বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন মসজিদ

কলেমাখচিত ইট

প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ও ইতিহাসের সূত্রনির্ভর বিশ্লেষণে বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন মসজিদ কোনটি তা নিয়ে হঠাৎ করে কিছু বলা কঠিন। তবে তথ্যসূত্রনির্ভর গবেষণায় দেখা গিয়েছে পর পর তিনটি ধারার মসজিদের ক্রমবিকাশ ঘটেছে বাংলাদেশে। আর সে হিসেবে সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের সময় (লিপিমালায় ১৪৫৬ খ্রিস্টাব্দের তারিখযুক্ত) নির্মিত ঢাকার বখত বিনতের মসজিদটি প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে এখন অবধি সর্বপ্রাচীন। এরপর সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের নির্দেশেই তাঁর সেনাদলের নেতা ও জননন্দিত আউলিয়া খান জাহান আলি রওনা হন দক্ষিণবঙ্গ জয় করার উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে বর্তমান বাংলাদেশের ঝিনাইদহের বারোবাজার এলাকায় নগর পত্তনের পাশাপাশি নির্মাণ করেছিলেন একগুচ্ছ মসজিদ। বারোবাজার এলাকার মসজিদের উপযুক্ত শিলালিপি না থাকায় মসজিদগুলোর সরাসরি সময়কাল নির্ধারণ কঠিন। তবে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে বাগেরহাট মসজিদ কমপ্লেক্সের অপেক্ষাকৃত পূর্বতন সময়কালের মসজিদগুলো এখানে নির্মিত হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
বিনত বিবির মসজিদ নামে পরিচিত বখত বিনতের মসজিদের পর তাই উচ্চারিত হওয়ার কথা ঝিনাইদহের বারো বাজার মসজিদ কমপ্লেক্সের জোড় বাংলা মসজিদ, নুনগোলা, পাঠাগার, শুকুর মল্লিক, সাদিকপুর, গোড়ার, সিংদহ আওলিয়া, সাতগাছিয়া আদিনা মসজিদ, মনোহর দিঘি মসজিদ, পীর পুকুর ও গলাকাটা মসজিদের নাম। কিন্ত অদ্ভুতভাবে এই মসজিদগুলো বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার ক্ষেত্রে ব্রাত্য ও অবহেলিত রয়ে গেছে। ইতিহাসের সূত্র বিচারে J. Westland এর A Report on the district of jessore its Antiquities , Its History and Its Commerce এবং K.G.M. Latiful Bari সম্পাদিত Bangladesh District Gazetteers Jessore এবং L.S.S O’malley এর Bengal District Gazetteers, Jessore থেকে এই অঞ্চল সম্পর্কিত নানা তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে খান জাহান আলি এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদী ভৈরবের পথ ধরে বারবাজারে এসে পৌঁছান। তারপর অল্পদিনের ব্যবধানে অনেকটা অভিন্ন পথে বাগেরহাটের (খলিফাতাবাদ) দিকে রওনা গমন করেছিলেন বলে ধরা হয়ে থাকে। সময়কাল বিচারে বাগেরহাটে মসজিদ কমপ্লেক্স বারোবাজারের পরবর্তীকালের। ফলে ষাট গম্বুজ মসজিদ, চুনাখোলা মসজিদ, বিবি বেগনী মসজিদ, সিঙ্গাইর মসজিদ, রণবিজয়পুর মসজিদ, রেজাখোদা মসজিদ কিংবা নয় গম্বুজ মসজিদও প্রাচীনত্যের বিচারে অনেকে এগিয়ে রয়েছে।

বখত বিনত মসজিদের শিলালিপি
বখত বিনতের মসজিদ

প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল অনেক গবেষক বাংলার মসজিদ-স্থাপত্যের প্রাথমিক পর্বের প্রতিটি মসজিদের নির্মাণ শৈলীকে গবেষকগণ চিহ্নিত করেছেন মামলুক রীতি হিসেবে। এই ধাঁচে বাংলার চিরাচরিত বাঁকানো ছাদ ও কর্নার-টাওয়ার-বিহীন এককভাবে ইট-নির্মিত এবং ইট ও পাথর-নির্মিত এই দুই প্রকার মসজিদ দেখা যায়। এই বিষয়টি চিহ্নিত করা সম্ভব উপযুক্ত প্রত্নতাত্ত্বিক খনন এবং তার সঙ্গে লভ্য ঐতিহাসিক সূত্রের প্রতিতুলনার মাধ্যমে। এ ধরণের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ না পাওয়ায় মিনহাজ ই সিরাজের তবকাত ই নাসিরিতে উল্লিখিত লখনৌতিতে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি এবং তার উত্তরসূরী হুসামুদ্দিন ইওয়াজ খলজি নির্মিত মসজিদগুলোকে সেভাবে আলোচনায় নিয়ে আসা হচ্ছে না।

মিনহাজের বর্ণনায় ৬০৪-০৫ হিজরি তথা ১২০৭-০৯ সালের দিকে বাংলার প্রথম মসজিদ নির্মিত হওয়ার কথা। তবে সে সময়ের কোনো স্থাপত্যিক নিদর্শন এখন অবধি টিকে না থাকায় ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি এখনও অস্পষ্ট। অন্যদিকে জালালুদ্দিন মাসুদ জানির (১২৪৭-১২৫১ খ্রিস্টাব্দ) সময়ের একটি শিলালিপিতে দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরে মসজিদ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে যেখানে লিপিতে উৎকীর্ণ সময়কাল পাওয়া যায় ১২৪৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে। আর তাই বখতিয়ার খলজির পুত্র ইখতিয়ারের (যাকে আমরা বখতিয়ার বলে অভ্যস্থ) সময় থেকে থেকেই দেবকোট মুসলিম সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠলেও সেখানে সর্বপ্রাচীন মসজিদের নমুনাটি অনুপস্থিত। মূলত শিলালিপির সাক্ষ্য পাওয়া গেলেও বাংলায় এখনও প্রাচীনতম মসজিদের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অপ্রতুল তথ্যসূত্রের কারণে সময়কাল বিচারে হুগলি জেলার ত্রিবেণীতে জাফর খাঁর মসজিদ, পাণ্ডয়ার বারদুয়ারি বা বাড়ি মসজিদ এবং মোল্লা সিমলা গ্রামের মসজিদ বাংলার মসজিদ-স্থাপত্যের একেবারে প্রাথমিক নমুনা বলে মনে করা যেতে পারে।

গিরিদাকিল্লা থেকে প্রাপ্ত নসওলালাগলি মসজিদের শিলালিপি

উপরের তথ্য প্রমাণ থেকে আপাত দৃষ্টিতেই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন মসজিদ নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় ভুল তথ্য পরিবেশ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা লালমনিরহাটের পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাস গ্রাম থেকে কয়েকটি ইঁটের টুকরা আবিষ্কার করে সেখানে একটি মসজিদের দাবি করা হচ্ছে। নানা ধরণের তুলনামূলক তথ্যের মারপ্যাঁচে যুক্তি দেয়া হলেও রামদাস গ্রামের ঐ জঙ্গলের মধ্যে হারানো মসজিদটির নামে যা আবিষ্কৃত হয়েছে সেখানে কোনো স্থাপত্যের অবকাঠামো পাওয়া দূরে থাক কোনো রকম প্রত্নতাত্ত্বিক খনন পর্যন্ত হয়নি। তারপরেও বিভ্রান্তিকরভাবে প্রেক্ষিত বিচ্যুত, ক্ষতিগ্রস্ত, আবহিক বিকারে ক্ষয়প্রাপ্ত এবং বিবর্তিত শিলালিপির আংশিক পাঠোদ্ধারে মসজিদটির নির্মাণকাল দাবি করা হচ্ছে ৬৯ হিজরি বলে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা কিংবা ইতিহাসের সূত্র থেকে অনুসন্ধান করতে গেলে গবেষণার বদলে এই ধরণের মিডিয়াবাজি নির্লজ্জ প্রতারণা, ইতিহাসবিচ্ছিন্ন মিথ্যাচার এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগের সঙ্গে নিঃসন্দেহে জঘন্য এক প্রতারণা।
প্রত্নতত্ত্ব আসলে কি? আমরা প্রত্নতত্ত্বের গবেষণায় কি করি? এই দুটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সহজেই লালমনিরহাটের সর্বপ্রাচীন মসজিদ নিয়ে মিথ্যাচার, বিভ্রান্তি ও প্রতারণার মুখোমুখি হতে হয়েছে তার থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে। এস জে নাডসন বলছেন, অতীতকালের মানুষের রেখে যাওয়া তাদের নির্মিত, ব্যবহৃত ও প্রভাবিত বস্তুগত উপাদানের প্রেক্ষিতনির্ভর গবেষণা ও পর্যালোচনাই প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা। আর গবেষক হিসেবে হিসেবে আমরা উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ তথা প্রত্নবস্তু ও বাস্তুবস্তুর বিচারে ইতিহাসের বিদ্যমান সত্যের আরও গভীরে যাওয়া তথা মূল সত্যের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করি। যদি তাই হয় তবে লালমনির হাটের মসজিদ সম্পর্কিত এত অপ্রয়োজনীয় তথ্যের বিন্যাস নিয়ে ঘাঁটাঘাটির প্রয়োজন ছিল না। অন্তত এখানে কোনোভাবেই রাসূল (সা.) এর ওফাতের আনুমানিক ৫০ বছর পরে প্রখ্যাত সাহাবি হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাছ (রা.) টেনে আনার কোনো প্রয়োজন ছিল না। উপযুক্ত তথ্যসূত্র অনুপস্থিত থাকায় চোখবন্ধ করে দাবি করা হচ্ছে ‘প্রাচীন নথি’ এর কথা। কিন্তু এই প্রাচীন নথি আদতে কি? কে কোথায় এর দেখা পেয়েছে সেটা এখনও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন।

প্রাপ্ত ইটের স্তূপ

প্রিয় পাঠক, আসুন প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটু বিশ্লেষণ করা যাক। এখানে পাওয়া গিয়েছে বেশ কিছু ইঁট কিন্তু খননের মাধ্যমে সেগুলো আবিষ্কৃত হয়নি। অন্যদিকে এই ইটগুলোর এমন কোনো স্থানিক বিন্যাস নেই যার থেকে এগুলোকে মসজিদ বলে দাবি করা যেতে পারে। এর আগে বাংলাদেশের যতগুলো মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধবিহার কিংবা স্থাপত্যিক অবকাঠামো আবিষ্কৃত হয়েছে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে খননে প্রাপ্ত ইটের উপযুক্ত স্থানিক বিন্যাস (Spatial Pattern) ছিল। এই স্থানিক বিন্যাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের বিস্তরণের ধরণ থেকে গবেষকগণ অনুমান করেছেন সেগুলো মসজিদ, মন্দির, বিহার, গির্জা নাকি সাধারণ কোনো বসতবাড়ি কি ছিল। অন্যদিকে প্রতিটি মসজিদ আবিষ্কারের সঙ্গে এর শিলালিপি ওতপ্রোতভাবে জড়িত যেখানে মসজিদের নির্মাতার নাম ও পদবী, কার পৃষ্টপোষকতায় কার মাধ্যমে ঠিক কোন সময়কালে নির্মিত তাও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে দেখা যায় এসব শিলালিপিতে। প্রসঙ্গত, উল্লেখ করা যায় বাংলাদেশের প্রাচীনতম কিংবা প্রাথমিক দিকের মসজিদ হিসেবে স্বীকৃত প্রায় প্রতিটি স্থাপনায় যে লিপি পাওয়া গিয়েছে তার সবগুলোই পাথরে খোদাইকৃত। আমরা তুলনামূলক বিশ্লেষণের পাশাপাশি একটু সাধারণ জ্ঞান খরচ করি, খেয়াল করে দেখি বাংলাদেশে এখনও নির্মিত বেশিরভাগ স্থাপত্যের যে নামফলক সেটা মার্বেল পাথরে তৈরি করা হয়। কিংবা খরচ বাঁচানোর চেষ্টা করলেও সেখানে অপেক্ষৃত ঝলমলে হোয়াইট সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়। তবে হ্যাঁ! সুলভ প্রাপ্তির সুযোগ কিংবা আর্থিক দৈন্যের কারণে ইঁটের উপরও লিপি উৎকীর্ণ করাটা অসম্ভব নয়। তবে এই লিপিতে কোনো কিছু না লিখে শুধুমাত্র ‘আল্লাহু’ লেখার পাশাপাশি হুট করে একটা তারিখ বসিয়ে দেয়া হবে এ চিন্তা তুলনামূলক অবাস্তব ও নজিরবিহীন।
প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা জনৈক টিম স্টিলের বর্ণনা করছেন যিনি আদতে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিকগবেষক নন বরং একটি পর্যটন সংস্থা টাইগার ট্যুরসের উপদেষ্টা মাত্র। সে হিসেবে আমরা তাঁকে একজন ‘রত্ন শিকারী’ তথা ট্রেজার হান্টার হিসেবে বর্ণনা করতে পারি সহজেই। তারপরেও পত্রিকাগুলো লিখে যাচ্ছে ‘শৌখিন ব্রিটিশপ্রত্নতাত্ত্বিক টিম স্টিল একসময় বাংলাদেশের টাইগার ট্যুরিজম’ নামের একটি পর্যটন উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা হিসেবে কর্তব্যরত ছিলেন। তিনি ১৯৮৬ সালের দিকে মসজিদটি আবিষ্কারের কথা শুনে লালমনিরহাট ছুটে আসেন। বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাস তন্ন তন্ন করে খুঁজতে শুরু করেন। ৬৯১ খ্রিস্টাব্দে কে বা কেন লালমনিরহাটে এই মসজিদটি নির্মাণ করল তা খুঁজতে নেমে গেলেন। যোগাযোগ করলেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদফতরের সঙ্গে। তারা আগ্রহ দেখায়নি।’ সহজ ভাষায় বলতে গেলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ‘বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরে’ যাঁরা কাজ করেন কিংবা এদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে যাঁদের বিন্দুমাত্র ধারণা রয়েছে তাদের কারও এই অদ্ভুতুড়ে চিন্তায় আগ্রহ দেখানোর কারণও নেই। কারণ উনারা জানেন একটি মসজিদ আবিষ্কার করতে গেলে কি কি থাকতে হয়। উপযুক্ত স্থানিক বিন্যাসের স্থাপত্যিক অবকাঠামো বাদে একটি ইটের টুকরো থেকে ‘স্বপ্নে দেখে মসজিদ আবিষ্কার করা’ একজন ট্রেজার হান্টার তথা রত্নশিকারী টিম স্টিলের পক্ষে সম্ভব। বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে বিন্দুমাত্র ধারণা থাকা কেউ এটা করতে পারেন না।

বাচ্চাকাচ্চা কিংবা কিশোররা অনেক সময় উল্টোপাল্টা নানা আবদার করে বসে পরিবারে। ঠিক যেমন ‘ভিডিও গেমস’ খেলার জন্য ট্যাব চাই, ক্রিকেট খেলার জন্য দামী ব্যাট চাই, বাইক চাই, কার চাইসহ আরও কত কি? কিন্তু তার পরিবারের সদস্যরা জানেন এই বাচ্চা কিংবা কিশোরের হাতে ট্যাব তুলে দিলে সে লেখাপড়া করবে না, ক্রিকেটের ব্যাট থাকার পরেও আরও দামি একটা ব্যাট কিনে দেয়াটা হবে নিতান্ত অপচয়, বাইক কিনে দিলে সে হয় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ঠ্যাঙ্গ ভেঙ্গে ল্যাংড়াতে ল্যাংড়াতে ঘরে ফিরবে অথবা লোকের মেয়েকে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে টিজ করবে। একইভাবে তার মতো বাচ্চা কিংবা কিশোরের হাতে কারের চাবি তুলে দেয়া আর অভিভাবক হিসেবে নিজের গলায় দড়ি পেঁচিয়ে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে পড়া সমার্থক। শিশুতোষ প্রত্নতাত্ত্বিক আচরণকারী টিম স্টিলকে দেখে এদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার যাঁরা অভিভাবক অর্থাৎ ‘বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর’ ঠিকই চিনতে পেরেছিলেন। তাঁরা বুঝতে পেরেছেন ভদ্রলোকের কথায় তাল দিলে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য প্রত্ননিদর্শনগুলো নিয়ে একটা কোট কেটে হাডুডু খেলতে নেমে যাবেন।

এ আই এ লোগো

বাচ্চা কাচ্চা থেকে শুরু করে কিশোর প্রত্যেকেই মা-বাবার কাছে কিছু চেয়ে যখন পায় না তাদের সামনে পথ খোলা থাকে ‘মামা বাড়ির আবদারের’। টিম স্টিলের সামনে ‘মামা বাড়ি’ হিসেবে আবদার পূরণের সুযোগ সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্নতাত্ত্বিকদের কথিত প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ‘আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিওলজিস্ট’। কিন্তু আমরা ‘এআইএ’ বলতে বুঝি আর্কিওলজিক্যাল ইস্টটিটিউট অব আমেরিকাকে (Archaeological Institute of America), যেখানে অনলাইনের নানা কর্মকাণ্ডে আমি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছি বিগত প্রায় এক দশক ধরে। সেই হিসেবে তারা যদি কোনো ঐতিহ্যকে স্বীকৃতি দেয় অনলাইনে অবশ্যই তার উপযুক্ত তথ্য ও পর্যালোচনা থাকবে। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা দেখেছি ‘কাদের ফুড সেন্টারকে’ ডাকা হতো ‘কে এফ সি’ হিসেবে। আর এআইএ এর ‘কাদের ফুড সেন্টার’ টাইপ কোনো ভার্সন হতে পারে টিম স্টিল সাহেবের কথিত প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ‘আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিওলজিস্ট’। লজ্জার বিষয় তারা নাকি শুধুমাত্র বাংলাদেশেরই নয় দক্ষিণ এশিয়ার সর্বপ্রাচীন মসজিদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু তারা খোঁজ নিতে পারেনি দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশের প্রথম মসজিদ বলে দাবিকৃত নিদর্শনটির স্থানে আদতে কোনো স্থাপত্য কাঠামো ছিল কি ছিল না?
টিম স্টিলের বিভ্রান্তিকর দাবির পক্ষে হাজির করা হাস্যকর প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণটির ব্যাপারেও উপযুক্ত দুুই একটি কথা বলা জরুরি মনে করছি। ট্রেজার হাস্টার মিস্টার স্টিল যে প্রমাণের ভিত্তিতে ৬৯১ খ্রিস্টাব্দের নির্মিত মসজিদ দাবি করেছেন সেই শিলালিপি আমি নিজেই শুধু দেখেছি এমন নয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রখ্যাত গবেষক ও ইতিহাসবিদ অধ্যাপক এ কে এম শাহনাওয়াজ স্যার এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস এ কে এম ইয়াকুব আলী স্যার পর্যন্ত এই লিপির ব্যাপারে ওয়াকিবহাল। আমার মতো অর্বাচীন যেখানে সহজেই চিনতে ও পড়তে পারছে সেখানে তাঁরা প্রথম দর্শনের লিপি শৈলী থেকে এটাকে খারিজ করে দিয়েছেন। অন্যদিকে মসজিদের শিলালিপি হতে গেলে তার গাঠনিক বিন্যাস ও বক্তব্যের ধাঁচে যে বিশেষ উপকরণ থাকা প্রয়োজন তার কিছুই উপস্থিত নেই এখানে। এটা ঠিক যে শিলালিপিটির উপর হিজরী সন ৬৯ লেখা দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু এই ৬৯ এর আগে আরও কি লিখা ছিল সেটা ভেঙ্গে গেছে। বিষয় অনেকটা এমন যে ‘মুরগি বাজার থেকে কিনে এনে নিজে একটা হাত না দিয়ে তার উচ্চতা দেখাতে গেলে মানুষ মনে করতে পারে মুরগিটা মাটি থেকেই ঠিক অতখানি উঁচু’। ১৯৮৬ সালের দিকে আমার জন্মেরও কয়েকবছর আগে ইটটি পাওয়া গিয়েছিল। বিভিন্ন গবেষক প্রেক্ষিত বিচ্যুত এই ইঁটটি দেখেছেন, আপাত দৃষ্টিতে গুরুত্বহীন মনে হওয়াতে এটি পড়ে আছে তাজহাট জমিদার বাড়িতে। এর থেকে সময়কাল যাইহোক অন্তত কোনো মসজিদ চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। আর সে হিসেবে লালমনিরহাট থেকে আবিষ্কারের দাবিকৃত মসজিদটি কোনোভাবেই বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন মসজিদ নয়।
মজার বিষয় মিস্টার স্টিল প্রহ্মপুত্র ও তিস্তার পাড় ধরে সিকিম হয়ে চীনের মধ্য দিয়ে আরব ও রোমান বণিকদের বাণিজ্য বহরের যাতায়াতের সঙ্গে তুলনা দিচ্ছেন। পাশাপাশি হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাছ (রা.) সময় নির্মিত মসজিদ হিসেবে এটিকে দাবি করছেন। কিন্তু মজার বিষয় ইসলামের প্রাথমিক যুগের কোনো মসজিদ ইট নির্মিত নয়। অন্যদিকে ইটে মুদ্রিত ফুল কিংবা নকশা নিয়ে গল্প ফাঁদা হচ্ছে সেটা প্রাথমিক যুগের মসজিদের ক্ষেত্রে পুরোপুরি অসম্ভব বলে প্রতীয়মান। গ্রামবাসীর কাছে মোস্তের আড়া বা মজদের আড়া নামে পরিচিত জায়গাটি ছিল ঝোপ জঙ্গলে ঘেরা। বন্য জীবজন্তু ও সাপ-বিচ্ছুর ভয়ে কেউ এখানে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। ১৯৮৩-৮৪ সালে স্থানীয়রা জঙ্গলটি চাষাবাদের জন্য পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিলে আবিষ্কার হয় গায়ে ফুল আঁকানো অনেকগুলো ইঁট। তাই স্থানীয় পুরনো কোন জমিদারবাড়ি তথা রাজবাড়ির কথা কল্পনা করে নিয়েছিলেন। ফলে বাংলাদেশের অন্যসব প্রত্নস্থানের রোবার ট্রেঞ্চের মতো পরিণতি হয়েছিল এই এলাকাটিরও। মজদের আড়া থেকে মানুষ যার যার মতো ইট তুলে নিয়ে গিয়ে নিজের বাড়িতে ব্যবহার করে। তবে জনৈক আইয়ুব আলী এখান থেকে প্রাপ্ত ইটে লেখা দেখতে পান পবিত্র কালেমার বাণী ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’। পাশাপাশি সেখানে একটি সময়কালও পাওয়া গিয়েছে যা ৬৯ হিজরি বলে দাবি করেছেন মিস্টার স্টিল। সহজপাঠ্য এ লিপির সময়কাল নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নাই।

এ কে এম ইয়াকুব আলীর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মুসলিম মুদ্রা ও হস্তলিখন শিল্প’, এ কে এম শাহনাওয়াজের ‘মুদ্রায় ও শিলালিপিতে মধ্যযুগের বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি’ এবং আহমদ আলী তাঁর প্রখ্যাত গ্রন্থ ‘মুসলিম লিপিকলা উৎপত্তি ও বিকাশ’ গ্রন্থে মুসলিম লিপিমালার ক্রমবিকাশ নিয়ে স্পষ্ট আলোচনা করেছেন। সে হিসেবে প্রাথমিক দিকের কুফিক লিপিতে ৬৯ সালের লিপিমালা উৎকীর্ণ হওয়া কথা। যেই লিপিমালার পাঠোদ্ধার করতে গেলে অধ্যাপক ড. আবদুল করিম কিংবা অধ্যাপক ইমেরিটাস এ কে এম ইয়াকুব আলী স্যারেও অনেক কষ্ট হওয়ার কথা। এরপর নাশখ, তালিখ কিংবা নাশতালিখ লিপির প্রচলন হয়। একটা পর্যায়ে বিমূর্ত শিল্পকলার নিদর্শন হিসেবে বিকাশ ঘটে তোঘরা লিপির। কিন্তু সাধারণ সর্বজন বোধ্য এই ধাঁচের লিপি মূলত লেখা হয়েছিল একেবারে মোগল আমলেরও একেবারে শেষাংশে এসে। ফলে আমরা যে কেউ ইটের উপর উৎকীর্ণ পবিত্র কালেমার বাণী ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ (لآ اِلَهَ اِلّا اللّهُ مُحَمَّدٌ رَسُوُل اللّ) পড়তে পারছি। পাশাপাশি এটাও দেখছি সেখানে কোনো মসজিদের নির্মাতা কিংবা পৃষ্ঠপোষক সম্পর্কে কোনো উপযুক্ত তথ্য নেই। ফলে তিনটা বিষয় আমাদের কাছে স্পষ্ট। তা হচ্ছে, ক. এটি কোনো মসজিদের শিলালিপি নয়, খ. এই শিলালিপির লিখন শৈলী ও সময়ালের বৈপরিত্য, গ. প্রেক্ষিত ও স্থানিক বিন্যাস থেকে বিচ্যুতি। যার যেকোনো একটি কারণ উপস্থিত থাকলেই এটাকে প্রাচীনতম দূরে থাক কোনো মসজিদের ধ্বংসাবশেষ হিসেবে স্বীকার করা কঠিন। তারপরেও এখানে হারানো মসজিদ নামে নতুন একটি মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে যা ঐতিহাসিক বিভ্রান্তিকে আরও জোরালো করে তুলতে পারে।

মসজিদের নতুন অবকাঠামো

সম্প্রতি ধুয়ো উঠেছে তেজষ্ক্রিয় কার্বন ডেটিং নিয়ে। কিন্তু সেখানে শুধুমাত্র একটি নমুনা নিয়ে কালমিতিক সময়কাল নির্ধারণ অসম্ভব। বরঞ্চ উপযুক্ত স্তরায়নভিত্তিক সময়কাল নির্ধারণ, লিখিত সূত্রের পর্যালোচনা ও যথাযথ ক্যালিব্রেশন আরও জরুরি। এটা না হলে রেডিও কার্বন ডিকে তথা তেজষ্ক্রিয় কার্বনক্ষয়ের সময়কাল বৈপরিত্য থেকে নানা ধরণের সময়কালজনিত জটিলতা তৈরি হতে পারে। একইভাবে ইতিহাস গবেষণা কিংবা প্রত্নতত্ত্বচর্চার ক্ষেত্রে ছলনা, মিথ্যাচার ও প্রতারণার ঘটনা নতুন নয়। লন্ডনের শেফিল্ড পার্ক থেকে পাওয়া কিছু অস্থি নিয়ে ইংল্যান্ডের কুখ্যাত ‘পিটডাউন প্রতারণার’ জন্ম দিয়েছিলেন কথিত প্রত্নতাত্ত্বিক চার্লস ডসন। বিশ্ব ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব গবেষণার ক্ষেত্রে ১৮ ডিসেম্বর ১৯১২ তারিখটি লালকালিতে দাগ দিয়ে রাখার মতো প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে তাঁর প্রতারণা ধরা পড়ে বিশ্ব ইতিহাসে কুখ্যাত হয়েছে ‘পিট ডাউন প্রতারণা’ নামে। বাংলাদেশের ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক চর্চার ক্ষেত্রে এমন ঘটনা রয়েছে যেখানে পরবর্তীকালে উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার পর জানা গিয়েছে ইতিহাসের বাস্তবতা আসলে কি? যেমন হাজার বছরের রাজধানী ঢাকাকে অনেকেই জানতেন এর বয়স মাত্র চারশত বছর। পরবর্তীকালে বিষয়টি নিয়ে উপযুক্ত গবেষণা হওয়ায় আমরা মূল সত্যের কাছাকাছি যেতে পেরেছি। তাই লাল মনিরহাটের এই মসজিদটিকে কোনোভাবেই বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম মসজিদ বলার সুযোগ  নেই। এটাকে শুধুমাত্র বিভ্রান্তি বলাটা ভুল হবে, সহজ প্রচার পাওয়া ও দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার ঘৃন্য উদ্দেশ্যে ইতিহাসপ্রিয় ও আবেগী ধর্মপ্রাণ মানুষের সঙ্গে সংঘটিত নিষ্ঠুর প্রতারণামাত্র। আমরা উপযুক্ত ইতিহাস জেনে এই প্রতারণা থেকে মুক্তিলাভের চেষ্টা করি।

 

(Visited 27 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *