জিনের বাদশাহর ফোনকল

জিনের বাদশাহ নাম নিয়ে জনৈক তালেবে এলেম আমাকেও ফোন করেছিলেন। ২০১৮ সালের জুন-জুলাই মাসের ঘটনা। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের সবে বছর পেরিয়েছে। তখনো বিয়ে করি নি। ক্যাম্পাস থেকে ফিরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি সৌধে সিড়িতে বসে বাচ্চাদের স্কেটিং দেখা। টোকাই পুলাপাইনের সঙ্গে মাঝে ক্রিকেট খেলার বাইরে সান্ধ্যকালীন কাজ তেমন ছিল না। যার তার সঙ্গে সেভাবে আড্ডা দিতে ভাল লাগে না। আবার ঐ সময়টাতে অতিরিক্ত জ্ঞানী বন্ধুবান্ধবকে এড়িয়ে চলছিলাম নানা কারণে। ফলে সহকর্মী বড় শাহীন আলম, আশিক বিশ্বাস আর বন্ধুবর ফখরুল পাটোয়ারির সঙ্গেই বেশিরভাগ সন্ধ্যা কেটে যেত। এগুলো সবই সেইদিনের গল্প যেদিন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস যানজট এড়িয়ে সঠিক সময়ে মিরপুরে ব্রেক কষতে পারতো। অন্যদিন গাড়ির পেছনের সিটে ঘুমিয়েই সন্ধ্যা পার হয়ে যেত।

যাই হোক মাগরিবের নামাজ শেষ করে এগ্রি কিচেনে গিয়ে বসে থাকাটা ছিল প্রতিদিনের রুটিন। এ সময় আসলে কি পড়ালেখা করবো তার একটা ধারণা মাথায় গুছিয়ে নিতাম। পাশাপাশি কফি মগে চুমুক দিতে দিতে অনেকটা মানসিক বিশ্রাম নিতে চাইতাম। এরপর বাসায় ফিরে সবার মুখস্থ চিৎকার, এতো দেরি করলি ক্যান। সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়াটাও প্রয়োজন মনে করতাম না। কারণ আমি জানি আমি কি করছি! সেই হিসেবে নাকে মুখে কিছু একটা গুজে দিয়ে পড়তে বসতাম। আর কোনোকেনো দিন এগ্রি কিচেন থেকেই খেয়ে ফিরতাম ইচ্ছে হলে। ফলে রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিরপুরের বাসায় সারারাত কম্পিউটার নিয়ে বসে থাকাই আমার একমাত্র কাজ। বিনোদন সংকটে ভোগায় ঐ ফোনকল পাওয়ামাত্র ভেবেছিলাম জিনের বাদশাহর সঙ্গে একটু ডাঙ্গুলি খেলা যাক।

জলদগম্ভীর কণ্ঠে বাক্যালাপ শুরু হয়।দুনিয়ার সব মানুষকে পাপিষ্ঠ বর্ণনা করার পাশাপাশি জিনের বাদশাহ তার কেরামতি নিয়ে নানা তথ্য জানাচ্ছিলেন। আমি সেগুলো শুনলাম অনেক মন দিয়ে। এমন একটা অভিনয় করলাম যে প্রচুর ভয় পেয়ে গেছি। তারপর আমতা আমতা করে নিজের কথা বলা শুরু করলাম। তাকে বললাম আমার একমাত্র প্রিয় শখ গোরস্তান কিংবা শ্মশান থেকে মড়ার খুলি কুড়িয়ে আনা। তারপর মাঘী পূর্ণিমার রাতে সেগুলো নিয়ে মালা বানিয়ে চৌরাস্তায় টাঙ্গিয়ে রাখা। এতে করে একাধারে আযরাঈল এবং হিন্দুদের চামুণ্ডেশ্বরীর অভিশাপ আছে আমার উপর। তাদের অভিশাপে আমি ভালো নাই। তাকে বললাম ভাই আমি অনেক গরীব একজন মানুষ। আমার এখনই জরুরী ভিত্তিতে ৫ লাখ টাকা লাগবে। এটা দুনিয়ার কোনো মানুষ পারবে না, আপনি জ্বিনের বাদশাহ আপনিই পারবেন। মানুষ জিনের বাদশাহর দেখা পাওয়ার জন্য কত্ত আমল করে, কত্ত দরবারে গিয়ে ধর্না দেয়। আমার ভাগ্য ভাল আমি আপনার দেখা পেয়ে গেছি। হুজুর আপনি কি সুন্দর সময়ে আমাকে ফোন দিয়েছেন। আপনি শুধু পাঁচ লাখ টাকা দেন। এবারের মাঘী পূর্ণিমায় মড়ার খুলির মালা আমি নিজে হাতে আপনার গলায় পরিয়ে আসবো।

আমি বুঝতে পারছি বেটা জ্বিনের বাদশাহ ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে। তবুও অনেকটা ফুঁ দিয়ে বুক ফুলিয়ে নেয়ার মতো স্টাইলে সে আমাকে চরম জোরে ধমক লাগায়। বুরবক! জানিস আমি কে! আমার কথা না শুনলে কি করতে পারি তুই ভাবতে পারিস। আমি উত্তরে বললাম জ্বি হুজুর জানি। এজন্যই তো বলছি আপনিই পারেন। প্লিজ আমাকে ৫ লাখ টাকা দেন। আমি জানি আপনি চাইলে এটা আপনার কাছে কোনো ব্যাপার না। এরপর জিনের বাদশাহ ফোন কেটে দিলেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে তাকে আবার ফোন দিলাম। কিন্তু এই বেটা ফোন রিসিভ করলো না। আমার জিদ চেপে গেছে। আমি বড় চাচার ফোন নিয়ে এসে তাকে আবার কল দিলাম। সে ফোন রিসিভ করে বললো রং নাম্বার। ফোন কেটে দিতে আবার কল দিলাম। এবার দেখি মহান জিনের বাদশাহ ফোন বন্ধ করে দিয়েছেন।

আমি দাপ্তরিক আবেদনপত্র লেখার স্টাইলে বরাবর জ্বিনের বাদশাহ… একটা এস এম এস লিখে তার কাছে ৫ লাখ টাকা চাইলাম।অনেক্ষণ রিপ্লাই না পেয়ে আমি আবার কল দিলাম। সে বিরক্ত হয়ে ফোন কেটে দিলো। আমি আবার কল করলাম। এভাবে কয়েকবার কল করেও কোনো সাড়া পেলাম না। ঘণ্টা খানেক পর আবার কল দিয়ে বুঝলাম সে ব্লক মেরেছে। তখনকার মতো অনেকটাই নিরুপায় হয়ে চুপ করে ভাবতে লাগলাম এই বেটাকে কিভাবে সাইজ করা যায়।

নির্মম প্রতিশোধটা নিলাম তারপরে। যে জিনের বাদশাহ নামধারী শয়তান হাজারো মানুষের ঘুম নষ্ট করেছে। কখনও মজা করতে গিয়ে মানুষকে কষ্ট দিয়েছে। কিংবা কেউ কেউ প্রফেশনাল চাঁদাবাজ তাদের সবাইকে তো আর সোজা করতে পারব না। ঐ বেটা জিনের বাদশাহ গায়ে পড়ে আমাকে কল করায় ওকে হাড়ে হাড়ে টের পাইয়েছিলাম কিভাবে রাতের পর রাত নির্ঘুম রাখা যায়।আমি আর আমার ছোট ভাই বোনরা অন্তত ২৫ জন মিলে তাকে রাতভর কল দিয়ে সাইজে রাখতাম। দুই দিন পর দেখা গেল তার ঐ নম্বর বন্ধ। আমরা বন্ধ হলেও ঐ নম্বরে কল দিয়ে চালু কিনা তা চেক করতাম। ফলে তার পক্ষে ঐ নম্বর চালানো অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল।

মজার ব্যাপার ট্রু কলার অ্যাপসে দেখা গেল ঐ বেটার নাম ‘জ্বিনের বাদশাহ’ শো করে। আমরা নিরুপায় হয়ে এবার ইমো-ভাইবার-হোয়াটসঅ্যাপ সফটওয়ারের সাহায্য নিলাম। ওর নম্বরটা সেভ করে রাখলাম ‘জিনের বাদশাহ’ নামেই। তারপর সে যখনই ফোনটা অন করেছে আমাদের প্রায় সবার সোজা নটিফিকেশন যায়। অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে মাস দুয়েক পর ঐ জ্বিনের বাদশাহ তার পরিচয় স্বীকার করে ক্ষমা চায়। বলা বাহুল্য আমি সেদিনো তার কাছে টাকা চেয়েছিলাম। সে হাউমাউ করে কেঁদে বলে আমি আর কাউকে কোনোদিন জ্বালাতন করবো না। অনেকদিন পর গতকাল রাতে এফ এম রেডিও থেকে কোন বজ্জাত নারী প্রাঙ্ক কল করেছে। অসুস্থতার পাশাপাশি একটা লেখা নিয়ে খুব ব্যস্ত সময় পার করছি। ফলে ফোন কেটে ব্লক মেরে দিলাম। এফএম ওয়ালীর ভাগ্য ভাল যে তাকে জ্বিনের বাদশাহর মতো সাইজ করার মুড ছিল না। যদি থাকতো, এতক্ষণ তার পুরো খান্দান প্র্যাঙ্কড আপ হয়ে যেত।

(Visited 90 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published.