দানের ইতিহাস ভুলে গরীব ঠকানোর ফতোয়া কেনো?

সরকারি ত্রাণ থেকে শুরু করে ইসলামী যাকাত এমনকি ফিতরা সবক্ষেত্রে নিয়ম আর ফতোয়া কেনো গরীবকে ঠকানোর জন্য করা হয়? লজ্জার বিষয় গরীবের সাহায্য নিতে গিয়ে তাকেও ১০ টাকার রাজস্ব স্ট্যাম্প কিনতে হয়। একইভাবে সুদখোর, ঘুষখোর কিংবা অন্যসব হারামখোরের ব্যাপারে নীরব হুজুরেরা শুধু সরব গরীবকে ঠকানোর ফতোয়াবাজিতে?
 
আপনারা অনেক বিজ্ঞজন, সহীহ হাদিস, দারস, শানে নুযুল কিংবা তাফসীর বিশ্লেষণে আপনাদের নখতূল্য যোগ্যতা নাই। তাই বরাবরের মতো এবারেও আমার প্রশ্ন ঐ ইতিহাস থেকে। ইতিহাস বলছে রাসূল (সা.) এর সময়ে সবাই সাদাকাতুল ফিতর তথা ফিতরা আদায় করেছেন খাবার দিয়ে। এখানে প্রধান খাওয়ার যদি ধরা যায় তা দিয়ে ফিতরা আদায় করতে আপনাকে চারমুঠ খাবার দিতে হবে। এবং এটা অবশ্যই এক হাতের মুঠো নয়, বরং নামাযের পর মুনাজাতের জন্য যেভাবে হাত উঠান সেভাবে পরিপূর্ণ চার মুঠ খাবার আপনাকে দিতে হবে যা ইতিহাসে صاع (‘সা’) ও نصف صاع (নিসফে সা’) হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
 
হুজুরেরা গেঞ্জাম লাগাচ্ছেন صاع (‘সা’) ও نصف صاع (নিসফে সা’) নিয়ে। প্রশ্ন উঠছে কোন নিয়ম কোনটা ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। অভিমত আছে যব, খেজুর, পনির ও কিসমিস দ্বারা আদায় করলে এক ‘সা’ এবং গম দ্বারা আদায় করলে ‘নিসফে সা’ প্রযোজ্য হবে। আমাদের তালেবে এলম বা মহাজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নাই। নিজেরা খেয়াল করলেই দেখতে পাই খাদ্যবস্তুর মূল্যগত পার্থক্য কত? এখানে চালের কেজির হিসাবই ধরা হোক। এই হিসেবে মধ্যে দেখুন কেউ কেউ খাচ্ছে পাকিস্তানি বাসমতির ১৭০ টাকা কেজির লম্বা লম্বা সরু চাল। কেউ কেউ আমরা খাচ্ছি গরুর খুরের মতো মোটা চাল, যার কেজি ৩৫-৪০ টাকা ।
 
লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে কথিত হুজুরেরা পক্ষ নিচ্ছেন তাদের বড়লোক প্রভুদের। তারা বেহায়ার মতো বলছেন সবচেয়ে কমদামের বস্ত্তকে মাপকাঠি ধরে কেউ যদি সাদাকাতুল ফিতর আদায় করে তাহলেও আদায় হায়ে যাবে। কিন্তু কোন সহীস হাদিস থেকে এই দান প্রমাণিত তা অনেকটা অনুচ্চারিত রয়ে যাচ্ছে। তারা ঢালাও বক্তৃতা দিচ্ছেন ‘উত্তম হল, নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি মূল্যের খাদ্যবস্ত্তকে মাপকাঠি ধরে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা।’ কিন্ত তারা যদি বলতেন যে যা খায় সেটা থেকেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে সেটাই ঐতিহাসিকভাবে যুক্তিযুক্ত হতো। এতে করে আর যাই হোক উপকৃত হতো গরীবরা।
 
গরীব ঠকানোর ফতোয়া দিতে হুজুরেরা হাজির করেছেন আধা সা ফিতরা আদায়ের নানা দলিল। তবে এই সব দলিল বিশ্লেষণে প্রকৃত ইতিহাস আলোচনার পূর্বে মাওলানা মুহাম্মাদ ইমদাদুল্লাহ প্রণীত রেফারেন্সগুলোকে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। তিনি শুরুতেই চেষ্টা করেছেন সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের দলিল হিসেবে আধা সা সম্পর্কিত হাদীস, সুন্নাহ ও আছার নিয়ে আলোচনা করতে। শুরুতে জামি তিরমিজি থেকে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত হাদিসটি তুলে ধরা যেতে পারে। সেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন ঘোষক প্রেরণ করলেন সে যেন মক্কার পথে পথে এ ঘোষণা করে যে-জেনে রেখো! প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, গোলাম-স্বাধীন, ছোট-বড় প্রত্যেকের উপর সদকায়ে ফিতর অপরিহার্য। দুই মুদ (আধা সা) গম কিংবা এক সা অন্য খাদ্যবস্ত্ত।

 أن النبي صلى الله عليه وسلم بعث مناديا ينادي في فجاج مكة : ألا إن صدقة الفطر واجب على كل مسلم، ذكر أو أنثى، حر أو عبد، صغير أو كبير، مدان من قمح، أو صاع مما سواه من الطعام.

(জামে তিরমিযী ১/৮৫)। ইমাম তিরমিযী রাহ. এর বর্ণনা মতে এই হাদীসটি নির্ভরযোগ্য ও যাচাইকৃত।

পরববর্তী প্রমাণ হিসেবে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিস তুলে ধরা হয়। তিনি রমযানের শেষ দিকে বসরার মিম্বারের উপর খুতবা দানকালে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকাতুল ফিতর অপরিহার্য করেছেন এক সা খেজুর বা যব কিংবা আধা সা গম; গোলাম-স্বাধীন, নারী-পুরুষ ও ছোট-বড় প্রত্যেকের উপর।

 فرض رسول الله صلى الله عليه وسلم هذه الصدقة صاعا من تمر أو شعير، أو نصف صاع من قمح على كل حر أو مملوك، ذكر أو أنثى، صغير أو كبير.

(সুনানে আবু দাউদ ১/২২৯। প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ আল্লামা ইবনে আবদুল হাদী আল হাম্বলী রাহ.  এই হাদিসটি প্রসঙ্গে বলেছেন যার সকল রাবী প্রসিদ্ধ, ইতিহাসসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য। আল্লামা যাহাবী রাহ. মনে করেন এই হাদীসটির সনদ শক্তিশালী ও প্রমাণনির্ভর। এরপর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ছালাবা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের একদিন বা দুদিন আগে সাহাবীদের উদ্দেশ্যে খুতবা দিয়েছেন। সে খুতবায় তিনি বলেছেন, তোমরা প্রতি দু’জনের পক্ষ থেকে এক সা গম অথবা ছোট-বড় প্রত্যেকের মাথাপিছু এক সা খেজুর বা এক সা যব প্রদান করো।

أدوا صاعا من بر أو قمح بين اثنين، أو صاعا من تمر، أو صاعا من شعير على كل أحد صغير أو كبير.

(মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৩১৮। আল্লামা যাইলাঈ রাহ. বলেন, এই হাদীসটির সদন সহীহ ও শক্তিশালী  এর বাইরে হযরত আসমা বিনতে আবু বকর রা. বলেন, যে মুদ তথা পাত্র দিয়ে তোমরা খাদ্যবস্ত্ত গ্রহণ করে থাক এমন দুই মুদ (আধা সা) গম আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যমানায় সদকাতুল ফিতর আদায় করতাম।

كنا نؤدي زكاة الفطر على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم مدين من قمح، بالمد الذي تقتاتون به.

(মুসনাদে আহমদ ৬/৩৪৬। শায়খ শুআইব আরনাউত বলেন, হাদীসটি সহীহ এবং এ সনদটি হাসান। শায়খ নাসীরুদ্দীন আলবানী রাহ. বলেছেন, এই হাদীসের সনদ বুখারী ও মুসলিমের শর্তে উত্তীর্ণ, সহীহ।)

ইমাম তহাবী রাহ. এ হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেছিলেন-

فهذه أسماء تخبر أنهم كانوا يؤدون في عهد النبي صلى الله عليه وسلم زكاة الفطر مدين من قمح، ومحال أن يكونوا يفعلون هذا إلا بأمر رسول الله صلى الله عليه وسلم، لأن هذا لا يؤخذ حينئذٍ إلا من جهة توقيفه إياهم على ما يجب عليهم من ذلك.

হযরত আসমা রা. জানিয়েছেন যে, নবী-যুগে সাহাবায়ে কেরাম সদকাতুল ফিতর দিতেন আধা সা গম। এ তো সম্পূর্ণ অসম্ভব যে, রাসূলুললাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ ছাড়া তাঁরা এই কাজ করতেন। কারণ দ্বীনের বিষয়ে তাঁদের কর্তব্য কী তা জানার একমাত্র সূত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিক্ষা ও নির্দেশনা। অন্যদিকে হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহ. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন দুই মুদ (আধা সা) গম।

فرض رسول الله صلى الله عليه وسلم زكاة الفطر مدين من حنطة.

(মারাসীলে আবু দাউদ পৃ. ১৬। আল্লামা ইবনে আবদুল হাদী আলহাম্বলী রাহ. বলেন, এ হাদীসের সনদ দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট, সহীহ। তবে তা মুরসাল। আর সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহ.-এর মুরসাল রেওয়ায়েতও দলিলযোগ্য হয়।)  ইমাম ইবনে শিহাব যুহরী রাহ. বলেন, তিনি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান ও উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উতবাহ রা. প্রমুখকে বলতে শুনেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকাতুল ফিতর আদায়ের আদেশ করেছেন এক সা খেজুর বা দুই মুদ (আধা সা) গম।

أمر رسول الله صلى الله عليه وسلم  بزكاة الفطر بصاع من تمر، أو بمدين من حنطة.

(শরহু মাআনিল আছার ১/৩৫০। আল্লামা আইনী রাহ. বলেন, হাদীসটি সহীহ। নুখাবুল আফকার ৫/২২৫)। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উতবাহ, কাসেম ও সালেম রাহ. বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করেছেন সদকাতুল ফিতরে এক সা যব বা দুই মুদ (আধা সা) গম আদায় করার।

أمر رسول الله صلى الله عليه وسلم في صدقة الفطر بصاع من شعير أو مدين من قمح.

(শরহু মাআনিল আছার ১/৩৫০। আল্লামা আইনী রাহ. বলেন, হাদীসটি সহীহ। শায়খ শুআইব আরনাউত বলেন, এটি সহীহ ও মুরসাল।) এদিকে সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহ. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে এবং আবু বকর সিদ্দীক ও উমর ফারূক রা.-এর শাসনামলে সদকাতুল ফিতর দেওয়া হত আধা সা গম।

كان الصدقة تعطى على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم وأبي بكر وعمر نصف صاع من حنطة.

(শরহু মাআনিল আছার ১/৩৫০। আল্লামা ইবনে আবদুল বার রাহ. বলেছেন, এটি সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহ. থেকে ছিকা রাবীগণ বর্ণনা করেছেন। শায়খ শুআইব আরনাউত বলেন, হাদীসটির সকল রাবী ছিকা ও নির্ভরযোগ্য। আল্লামা আইনী রা. বলেন, হাদীসটির সনদ সহীহ। তবে হযরত আবু উবাইদ কাসেম ইবনে সাল্লাম রাহ. বর্ণনা করেন, আবদুল খালেক ইবনে সালামা আশশাইবানী রাহ. বলেন, আমি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহ.কে সদকাতুল ফিতর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে তা ছিল মাথাপিছু এক সা খেজুর বা আধা সা গম।

حدثنا إسماعيل بن  إبراهيم عن عبد الخالق بن سلمة الشيباني قال : سألت سعيد بن المسيب عن الصدقة. فقال : كانت على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم صاع تمر، أو نصف صاع حنطة عن كل رأس.

(কিতাবুল আমওয়াল পৃ. ৫৬৪) ইমাম আবু বকর ইবনে আবী শাইবা রাহ.ও বর্ণনা করেছেন যে, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহ.কে সদকাতুল ফিতর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল। তখন তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ছোট-বড়, গোলাম-স্বাধীন প্রত্যেকের মাথাপিছু আধা সা গম বা এক সা খেজুর বা যব।

هشيم عن سفيان بن حسين، عن الزهري عن سعيد بن المسيب يرفعه أنه سأل عن صدقة الفطر. فقال : عن الصغير والكبير، والحر والمملوك نصف صاع من بر، أو صاع من تمر أو شعير.

(মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০১। শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা মুসান্নাফের টীকায় বলেন, এটি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহ.-এর মুরসাল হাদীস, যা মুহাদ্দিসগণের নিকট বিশুদ্ধতম মুরসালের অন্তর্ভুক্ত। মজার বিষয় সাদাকাতুল ফিতরের পরিমাণ কমানোর জন্য দলিল দস্তাবেজ ঘেঁটে কম চেষ্টা করা হয়নি। আদতে এই চেষ্টার ফলাফল হিসেবে ঠকেছে গরীবরাই। রাসূল, সা. নিজে যেখানে দান সদকাহকে সমর্থন করেছেণ সেখানে একটু বেশি থেকে কমানোর জন্য দলিল ঘাঁটাঘাটির প্রবণতাটি ক্ষেত্রবিশেষে লজ্জারও।

কিন্তু সব সময়ের রাষ্ট্র নায়কদের আদর্শ খোলাফায়ে রাশেদীনের অনুশীলন দেখুন। স্বয়ং আবু কিলাবা রাহ. বলেন, স্বয়ং ঐ ব্যক্তি আমাকে বলেছেন, যিনি হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর নিকট এক  সা গম দ্বারা দুই ব্যক্তির সদকাতুল ফিতর আদায় করেছেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০০; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৩১৬)। এখানেও অনেক হুজুর ঠ্যালাঠেলি করেছেন আরেক যুক্তি নিয়ে। অন্যদিকে  নাফে রা: বলেন, তিনি হযরত উমর রা.কে জিজ্ঞাসা করেছেন, আমি একজন ক্রীতদাস। আমার সম্পদের কি কোনো যাকাত আছে? উমর রা. বলেছেন, তোমার যাকাত তো তোমার মনিবের উপর। সে তোমার পক্ষ থেকে প্রতি ঈদুল ফিতরে এক সা যব বা খেজুর কিংবা আধা সা গম প্রদান করবে।

إنما زكاتك على سيدك أن يؤدي عنك عند كل فطر صاعا من شعير أو تمر أو نصف صاع من بر.

(শরহু মাআনিল আছার ১/৩৫০; শরহু মুশকিলুল আছার ৯/৩৮)

হযরত ছালাবা ইবনে আবু সুআইব রা. বলেন, আমরা উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর খেলাফত আমলে সদকাতুল ফিতর দিতাম আধা সা গম।

كنا نخرج زكاة الفطر على عهد عمر بن الخطاب نصف صاع.

(শরহু মাআনিল আছার ১/৩৫০; শরহু মুশকিলুল আছার ৯/৩৯)

১২. আবুল আশআছ রাহ. বলেন, খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত উসমান রা. আমাদের উদ্দেশ্যে খুতবা দিলেন। ঐ খুতবায় তিনি বলেছেন, তোমরা যাকাতুল ফিতর আদায় কর দুই মুদ (আধা সা) গম।

أدوا زكاة الفطر مدين من حنطة.

(শরহু মুশকিলিল আছার ৯/৩৯। আল্লামা আইনী রাহ. বলেছেন, হাদীসটির সনদ সহীহ ও শক্তিশালী। শায়খ শুআইব আরনাউত বলেন, এ হাদীসের সনদ ইমাম মুসলিমের শর্তে উত্তীর্ণ।)

১৩. হযরত আলী রা. বলেন, সদকাতুল ফিতর (এর পরিমাণ) হল, এক সা খেজুর বা এক সা যব কিংবা আদা সা গম। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০৩; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৩১৫; সুনানে দারা কুতনী ২/১৫২; কিতাবুল হুজ্জাহ আলা আহলিল মদীনাহ ১/৩৩৬)

পরিমাণ নিয়ে মত দ্বিমত যাই থাক প্রকৃতিটা গুরুত্বপূর্ণ। খেয়াল করে দেখুন সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ হল গম থেকে আধা সা আর গম ছাড়া অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী থেকে এক সা। পরিমাণটি নির্ধারিত হয়েছিল আরবের তৎকালীন বাস্তবতায়। যেখানে গমের বিপরীতে ঐসব খাদ্যবস্তুর অবস্থান ছিল যেমন তেমনি মানদণ্ডে সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ করা হয়েছিল। শরীয়তের  এই গিট্টু থেকে সুন্দরভাবে গরীব ঠকানোর ধান্দা করা হচ্ছে। বিশেষত, দামি খাবার দিতে গেলে দেওয়া লাগে এক সা, আর অপেক্ষাকৃত কমদামী গমের পরিমাণ আধা সা। চান্সে হুজুরদের ঢাল হিসেবে সামনে দাঁড় করিয়ে যারা সারা বছর চাল, খেজুর, কিসমিস আর পনির খাচ্ছে তারা গরীবের সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ করছে  আধা সা গম। লজ্জার বিষয় এই গমের যে দাম আমার ধারণা ঐ দামে মানুষ খাওয়ার নয় ছাগল, ভেড়া কিংবা মুরগি-কতুবর খাওয়ানোর গম পাওয়া যেতে পারে। আমরা ইতিহাসের লোক, কুরআন ও সুন্নাহ হয়তো সরাসরি তাফসীর করতে পারিনা। অন্যদিকে ইজমা ও কিয়াস নিয়ে যত গিট্টু সেগুলো ছাড়ানোর চিন্তাও করতে চাই না। শুধু সরল অঙ্ক মিলিয়ে বলতে চাই আল্লাহর রাসূল যেখানে বলেছেন মানুষকে তাই খাওয়াতে যা আমরা নিজেরা খাই। সেখানে পুরো বছর খেজুর,কিসমিস পনির খাওয়া মানুষ কোন লজ্জায় কোন দলিলের ভিত্তিতে ছাগল, ভেড়া ও কবুতর খাওয়ানো গমের মূল্যে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করে। এটাকে আমার ফতোয়া মনে হয়, এটা নিছক গরীবের সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রতারণা।

সাদাকাতুল ফিতর ধনীদের দয়া নয়, এটা গরীবের অধিকার। আমি শ্রমিকের অধিকার নিয়ে বর্ণিত সহিহ বুখারির হাদিসটির রেফারেন্স টানতে চাই। সেখানে বলা হয়েছে —‘যারা তোমাদের কাজ করে জীবিকা উপার্জন করে, সে শ্রমিক তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। তাই যাদের কাছে এমন লোক আছে তাদেরকে যেন তা-ই খেতে দেয় যা তারা নিজেরা খায়, তাদেরকে যেন তা-ই পরতে দেয়, যা তারা নিজেরা পরে। তোমরা তাদেরকে তাদের সামর্থ্যরে বাইরে কোনো কাজ করতে বাধ্য করবে না। যদি তাদেরকে তোমরা কোনো কঠিন কাজ করতে দাও, তা হলে তোমরা তাদের সহযোগিতা করবে।’ একইভাবে মিশকাত শরীফ ও মুসলিম থেকে পাওয়া যায় ‘শ্রমিকেরা তোমাদেরই ভাই, আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের দায়িত্বে অর্পণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা যার ভাইকে তার দায়িত্বে রেখেছেন, সে যা খাবে তাকেও তা খাওয়াবে, সে যা পরিধান করবে তাকেও তা পরিধান করাবে; তাকে এমন কষ্টের কাজ দেবে না যা তার সাধ্যের বাইরে, কোনো কাজ কঠিন হলে সে কাজে তাকে সাহায্য করবে’।

খেয়াল করে দেখুন প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেরা যা খাবেন সেটাই শ্রমিকদের খাওয়াতে বলা হয়েছে। তাহলে সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের ক্ষেত্রে নিজের খাওয়ার না খাইয়ে ছাগল, ভেড়া আর কবুতর খাওয়ানো গম দিয়ে কেনো হিসেব করা হচ্ছে? আর যদি হিসেব করতেই হয় তবে হিসাব করুন চাল দিয়ে। ঐ চাল দিয়ে হিসাব করুন যে চাল আপনি নিজে খান। এতো ফতোয়াবাজির কি প্রয়োজন। আপনি তো সারাবছর বাসমতি চাল খাচ্ছেন। একমাত্র ঈদের দিনটায় যদি একজন গরীব আপনার ঐ বাসমতি চাল থেকে ‘তিন কেজি তিনশত গ্রাম’ ভাগ বসায় এতো কষ্ট পাচ্ছেন কেনো? কি প্রয়োজন তাদের ঠকানোর জন্য শতসহস্র দলিল ঘেঁটে গরীব ঠকানোর আয়োজন করার? মনে রাখবেন আপনি দানের ক্ষেত্রে যতটা উদার হবেন, আল্লাহ আপনার প্রতি ততোটাই দয়াবান হবেন। যে বিলগেটস, জাকারবার্গকে সারাদিন ইহুদি বলে গালি দেন। সারাদিন যাদের গোষ্ঠী নিপাত করেন। খেয়াল করে দেখেন তো তারা চ্যারিটি কিংবা সি এস আর প্রোগ্রামে কত দান করে? আল্লাহ এজন্যই কি তাদের এতো ধনী করেছেন? কে জানে? ভাল কিছু শেখার চেষ্টা করুন সেটা যদি আপনাদের ভাষায় বর্ণিত ইহুদী নাসারাদের থেকেও হয় হোক না, মন্দ কী? ইতিহাস বলছে দান ছদকা করে কেউ দেউলিয়া হয়নি। বরঞ্চ হযরত উসমান (রা.) মতো মানুষরা ধনীই ছিলেন।

ফিতরার হিসাব

যাই হোক ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এবারের হিসেবে ঐ কুখ্যাত ছাগল, ভেড়া ও কবুতর খাওয়ার গম  কিংবা তার থেকে পেঁষা আটার দাম যদি ৪২ টাকা ধরা হয় সেই সঙ্গে (আধা সা) হিসেব করে কেঁদে কেটে গরীবকে দিতে পারবেন ৭০ টাকার মতো। অন্যদিকে যব দিয়ে যদি ৮২ টাকা হিসেব করেন হবে ফিতরা হচ্ছে ২৭০ টাকা। অন্যদিকে আপনি ১৬০০ টাকা দামের খেজুর খাচ্ছেন কিন্তু ইসলামিক ফাউন্ডেশন আপনার প্রতি সদয় হয়ে খেজুরকে ৫০০ টাকা করে ধরে ফিতরা ঠিক করে দিয়েছে ১৬৫০ টাকা। একইভাবে সেমাই, পোলাও, সুজি থেকে শুরু করে কত কিছুতে তো বটেই টেবিলে বসে টুকটাকা ভলোই কিসমিস চিবিয়েছেন সারাটা বছর। এর দামও যদি সর্বনিম্ন ৪৫৪ টাকা করে ধরে তবে আপনার ফিতরা হয় ১৫০০ টাকার কাছাকাছি। আর ওজন কমানো থেকে শুরু করে মুখের স্বাদ সবখানে খাদ্য তালিকায় এগিয়ে রাখেন যে পনিরকে তার মধ্যে অনেকটাই বেজাত-কুজাত ব্র্যান্ডের দাম (অবশ্যই আপনার খাওয়া রকফোর্ড কিংবা ক্যামেমবার্ট নয়) ৬৬৭ টাকা করে ধরলে ফিতরা হয় ২২০০ টাকা। তাই ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রণীত তথ্যে এবারের ফিৎরার হিসাব যাই হোক না কেনো আপনি তো জানেন প্রতিদিন আপনার খাদ্য তালিকায় কি কি থাকে। আসুন আমরা ক্ষমতা অনুযায়ী সর্বোচ্চটা দেয়ার চেষ্টা করি। গরীব মানুষ কয়েকটাকা বেশি পেয়ে যদি দুইবেলা পেটভরে খায় আমাদের ক্ষতি নাই। তাই এতো ফতোয়া আর হিসাবের মারপ্যাচ না কষে যত পারা যায় দেওয়ার চেষ্টা করি। সবাই মনে করেন আপনার করোনা হলে ডাক্তারকে কত টাকা দেওয়া লাগতো। তার ১০% গরীব মানুষকে দেয়ার চেষ্টা করেন। কিছু না হোক করোনা থেকে বেঁচে গেলে একরকম মানসিক প্রশান্তি যেমন পাবেন, এর বদলে পেট ঠাণ্ডা হবে অনেক অসহায়ের।

ড. মো. আদনান আরিফ সালিম
সহকারী অধ্যাপক
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। 
(Visited 41 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *