর ১৮৩৬ সালে বাংলা ভাষায় কুরআন শরীফের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ করেন মৌলভী নাঈমুদ্দীন।’। অনেকে দাবি করেন ভাই গিরীশ চন্দ্র সেন শুধু তাদের অনুবাদকে গ্রন্থাকারে সন্নিবিষ্ট করেছেন। অন্যদিকে আমরা যারা ইতিহাস বিশ্লেষণ করি আমাদের কাছে সময়কালটাও গুরুত্বপূর্ণ।

মাওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়া কিংবা মৌলভী নাঈমুদ্দীনের সময়কালের তুলনায় ভাই গিরীশ চন্দ্রের সময়কালও অনেক পরের, অর্থাৎ ১৮৮৬ সাল। এতোদিন আল কুরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক হিসেবে আমরা যে ভাই গিরীশ চন্দ্র সেনের নাম শুনেছি ইতিহাস সংশোধনের মাধ্যমে সেখানে মৌলভী নাঈমুদ্দীনের নামটা আশা জরুরি। একটু পর্যালোচনা করে দেখা যাক গিরীশ চন্দ্র সেনের জন্ম ১৮৩৫ সালে এবং মৃত্যু ১৯১০ সালে সে হিসেবে তাঁর জন্মেরও শতবর্ষ পূর্বে ১৮০৮ সালে কুরআন শরীফ বঙ্গানুবাদের কাজ শুরু করেছিলেন মাওলানা আমীর উদ্দীন বসুনিয়া। সময়কাল বিচারে ভাই গিরীশ চন্দ্র সেনের জন্মের এক বছর পর অর্থাৎ ১৮৩৬ সনে মৌলভী নাঈমুদ্দীন পূর্ণাঙ্গ কুরআন শরীফের বঙ্গানুবাদ শেষ করেছিলেন।

১৮৭১ সালে ভাই গিরীশচন্দ্র সেন সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে ব্রাহ্ম্যধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। ফলে একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে এটুকু অনুমেয় যে তাঁর কাছে বেদ, গীতা, উপনিষদ কিংবা আল কুরআন কোনোটারই গুরুত্ব থাকার কথা নয়। আর গুরুত্ব যদি নাই থাকে তিনি কোন দু:খে এতবড় একটা গ্রন্থ অনুবাদ করতে যাবেন? আজ থেকে আনুমানিক ২১২ বছর আগে ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলা চিলাখাল মটুকপুর গ্রামে এই অনুবাদের কাজটা শুরু করেছিলেন মৌলভী আমিরুদ্দীন বসুনিয়া। তিনি ৩০ তম পারা তথা আমপারার বঙ্গানুবাদ করেছিলেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁর অনূদিত আমপারা অংশ লিথো প্রেসে মুদ্রিত হওয়ার কথাও দাবি করেছেন অনেকে। তাদের দাবি অনুযায়ী তার পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ১৬৮। মুদ্রণের তারিখ অজ্ঞাত হলেও আমরা যারা প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করি খুব সহজেই মুদ্রণ রীতির বৈশিষ্ট্য থেকে এর সময়কালের তুলনামূলক ধারণা ‍উপস্থাপন করতে পারি।স্থানীয়ভাবে অনেকে দাবি করেছেন আমিরুদ্দীন বসুনিয়ার কৃত বঙ্গানুবাদের খণ্ড এখনও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের গ্রন্থাগারে পাওয়া যেতে পারে। তাদের বর্ণনায় আমপারার ঐ বঙ্গানুবাদের প্রকাশকাল আনুমানিক ১৮০৮/১৮০৯ খ্রিস্টাব্দ। এখন সব তর্ক বিতর্কের অবসান হতে পারে যদি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ লাইব্রেরিতে গিয়ে ঐ খণ্ডটি উদ্ধার করা যায়। যদিও আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ (১৮৭১-১৯৫৩ খ্রি.) তার সংকলিত “বাংলা প্রাচীন পুঁথির বিবরণ” গ্রন্থও  আমীর উদ্দিন বসুনিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে গেলে দেখা যায় রংপুরের কুন্ডি পরগনার গোপালপুরের কাছাকাছি অবস্থিত শ্যামপুর রেলস্টেশন। খুব সম্ভবত সেখানে ছাপাখানা বসিয়ে পূর্ববঙ্গের সর্বপ্রথম পত্রিকা “সাপ্তাহিক রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ” প্রকাশ করা হয় ১৮৪৭ সালে। তাই এই “সাপ্তাহিক রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ”পত্রিকার মুদ্রণরীতির সঙ্গে আমীরুদ্দীন বসুনিয়ার অনুবাদের ছাপার অক্ষর মিলিয়ে দেখলেই হয়।যদি এটা প্রমাণ করা যায় তবে মেনে নিতে হবে ভাই গিরীশ চন্দ্র সেনের প্রায় ২০ বছর আগেই রংপুরের আমির উদ্দীন বসুনিয়া কুরআনের বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি না করে জটিলতা নিরসনের উদ্দেশ্যে উপযুক্ত গবেষণা হওয়া জরুরি।সাম্প্রদায়িক আবেগ কিংবা সেকুলার ভাঁড়গিরি নয় বরং সত্যানুসন্ধান আমাদের ব্রত হোক। আমরা যেন অস্বীকার না করি ইতিহাস সত্যাশ্রয়ী এবং তা অবশ্যই তথ্যনির্ভর। তথ্যের উপযুক্ত সন্নিবেশ ও বিশ্লেষণ থেকে যেকোনো বিষয়ের ইতিহাস পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংযোজন-বিয়োজনের দাবি রাখে।

ড. মো. আদনান আরিফ সালিম
সহকারী অধ্যাপক
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

(Visited 89 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *