তাজ হাশমীর ‘মুনতাসীর মামুন বৃত্তান্ত’ প্রসঙ্গে

মুনতাসীর মামুন

বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ (Peasant Utopia: The communalization of class politics in East Bengal, 1920-1947) প্রণেতা, তাজ উল-ইসলাম হাশমী স্যার, যিনি তাজ হাশমী নামেই সমধিক পরিচিতি; তিনি তাঁর মুমুর্ষ সহকর্মী মুনতাসীর উদ্দিন খান মামুন সম্পর্কে ফেসবুকে কয়েক লাইন লেখার পর থেকে আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ জবাব এবং পাল্টা জবাবে ফেসবুকে একাংশ রণক্ষেত্রের রূপ নিয়েছে। আমি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করলাম তাজ হাশমী স্যার কিংবা মুনতাসীর মামুন স্যার উনারা যে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করেছেন সেগুলোর কোনোটাই সমালোচনার উর্ধ্বে নয়, কিন্তু তা নিয়ে কেউ কোনো কথা বলছে না। উপরন্তু আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের যে ধারা সেখানে শুধু খেয়াল করা যাবে অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে কে কাকে কতটা কাবু করতে পারে তার প্রতিযোগিতা।

তাজ হাশমী

আমি সত্যিই অবাক হয়েছি তাজ হাশমী স্যারের বক্তব্যের ভাষা দেখে। তাঁর অমর গ্রন্থ (Peasant Utopia: The communalization of class politics in East Bengal, 1920-1947) পড়তে গিয়ে প্রতিটি লাইন যেমন শিহরণ জাগায়, আজকের পোস্টটি পড়ার পর সত্যিই এক অন্য তাজ হাশমী স্যারের সঙ্গে পরিচিত হলাম। তিনি লিখেছেন— ‘আমি মুনতাসির মামুনকে ১৯৭৪ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহকর্মী হিসাবে চিনি। তার সম্পর্কে যা জানি, লিখলে একটা মহা কাব্য হবে! সে আমার দু বছরের কনিষ্ঠ। ইতিহাস বিভাগ থেকে এম.এ. তে ২য় শ্রেণীতে ২৮ তম স্থান অধিকারী। তার সরকারী কলেজেও চাকুরী পাবার কথা নয়। কিন্তু চাঁদপুরর প্রয়াত আওয়ামী মন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী ছিলেন সম্পর্কে তার নানা। আর তখন ঢ:বি:র উপাচার্য ছিলেন নব্য আওয়ামী মতিন চৌধুরী, যিনি পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানের ধামাধরা ছিলেন। যাক, মিজান-মতীন-দের দুর্নীতির কারনে ১৯৭৪ সালে মামুন সুই হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে ঢুকে পরল।

ইতোমধ্যে সে “বিশপ হেবারের চোখে ঢাকা” নামে একটা ইংরেজী বই বাংলায় অনুবাদ করে নিজের নামে চালিয়ে দিল। জ্ঞান চর্চার জগতে এটা তার প্রথম চুরি। এর এক বছর পরে ঘটল মুজিবের পতন। আর আমরা সবাই অবাক হয়ে দেখলাম এক নতুন মামুনের অভুধ্যয়! সে তখন এক প্রচন্ড আওয়ামী বিরোধী দেশপ্রেমিক। আমাদের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলাপী দলের একজন পাতি নেতা! আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ও মুনিরুজজামান মিয়াদের সাথে হরিহর আত্মা। জিয়াউর রহমানের সময় মামুন আর চাচা বোরহানউদদীন জাহাঙ্গীর তখন কট্টর বাকশাল বিরোধী প্রগতিশীল। আরেক চাচা মহিউদ্দীন খান আলমগীর তখন জিয়ার খালকাটা আন্দোলনের এক মহা সমর্থক! মখা এর মধ্যে বসটন ইউনিভার্সিটি থেকে খাল কাটার উপর পিএইচডি করে ফেলল। তখন আজকের প্রচন্ড মুজিববাদী ইতিহাস বিভাগের আরেক মহারথী সৈয়দ আনোয়ার হোসেন প্রয়াত মুজিবকে স্বৈরাচার গণ্য করতেন।

এক কথায় মামুন একজন Fourth Classবা চতুর্থ শ্রেণীর ঐতিহাসিক। তার তথাকথিত পিএইচডি ডিগ্রির কথা আজ না হয় নাই বা বললাম! মামুন নাকি ৩০০ টি গ্রন্থ রচনা করেছে। আমার বা বিশ্বের যে কোন ঐতিহাসিকের এ কাজ করতে সময় লাগতো কমপক্ষে ৯০০ বছর! মামুনকে তো এই মহা অর্জনের জন্য কমপক্ষে এক ডজন নোবেল পুরস্কার দেয়া যেতে পারে। সে কথা থাক। আমি চাই না মামুন হঠাৎ করে , অনেকে যেটাকে “না ফেরার দেশ” বলে সেখানে যাক। সে আরো দশ বছর বেঁচে থাকলে আমাদের আরো ১০০ টি বই উপহার দেবে!

শেষ কথা: আমি তার মৃত্যুর পর তাকে গালাগাল করার ঘোর বিরোধী। আর আমি চাই না দেশদ্রোহী কারো বিচারের আগে পরপারে যাত্রা! এরশাদের মত আরো অনেকেই পার পেয়ে গেছে ’

স্ট্যাটাসের উপরের অংশ
স্ট্যাটাসের নিচের অংশ

আমি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করছি মামুন স্যারের এতজন গুণমুগ্ধ শিক্ষার্থী তাজ হাশমী স্যারের বক্তব্যের প্রতিবাদ করে যাচ্ছেন কিন্তু কাউকে দেখলাম না মামুন স্যারের গবেষণাকর্ম থেকে উদ্ভৃত করে এর প্রতিবাদ করছেন। আমি আরও অবাক হয়েছি কয়েকজন অতি উৎসাহী আপ্লুত হয়ে তাজ হাশমী স্যারকে মূর্খ পর্যন্ত বলছেন। কিন্তু তারা কেউ খেয়াল করলো না তাজ হাশমী স্যার দ্বিতীয় প্যারাতে লিখেছেন ‘বিশপ হেবারের চোখে ঢাকা’ এই নামটা ভুল। মাওলা ব্রাদার্স ১৯৭৪ সালে যে বইটি প্রকাশ করেছিল তার নাম ছিল ‘বিশপ হেবারের চোখে বাংলাদেশ’।আর প্রাসঙ্গিকভাবেই প্রশ্ন করা উচিত কোন বই থেকে চুরি করা সেই বইটির নাম উল্লেখ করার জন্য। আর সেটা করা না গেলে এ ধরণের বক্তব্য রাখা নিতান্ত অনুচিত।

প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্র, বিশেষত শিলালিপি, তাম্রশাসন কিংবা মুদ্রাগাত্রের লিপিমালার আলোকে প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস গবেষণাতেই আমার সিংহভাগ বিচরণ। তারপরেও একজন শিক্ষক হিসেবে যেটুকু পড়েছি সেখান থেকে জেনেছিলাম ঢাকার সেইন্ট থমাস চার্চের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসেছিলেন কলকাতার বিশপ Reginald Heber। তিনি ১৮২৪ সালে নারিন্দার খ্রিস্টান সমাধিও ভ্রমণ করেছেন। তিনি সেখানকার কুলম্ব সাহিবকে নিয়ে একটা সুন্দর বর্ণনা দিয়েছিলেন। বাংলাদেশে তাঁকে নিয়ে জাতের লেখালিখি আছে বা হয়েছে সেটা নিয়ে তেমন কিছু জানা নেই। প্রখ্যাত এই ইংরেজকে নিয়ে কেউ কিছু লিখে রাখলে তা সম্পর্কে গুগলে অন্তত তথ্য থাকার কথা, সেটিও নেই। ফলে তাজ হাশমী স্যার নিজে থেকে না বললে তাঁর দাবিকৃত ‘বিশপ হেবারের চোখে ঢাকা’ বইটির চুরি প্রসঙ্গ আমি মেনে নিতে পারছি না। এরপর রাজনীতি নিয়ে তাজ হাশমী স্যার লাল-নীল-গোলাপি দল সম্পর্কিত বেশ কিছু লাইন লিখেছেন সেটা আমার ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। যেহেতু তিনি দাবি করেছেন দুই বছরের সিনিয়র, সেহেতু এটা তাঁদের সিনিয়র জুনিয়রের প্রশ্ন। শিক্ষক এবং গবেষক হিসেবে আমি প্রশ্নের উত্তরগুলো শুধুমাত্র ইতিহাসের প্রেক্ষাপট থেকে খুঁজতে চাই।

গবেষকের ক্লাস নিয়ে এর আগে কোনো একাডেমিক জার্নাল কিংবা প্রবন্ধে শুনিনি। তাজ হামশী স্যার লিখেছেন ‘এক কথায় মামুন একজন Fourth Classবা চতুর্থ শ্রেণীর ঐতিহাসিক। তার তথাকথিত পিএইচডি ডিগ্রির কথা আজ না হয় নাই বা বললাম! মামুন নাকি ৩০০ টি গ্রন্থ রচনা করেছে।’ সাম্প্রতিক হিসাব ধরলে মুনতাসীর মামুন স্যারের রচিত, সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা এবারের বইমেলায় রচিত ২০ টির মতো সম্পাদনাসহ ধরলে ৩৫০ ছাড়িয়েছে বহু আগেই। এখানে মুনতাসীর মানুম রচিত গ্রন্থের পাশাপাশি সম্পাদিত বইগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কম। বইগুলোর পক্ষে বিপক্ষে মত থাকতে পারে। আমরা বইয়ের রিভিউ কিংবা সমালোচনা অবশ্যই লিখতে, শুনতে এবং পড়তে আগ্রহী। কিন্তু এগুলোকে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নাই। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল, মুনতাসীর মামুন স্যারের একার কাজ এই ৩৫০ টি বই নয়। তিনি সুবিশাল একটা গবেষক দল গড়ে তুলেছেন, সেখানে সবার সম্মিলিত শ্রম, প্রচেষ্টা আর সাধণার ফল এই বইগুলো। সেখানে সম্পাদক হিসেবে তাঁর নাম থাকায় বইগুলোকে দেখানো হয় মুনতাসীর মামুনের বই হিসেবে।

তাজ হাশমী স্যার লিখেছেন ‘আমার বা বিশ্বের যে কোন ঐতিহাসিকের এ কাজ করতে সময় লাগতো কমপক্ষে ৯০০ বছর! মামুনকে তো এই মহা অর্জনের জন্য কমপক্ষে এক ডজন নোবেল পুরস্কার দেয়া যেতে পারে।’। আমি বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই এই কাজ করতে আপনার অতোদিন লাগাটা স্বাভাবিক, কারণ আপনার হাতে সহস্রাধিক মানুষের সমন্বিত একটি গবেষক দল নেই। আপনি একটি তথ্য চাইলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকডজন শিক্ষক সেটা খুঁজে দিতে ঝাঁপিয়ে পড়বেন না। ফলে যেভাবেই হোক এই ৩৫০ টির অধিক গ্রন্থপ্রণেতা হিসেবে যে দক্ষতা মুনতাসীর মামুন দেখিয়েছেন সেটার কৃতিত্ব অবশ্যই তাঁর উপর বর্তায়। নির্জলা এই ব্যক্তি আক্রমণ নিয়ে আমি দুই একটা লাইন বলতে চাই। আপনার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি তাজ হাশমী স্যার ‘আপনি এবং মুনতাসীর মামুন স্যার দুজনে মিলেও যদি লেখা শুরু করেন একটা নতুন টপিকে আপনারা এক সপ্তাহে যা লিখবেন বাংলাদেশে কেউ কেউ আছে যে দুই দিনে তার থেকে বেশি লেখার ক্ষমতা রাখে’। তাই বলে আপনি সেই লেখাকে চতুর্থ শ্রেণির বলে উড়িয়ে দিতে পারেন না। পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে কটাক্ষ করা বাংলাদেশে নতুন প্যাশান, ফ্যাশান অনেকের ক্ষেত্রে প্রফেশানও। আমি সেটা নিয়ে বলতে চাই একটা কথাই ‘এ ধরণের প্রচেষ্টা বিদ্যায়তনিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয় বলে নেহায়েত লজ্জাজনক’।

বইয়ের সমালোচনা ও নকল প্রসঙ্গে আলোচনা সমালোচনা অনেকগুলোই পড়ার সুযোগ হয়েছে। ল্যাঙ্গুয়েজ হাইজিনে আমি আস্থা রাখি না, তবে সত্যের প্রকাশটা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, আহমদ ছফা হুমায়ুন আজাদের লেখা নিয়ে লিখেছেন ‘একবার হুমায়ুন আজাদ ভাষাবিজ্ঞানের ওপর থান ইটের মত প্রকান্ড একখানা কেতাব লিখে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশ করলেন এবং যত্রতত্র বুক ফুলিয়ে বলে বেড়াতে লাগলেন যে, আমার সমান ভাষাবিজ্ঞানী বাংলাভাষায় কস্মিনকালেও আর একজন জন্মাননি। তার অনতিকাল পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. মিলন কান্তি নাথ নামে আর একজন অধ্যাপক প্রবন্ধের পর প্রবন্ধ লিখে অকাট্য প্রমাণ হাজির করে দেখালেন যে, হুমায়ুন আজাদের এ ঢাউস বইটা আগাগোড়াই চৌর্যবৃত্তির (নকল করে লেখা) ফসল। ওই রচনা যাঁরা পড়েছেন, বাংলা একাডেমীর কাছে কৈফিয়ৎ চেয়ে বসলেন, আপনারা এমন একটা বই কেন প্রকাশ করলেন, যার আগাগোড়া চৌর্যবৃত্তিতে ঠাসা? বাংলা একাডেমী হুমায়ুন আজাদের বই বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নিলেন এবং বিক্রয় বন্ধ করলেন আর হুমায়ুন আজাদের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করলেন,- “আপনি দায়িত্বশীল ব্যক্তি হয়েও কেন আগাগোড়া একটি নকল গ্রন্থ একাডেমীকে দিয়ে প্রকাশ করিয়ে একাডেমীকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেললেন?”

হুমায়ুন আজাদের ‘নারী’ বহুল আলোচিত গ্রন্থ। আমি নিজেও এক কপি কিনেছিলাম। কিন্তু কিনে মুশকিলে পড়ে গেলাম। বইটি এতই জীবন্ত যে, মাসে মাসে রক্তশ্রাব হয়। অগত্যা আমাকে বইটি শেলফ থেকে সরিয়ে রাখতে হল। হুমায়ুন আজাদ দাবি করেছেন, এটা তাঁর মৌলিকগ্রন্থ। আমার একটুখানি সংশয় জন্ম নিয়েছিল। তাহলে সিমোন দ্যা বোভেয়ার (একজন ব্রিটিশ মহিলা দার্শনিক) কী করছিলেন? পরবর্তী গ্রন্থ ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ প্রকাশিত হওয়ার পরে আমার সব সংশয় ঘুচে গেল। হুমায়ুন আজাদ অত্যন্ত বিশ্বস্ততারসহকারে সিমোন দ্যা বোভেয়ারের বই বাংলাভাষায় নিজে লিখেন। সমস্ত মাল-মসলা সিমোন দ্যা বোভেয়ারের। হুমায়ুন আজাদ এই বিদূষী দার্শনিক মহিলার পরিচ্ছন্ন রুচি এবং দার্শনিক নির্লিপ্ততা কোথায় পাবেন? কুরুচি এবং অশ্লীলতাটুকুই এই গ্রন্থে হুমায়ুন আজাদের ব্যক্তিগত বিনিয়োগ। এ বিষয়ে আরো একটা কথা উল্লেখ করতে চাই। ‘নারী’ গ্রন্থটি যখন বাজেয়াপ্ত করা হল আমরা লেখকরা মিলে প্রস্তাব করলাম এ ধরণের গ্রন্থ নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে মিছিল করে প্রতিবাদ জানাব। আদালতে মামলা করব। কিন্তু হুমায়ুন আজাদ পিছিয়ে গেলেন। তখন ধরে নিয়েছিলাম হুমায়ুন আজাদের সৎসাহসের অভাব আছে। ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ প্রকাশিত হওয়ার পর আসল রহস্য বুঝতে পারলাম। মামলায় লড়ে ‘নারী’ গ্রন্থটি বাজারে বিক্রির ব্যবস্থা করা গেলেও আর্থিকভাবে হুমায়ুন আজাদের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা অল্প। কারণ এই লেখার যতটুকু চমক প্রথম বছরেই তা নিঃশেষ হয়েছিল। নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হলেও পাঠকের বিশেষ চাহিদা থাকবে না। ‘নারী’ গ্রন্থটি নিষিদ্ধ হওয়ার সুযোগ গ্রহণ করে হুমায়ুন আজাদ নতুন একটা জালিয়াতি করলেন। সে একই বই ভিন্ন নামে ভিন্ন মোড়কে প্রকাশ করলেন। বাংলাদেশে মহাজ্ঞানী-মনীষী হতে হলে এই ধরনের কত রকম ফন্দি-ফিকির করতে হয়! কত রকম ফন্দি-ফিকির শিখতে হয়!

হুমায়ুন আজাদ একটা দাবি অত্যন্ত জোরের সঙ্গে করে আসছেন, (তা হলো) তিনি পশ্চিমা ঘরানার পন্ডিত। এতদঞ্চলের নকলবাজ, অনুকরণসর্বস্ব পল্লবগ্রাহী বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তাঁর কোন সম্পর্ক নেই। তাঁর ‘আমার অবিশ্বাস’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পর এই দাবির যথার্থতা প্রমাণিত হল। প্রয়াত বৃটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল ঊনত্রিশ বছর বয়সে যে গ্রন্থটি ‘Why I am not a christian’ লিখেছিলেন, তার বঙ্গীয় সংস্করণ প্রকাশ করে সর্বত্র আস্ফালন করে বেড়াতে লাগলেন এটা তার মৌলিক কীর্তি। কী করে পশ্চিমা ঘরানার পন্ডিত হতে হয়, এ সময়ের মধ্যে হুমায়ুন আজাদ তার এক সহজ ফর্মুলা উদ্ভাবন করে ফেলেছেন। স্বর্গত পশ্চিমা লেখকদের লেখা আপনার মাতৃজবানে অনুবাদ করবেন এবং তার সঙ্গে খিস্তি-খেউর মিশিয়ে দেবেন। তাহলেই আপনি পশ্চিমা ঘরানার পন্ডিত বনে যাবেন।’

খেয়াল করলে দেখা যাবে প্রতিটি পদেই উপযুক্ত সূত্র ব্যবহার করেছেন আহমদ ছফা। এই বক্তব্যগুলো হুমায়ুন আজাদ স্বয়ং কিংবা তার পক্ষের কেউ খণ্ডাতে পেরেছেন বলে আমার জানা নেই। ফলে কেউ যদি এগুলোকে সত্য বলে দাবি করে আমার চুপচাপ সেটা শুনে যাওয়ার বাইরে অন্য কিছু করার সুযোগও কম। সেদিক বিচারে তাজ হাশমী স্যার যখন লিখলেন “বিশপ হেবারের চোখে ঢাকা” বইটির চৌর্যবৃত্তি নিয়ে সেখানে আমি বাধ্য হয়েই দ্বিমত করছি, কারণ এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ তাজ হাশমী স্যার হাজির করতে পারেননি। অন্যদিকে মুনতাসীর মামুন স্যারকে চতুর্থ শ্রেণির ইতিহাসবিদ হিসেবে উল্লেখ করায় আমি লজ্জিত। সবথেকে বড় কথা একজন ইতিহাস গবেষক হয়ে এ ধরণের বর্ণবাদী মন্তব্য করা নজিরবিহীন এবং দু:খজনক।

প্রসঙ্গত বলতে হয়, পশ্চিমা ডিগ্রিধারী প্রথম শ্রেণির অধ্যাপকদের অনেকের নামই আমরা বাংলাদেশে বসে জানি না। এক ইফতেখার ইকবাল স্যারকে চিনি প্যালগ্রেভ ম্যাকমিলানে থেকে ২০১০ সালে প্রকাশিত ‘The Bengal Delta: Ecology, State and Social Change, 1840–1943’ বইটার খাতিরে। আমি একজন ইতিহাস গবেষককে এভাবে তাঁর গবেষণা এবং প্রকাশনা দিয়েই চিনতে চাই। যেমন উল্লিখিত বইটা(Peasant Utopia: The communalization of class politics in East Bengal, 1920-1947) তাজ উল-ইসলাম হাশমী স্যারও আমার কাছে অপরিচিতই রয়ে যেতেন। সেই হিসেবে আমাদের মতো সাধারণ পাঠকের কাছে মুনতাসীর মামুন অনেক পরিচিত এক নাম। ঢাকা নিয়ে জানতে গেলে তার বই না পড়ে যেমন কোনো উপায় নাই। তেমনি, পূর্ববঙ্গের সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়েও তার বইয়ের বাইরে উল্লেখ করার মতো তেমন রেফারেন্স নাই। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিপক্ষে অনেক কথা সবাই যে যার অবস্থান থেকে বলেছেন। কিন্তু গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ বই বলতে যা বাজারে, লাইব্রেরিতে, শেলফে কিংবা অনলাইনে আছে তার শতকরা নব্বই ভাগের বেশি বই উল্লিখিত ‘ফোর্থ ক্লাস’ ইতিহাস গবেষকের।

কলেজ জীবনে প্রবেশের আগে ‘আলবেয়ার কামুর’ লেখা ‘দি আউটসাইডার’ পড়েছিলাম মুনতাসীর মামুনের অনুবাদেই। একজন ইতিহাসের অধ্যাপকের পক্ষে এমন ঝরঝরে অনুবাদ করা সত্যিই অনেক দক্ষতার ব্যাপার। মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র থেকে শুরু করে বাংলাদেশ চর্চা নিয়ে তাঁর যত লেখা সেগুলোকে এক শেলফ থেকে অন্য শেলফে স্থানান্তর করতে অনেকের পুরোটা দিন লেগে যাবে। ফলে বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে তিনি ধীরে ধীরে এক মহীরুহে পরিণত হয়েছেন, যেখানে‘ফোর্থ ক্লাস’ ইতিহাস গবেষক নাকি ‘ফার্স্ট ক্লাস’ লেখক সেটা নিয়ে চিন্তার সুযোগ কোথায়। কেউ কেউ তো মনে করতে বসেছেন ‘বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চা এবং মুনতাসীর মামুন একই স্রোতে এসে মিশেছে’।

শর্মিলা বোস, ডেড রেকনিং, পৃষ্ঠা ১৯৮

আমরা মুনতাসীর মামুন সম্পর্কে দলাদ্ধ তেল চুপচুপে প্রশংসা কিংবা রক্তাপিয়াসী আক্রমণাত্মক সমালোচনা এ দুটোই শুনে অভ্যস্থ। কিন্তু লজ্জার বিষয় তাঁর গবেষণা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা এটা আমাদের যে কারো জন্য গর্বের বিষয় হতে পারতো। আমরা আনন্দের সঙ্গে বলতে পারতাম তার সৃষ্টিশীলতা ও কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে। আর সমালোচনা যদি করি সেটা শর্মিলা বোসের মতো হলেও নিদেনপক্ষে চলনসই বলে মেনে নেয়া যেত। OXFORD UNIVERSITY PRESS থেকে 2011 সালে প্রকাশিত DEAD RECKONING বইয়ের লেজে সংযুক্ত ‘বিবলিওগ্রাফিক নোটসের’১৯৮ পৃষ্ঠায় এক্কেবারে শেষ প্যারাটা খুলে পড়ে নিতে পারেন কেউ চাইলে। আমি ইমেজ হিসেবে সেটা সংযুক্ত করছি। কিন্তু এই বিষয়গুলো না উল্লেখ করে অনর্থক আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ আমাদের হতাশ করে। একজন ইতিহাস গবেষক ও শিক্ষক হিসেবে আমি চাই তাজ হাশমী স্যার তাঁর নামের প্রতি সুবিচার করবেন। তিনি তাঁর বাকি জীবনে  ‘Peasant Utopia’ বইটার মতো এমন কিছু মাস্টারপিস উপহার দিয়ে যাবেন। কে কি বলবে, আমি তাঁর কাছে এমন বিষাক্ত ব্যক্তি আক্রমণমূলক পোস্ট দেখতে চাই না। আর সমালোচনা যদি করতেই হয়, সেটা হোক রেফারেন্সনির্ভর, পদ্ধতিগত ও যুক্তিযুক্ত বিষয়কে সামনে রেখে। সবাই সুস্থ থাকুন, নিজ ঘরে নিরাপদ থাকুন। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে ভয়াবহ মহামারী করোনার বিপদ থেকে রক্ষা করুন।

ড. মো. আদনান আরিফ সালিম
সহকারী অধ্যাপক
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

 

(Visited 71 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *