ছাগবিত্তান্ত

১.
গ্রাম- শহর-মফস্বলের নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত অনেকেই জীবন্ত মূলধন হিসেবে কিংবা নিছক শখের বশে গরু-ছাগল পালন করেন। আমরা যারা গ্রামে থাকি শৈশবের অনেক অম্লমধুর অভিজ্ঞতা রয়েছে এই ছাগল নিয়ে। এ ধরণের অনেক মজার মজার অভিজ্ঞতা কেউ কেউ লজ্জার বশে স্বীকার করেন না, পাছে মেকী শহুরে সেজে একটু ভাব নেওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
 
বেপরোয়া আচরণের জন্য শৈশব থেকে সুবিদিত থাকায় আমি এসব গল্প বলতে এখনও কোনো রাখ ঢাক করি না। বাস্তবে যা ঘটেছে তা যদি সাদা হয় সেটাকে ফকফকে সাদা হিসেবে তুলে ধরি, আর যদি কালো হয় তবে সেটাকে একটু কষ্ট নিয়ে হলেও কালো হিসেবে উপস্থাপন করি। খুব ইচ্ছে ছিল আমার বন্ধু ও পাঠকদের সঙ্গে ছাগলকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতাগুলো বিনিময় করার। নানা ব্যস্ততায় সেটা আর হয়ে ওঠেনি বলে আজই সুযোগটা নিতে চাইছি। 
২.
সবার বাসায় কমবেশি খাসি, ধাড়ি ও পাটি ছাগল থাকলেও অণ্ডকোষধারী দুর্গন্ধযুক্ত ছাগল তথা পাঁঠা পালনকারী পরিবারের সংখ্যা নিতান্ত কম ছিল। তাই ছাগল পালনকারী পরিবারের দোপেয়ে ছাগল তথা শিশু ও কিশোরদের জন্য লজ্জাজনক একটি কাজ ছিল ধাড়ি-পাটি ছাগলের সঙ্গমউদ্দেশ্যে তাকে পাঁঠাগৃহে নিয়ে যাওয়া। আমার অভিজ্ঞতাও বেশ তিক্ত। তবে পরিবারে তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় হওয়ায় এই ঝামেলা থেকে বেঁচে যেতাম।
 
যদিও বাইরের ভাড়াটে কোনো ছোকরার সঙ্গে যেতে হতো আমার ছোট দুই ভাই এতে চরম লজ্জা পেতো। সবথেকে কম সক্ষমতা কিন্তু সর্বোচ্চ যৌনাকাঙ্খার ইতর মুরুব্বিদের অশ্লীল কটাক্ষ তাদের লজ্জা পাওয়ার মূল কারণ। একবার এমন পরিস্থিতি হয়ে গেল যে বাইরের ভাড়াটে ছোকরা পর্যন্ত সঙ্গমেচ্ছুক ছাগলকে পাঁঠাগৃহে নিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। আমি দিনের বেলা অনেকটা নির্বিকার ছিলাম কিন্ত রাতের বেলা তার আর্তচিৎকারে কান পুরো ঝালাপালা হয়ে যাওয়ার যোগাড়। বিরক্ত, বিব্রত ও বিষন্ন মনে জনৈক রিকশাঅলার সাহায্য নিয়ে ভাবলাম ঐ সঙ্গমেচ্ছুক ছাগলটাকে নিজেই পাঁঠাগৃহে নিয়ে যাই।
 
যথারীতি ছাগলটার দড়ি ধরে টেনে নিয়ে রিকশায় চেপে রওনা দিলাম। সে গলা ছেড়ে আর্তচিৎকার করেই যাচ্ছে। একটু সামনে এক চায়ের দোকানের কাছে আসতেই ছাগলের ব্যা ব্যা রব ছাপিয়ে জনৈক মুরুব্বির কর্কশ হাসির শব্দ কানে আসলো। সে বিশ্রিভাবে উপহাস করে আমাকে বললো ‘কি ব্যাটা ছাগল লিয়ে কতি যাচ্চাউ’। আমি নিরুত্তাপ থাকলাম। মুরুব্বি উৎসাহ বোধ করলেন। এগিয়ে এসে বললেন ‘ক্যা পাঁঠার কাছে লিয়ে যাচ্চাও নাকি? কতি যাচ্চাও কইবি ল্যা নাকি?’
 
চালককে ইশারায় থামতে বলে রিকশা থেকে নামলাম। ছাগলটার দড়ি ধরে এগিয়ে যেতে যেতে শান্ত নিরুত্তাপ গলায় প্রশ্ন করলাম কি বললেন কাকা? সে আবার বিশ্রিভাবে ঐ প্রশ্ন করলো। আমি উত্তর দিলাম ‘আমি আসলে আপনার কাছেই ছাগলটাকে নিয়ে যাচ্ছিলাম। না জানিয়ে বাসায় নিয়ে গেলে নতুন এই সতীন দেখে চাচি কি মনে করবেন জানি না। তাই প্রশ্ন যেহেতু করেই দিলেন আসেন এখনই আপনার সঙ্গে এর বিয়ে দিয়ে দেই। আপনি একে নিয়ে ঘরে যান’।
 
দাঙ্গা পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়লে আন্দোলনকারীরা যেভাবে পালিয়ে যায়। আমার ঐ কথা শুনে মুরুব্বি তো বটেই তার সঙ্গে দাঁত কেলিয়ে মজা নিতে থাকা আশেপাশের অনেকেই সেখান থেকে সটকে পড়লো। কথাবার্তার আওয়াজ পেয়ে আমার দুইভাই ততক্ষণে চলে আসছে। তারা এই কাণ্ড দেখে সাহস পায়। এরপর আমাকে আর যেতে হয়নি। এমনকি ঐ ভাড়াটে ছোকরাকেও নিতে হয়নি। আমার ছোট দুই ভাই একবুক সাহস নিয়ে দড়ি ধরে ছাগলটাকে সঙ্গে করে পাঁঠাগৃহের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। বুঝতে পারলাম ট্যাবু ভাঙ্গা সমাজের জন্য কতটা জরুরি।
 
blank৩.
ঈদের ছুটিতে আমার ভোটকা ফুফাত ভাইটা বেড়াতে এসেছে তার নানুবাড়িতে। আমাদের থেকে বেশ বড় হলেও তার লাজ লজ্জার বালাই কম। থপাথপ পা ফেলে রাজকীয় ভঙ্গিতে সে হাঁটে। গোসলের অন্তত আধাঘণ্টা আগে সে মিয়ামী ন্যুডিস্ট বিচের স্টাইলে বাড়ির চারদিকে ঘোরাঘুরি শুরু করে। একদিন অমনি ঘোরাঘুরির এক পর্যােয়ে সে অমন জন্মদিনের পোশাকেই আমার ছোটচাচার থেকে আখ নিয়ে চিবুচ্ছে। সেই আখের রস তার মুখ, চিবুক, গলা আর পেট বেয়ে সোজা গোপনাঙ্গ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় নিচে পড়ছে। এইটা আমরা খেয়াল করিনি, খেয়াল করেছে মাস তিনেক বয়সের একটা ছাগলের বাচ্চা। সে সুন্দরভাবে ঐ রস খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। এরপর ভোটকা ব্যাটা এমন চিৎকার দিয়ে ওখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল যেটা আজও আমাদের কানে বাজে। মজার ব্যাপার হচ্ছে ঐ ঘটনার পর থেকে আজ অবধি তাকে অমন ন্যাংটাপুটু হয়ে ঘুরতে দেখিনি।
৪.
আমাদের বাসার কাজের মেয়ে রোজিনা আশরাফ নামের এক রিকশাঅলার সঙ্গে প্রেম করতো। তাদের মধুর প্রেম লুকিয়ে রাখতে তারা চৌকির তলাকে আশ্রয় হিসেবে মনে করতো। একদিন তাদের উত্তাল প্রেমের সময় আমাদের বাড়ির বিশাল খাসি ছাগলটা এসে হাজির। তারা খেয়াল করেনি এইটা ছাগল নাকি মানুষ। রোজিনা পালালেও আশরাফ চৌকির তলায় ঢুকে পড়ে। বিশালাকার ছাগলটা এদিক ওদিক তাকিয়ে সামনে দুই পা তুলে হিসু করার শুরু করলো। সেই হিসু গড়িয়ে গিয়ে আশরাফের পুরো শরীর ভিজিয়ে তাকে অনেকটা গোসলের পর্যায়ে নিয়ে যায়।
 
৫.
আমার খুব প্রিয় ছাগল ছিল র‌্যাম্বো। বিশালদেহী এই ছাগলটা অনেক জ্ঞানীও ছিল। আমি বলতাম সেবা প্রকাশনীর অন্তত ১৫-২০ টা বই ওর পেটে থাকায় এতো বুদ্ধি এসেছে। সে মূলত নিউটপ্রিন্টের কোনো বই পেলে সেটা চিবিয়ে খেয়ে ফেলত। এটা হজম করতে না পারার ভয়ে পরে আবার জাবর কেটে তুলে ফেলে দিতো। তবে মলাটবাদে পুরো বই হঠাৎ করে গায়েব করার ক্ষেত্রে তার জুড়ি ছিল না। যাই হোক এর বাইরে সে কলা, বিস্কুট, চানাচুর এগুলো চুরি করে খাওয়ায় সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছিল।
 
র‌্যাম্বের হাত থেকে রক্ষাকল্পে আমার মা প্রায় ডজনখানেক কলা এনে আলমারির উপরে রেখে গেলেন বেশ উঁচুতে। তারপর বাইরে থেকে দরজা বন্ধ। সুতরং আক্রমণের সুযোগ অনেকটা নাই দেখে আম্মা রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত হলেন। র‌্যাম্বো দাঁত দিয়ে পাটের দড়ি কেটেছে। তারপর শিং দিয়ে গুঁতো মেরে ভেজানো দরজা খুলে ঘরের মধ্যে ঢুকেছে। এরপর কলাগুলো তার চোখে পড়ে।
 
সে নানাদিক থেকে কলা খাওয়ার জন্য জরিপ ও অনুসন্ধান করে। অবশেষে ঘরের আরেকপ্রান্ত থেকে একটা চেয়ার পিঠ বাধিয়ে ঠেলে ঠেলে আলমারির কাছে নিয়ে আসে। এরপর লাফ দিয়ে ঐ চেয়ারে উঠে পেছনের দুইপায়ে ভর দিয়ে সটান লম্বা হয়ে আলমারির মাথা থেকে কলাগুলো পেয়ে খেয়ে দেয়ে সটকে যায়। তার এই কর্মকাণ্ড মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে দেখতে আমি তাকে তাড়ানোর কথাটা পর্যন্ত বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম।
 
blank৬.
ভর দুপুরে ঘুমানো আমাদের জনৈক নিকটাত্মীয়ের চরম বদভ্যাস। একদিন ভাত খাওয়ার তিনি চৌকির উপর শুয়ে শটান নাক ডাকতে শুরু করলেন। এদিকে বিদ্বান র‌্যাম্বোর দড়ি খোলা ছিল। সে গিয়ে প্রথমে ভদ্রলোকের ঘর্মাক্ত পেট চেটে বেশ মজা পেল। তারপর শরীরের উন্মুক্ত আরও কিছু এলাকা চেটে এক পর্যায়ে মুখও চাটলো। এতেও ঘুমকাতুরের লোকটার কোনো বোধোদয় নাই। এরপর তার ঘামে ভেজা লুঙ্গিটা র‌্যাম্বোর বেশ পছন্দ হয়ে যায়। সে চৌকির উপর সামনের দুই পা তুলে দিয়ে মনের সুখে লুঙ্গিটা চিবুতে থাকে। ফলাফল হিসেবে ভদ্রলোকের ঘুম যখন ভাঙ্গল তার লুঙ্গিতে অনেকগুলো বড় বড় ছিদ্র। পাশাপাশি বেশ কয়েক জায়গায় র‌্যাম্বো চিনিয়ে খেয়েই ফেলেছে।
 
৭.
গরুচোর নাটকের বিখ্যাত একটি সংলাপ ‘মাতার মদ্দি পিরেম পিরিতি ঘুরতি থাকলি গাই আর বলদ চিনতি ভুল তো হবিই অ্যাঁ’। আসলে আমার মাথায় তখন কোনো প্রেম পিরিতি ঘুরপাক খায়নায়। তবুও ছাগলের লিঙ্গ নির্ধারণে চরম ভুল করি। অ্যারোপ্লেনের মতো দুপাশে প্রসারিত কানযুক্ত পেট সাদা একটা নারী ছাগলকে খাসি ভেবে হাট থেকে কিনে এনেছিলাম। বাড়ির সবাই আমাকে ঐ ছাগল বদলে আনা থেকে রাস্তায় গিয়ে ছেড়ে আসার কথা পর্যন্ত বলে। কিন্ত আব্বা বললেন ‘ও যখন কিনে আনছে থাক’। আমি জাহাঙ্গীরনগরে চলে যাওয়ার পর এই ছাগলটা একটা সময় এসে আব্বার পেছনে পেছনে ঘুরতো সারাদিন। কেউ অসতর্ক হলে এর বিশ্বস্ততা আর আন্তরিকতা দেখে ছাগলের বদলে কুকুর ভেবে ভুল করতে পারেন।
একদিন হঠাৎ করে আব্বা মারা গেলেন। আমার ছোট দুইভাই তখন স্কুলে পড়ে, আমি সবে স্নাতক প্রথমবর্ষে। পিতৃবিয়োগের শোক ভোলা কঠিন। তবুও বাঁচতে হবে কঠিন বাস্তবতাকে সঙ্গী করে, এটা মেনে নেয়ার অনুসঙ্গে আব্বার লাশ কবরে নামিয়েছি শিশু দুই ভাইকে নিয়ে। ভিজে আসা চোখ মুছে শক্ত থাকার চেষ্টা করেছি পাছে মা আর ছোট দুই ভাই ভেঙ্গে পড়ে। আমরা যত কষ্ট পাই খানাপিনা ছাড়িনি। কিন্ত অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করলাম ঐ ছাগলটা আব্বা মারা যাওয়ার পর টানা তিনদিন কিচ্ছু খায়নি।
আমি আর আমার ছোট চাচা ওকে ওর খুব প্রিয় টোস্ট বিস্কুট, মুড়ি আর রুটি খাওয়ানোর চেষ্টা করে বারংবার ব্যর্থ হলাম। আব্বার কুলখানি অনুষ্ঠানের পর সবাই দোয়া শেষ করে যখন ফিরে যাচ্ছে আমার ছোট চাচা ছলছল করতে থাকা চোখে ছাগলটার দিকে ইশারা করলেন। তাকিয়ে দেখি সে বসা থেকে হঠাৎ চার-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লো। এরপর সেই যে নীরব নিথর হয়ে গেল এরপর আর তাকে নড়তে দেখিনি। সামান্য ছাগল হলেও ওকে পরম মমতায় তুলে দিয়ে গিয়ে অনেক যত্ন সহকারে কবর দিয়ে এসেছিলাম আমাদের বাড়ির একটা কোণায়। দৃশ্যটা এখনও চোখে ভাসছে।
 
 
 
 
(Visited 268 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published.