করোনাক্রান্তিকালে ‘যুদ্ধ ও শুদ্ধতার’ কথকতা

চীনের উহান থেকে বাংলাদেশ কতটা দূর। করোনাক্রান্তিকালে বন্দীত্বের অভিশাপে ক্লান্ত জীবনের যে অপনোদন সেখানে এই দূরত্ব থেকে দুর্বিসহ লাগে, মরণাপেক্ষা বড় বরাভয়। তাই হঠাৎ পড়ার জন্য যে কবির কবিতা হাতে নিয়েছিলাম তিনিও পেশায় চিকিৎসক। আইসিইউতে থেকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন রোগীদের। শুধু কি তাই অবসর সময়ে দুনিয়ার কবি, সাহিত্যিক লেখক আর সাধারণ মানুষ আমরা যে যেভাবে পারছি তাকে বিরক্তি করছি এ সমস্যা সে সমস্যা আর করোনার উপসর্গ-অনুসর্গ নিয়ে। তবুও একরত্তি বিরক্তি কখনও লক্ষ করিনি, হয়তো তার মাঝে বিদ্যমান মানবিক কবিমনের প্রভাবে।

কাব্যচর্চার বর্ণনা দিতে গিয়ে ব্যক্তি পরিচয় কেনো করালাম, সেটার উত্তর নিরর্থক। তবুও যারা জানতে চান, তাদের জন্য বলছি ‘আমি সাহিত্য সমালোচক নই, আমার কাজকারবার ইতিহাস-ঐতিহ্য-প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে’। কালজয়ী, বছরজয়ী, মেলাজয়ী গ্রন্থে কিংবা কোনো সাহিত্য সম্পাদকের সনদে আমার আস্থা নেই। আর সবকিছুর মতোই আমি সাহিত্য পড়ি, ভাল লাগলে যা মনে আসে দুকলম লিখি। আর এখানে আমার মন যা চায় সেটাই লিখতে থাকি, কারও চিন্তার ধারও ধারি না।

যাই হোক ইতিহাস-প্রত্নতত্ত্বে অনুরক্তি যেখানে গল্প ও উপন্যাসের পাঠাভ্যাস থেকেই আমায় ঠেলে দিয়েছে যোজন যোজন দূরে, সেখানে কবিতার বই হাতে নেয়া হয় কালেভদ্রে। সত্য বললে এপারে ইমতিয়াজ মাহমুদ আর আখতারুজ্জামান আজাদ, ওপারে শ্রীজাত বাদে খুব কম কবির কবিতা আমার পাঠ তালিকায় স্থান পায়। তবে কিছু ব্যতিক্রম রয়ে যায়। যেখানে ইচ্ছে অনিচ্ছেয় হয়তো কাব্যিকতার টানে কিংবা ভাষার বাণে বানভাষী হয়ে দৃষ্টিপটে ভেসে ওঠে অনুপম কিছু লেখনী।

আশরাফ জুয়েলের বইটা ২০১৪-১৫ সালের বইমেলায় দেখেছিলাম খুব সম্ভবত অনুপ্রাণনের ব্যানারে। জনৈক কবির লুতুপুতু প্রেমের কবিতা দেখে কটাক্ষ করলাম। তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন তুই কবিতায় যুদ্ধবিগ্রহ আর বিপ্লব বাদে অন্যকিছু কোনোদিন খুঁজেছিস? তোর এই মারামারি হানাহানি কোথায় পাবি? পাশ থেকে বন্ধু মৃদুল একটা বই হাতে নিয়ে বললো এই দেখ যুদ্ধ বিগ্রহ কিনবি এইটা। আমি বইয়ের পাতা উল্টে আর দুই এক পাতা না পড়ে বই কিনি না।

‘যুদ্ধ ছাড়া শুদ্ধতা অসম্ভব’ শীর্ষক বইটাও যখন হাতে নিলাম তেমন চিত্তাকর্ষক কিছু ছিল না। তবুও ‘আমাদের বেঁকে যাওয়ার ইতিহাস’ শীর্ষক কবিতাটা এতো ভাল লাগলো যে এরপর আর কোনো পাতা উল্টাতে হয়নি। সোজা বইটা নিয়ে ব্যাগে ভরেছিলাম। এরপর বাসের মধ্যে বসে বসে কিছু কবিতা পড়া হলেও, কয়দিন পর বাড়িতে এসে টেবিলে ফেলে যাই বইটা।

করোনার বন্দীত্বে আশেপাশে পড়ার মতো তেমন কিছু নাই। এক জীবনানন্দ, সুনীল আর শ্রীজাতে কতক্ষণ। আবুল হাসানের কিছু কবিতা মনে দোলা দিলেও অল্প বিরতিতে তার কবিতা বিরক্তিকর মনে হয়। হয়ত সাহিত্য বুঝিনা বলেই আল মাহমুদ, শামসুর রহমান কিংবা জয় গোস্বামীর কবিতা আমায় টানে না। এদিকে  ইমতিয়াজ মাহমুদের কবিতা পড়তে পড়তে মুখস্থ হওয়ার পথে। ফলে দুই তিন দিন আগে ভোরবেলা টেবিল থেকে টান দিয়ে নিয়েছিলাম কবি আশরাফ জুয়েলের ‘যুদ্ধ ছাড়া শুদ্ধতা অসম্ভব’ কাব্যগ্রন্থটি।

প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে শিখেছি সাহিত্য, ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব আমরা যাই করি কিংবা পড়ি সেখানে উপজীব্য মানুষ। কোনো লেখকের লেখা বুঝতে গেলে আগে তাকে জানতে বুঝতে হবে এটা কেউ কেউ অস্বীকার করেন। কিন্ত হাজার বছরের সংস্কৃতি সভ্যতার অধ্যয়নে দীর্ঘ এক যুগ পার করে আমার এ বিশ্বাস আরও শক্তপোক্ত ও ইস্পাতের মতো দৃঢ় হয়েছে।

আমি ‘যুদ্ধ ছাড়া শুদ্ধতা অসম্ভব’ কাব্যগ্রন্থের পাতা উল্টে একটা একটা করে কবিতা পড়তে গিয়ে আবিষ্কার করেছি একজন দায়িত্ববান চিকিৎসকের অবসর যাপনের দিনলিপি, যেখানে যু্দ্ধ-বিগ্রহ, ক্ষোভ-বিক্ষোভ, রাগ-অনুরাগ, প্রেম-প্রতিঘাত মিলেমিশে একাকার হয়েছে কাবিক অনুরণনে।

সাত সকালে ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে আমাদের দুঃস্বপ্নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এক একটি দিন আসে। আর সেইটার ভাবার্থ আমি খুঁজে পেলাম আজ থেকে অর্ধযুগ আগে লেখা কাব্য থেকে। কবি তোর ‘কিছু সিডেটিভ লেগে আছে রাতটার জিভে’ শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন ‘হুঁস হুঁস ব্যাক লাইট জ্বেলে চলে যাচ্ছে কিছু প্রেমিক, ঠোঁটে খেলা করছে অপরিচিত অন্ধকার। অ্যাম্বুলেন্স গলা ফাটিয়ে দেশটাকে নিয়ে পাড়ি দিচ্ছে অজানার পথে। আমার আঙুলে নিয়নের খিটখিটে মেজাজ, পানের পিক ফেলে হাঁটছে, পিক নয় ওগুলো রক্তবমি, আল্পনা আঁকছে নিজের শরীরেই।’

অসহ্য সময়ে আমরা একে ওকে গালি দিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। আর কবি লিখে গেছেন ‘আমাদের খিস্তির অভিধান মাংসল হচ্ছে’। কবিতায় আরও খুঁজে পেলাম আমাদের বেঁকে যাওয়ার ইতিহাস যেখানে চৌরাস্তায় ট্র্যাফিক স্ট্যান্ডে দাঁড়িযে ভাষণের ভঙ্গিতে আজকের পত্রিকা পড়ছে একটা হাফপ্যান্ট, আজ নাকি আমাদের ঠিকুজি ছাপানো হয়েছে। কবি লিখেছেন সুবিধাবাদী হয়ে ওঠা কিছু কণ্ঠ খুঁজে চলেছে প্রতিদিনের বাসি বাসনকোসনের দুর্গন্ধ। আর সেখানেই নাকি বেঁকে যাওয়ার ইতিহাস নাকি সমাজ সংস্কৃতির বাঁকবদলের গল্পটা খুঁজে নিতে পারি আমরা।

মৃত্যুভয়কে সঙ্গী করে না মানা নিয়মের ফাঁদে পড়ে ধীরে ধীরে বুড়ো হয় আমাদের রাত। তারপর নির্ঘুম রাতের ক্লান্তিকে আরেকটু প্রলম্বিত করে অসহ্য সকাল কিংবা বিব্রত দুপুরের গল্পগুলো। আর সেসবের এক আবেগী চিত্রণে কবি বলেছেন ‘এক টুকরো আকাশ উড়ে আসে শিথিলতার খবর নিয়ে/পলক পড়ে/শালিক কোথায় হারায়?/পথিক সুখ মেখে পথ খোঁজে/ সব ঘটতে থাকে সন্ধির অনুচ্ছেদে’। কবিতার লাইনে লাইনে কিংবা, অনুচ্ছেদের প্রান্তভাগে ছেদ পড়ে, টিভি ছাড়লেই আমরা শুনতে পাই বিচ্ছেদ ও হারিয়ে যাওয়ার গল্প। সব ছেড়ে মহাকালের পানে পাড়ি দিচ্ছে আমাদের থেকে কেউ কেউ।

আমার জীবনে ‘লাইন অফ কন্ট্রোল, নাকি স্মৃতিহীন দাগে শাপমোচনের চেষ্টা  ছেড়ে আমরা যখন ‘ভাত গণনা করছি মহা আক্রোশে’ চিৎকার দিয়ে বলতে ইচ্ছে হয় ‘হে প্রিয়তম বাংলাদেশ’ তুমি আমাদের ‘আকাশটা নাও, রংধনুটা দাও’ কিংবা খুঁজে ফিরি ‘কোথায় আমার দেশ’। ঠিক তখনি কবি আশরাফ জুয়েলের কবিতা আমাদের জানা দিচ্ছে ‘যুদ্ধ ছাড়া শুদ্ধতা অসম্ভব’। কবিতার লাইনে লাইনে দেখতে পাই ‘অন্ধকার চষে ফিরেছে সম্ভ্রম’, ‘চাট গাঁ থেকে কানসাট’, ‘শিরোনামহীন’, ‘পরিণতি’, জেনেও ‘তেত্রিশ বছর আগে’ ‘একটা ছবি’,‘আর্তনাদ করে’ দেখায় ইশারায়; ঝুলতে দেখি ‘পৃথিবীর হ্যাঙারে কবি’।

বিপদের দিনে বিপথগামী জনতার যখন হাউমাউ করে কান্না করছে হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল কিংবা আউসিউওর দোরগোড়ায়। কবি লিখে গেছেন অর্ধযুগ আগেই—

‘হুজুর বেয়াদবি নেবেন না, এবার যে ঘরে ফিরতে হয়

পেটে পাথর বেঁধে মিছিলে স্লোগান দিতে আর পারব না’।

ইতিহাস পড়তে গিয়ে বিব্রত হয়ে জেনেছি আমার বিশ্বাস লুট হয়েছে বহুযুগ আগেই। কবি বলেন ‘শালুক তুলতে গিয়ে পা ফসকে পড়ে যাচ্ছিলাম গভীর জলে, হাত বাড়াসনি? অথচ শুধু চেয়েছিলাম তোর দৃষ্টির প্রশ্রয়’। একটু নিরাপদ আশ্রয়, একটু আহারের সন্ধান কিংবা মুক্ত বাতাসের খোঁজে সবাই যখন ক্লান্ত। একটি লাইন আমার তো বেশ ভাল লেগে গেছে—

‘এক টুকরো আকাশ উড়ে আসে

শিথিলতার খবর নিয়ে’।

আমার তালগোল পাকানো কথা অনেক হয়েছে, এবার থামতে চাই। আগ্রহীরা পড়ার উদ্দেশ্যে বইটি সংগ্রহ করে পড়তে পারেন। রকমারীতে এখনও আছে। একটু ভিন্ন ধাঁচের পরিমিত রূপকের ব্যবহার অতুলনীয় করেছে কয়েকটি কবিতাকে। পড়তে পড়তে আমার বেশ ভাললাগায় আমি স্বল্পজ্ঞানের পাশাপাশি কিছুটা আবেগের উপর ভর করে দুই এক লাইন লিখে ফেললাম। ভুলত্রুটি মার্জনীয়। আর কেউ গালি দিতে চাইলে গালি দিন, সেটাও সানন্দে গ্রহণ করতে প্রস্তুত আছি।

কবি পরিচিতি:
জন্ম ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮, চাঁপাইনবাবগঞ্জ। কবি, কথাসাহিত্যিক।
এম বি বি এস, ডিপ্লোমা ইন এনেসথেসিয়া (ঢাকা ইউনিভার্সিটি)।
পেশা : চিকিৎসক, স্পেশালিস্ট, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, ইউনাটেড হসপিটাল।
প্রকাশিত বই :
যুদ্ধ ছাড়া শুদ্ধতা অসম্ভব [অনুপ্রাণন, ২০১৩]
অতীতা দুঃখরা পাখি হয়ে গেল [প্রিয়মুখ প্রকাশন, ২০১৪]
অনুজ্জ্বল চোখের রাত [নন্দিতা, ২০১৬]

 

পাদটীকা:

রিভিউ শেষে কবি ডা.আশরাফ জুয়েলসহ করোনাক্রান্তিকালের সব সম্মুখ যোদ্ধার প্রতি আমার শ্রদ্ধাবনতা সালাম জানাচ্ছি। এইসব বীরযোদ্ধাদের শ্রম আর মহান স্রষ্টা আল্লাহর রহমত সঙ্গী হলে ইনশাআল্লাহ এ বিপন্নতার দিন শেষে আলো আসবেই। সবার জন্য শুভকামনা।

(Visited 132 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *