কারা আমার মুখের ভাষা কাইড়্যা নিতে চায়?

হিন্দির আগ্রাসন বাংলাদেশ শুধু নয় কলকাতা তথা বাংলা থেকে শুরু করে ভারতের অন্য সব প্রদেশের ভাষাগুলোকে প্রান্তিক করে দিয়েছে। পাঞ্জাবী, উড়িয়া, কানাড়ি, অহমিয়াসহ ভারতের এমন কিছু আঞ্চলিক ভাষা রয়েছে যেগুলো ঐতিহ্যগতভাবে সংরক্ষণ জরুরি ছিল। আমরা পাশের দেশের ইতিহাসচর্চাকারী দুর্বল লোক হিসেবে শুধু একটা স্ট্যাটাস দিয়েই দায় সারছি, কিন্তু যা করার ভারতীয়দেরই করতে হবে।
এটা ঠিক যে হিন্দি ভাষা, বলিউডি চলচ্চিত্র, ক্রিকেট খেলা আর উগ্র জাতীয়তাবাদী হিন্দুধর্ম অখণ্ড ভারত রক্ষার জন্য জরুরি, কিন্ত তার সাংস্কৃতির বৈচিত্র্য তাকে বিশ্বের অন্য দেশ থেকে পৃথক করেছে এটা অস্বীকার করে সাধ্য কার।রাজনৈতিক মানচিত্রের বিচারে অনেকে ভারত, বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তান আলাদা করে দেখে। আবেগী সংলাপ ও ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি জাতীয়বাদী উগ্র চেতনা আমাদের অন্ধ করে দেয়।
 
ভারতের পক্ষে ইতিহাস নিয়ে একটা কথা বরতে গেলে বিপদ। কারণ একটি শ্রেণি ভারত বলতেই বোঝেন কাঁটাতারে ঝুলন্ত ফেলানি কিংবা বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা একটি দেশের গল্প যাদের ব্যাপারে ইতিবাচক কিছু বলা যাবে না। একই ভাবে পাকিস্তানের বাসমতি চাল আর পাক ফ্যান-জিএফসি ফ্যানের বাতাস খাওয়া একশ্রেণির মানুষ আছেন পাকিস্তান নিয়ে ইতিবাচক কিছু বলতে গেলেই ১৯৭১ নিয়ে চিৎকার চেঁচামিচি শুরু করে দেবেন।
 
মিনহাজ ই সিরাজের বর্ণনা থেকে শুরু করলে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের আগে বাংলা জিনিসটা কোথায়। সেই শাহ-ই-বাঙ্গালা কিংবা শাহ বাঙ্গালিয়ানের বাংলকে আমরা এখন এত বড় করে তুলেছি সেখানে ভারত কিংবা পাকিস্তান পুরোপুরি অনুপস্থিত। কিন্ত ইতিহাসের উত্তরাধিকার বলছে অন্যকথা। সেই সোয়ান উপত্যকা থেকে প্রাগৈতিহাসিক সংস্কৃতির যে ধারা তা আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশকে।
 
রাজনৈতিক মানচিত্র আর ভূ-রাজনৈতিক নানা সংলাপকে পায়ে ঠেলে এ তিন দেশ তো একই সত্তা। আর এজন্যই রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ইতিহাস চর্চা ও তার অনুশীলন জরুরি। আমি নিজেও বাংলার মতোই হিন্দি পারি এটা একরকম আনন্দের অনুভূতি। আমি উর্দু শুনলে বুঝি কিংবা পড়তে কিংবা লিখতে গেলে বকলম। একইভাবে পাঞ্জাবী, অহমিয়া কিংবা হরিয়ানার পাশাপাশি তেলেগু ভাষার কিছুই বুঝিনা যেটা চরম অক্ষমতা।
 
পাঠক্রমের অংশ থাকার পাশাপাশি প্রচুর বেই পড়ায় ইংরেজি চলার মতো পারি। বলতে গেলে টুককাজ কাজ চালিয়ে নিতেও পারি যেটা নিয়ে আমার আদতে তেমন আগ্রহ নাই। সত্য বলতে মন থেকে ইংরেজি কখনই আমাকে টানে না। ভাষায় যে মানবিক আন্তরিক একটা টান আছে সেটা আমি পাই বাংলায়, হিন্দিতে, উর্দুতে, আরবিতে,ফারসি এমনকি তেলেগু কিংবা অহমিয়াতেও। তাই কেউ আইইএল টি এসের স্কোর নিয়ে বাহাদুরি করতে গেলে আমার তাকে বিরক্তিকর মনে হয়। কারণ আমার আগ্রহের জায়গা হিন্দি, সংস্কৃত,আরবি, ফারসি, তেলেগু, পাঞ্জাবী কিংবা অহমিয়াতে নিহিত।
 
সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গবেষক হিসেবে আমার কাছে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতিটি ধারা ও উপধারা গুরুত্বপূর্ণ আর তাই ভাষাও এখানে অনেক গুরুত্ববহ। তাই আমি কখনই চাই না ভাষাগত তাণ্ডবে কারও মাতৃভাষা হারিয়ে না যাক। আজ ইংলিশ মিডিয়াম বাংলাকে শেষ করে দিচ্ছে, আমরা নীরব। আমর ঠিক সেভাবে নীরব ছিলাম যখন চাকমা, মারমা, খাসিয়া কিংবা সাঁওতালদের ভাষাকে খেয়ে দিয়েছিল আমাদেরই প্রিয় মাতৃভাষা বাংলা।
 
লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর দিকে তাকান, দৃষ্টি দিতে পারেন আফ্রিকার দিকেও। দেশগুলো ছালচামড়া আর মাটির দিক থেকে লাতিন কিংবা আফ্রিকান্। কিন্ত তাদের কথা বলতে হয় ইংরেজি, ফ্রান্সের ভাষা, স্পেনের ভাষা কিংবা পর্তুগিজ ভাষাতেই। আমি ভারতবর্ষ, পাকিস্তান কিংবা মাতৃভূমি বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে এখানেই গর্ব করি যে হিন্দি, বাংলা, উর্দু, তেলেগু, হরিয়ানা, অহমিয়া, ফাঞ্জাবী, তামিল কিংবা কানাড়ি ভাষা এখনও টিকে আছে। ঐ অঞ্চলে মানুুষ গর্বভরে সে ভাষায় কথা বলে। হয়ত আমরা এজন্যই অন্যদের থেকে আলাদা। তাই অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ আপনার সন্তানকে জোর করে ইংরেজি শিখাতে গিয়ে বাংলা ভোলাবেন না।
 
যদি সম্ভব হয় প্রমিত বাংলার পাশাপাশি আমাদের নোয়াখাইল্লা, বরিশাইল্যা, সিলেটি, চাটগাঁইয়া কিংবা উত্তরবঙ্গের ভাষাতেই নিজ সন্তানকে কথা বলা শেখান। এটা আপনার জন্য একটা সময় অনেক আনন্দের হবে। কারণ আপনার শেকড় নিহিত ভাষাতেই। আপনার কথায় আঞ্চলিক টান থাকাটা স্থানিক পর্বে গর্বের । এটা নিয়ে সংকোচ বোধ করবেন না। এটাই আপনার পরিচয়, এটাকে গোপন না করে প্রকাশ করুন। নোয়াখালির মানুষ নোয়াখাাইল্লা হিসেবে মাথা তুলে বাঁচুন। কুমিল্লার মানুষ বুক ফুলিয়ে বলুন কুমিল্লার্। আর আপনারা এভাবে বাঁচলে বাঁচবে বাংলাভাষা। স্বতন্ত্র ভাষা নিয়ে বাঁচবো আমরাও অনেক গৌরবের সঙ্গে।
কেউ কেউ দেখবেন আপনার মাতৃভাষায় কথা বলা শুনে আপনাকে উপহাস করতে পারে। কেউ কেউ দেখবেন ভেংচি দিয়ে ইংরেজি বলে নিজেকে কেউকেটা ভাবতে পারে। ওদের এড়িয়ে যান। সম্ভব হলে ওদের মুখের উপর খাঁটি আঞ্চলিকতার টানে বাংলায় কথা বলেন। এটাই হবে ওদের জুতোপেটা করার শামিল। মনে রাখবেন ইংল্যান্ডের প্রতিটি মানুষ এমনিতেই ইংরেজিতে কথা বলে। তাদের পঞ্চাৎদেশে বুটের লাত্থি মারলেও সে আপনার চাটগাঁইয়্যা টানে কথা বলতে পারবে না। তাহলে আপনার কি দায় ঠেকেছে ওদের টোন নকল করার। মনে রাখবেন, ওরা আপনার দেশ লুট করে গিয়ে সভ্য সাজছে। আগে ওরাই কুকুরের মতো জিহ্বা করে আপনার দেশের দিকে তাকিয়ে লালা ঝরাতো। তারপর সুযোগ বুঝে আপনার দেশকে চুষে ছিবড়ে করে দিয়েছে। এখন ওদেরই পা চাটা ভৃত্যের দল আপনার ভাষাকে গিলে খেতে চাচ্ছে। নিজ ভাষায় কথা বলুক, আঞ্চলিক টানে কথা বলুন। ইংরেজিসহ ঔপনিবেশিক ভাষা বলতে বাধ্য করা দালালদের জুটোপেটা করে প্রতিহত করুন। কারণ আপনার টিকে থাকার সঙ্গে আপনার ভাষাটা জরুরি। এই ভাষা  হারিয়ে গেলে একদিন অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বেন আপনিও।

পরিশেষে দেখুন চণ্ডিলের বক্তব্যটা…

(Visited 165 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published.