সেই সব সভাকবি এবং আমাদের নির্মলেন্দু গুণ

“খুন বললো ছুরি হবো ,ছুরি বললো খুন/ পদক বললো আমি হবো নির্মলেন্দু গুণ।” দুটি লাইন আমার লেখা নয়। লিখেছেন আমাদের প্রজন্মের জনপ্রিয় কবি ইমতিয়াজ মাহমুদ।যাই হোক, রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায়ও একজন সভাকবি থাকা যেতে পারে কি পারে না তার ইতিহাস অনুসন্ধান দূরে থাক সবাই এখন মান্যবর কবি নির্মলেন্দু গুণকে গালাগালে লিপ্ত । আমি পক্ষ-বিপক্ষ না বিচার করে সমাধান খুঁজতে ইতিহাস থেকে চিন্তা করেছি। ভেবে দেখলাম,  রাজ দরবারে সভাকবি থাকা এতো অনেক পুরাতন কথা। সে হিসেবে কবি নির্মলেন্দু গুণের রাজনৈতিক সততার প্রশংসা না করে শুশীল সাজার কোনো মানে হয় না। অনেক ভণ্ড সাহিত্যিক ও সুশীল ভেকধারী ব্যক্তি আছেন যারা রাজনৈতিক আদর্শ গোপন করে গাছেরটা খান, তলারটাও কুড়াতে চেষ্টা করেন। আমি বলতে চাই তাদের তুলনায় মান্যবর নির্মলেন্দু গুণ অনেক সম্মানজনক একটা কাজ করেছেন তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় স্পষ্ট করে। একজন কবি হিসেবে তিনি এক্ষেত্রে অবশ্যই সততার পরিচয় দিয়েছে। আমরা যদি ইতিহাস বিচ্ছিন্ন না হতাম তাহলে কোনোভাবেই নির্মলেন্দু গুণকে গালাগাল কিংবা কটাক্ষ করতাম না।

বাংলার ইতিহাস নিয়ে কথা বলার আগে ভারতবর্ষের দিকে দৃষ্টি দেই। কুষাণ সম্রাট কণিষ্কের সভাকবি ছিলেন অশ্বঘোষ। তিনি বুদ্ধচরিত শীর্ষক গ্রন্থটি রচনা ক’রে ইতিহাসে অমর হ’য়ে আছেন। সংস্কৃত সাহিত্যের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক অশ্বঘোষ বৌদ্ধ মহাযান সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রূপে কীর্তিত হ’য়ে থাকেন। মহাকবি কালিদাস ছিলেন বিক্রমাদিত্যের সভাকবি। বাংলার ইতিহাস নিয়ে  অন্যতম ত্যানা প্যাঁচানো মাতবর বাণভট্ট ছিলেন থানেশ্বরের পুষ্যভূতি বংশীয় রাজা হর্ষবর্ধনের সভাকবি। তিনি গৌড়েশ্বর শশাঙ্কের চৌদ্দগোষ্ঠী নিপাতের মাধ্যমে তাকে জল্লাদ প্রমাণের চেষ্টায় ব্রতী হয়েছিলেন। পরবর্তীকানে তিনি তার সাঙ্গাত হিসেবে সঙ্গে পেয়েছিলেন হর্ষবর্ধনের রাজপ্রাসাদের রুটি হালুয়াখোর চৈনিক ধাঙড় হিউয়েন সাঙ্গ তথা য়ুয়ান চুয়ানকে।

সাম্প্রদায়িক সংঘাত, ব্রাহ্মণবাদী শাসনের কলঙ্ক আর জাতিভেদ প্রথার আড়ালে নিষ্পেষিত মানুষের জন যন্ত্রণা লুকিয়ে বাঙ্গালরাজ লক্ষণ সেনকে মহান করে তোলার গুরুদায়িত্ব গিয়ে বর্তায় ধোয়ী, উমাপতিধর, শরণ,  হলায়ূধ এবং জয়দেবের উপর। উচ্চ দক্ষিণার বিনিময়ে লক্ষ্মণ সেন তার সাম্প্রদায়িক শাসনের সব কলঙ্ক আড়াল করার জন্য এই পাঁচ কবি নামের পুচ্ছবিহীন সারমেয়শাবককে পালতেন। এদিকে কবীন্দ্র পরমেশ্বরখ্যাত শ্রীকর নন্দীও ছিলেন পরাগল খাঁর দরবারে এদিক ওদিক থেকে ছিটকে আসা হাড় হাড্ডি চুষে তার মজ্জা বের করে খাওয়ার ধান্দায়। রাজ দরবারে রাজার পা চাটায় লকলকে জিহ্বা বের করে এগিয়ে গেছেন হলধর মিশ্রও। তিনি নরসিংহ দেবের পায়ের তালু চেটে পরিচ্ছন্ন রাখার গুরুদায়িত্ব পেয়েছিলেন।

জিয়াউদ্দিন বারানি (১২৮৫-১৩৫৭) ছিলেন সুলতান মোহাম্মদ বিন তুঘলক ও ফিরোজ শাহ তুঘলকের সময় দিল্লি সালতানাতের একজন মুসলিম ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। তার রচিত তারিখ-ই-ফিরোজশাহী বইর জন্য তিনি অধিক পরিচিত। এটি মধ্যযুগের ভারতের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক কর্ম। এতে গিয়াসউদ্দিন বলবনের সময় থেকে ফিরোজ শাহ তুঘলকের শাসনের প্রথম ছয়বছর নিয়ে নানা বিষয় লিখে গেছেন। এগুলো নিয়ে পরে আবার ইতিহাস গবেষকরা তথ্যসূত্র বিশ্লেষণের কাজে হাত দিয়েছেন।

আপনারা যারা সভাকবিদের গোষ্ঠী নিপাত করছেন একবার ভেবে দেখেন তো কলহন সাহেব না থাকলে লোকে ললিতাদিত্য মুক্তপীড়, জয়পীড় ও বাকপীড়ের সম্পর্কে কিভাবে জানতে পারতো। জেনে রাখুন এই কলহনের রাজতরঙ্গিণী তদানীন্তন কাশ্মীরের সমাজ-ইতিহাসের দলিল। আগামী দিনের সমাজ-গবেষকের গবেষণার বিষয়বস্তুও বটে। সুশাসন এবং অপশাসন দুটোই পাঠকের দৃষ্টিকে আকর্ষণ করে। সুশাসকের জয় এবং অপশাসকের নিন্দামন্দ ক্ষমতার শীর্ষে থাকা আধুনিককালের পদাধিকারীদেরও রাস্তা দেখায়। এখানে পাঠক উপলব্ধি করেন যে, রাজারাজড়াদের ব‌্যাপার-স‌্যাপারই আলাদা। ন‌্যায়নীতির পৃষ্ঠপোষক এবং দুর্নীতি কেলেঙ্কারির কুশীলবদের চরিত্রচিত্রণের ক্ষেত্রে লেখকের অনবদ‌্য মুনশিয়ানাতেও পাঠক বিস্মিত হন। দুর্ভিক্ষাদি সংকটকালে দেশবাসীর ভরসা যে প্রচ্ছন্ন ভাবমূর্তির মানুষ ইতিহাসপ্রণেতা কলহন তা প্রতিপন্ন করেছেন। মুদ্রা, জালমুদ্রা, যুদ্ধবিগ্রহ, অপরাধপ্রবণতা, গুপ্তচরবৃত্তি, সজ্ঞানে অপরকে প্রতারিত করার পাশাপাশি মন্দির-উদ‌্যান-বিহার নির্মাণ, খালখনন, জলবণ্টন ব‌্যবস্থার উন্নয়ন ইত‌্যাদি ভেদে অমা-উমা উভয়ই চিত্রিত হয়েছে গ্রন্থটিতে। নিরপেক্ষ বিচারবুদ্ধি, তথ‌্যবিন‌্যাস এবং দেশ ও জাতি সম্বন্ধে জ্ঞাতব‌্য তথ‌্যসমূহের নিবিড় পরিচয়ই ঐতিহাসিককে প্রকৃত ইতিহাস রচনায় প্রেরণা জোগায়। এর সব গুণই কলহনের ছিল। কাশ্মীর সম্বন্ধে যা কিছু জানবার কলহন তা যথাসাধ‌্য পরিবেশন করেছেন। শান্তরসপ্রধান এই রচনা ইতিহাস ও মহাকাব‌্যের দ্বৈতমর্যাদায় ভূষিত।

সন্ধ্যাকর নন্দী বাংলার পাল শাসনামলের একজন পা-চাটা কবি। আনুমানিক ১০৮৪ সালে তার জন্ম। উত্তরবঙ্গের প্রাচীন নগরী পুন্ড্রবর্ধনের বৃহদ্বটু গ্রামে(এখন দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কুমারগঞ্জের বটুন গ্রামে) এক কায়স্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতামহের নাম পিনাক নন্দী এবং পিতার নাম প্রজাপতি নন্দী। তার পিতা পাল রাজা রামপালের কাব্যিক পদলেহনে নিয়োজিত ছিলেন। আপনারা লাফালাফি করার আগে জেনে রাখুন রামচরিতম্ সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত সংস্কৃত ভাষার একটি কাব্যগ্রন্থ। আনুমানিক ১০৫০ থেকে ১১৫০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে রচনা করা হয়। রামচরিতম্ সংস্কৃত ভাষায় রচিত বরেন্দ্র বা উত্তর বাংলার একমাত্র গ্রন্থ যেখানে পাল শাসনামলের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি স্থান পেয়েছে। এই কাব্যে যুগপৎ হিন্দু ধর্মের অবতার রামচন্দ্র এবং গৌড়ের রাজা রামপালের প্রশংসা বর্ণনা করা হয়েছে। তথাপি এই কাব্যকে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসাবে মনে করা হয়।কিন্তু আপনারা এই গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলোকে গুরুত্ব দেবেন না। অসভ্যের মতো পড়ে থাকবেন পা-চাটাচাটি নিয়ে। শুধু কি তাই এই রামচরিতম না থাকলে কৈবর্ত নেতা দিব্য কর্তৃক বরেন্দ্র বিদ্রোহের মাধ্যমে পাল রাজা দ্বিতীয় মহিপালের হত্যাকান্ড ও বরেন্দ্রর পতন সম্পর্কেও আমরা জানতে পারতান না। পরবর্তিতে রামপালের বরেন্দ্র পুনরুত্থানের কাহিনীও তার লেখায় লিপিবদ্ধ হয়েছে। রামপালের পর রাজা মদনপালের রাজত্বের প্রাথমিক সময়ের কিছু বর্ণনাও রামচরিতম্ এ পাওয়া যায়। এগুলো খেয়াল করেছেন আপনারা ?

একবারও ভেবে দেখেছেন তবকাত-ই-নাসিরী মিনহাজ-ই-সিরাজ জুর্জানি রচিত মধ্যযুগের সাধারণ ইতিহাস গ্রন্থ। এ গ্রন্থে ইসলামের বিভিন্ন নবী-রসুলের ইতিহাস থেকে শুরু করে মিনহাজ তাঁর নিজের সময় পর্যন্ত ঘটনাবলি বর্ণনা করেছেন। বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার ইতিহাস পুনর্গঠনের জন্য এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আকর গ্রন্থ। বাংলা মুলুকে মুসলিম শাসনের প্রথম ৫০ বছরের ইতিহাস একমাত্র এ গ্রন্থেই পাওয়া যায়। ঘোরের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত জুর্জান ছিল মিনহাজের পরিবারের আদি নিবাস। তিনি ১১৯৩ হিজরির কাছাকাছি কোনো এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ঘোরী সুলতানদের অধীনে কাজীর পদে নিযুক্ত ছিলেন। এইরকম সম্মান ও পদ পাইতে গেলে এক আধটু তেলবাজি করলে সমস্যা কি?

এদিকে ৩৪ বছর বয়সে মিনহাজ ভারতে আসেন। সমসাময়িক মানদন্ডে তিনি উচ্চশিক্ষিত ছিলেন এবং তাঁর কিছু কূটনৈতিক অভিজ্ঞতাও ছিল। তিনি প্রথমে উচ্চ-এ নাসিরুদ্দীন কুবাচার দরবারে যোগদান করেন। কুবাচা তাঁকে কাজী পদে নিযুক্তি দেন। কুবাচার নিকট থেকে শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশ মুলতান দখল করে নিলে মিনহাজ দিল্লিতে চলে আসেন। দিল্লিতে মিনহাজ তাঁর মেধা বিকাশের অনুকূল পরিবেশ পান এবং একাধারে ইমাম, কাজী, খতিব প্রভৃতি পদে অধিষ্ঠিত হন ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দিল্লি সুলতানদের সাহচর্যে আসেন এবং মাদ্রাসার অধ্যক্ষ, ইমাম, খতিব, কাজী ও সদর-ই-জাহান পদে নিয়োগ লাভ করেন। সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদের রাজত্বকালে দিল্লির কাজী থাকা অবস্থায় তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ তবকাত-ই-নাসিরী রচনা করেন এবং ক্ষমতাসীন সুলতানের নামে এটি উৎসর্গীকৃত হয়। একবার ভেবে দেখেছেন এই মিনহাজ সাহেব না থাকলে ঐ সময়ের ইতিহাসের দলিল আমরা কোথায় কিভাবে পেতাম?

আমির খসরু ছিলেন আলাউদ্দিন খলজির দরবারে। আমাদের সবার চেনা ভারততত্ত্বের বিখ্যাত স্রষ্টা অলবিরুনিকে চিরুনি দিয়ে মাহমুদ গজনির চুল আঁচড়ে দিতে হয়নি, তবে লেখালিখিতে উঁকুন বাছার কাজ তো তিনি করেছেনই। চাঁদ বরদই চামচামি করেছ পৃথ্বীরাজ চৌহানের। বারুপতি আ ভবভূতির দায়িত্ব ছিল কনৌজরাজ যশোবর্ধনের ধন-মান-ইজ্জত সামলে রাখা। সোমদেব তেলের বাটি নিয়ে বসে থাকতেন দ্বিতীয় পৃথ্বীরাজের দরবারে। এতো লোকের তেলবাজির গল্পে মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি শিবাজিই বা বাদ যাবে কেনো। সেখানে তেল মাখানোর গুরুদায়িত্বটা গিয়ে পড়েছিল পরমানন্দের উপরে। এদিকে পণ্ডিত গঙ্গাধর মিশ্র সব কাব্যকবিতার মিশ্রণে সম্বলপুরের রাজা বালিয়ার সিঙের সিঙ্গা বাজিয়েছেন। আল্লাসানি পেদ্দান তার কাব্যদান করেছেন কৃষ্ণদেব  রায়ের পদযুগলে। গোপাল ভাঁড় যেমন ভাঁড়ামো করতো, তেমনি রামপ্রসাদ সেন ছিলেন নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি। অবশ্য গোপাল ভাঁড় কাটুনে তাকে অমন লিকলিকে কেনো দেখায় কে জানে?

লেখা শুরু করলে পাতার পর পাতা শুধু সভাকবিদের নিয়েই লিখে যাওয়া সম্ভব। তবে পোস্টের দৈর্ঘ্য আর বাড়াতে চাইনা। শেষ করছি মোগল রাজ দরবারের নিকৃষ্ট দালাল আবুল ফজলকে দিয়ে।মোগল সম্রাট আকবর দ্য মেশিনম্যানের দরবারে তার মেশিন ধোয়ামোছার কাজ যারা অত্যন্ত সুন্দরভাবে করেছেন তাদের অগ্রপথিক এই আবুল ফজল। আপনারা এখানেই থেকে যাবেন। আমি শুধু ছোট্ট একটা প্রশ্ন করব, এই আবুল ফজল যদি আইন-ই-আকবরি না লিখত আপনারা কি আকবরের সময়কালের ইতিহাস স্বপ্নে দেখতেন, নাকি টাইন মেশিন নিয়ে ঐ সময়ে চলে যেতেন? তাই সময় থাকতে ইতিহাস পড়ুন, মন্তব্য করার আগে বাস্তববাদ হউন। মনে রাখবেন ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করেনা। যদি আপনাদের ক্ষমা করে তবুও লাভ নাই, আপনাদের গোষ্ঠী নিপাতের জন্য আমি তো আছি।

(Visited 77 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *