পণ্যাসক্তি ও মনোজাগতিক দুর্বৃত্তায়ন

সংস্কৃতি গড়ে ওঠে বিশেষ অঞ্চলে মানুষের নিত্যদিনের নানা অনুশীলনের মধ্য দিয়ে। ফলে এর সঙ্গে তার কর্মগত, পরিস্থিতিগত ও উপায়ভিত্তিক সামঞ্জস্য বিধান জরুরি হয়ে পড়ে। সেটা সমন্বয় করতে পারলেই সমাজ টিকে থাকে, নচেত্ নয়। বিশেষ জনপদে মানুষের পোশাক কী হবে, সেটা নির্ধারিত হয় তার পরিবেশ ও সমাজ থেকে। তার খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচার কেমন হতে পারে, সেটাও নির্ধারিত হয় দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক অনুশীলনের মধ্য দিয়েই। তবে হঠাত্ করে কোনো বদল পুরো পরিস্থিতি বিগড়ে দিতে পারে, বিধ্বস্ত করতে পারে পুরো সাংস্কৃতিক পরিসরকেই। গেল বছর ঈদের সময় পোশাক বিক্রি নিয়ে ঘটে যায় হুলস্থূল এক কাণ্ড। জনৈক ভারতীয় বাংলা টিভি সিরিয়াল অভিনেত্রীর নামে পোশাক এসে ছেয়ে যায় বাংলাদেশের ঈদ বাজার। শ্রেণীকরণের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বললে, একেবারে উচ্চ শ্রেণী থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে খেটে খাওয়া মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে ওই পোশাকের ওপর। অনেক পরিবারে এ পোশাক কেনা নিয়ে দেখা দেয় অশান্তি।

রোলাঁ বার্থ তার লেখকের মৃত্যু শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘প্রত্যেক মানুষ কোনো বিষয় পড়া কিংবা কোনো চলচ্চিত্র দেখার ক্ষেত্রে ঠিক তা-ই দেখে, যা দেখতে চায়; এক্ষেত্রে আসলে সে গল্প-চলচ্চিত্রের চরিত্রে নিজেকেই দেখে। তার ভাবনায় বিম্বিত হতে গিয়ে হারিয়ে যায় গল্পের ওই বিশেষ চরিত্র। কার্যত দেখা যায়, ভাবনায় মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে সে নিজে। উপরোদ্ধৃত ভারতীয় বাংলা সিরিয়ালের ওই নায়িকা এবং আমাদের দেশের কিশোরীদের ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক তাই। তাদের প্রত্যেকের মনে যে চিন্তাগুলো কাজ করে, হয়তো পরিচালক বেশ দক্ষতার সঙ্গে সেগুলোই দেখাতে পেরেছেন। এতে সিরিয়ালটি যেমন তাদের মনে পুরোপুরি গেঁথে গেছে, তেমনি দেখা দিয়েছে প্রত্যেকের মধ্যে এক একজন ওই সত্তার বেড়ে ওঠা। মনোজাগতিক পরিসরে প্রত্যেকে এতটাই গভীর থেকে ওই অভিনেত্রীকে নিয়ে ভেবেছেন, যা নামান্তরে জন্ম দিয়েছে ‘কমোডিটি ফেটিসিজম’ তথা পণ্যাসক্তি। এ পণ্যাসক্তি এতটাই গুরুতর হয়ে উঠেছে, যা অনেক কিশোরীর জন্য অনিবার্য হয়ে দেখা দেয়; নামান্তরে কেউ কেউ বেছে নেয় আত্মহননের পথ, বিচ্ছেদের পথে এগিয়ে যায় অনেকগুলো সামাজিক সম্পর্ক আর অশান্তির বিষবৃক্ষ ছেয়ে যায় সাজানো-গোছানো পরিবারে।

মানুষ যা চায়, ব্যবসায়ীদের কাজ ঠিক তা-ই বিকোতে চেষ্টা করা। আর শিশুদের মনোজাগতিক পরিসরে খুব সহজেই ঢুকিয়ে দেয়া সম্ভব বলে তাদের টার্গেট পপুলেশনে সবার আগে থাকে শিশুরা। ওই সিরিয়াল অভিনেত্রীর আদলে তৈরি পোশাকের সাফল্য ব্যবসায়ীদের এতটাই প্রাণিত করেছে যে, তারা এগিয়েছে নতুন ধারা সামনে রেখে। বেশ কয়েকটি প্রিন্ট ও অনলাইন দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, স্কুলগামী শিশুদের খাতার মলাটে পর্যন্ত ব্যবহার করা হচ্ছে ওই জাতীয় সিরিয়ালের নানা পোস্টার ও ছবি। এক্ষেত্রে তাদের চিন্তা— কোনো অভিভাবক যদি পছন্দের নায়িকার ছবি দেখে খাতাটা কিনে নেয় তার সন্তানের জন্য। অনেকটা দৃষ্টিকটু দেখা গেলেও ২০ থেকে শুরু করে ১০০ টাকায় এ খাতাগুলো ঠিকই বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে যেকোনো খাতার চেয়ে বইগুলোর বিক্রি বেশিই হচ্ছে বলে দৈনিক পত্রিকাগুলোয় প্রকাশিত সংবাদে জানা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা সমাজ-সংস্কৃতির ধার ধারেন না, তাদের কাছে মুনাফা সর্বংসহা-সর্বারাধ্য গঙ্গোদক। কিন্তু বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত অভিভাবকদের। সেখানেই ঘটেছে মূল বিপত্তি। অভিভাবকরা কোথায় সন্তানের ভবিষ্যত্ কিংবা সামাজিক বিকাশের কথা চিন্তা করবেন, সেখানে তাদের চিন্তায় দোলা দেয় প্রিয় সিরিয়াল অভিনেত্রীর ছবি। আর মনের খায়েশ মেটাতে গিয়ে সেগুলোকে তুলে দিচ্ছেন শিশুদের হাতে। সামাজিক পরিসর থেকে যতটাই রোধের চেষ্টা করা হোক না কেন, মনোজাগতিক দুর্বৃত্তায়ন বার বার ঘটাচ্ছে অবক্ষয়। এখনই সবার ভাবা উচিত, কীভাবে এর থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে নেয়া যায়। অন্তত একটা সুন্দর আগামীর জন্য অভিভাবকদের উচিত এখনই সতর্ক হওয়া।

(Visited 18 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *