বাগদাদ অভিমুখে হালাকু খান

হালাকু খানের চিঠিতে কটাক্ষ করা হয়েছিল এভাবে যে যেখানে মোঙ্গলদের পা পড়েছে সেটাই তাদের দখলে গেছে অল্প কিংবা বেশি সময়ের ব্যবধানে। তাই বাগদাদের দরজা কেনো তাদের জন্য বন্ধ থাকবে। সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে তারা আঙ্গুল বাঁকাতে বেশ ভালো জানে। অন্তত খলিফা যদি তাদের জন্য বাগদাদের দরজা উন্মুক্ত না করে তবে এটা কিভাবে খুলতে হয় তা মোঙ্গলদের জানা আছে। সে আরও উল্লেখ করে ‘খলিফা তুমি যতবড় মাতুব্বরই হওনা কেনো অন্তত গরম লোহার পেরেকের উপর পশ্চাৎদেশ দিয়ে ঠেসে বসার মতো বোকামি করবে না। তুমি নিজে একটা কম দামের চিকন মোমবাতি হয়ে কেনো ঝলসানো সূর্যের তেজের সামনে অহংকার আর দুঃসাহস দেখাচ্ছো? আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। সেই শুরু থেকে আমরা তোমার আর তোমার বংশধরদের ঘাড় ত্যাড়ামি দেখে আসছি; এবার আর নয়। তুমি সময় থাকতে বাগদাদের দুর্গপ্রাচীর ভেঙ্গে দাও। যদি প্রাণে বাঁচতে চাও তোমার ছেলেকে নগরীর দায়িত্ব দিয়ে সেখান থেকে ভেঁপু বাজিয়ে কেটে পড়। আর তোমার ছেলে যদি এতোটাই বেআক্কেল আর অপদার্থ হয়ে থাকে তাকে পরামর্শ দেয়ার জন্য তোমার উজির কিংবা আইবেগকে রেখে যেতে পার। তবে যাই হোক আমি বাগদাদে তোমার টিকিটাও যেন দেখতে না পাই’। বিশ্রি ভাষায় অপমানজনক সম্বোধনে লেখা চিঠির শেষে উল্লেখ করতে দেখা যায় এর সবগুলো শর্ত বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিলে তবেই রক্ষা পাবেন মুস্তাসিম, নচেৎ নয়। এর অন্যথা হলে মোঙ্গল বাহিনী বাগদাদের দিকে মার্চ শুরু করবে। তারপর আরেকদফা কটাক্ষ করা হয় এভাবে ‘একবার আমার সেনাবাহিনী ঢুকে পড়লে তুমি কোথায় লুকোবে; মাটির গর্ত করে সেখানে নাকি সোজা পরপারে জাহান্নামে গিয়ে খই ভাজবে?’
উজিরের পরামর্শে সেনাবাহিনীর আকৃতি খর্বকায় করে তুললেও অন্তত হালাকু খানের চিঠির উপযুক্ত জবাব দেয়ার সক্ষমতা ছিল মুস্তাসিম বিল্লাহর। সারাটা সময় শিল্প সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করে অভ্যস্থ মুস্তাসিম নিজেও কবি হিসেবে তুচ্ছ ছিলেন না। তিনি হালাকু খানের চিঠির প্রত্যুত্তরে বেশ সুন্দর করে জবাব দিয়েছিলেন তার প্রতিটি কটাক্ষের। সেখানে তিনি চিঠির জবাব সহ ফেরত পাঠান শরিফ উদ দিন ইবন দুজি (Sherif ud din ibn Duzy), বদর উদ দিন মুহাম্মদ (Bedr ud din Muhammed), জঙ্গী নাখজিভানিকে (Zanghi Nakhjivani)। এই নাখজিভানি ছিলেন আর্মেনিয়ার একজন বিশিষ্ট জ্ঞানী ব্যক্তি। সেখানে পাঠানো চিঠির প্রত্যুত্তরে লেখা হয় ‘আরে তুমি তো বাচ্চা ছেলে; এখনও নাক টিপলে দুধ বের হয়। মাত্র কয়েকটা যুদ্ধ জিতে নিজেকে এত বাহাদুর ভাবতে শুরু করলে কেনো? তুমি মাত্র কয়েকটা দেশের ওপর অন্যায় আক্রমণ চালিয়ে সেগুলোকে দখল করেছ। সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ জিততে না পেরে অন্য স্থানের নিরীহ বেসামরিক মানুষ হত্যা করে তাদের রক্তে হোলি খেলেছো। এসব হত্যাকাণ্ড, আক্রমণ আর প্রাণনাশের মধ্যে বাহাদুরির কিছু নাই, বরং তোমার লজ্জায় মরে যাওয়া উচিত এসব কাপুরুষোচিত আচরণের জন্য। তুমি কি মনে কর তোমার দক্ষতা, তোমার সেনাদলের সক্ষমতা এতোটাই বেড়ে গেছে যে তোমার ইচ্ছে হলে আকাশে লাথি দিতে পারবে? তুমি হয়ত ভুলে গেছো পশ্চিম আর পূর্বে বাহাদুরি দেখাতে যাওয়ার তফাৎ কতটা। সেখানকার ঘেষো জমিতে তুমি যা ইচ্ছে করে এসেছো। যেমনভাবে ইচ্ছে ঘোড়া দাবড়ে বেড়িয়েছো। তবে মনে রাখবা তৃণভূমি আর মরুভূমির লড়াই কখনই এক নয়। তুমি এখন পর্যন্ত যা ইত্রামি করেছ তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার এটাই উপযুক্ত সময়। তাহলে খুব বেশি সময় লাগবে আমার সেনাদল সংঘটিত করতে। এর পাশাপাশি আশেপাশের মানুষ যারা মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখে তারা দলে দলে এসে যোগ দিতে প্রস্তুত খিলাফতের পতাকা সামনে রেখে। এই জনপদের সৈন্যদের পাশাপাশি আবালবৃদ্ধবণিতা যখন মাতৃভূমি রক্ষার শপথ নিয়ে একটা পতাকা সামনে রেখে সমবেত হবে তখন মূত্রত্যাগের সময় থাকবে তোমার? তাই এখনও বলছি সময় থাকতে তুমি পালিয়ে গিয়ে প্রাণ রক্ষা কর নিজের। নাহলে আগে ইরানের সঙ্গে ঝামেলা মিটে যাক, তারপর তোমাকে আর দাম্ভিক খুনে বাহিনীকে শায়েস্তা করতে খুব একটা সময় লাগবে না আমাদের’। এই চিঠির নিচে পাদটীকা হিসেবে খলিফা আরও যুক্ত করেছিলেন কিছু কথা ‘আমি, খাকান কিংবা তার প্রতিনিধি হালাকু প্রত্যেকেরই স্ব স্ব হৃদয় এবং মনের ভাব প্রকাশের ভাষা আছে। আমরা প্রত্যেকেই চাইলে প্রতিহিংসার পথ ছেড়ে বন্ধুত্বের কথা চিন্তা করতে পারি। তাই তোমার কি এত প্রয়োজন পড়েছে আমার নগর দখল করা কিংবা এর দুর্গ প্রাচীর ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়ার মধ্যে। তাই এত দাঙ্গা ফ্যাসাদের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে সোজা খোরাসানের রাস্তা মাপার চেষ্টা করাই তোমার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। আর শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ যদি করতেই চাও মনে রাখবা, আমার সেনাদল যুদ্ধক্ষেত্রে নামলে তাদের ভয়ে সমুদ্রের ঢেউ পথ হারায়, বহতা নদী শুকিয়ে যায়’।
ঐ সময় অনেকের লিখে রাখা স্মৃতিকথা থেকে নানা কথা পাওয়া যায়। পাশাপাশি ব্রিটিশ মিউজিয়ামের নথিতে এই চিঠির কপি পাওয়া যায় বলে উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে ‘ইলাস্ট্রেটেড হিস্ট্রি অব মোঙ্গলসে’ বর্ণনার ক্ষেত্রে সরাসরি এই চিঠিই ব্যবহার করা হয়েছে। তবে সে সময়ের প্রায় সবগুলো তথ্য থেকে জানা গেছে খলিফা অসম্ভব রকমের অহংকারী ছিলেন। তিনি নিজেকে সমুদ্র থেকে শুরু করে বিশ্বের পুরো ভূভাগের অধিপতি মনে করতেন। এজন্যই মুস্তাসিম নিজের উপাধি রেখেছিলেন জাহাঙ্গীর যার অর্থ এই ধারণার প্রতিফলন করে। একবার তুর্কি বাহিনী বাগদাদ আক্রমণের জন্য চরমপত্র প্রেরণ করেছিল। তার জবাবে সবাই যখন প্রস্তুতি নিচ্ছে খলিফার পক্ষ থেকে জানানো হয় ‘এই তুর্কি নেড়িকুত্তাদের নিয়ে এত চিন্তা করার কি আছে, তাদের এমন কি সক্ষমতা যে আমরা মেনে চলতে বাধ্য’। এ ধরণের নানা ঘটনা শুনে হালাকুর সভাসদগণ যখন জানাল যে মানুষ হিসেবে খলিফা অনেকটা ধনুকের মতো বাঁকা, প্রত্যুত্তরে হালাকু বলে বসে ‘এই বাঁকা ধনুককে আমি তীরের মতো সোজা করে ছাড়ব’ (The Khalif was as crooked as a bow, but I would make him as straight as an arrow)। এরপর হালাকু খানের সভাসদরা খলিফার দূতকে যাচ্ছেতাই অপমান করে তাড়িয়ে দেয়। তারা সোজা বলে দেয় চেঙ্গিস খানের বংশধর হিসেবে হালাকু এখন পুরো বিশ্বের সম্রাট। তাদের সম্রাট খলিফার কোনো দাবিই মানতে প্রস্তুত নন। যদি ক্ষমতা থাকে খলিফা যেন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
খলিফার দূতরা অপমান হয়ে ফিরে আসার পর একমাত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি বাদে আর কোনও পথ খোলা ছিল না তাদের সামনে। এ সময় দেরি করার অর্থ আর কিছুই নয়, বাগদাদবাসীর জন্য বিপদ ডেকে আনা। তবে দুর্ভাগ্য খলিফার, হতভাগ্য বাগদাদবাসীর জন্য অপেক্ষা করছিল চরম জিঘাংসার মুহূর্ত। তাদের এই বিপদ চূড়ান্ত পর্বে গিয়ে উপস্থিত হয় খলিফার গর্দভ উজিরের আরেক দফা গাধামিতে ভর করে। যে উজির রাষ্ট্রীয় খরচ কমানোর জন্য সেনাবাহিনী ছেঁটে ফেলার পরামর্শ দিয়েছিল, সে আরেকদফা খলিফাকে পথভ্রষ্ট করে। তার বুদ্ধি শুনে খলিফা মনে করেন হালাকু খানকে উপহার দিয়ে এযাত্রা রুখে দেয়া সম্ভব হবে। শেষ পর্যন্ত ১০০০ আরবি ঘোড়া, ১০০০ উট, ১০০০ গাধা এবং ১০০০ খচ্চরের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ রতœ সামগ্রী হালাকু খানের দরবারে প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এদিকে হালাকুর নামে স্মারক মুদ্রা জারির প্রস্তাবের পাশাপাশি অনেকের মতে খুতবায় পর্যন্ত হালাকু খানের স্তুতি প্রকাশের মতো হঠকারি প্রস্তাবও খলিফার পক্ষ থেকে প্রেরণ করা হয়েছিল তখন।
যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার বদলে বারংবার শান্তি প্রস্তাব পাঠানোর ব্যাপারটা বিজ্ঞ সভাসদদের কেউ মেনে নিতে পারেননি। বিশেষ করে এক সময়ের চরম বিশ্বস্ত আইবেগ দরবার থেকে ক্ষিপ্ত হয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বললেন একমাত্র মহান আল্লাহর দয়া বাদে বাগদাদের মানুষের রক্ষা পাওয়ার আর কোনও পথ খোলা নেই। যেখানে শক্তিশালী আব্বাসীয় সেনাবাহিনী তাদের গর্ব হতে পারত সেখানে তাদের খর্ব করে ফেলার মধ্য দিয়ে মেরুদ- ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে খিলাফতের। এখন এই মৃতপ্রায় খিলাফতের মৃত্যুঘণ্টা বেজে গেছে, অপেক্ষা শুধু মহাপ্রলয়ের। এতদিন নাচ-গান, কবিতা আর ভোগ আহলাদের মধ্যে থেকে খলিফার কাঁধে যে অক্ষমতা সওয়ার হয়েছে এখনকার নটাঙ্কিপনা শুধুমাত্র তার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। দিনের পর দিন অলস ভুরিভোজের পাশাপাশি সঙ্গীতে মেতে থাকা দরবারের লোকগুলো যেদিন থেকে সেনাবাহিনীকে গুরুত্বহীন করেছে সেদিন থেকেই পতন আসন্ন হয়েছিল খলিফার।
(Visited 67 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *