আমাদের অসময় এবং সেই সব মীরজাফর

গতবছর রমজানে। খুব সম্ভত ১৭ রমজান ওপেন হার্টের রোগী ছোট চাচাকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। এদিকে আমার নিজের অবস্থা খুব একটা ভাল নাই। তাড়াহুড়া করে বটি টান দিতে গিয়ে আগের ক্ষতের উপর আবার কেটেছে হাত। কাটা হাতে শক্ত ব্যান্ডেজ করার পরেও সেখান থেকে গলে গলগল করে রক্ত ঝরছে। অসুস্থ চাচা যদি এটা দেখে তবে আমার সঙ্গে ডাক্তারের কাছে যেতে চাইবে না। তাই হাতটা পেছনের দিকে নিয়ে রেখেছি যাতে চাচা টের না পায়। ভাল হাতটা নিয়ে চাচাকে ধরে রেখেছি। আর ঐ অবস্থায় কাটা হাতের ইশারায় এক রিকশাঅলাকে ডাকলাম। সে ভেংচি দিয়ে বললো যাবো না। এর অল্প সময় ব্যবধানে আরেকজন রিকশাঅলার দেখা মিলল। সে হাতের সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে শূন্যে নিক্ষেপ করতে করতে জানাল  ভাড়া লাগবে আশি টাকা। অবাক হয়ে লক্ষ করলাম মাত্র ত্রিশ টাকার ভাড়া সে কিভাবে আশি টাকা চাচ্ছে। পাশাপাশি জানতে চাইলো কোথায় কিভাবে এক্সিডেন্ট করছে। হাত থেকে এত রক্ত ঝরছে ক্যান? কোন ডাক্তার খানায় যাবো?

এতো প্রশ্ন শুনে বিরক্ত হওয়ার পাশাপাশি আরেকটু বিচলিত হলাম এজন্য যে চাচা জেনে গিয়েছেন হাত কাটার ব্যাপারটা। এ সময় তিনি আগে আমার হাতের চিকিৎসা কররা জন্য ব্যাকুল হবেন। তারপরেও ভয়ানক মুহুর্তে মজা নেয়ার চরম দুর্নাম আছে আমার। আমি রিকশাঅলাকে বললাম হাত কাটে নাই। নাটকের শুর্টিং চলতেছে হোতাপাড়া খতিবের বাড়িতে। মুরুব্বি এট্টু অসুস্থ উনাকে ডাক্তারের কাছে নেবো তাই হাতের মেকআপ তুলি নাই। পাশাপাশি বললাম তুমি যাও অন্য রিকশা নেব। অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করি। রিকশাঅলা একটু ঘুরে এসে বলে চলেন যাবো। এক লাফে রিকশাভাড়া নেমে গেল চল্লিশে। তবুও তার রিকশায় আর যাইনি। গেছি অন্য রিকশায় যে ভাড়া ত্রিশ চাইলেও চল্লিশটাকা দিয়েছিলাম শুধু আগেরজনের শয়তানির কথা স্মরণ করে।

আরেকদিনের কথা। খুব সম্ভবত আস থেকে মাস ছয়েক আগেকার কথা হবে। আমার স্ত্রী, বাচ্চা আর ছোট ভাইকে রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে একটু এগিয়ে গিয়ে সি এন জি খুঁজতেছি। আমি ওদের থেকে ফুট দশেক দূরত্বে দাঁড়ানো। আমার স্ত্রী সি এন জি দাঁড় করালো। সঙ্গে বাচ্চা দেখে চোখ বন্ধ করে উত্তরা পর্যন্ত ভাড়া হাঁকলো ৫০০ টাকা। সে কিছু না বলে সি এন জি অলাকে না করে দিল। একই সি এনজি আমি হাত মারতে প্রথমে বলে যাবো না। পরে ভেংচি দিয়ে বলে ৩৫০ টাকা দিয়েন। আমি বললাম ৩০০ টাকার কথা। সে বলল আর ২০ টাকা বাড়ায় দিয়েন। আমি বললাম আচ্ছা। তারপর ওদের ডাকলাম সি এন জিতে ওঠার জন্য। কিন্তু মজার বিষয় ওদের উঠতে দেখে সি এন জি অলার চক্ষু চড়ক গাছ। এমনকি উত্তরা যাওয়ার পর রাস্তার এক মাথা থেকে অন্য মাথায় সে যাবে না। তারজন্য অনর্থক তর্ক জুড়লো। তাকে থামানোর জন্য তখন কষে ধমক লাগাতে হয়েছিল। তারপরেও অনেক গাঁইগুই করেছে সে শেষ পর্যন্ত।

করোনা সংক্রমণের পর থেকে ঐ মীরজাফর রিকশাঅলা আর সিএনজি অলার কথা মনে হয়েছে খুব। ওরা যেমন মানুষের বিপদকে যেমন পুঁজি করতে চাইছে তেমনি হাজারো মানুষ আমাদের ঘিরে আছে। যেমন, যেই দেখলেন ভিটামিন সি এর চাহিদা বেড়ে গেল বাজার থেকে সব রকম কমদামি ভিটামিন সি আউট। তারা ভাস্কো নামে সাড়ে তিন টাকা দামের ভিটামিন সি বিক্রি শুরু করে দিল। এরপর আস্তে আস্তে আরও বেশি দামের ওষুধগুলো তারা সামনে রাখতে থাকে। অন্যদিকে হঠাৎ করে কোনো দোকান থেকে নাপা এক্সট্রা প্যারাসিটামল গায়েব। কারও দোকান থেকে সব ধরণের এন্টি হিস্টামিন গায়েব। কোনো কোনো জায়গা থেকে ব্রডিল, ভেন্টোলিনের মতো সাববিউটামল গায়েব, কোনো কোনো দোকান থেকে পেইন কিলার গায়েব। কিন্তু মজার ব্যাপার এই ওষুধই এক সপ্তাহ ব্যবধানে খুব অল্প করে করে তারা বিক্রি করছে। এবং অবশ্যই প্রতিটি ওষুধের দাম বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। লক ডাউনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর অনেক অমানুষ ওষুধ বিক্রেতা নাপা প্যারাসিটামল বিক্রি করেছে প্রায় ৫ টাকার উপরের দামে।

বাচ্চাদের দুধ একটা ব্র্যান্ড একবার অভ্যস্থ হয়ে গেলে তারা অন্যটা মুখে দিতে চায় না। এটা দোকানদাররা খুব ভাল করে জানে। তাই এগুলো নিয়ে লকডাউনের পর থেকে তারা যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বা করছে সেটাও চিন্তাতীত। প্রত্যেকের একই কথা ডিলার দুধ দিচ্ছে না। অমুক এ হয়েছে, তমুকের তা হয়েছে। পরিবেশে প্রতি কৌটায় তারা ১৫০-২০০ টাকা বেশি দাবি করছে। একই ঘটনা বেবি ডায়াপারের ক্ষেত্রেও। তারা জানে যে বাচ্চারা এক ধরণের ডায়াপার  অভ্যস্থ হলে অন্যগুলোতে অস্বস্তিবোধ করে। ফলে এখানেও তাদের কারচুপি ও কালোবাজারি সমান তালে চলছে। তারা সাপ্লাই চেইনকে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে জটিলতা হয়েছে বহুমুখী।

বাংলাদেশের এই সমস্যা আজ নতুন না। ঈদের সবাই নতুন পরিধেয় কিনে। ফলে বছর জুড়ে হা করে থাকা বোয়াল মাছের মতো পোশাক বিক্রেতারা বাংলাদেশের সবার পকেটের সব টাকা গিলে খেতে চায়। বর্ষায় ছাতার দাম বাড়ে। গ্রীষ্মকালে দাম বাড়ে এয়ারকুলার কিংবা এসির। এমনকি গরীরের ছোটখাট বৈদ্যুতিক পাখাগুলোর দামও তারা বাড়িয়ে দেয় চশমখোরের মতো। মানুষের দু্র্দিনের সুযোগ নিয়ে মীরজাফর যে ইতিহাস রচনা করেছিল, তার থেকে এরা বের হতে পারেনি। তাইতো রমজানে সবাই ইফতারি সাহরী করে তাই খাবারের দাম বাড়ে। পরীক্ষার্থীদের পাস করতে হবে এই দুর্বলতা সামনে রেখে তাদের ভিক্টিম বানায় শিক্ষক নামের দুর্বৃত্তরা। কেউ কেউ ভালো রেজাল্ট করে চেয়ারম্যানের ব্যাগ টানে পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি বাগাবে বলে । আবার লজ্জাজনক এই পেশা অনেকটাই ধারাবাহিক। আমরা দেখেছিলাম জনৈক ব্যক্তির অফিসের বস হিস্যু করতে গেলে পাশে সে টিস্যু হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে খচ্চরের মত। গ্রামে দেখা যায় চেয়ারম্যানের ছাতা ধরা লোক। নেতাদের ধামাধরা লোকের সংখ্যাও  বেশ উন্নত সংখ্যক।  আর সে জন্যই সবাই যতটা এগিয়ে যাচ্ছে, এরা আমাদের দেশকে সব উন্নতির ঠিক পেছন থেকে পা ধরে নিচে নামানোর জন্য টানছে…

(Visited 48 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published.