আমাওয়ার প্লেগ ও ইসলাম

ইম্মাউস নিকোপোলিস তথা আমাওয়ার প্রত্নস্থানে যে বিস্তর ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তা অল্প কয়েক বছরের? মোটেও না। ইউরোপের পাশাপাশি বিশ্বের নানা দেশে প্লেগ আক্রান্ত হওয়ার সময় ভয়াবহ সংক্রমণ ঘটেছিল আমাওয়াতেও। মধ্যযুগের ইউরোপে ইংল্যান্ডের উত্তরাংশ এবং স্কটল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বাংশের নর্দাম্ব্রিয়ান রাজ্য প্লেগ আক্রান্ত হয় ৬৬০ সালে। এর ঠিক দুই প্রজন্ম আগেই এই অঞ্চল বেশ সমৃদ্ধ ছিল। উর্বর ফসলি জমির মালিক, রাজক্ষমতায় ক্ষমতাবান কিংবা প্রচুর ধনসম্পদের অধিকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্লেগের সংক্রমণ আলাদা কিছু ছিল না। এক কথায় বলতে গেলে প্লেগের তা-ব যে অঞ্চলে শুরু হয়েছে সেখানকার কেউই এর থেকে রক্ষা পায়নি। প্লেগ আক্রান্ত জনপদের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ফলাফল ছিল অভিন্ন। গণমড়ক শুরু হয়ে গেলে কেউ আর সেখানে কবরপ্রথার ধার ধারেনি। ঘরে, বারান্দায়, বাজারে, গির্জায় কিংবা রাস্তায় যেখানে মানুষের প্রাণ দেহত্যাগ করেছে সেখানেই পচেগলে শেষ হয়েছে তার শবদেহ। অনেকে ক্ষেত্রে শবভূক প্রাণিদের মৃতদেহ খুবলে খেতে দেখা গেলেও তাদের সংখ্যা ছিল নিতান্ত কম। অনেকে মনে করেন প্লেগ আক্রান্ত শহদেহ ভক্ষণের ফলে শবভূক প্রাণিরাও বাহিত জীবাণুর মাধ্যমে সংক্রমিত হয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে মারা পড়েছিল।
বাইজেন্টাইন সা¤্রাজ্য ও ইংল্যান্ডের তুলনায় সিরিয়ায় এই প্লেগের (The plague of Amwas; 638–639 A.D.) প্রভাব ছিল একটু অন্যরকম। বিশ্বের নানাস্থানে প্লেগ যেমন একবার থাবা বসানোর পর আস্তে আস্তে তা বিলুুপ্ত হয়ে গেছে সিরিয়া চলেছে তার ঠিক উল্টোপথে উল্টোরথে। এখানে প্রাথমিক সংক্রমণে যেমন অগণিত মানুষের প্রাণ গেছে, তেমনি অল্প দিনের বিরতিতে বারংবার আঘাত হেনেছে এই মহামারী। ৫৪২ সালের দিকে মিসর হয়ে গাজা, এন্টিয়ক ও আস্কিলন বন্দর দিয়ে প্রথমবারের মতো সিরিয়াতে প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এইসব এলাকায় প্রাথমিক সংক্রমণের পর তা দামেস্ক এবং আরও দক্ষিণে ছড়িয়ে পড়ে। জনের (John of Ephesus) বর্ণনা থেকে দেখা গিয়েছে ৫৪১-৫৪৯ সালের মধ্যে প্রায় প্রতি বছর সিরিয়ার কোনো না কোনো এলাকায় প্লেগের সংক্রমণ লেগেই ছিল। দীর্ঘদিনের সংক্রমণে কৃষিজমির চাষ কাজে নিয়োজিত কৃষকদের মৃত্যুতে ফসল উৎপাদনে মন্দাভাবে দেখা দেয়। উচ্চ মৃত্যুহারের কারণে সিরিয়ার অনেক এলাকা তখন জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল।
আরবদের যাযাবর জীবনের উপর এই প্লেগের প্রভাব ছিল ভিন্নরকম। বেদুইনরা বিভিন্ন তাঁবুতে বাস করতো। তারা বছরের পুরোটা সময় নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে আটকে থাকেনি। ফলে তাদের অনেকে কাফেলা এক স্থান থেকে অন্যস্থানে জীবাণু সংক্রমণ ঘটালেও তারা অন্যস্থানের মতো একেবারে গণহারে মারা পড়েনি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে সংক্রমণ ঘটার আগেই কোনো কোনো কাফেলা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওযায় তারা সে যাত্রা রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু পরে তারা আবার নতুন কোনো এলাকায় গিয়ে আক্রান্ত হয়েছে আংশিকভাবে। পাশাপাশি বেদুইনদের মধ্যে উচ্চ জন্মহার প্লেগের মৃত্যুর সঙ্গে পাল্লা দিতে থাকে। ফলে গণমৃত্যুতে জনসংখ্যা যেভাবে হ্রাস পায় তার বিপরীতে উচ্চ জন্মহার অনেক দিক থেকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে সমন্বয় সাধন করে। তবে কৃষি উৎপাদন ব্যহত হওয়ায় রাষ্ট্রের আয় কমে যায় যার প্রভাব পড়ে শাসক ও যাজক সম্প্রদায়ের উপরেও। এভাবে ফি বছর প্লেগের সংক্রমণ থেকে সিরিয়ার নামের সঙ্গে ‘প্লেগের ধাঁধায় আটকে পড়া জটিল জনপদ’ তকমটা লেগে যায়। ইসলামের আবির্র্ভাবপূর্ব সিরিয়ায় যেভাবে প্লেগের প্রাদুর্ভাব সৃষ্টি হয়েছিল তা অনেকদিন স্থায়ী হয়। এমনকি ইসলামের আবির্ভাবের পর মুসলিম সিরিয়ার শাসকদেরও লড়তে হয়েছে এই প্লেগের বিরুদ্ধে।
ইসলামি যুগে সিরিয়ায় প্লেগ মহামারীর সুস্পষ্ট প্রমাণও পাওয়া গিয়েছে। ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দ তথা ১৮ হিজরির সে সময়ে মুসলিম জাহানের খলিফা ছিলেন হজরত ওমর রাদিয়াল্লাাহু আনহুম। ইসলামি খেলাফতের আমির হিসেবে তিনিও সিরিয়ার প্লেগ সম্পর্কিত নানা জটিলতা সম্পর্কে অবগত হয়েছিলেন। যেকোনো মহামারী দেখা দিলে ইসলামী শরীআতের যে বিধান তার অনেকটাই এই সিরিয়া এবং প্লেগ কেন্দ্রিক। তখন সিরিয়া-ফিলিস্তিনে মহামারি প্লেগ দেখা গিলেও খলিফা ওমর রা. সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে এই সম্পর্কে জানতেন না। তিনি অল্প সময় ব্যবধানে যখন জানতে পেরেছিলেন যে সিরিয়ায় মহামারি প্লেগ দেখা দিয়েছে তখন তিনি তাঁর সিরিয়া সফর স্থগিত করেছিলেন। ইসসলামের ইতিহাসে মহামারি প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষায় কৌশল হিসেবে মুসলিম জাহানের প্রতাপশালী খলিফা হজরত ওমরের এই সিদ্ধান্তকে সেরা এবং কার্যকরী বলে মনে করা হয়।
প্রায় অর্ধ-জাহানের খলিফা হযরত ওমরের তখন সিরিয়া-ফিলিস্তিনে রাষ্ট্রীয় সফরের সমময়। তিনি আগে থেকে কোনো সংবাদ না পেয়ে সিরিয়া সফরের উদ্দেশ্যে মদিনা থেকে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। তবে মদিনা থেকে ‘সারগ’ নামক অঞ্চলে পৌছানোর পর সেনাপতি আবু উবায়দাহর (রা.) কাছ থেকে সিরিয়ায় প্লেগ সংক্রমণের কথা জানতে পারেন। ইসলামের ইতিহাসে এ ঘটনা তাউন আম্মাউস (طاعون عمواس) নামে পরিচিতি পেয়েছে। সিরিয়া যাত্রার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হযরত ওমর (রা.) কয়েকজন প্রবীণ সাহাবীর কাছে পরামর্শ চান। হযরত ওমর (রা.) সিরিয়া সফর করবেন নাকি মদিনায় ফিরে যাবেন এই মর্মে সাহাবীদের কাছে পরামর্শ চাইলে তাঁরা পক্ষে-বিপক্ষে দুই ধরণের মতামতই জানিয়েছিলেন। এই মতামত জানতে হজরত ওমর (রা.) কে ৩টি পরামর্শ সভা করতে হয়েছিল। প্রথম সভা থেকে অপেক্ষাকৃত প্রবীণ সাহাবিদের পরামর্শ ছিল সিরিয়ায় যাওয়ার পক্ষে। তবে এর বাইরে কয়েকজন সাহাবী বলেছিলেন ‘খলিফার সিরিয়া যাওয়া উচিত হবে না’। দ্বিতীয় দফায় আনসার ও মুহাজিরদের পরামর্শ সভায়ও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। শেষ পর্যন্ত হযরত ওমর (রা.) পরামর্শ চাইলেন প্রবীণ কুরাইশদের কাছে। দক্ষ ও অভিজ্ঞ কুরাইশ সাহাবিরা কোনো রকম মতানৈক্য না রেখে অভিমত দিলেন ‘সিরিয়ার সফর স্থগিত করে খলিফার মদিনায় ফিরে যাওয়া উচিত। যাই হোক খলিফার পক্ষ থেকে তার সঙ্গীদের মহামারী প্লেগের দিকে ঠেলে দেওয়াটা উচিত হবে না’।
সিরিয়ার প্লেগ নিয়ে হযরত ওমর (রা.) যে সঙ্কটের মধ্যে পড়েছিলেন তার থেকে মুসলিম উম্মাহর জন্যও অনেক দিক নির্দেশনা রয়েছে। বিশেষত, তিনি মদীনায় ফিরে গেলে সেনাপতি হজরত উবায়দাহ (রা.) বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনিন! আপনি কি আল্লাহর নির্ধারিত তাকদির থেকে পালিয়ে এলেন?’ সেনাপতি হজরত আবু উবাইদাহ (রা.) এর মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ সাহাবির কাছ থেকে এমন প্রশ্ন শুনে হজরত ওমর (রা.) অনেক বিব্রত হয়েছিলেন। খলিফার অনেক পছন্দের ব্যক্তি এবং সেনাপতি আবু উবায়দাহ (রা.) তাঁর জীবদ্দশাতেই রাসূল (সা.) এর কাছ থেকে জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন। ফলে তাঁর বক্তব্য হযরত ওমর (রা.) এর কাছে অনেক গুরুত্ব পায়। তিনি আবু উবায়দা (রা.) কে বোঝানোর জন্য একটি উদাহরণ দিয়েছিলেন।
হযরত ওমর (রা.) আবু উবায়দা (রা.) কে উদ্দেশ্য করে বললেন ‘ হে আল্লাহর রাসূলের সাহাবি আপনি বলুন তো আপনার কিছু উটকে এমন কোনো উপত্যকায় নিয়ে গেলেন যেখানে দুইটি মাঠ আছে। মাঠ দুইটির মধ্যে একটি মাঠ সবুজ ঘাস-পাতা ও গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ সুশ্যামল। অন্যদিকে আরেকটি মাঠ একেবারে শুষ্ক, উষর ও প্রাণহীন ধূসর। এখন আপনি আপনার উটের পালকে সবুজ-শ্যামল মাঠে ছেড়ে দিলে সেটা যেমন আল্লাহর নির্ধারিত তাকদির অনুযায়ী চরানো হবে, তেমনি ঐ শুকনো ঘাস লতাপাতাহীন মাঠে নিয়ে ছেড়ে দিলে সেটাও মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রদত্ত তাকদির অনুযায়ীই চরানো হবে’। এই সুন্দর যুক্তি দিয়ে বোঝানোর পর আবু উদায়দা (রা.) পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করেন। তিনি হযরত ওমর (রা.) এর বর্ণনা থেকে মেনে নিলেন যে সামনে সুন্দর সুযোগ সুবিধা থাকলে তা গ্রহণ করার অর্থ এই নয় যে সেখানে আল্লাহ নির্ধারিত কোনো সুনির্দিষ্ট তাকদির থেকে পালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তর্ক বিতর্কের অবসান ঘটে প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) এর বক্তব্য উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে। তিনি রাসূল (সা.) এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন ‘তোমরা যখন কোনো এলাকায় মহামারী প্লেগের বিস্তারের কথা শুনো, তখন সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোনো এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব নেমে আসে, আর তোমরা সেখানে থাকো, তাহলে সেখান থেকে বেরিয়েও যেও না।’ পরবর্তীকালে হাদিস সঙ্কনের সময় ইমাম বুখারি (রহ.) এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। সবথেকে বড় কথা এই হাদিসের মাধ্যমে হযরত ওমর (রা.) এর সময় সিরিয়ায় প্লেগের বিস্তার সম্পর্কে জানা গিয়েছে। অন্যদিকে আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) এর বক্তব্য থেকে এটাও বোঝা সম্ভব যে রাসূল (সা.) পর্যন্ত প্লেগ মহামারী সম্পর্কে অবগত ছিলেন বলেই তিনি এর থেকে পরিত্রাণের জন্য উপযুক্ত দিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। মহামারীর ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গেলে শুধুমাত্র ঐতিহাসিক সূত্রের উপর নির্ভর করলে চলবে না। এক্ষেত্রে প্রাণিবিজ্ঞান, অনুজীববিজ্ঞান, প্রাণ রসায়ন, প্রতœতত্ত্ব ও নৃ-বিজ্ঞান থেকে সাহায্য নিতে হবে। অন্যদিকে ধর্মীয় সূত্রে এই ধরণের মহামারী মোকাবেলার জন্য কি ধরণের নির্দেশনা এসেছিল কিংবা আছে সেগুলো থেকে মহামারীর সামাজিক ও জনগোষ্ঠীগত বাস্তবতা যাচাই করা যেতে পারে।

সিরিয়ার বিখ্যাত রুসাফা তোরণ যেখান দিয়ে প্লেগের সময় খলিফা হিশাম তার মরু প্রাসাদে ঢুকতেন।
(Visited 59 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *