বাঙালির শর্টকোর্সপ্রীতি এবং দীর্ঘমেয়াদের দুর্ভাবনা

শর্টকোর্স হচ্ছে বাঙালির সত্যিকার হাজার বছরের ঐতিহ্য। মীরজাফর শর্টকোর্সে বাংলার নবাব হতে চাইছে। এরপর থেকে এই শর্টকোর্স আমাদের পিছু ছাড়ছে না। ভাবা যায় রান্নাবান্না, ইংরেজি ভাষা শিক্ষা, ড্রাইভিং, ফ্রি-ল্যান্সিং, সাইক্লিং, স্কিপিং, সার্ফিং, ক্রিকেট, ফুটবল, বাস্কেটবল, ফটোশপ, ইলাস্ট্রেটর, জিআইএস, ভিজ্যুয়াল বেসিক্স, ওয়ার্ড, এক্সেল, ওয়েব ডিজাইন কিংবা বিগডাটা পাইথন সবকিছুরই এদেশে শর্টকোর্স আছে। ফলে জানাজার মাধ্যমে করোনা আক্রান্ত হয়ে জান্নাতে যাওয়ার শর্টকাট খোঁজা মানুষগুলোকে অহেতুক দোষ দিয়ে কি লাভ? উনারা কেউই তো আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যের বাইরে নয়। করোনা দুর্যোগের দিনে মাওলানা যুবায়েরের জানাজায় যারা ঝাঁকে ঝাঁকে পালে শরিক হয়েছেন তাদের অনেকে এটাকে জান্নাতে যাওয়ার শর্টকোর্স হিসেবে মনে করছেন। ভাগ্যে থাকলে উনারা হয়তো জান্নাতে যেতে পারবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে উনারা জান্নাতে যাওয়ার আগে সঙ্গে আরও অনেক মানুষকে টান দিয়ে দুনিয়ার ওপারে নিয়ে যাচ্ছেন যারা জান্নাত না জাহান্নাম কোথায় যাবে সেটা নিয়ে এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। 

বছর চারেক আগের কথা। একটা তামিল মুভি দেখছিলাম অনেক মন দিয়ে। সেখানে জনৈক শিক্ষক তার ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলছিলেন তোমরা সবাই বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখো, কিন্তু আশেপাশে এমন ছোটখাট অনেক কাজ আছে যেগুলো সব বড় কাজকে ছাপিয়ে আরও বড় হয়ে উঠতে পারে। একজন ছাত্র জানতে চাইলো স্যার এমন ছোট ছোট কি কাজ হতে পারে যা বড় কাজকে ছাপিয়ে উঠতে পারে। ঐ শিক্ষক তাকে বলেছিলেন বাবা তুমি তোমার চারপাশে খুঁজে নাও, মানুষের উপকার হয় এমন ছোট একটা কাজ দিয়েই শুরু করো। তোমার কাজ যদি ধারাবাহিক হয় তবে দেখবা একদিন পরিবর্তন আসবেই।

সেদিন অনেক চিন্তা করে একটা কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তারপর বেছে বেছে আরও দুটি কাজ মিলিয়ে মোট তিনটা কাজ শুরু করেছিলাম। এগুলো বেশ ছোট তবে আমার আশেপাশের পরিমণ্ডলে অনেক বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছে গত কয়েক বছরে। কিছুই না শুধুমাত্র হাউকাউয়ের মধ্য দিয়ে এটা করা সম্ভব হয়েছে। এর জন্য এলাকার বড় নেতা হওয়া লাগেনি কিন্তু হাতুড়ি হাতে নিয়ে কারো মেরুদণ্ড ভাঙ্গা লাগেনি। ধারাবাহিকভাবে বলতে গেলে…
— এক. পলিথিন বর্জন করা।
— দুই. খাবার টেবিলে ময়লা না ফেলা।
— তিন. যানজটের মধ্যে নেমে ট্রাফিক পুলিশকে হেল্প করা।

আমি বাজার থেকে যাই কিনি প্রয়োজনে হাতে করে নিয়ে যাই কিন্তু পলিথিন নিতাম না। এতে প্রথম প্রথম দোকানদারেরা হাসাহাসি করতো। পরে তারা অভ্যস্থ হয়ে যায় এমনকি আমার এই উদ্যোগকে তারা বেশ সম্মানের চোখে দেখতে শুরু করে গত বছরখানেক থেকে। আমার দেখাদেখি বাসার আশেপাশের পিচ্চিকাচ্চারা অনেকেই এই কাজ শুরু করে দেয়। কয়েকজন পলিথিন ব্যবহার করে না এই কথা খুব আগ্রহ নিয়ে বলতেও আসে আমার কাছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলেও সত্য যে আমি তাদের অনেককেই চিনি না। কিন্তু তারা এগিয়ে আসে, অমায়িক সুন্দর আগ্রহ নিয়ে পিচ্চিরা সালাম দেয়। তারপর বলে ভাইয়া/আংকেল/স্যার আমিও আপনার মত পলিথিনে কিছু নেই না।

বড় সফলতার গল্পটা লেখা যায় আজ সন্ধ্যার ঘটনা থেকে। চাচার অনেক পছন্দের ফল জাম্বুরা। বাজার থেকে দুটো জাম্বুরা কেনার পর ফলওয়ালা সেটা পলিথিনের ব্যাগে দিতে চেষ্টা করে। পাশ থেকে আরেক ফলওয়ালা রীতিমত হুঙ্কার দিয়ে ওঠে, বলে জানিস না স্যার পলিথিনে কিছু কিনে না। সেই সঙ্গে সে একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে এগিয়ে আসে। বলে স্যার এই ব্যাগে নিয়ে যান, আপনি প্রয়োজন হলে বাসায় রেখে দিবেন। আর যদি অপ্রয়োজনীয় মনে হয় আগামী দিন এসে আমাকে ফেরত দিয়েন। আপনার এই কাণ্ড থেকে নিজেও ভাবছিলাম অনেক, বাসায় গিয়ে ছেলেমেয়েদের সঙ্গেও আলোচনা করেছি। পরে ভাবলাম এই যে একটু বৃষ্টি হলেও রাস্তায় ময়লা পানি জমে, আমাদের সবার এতো কষ্ট হয় এর অনেকটাই এই পলিথিনের জন্য। এরপর থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি পলিথিনে আর কিছু বিক্রি করবো না। তারপর দেখেন স্যার আমি বুঝিয়েছি, আমার কথা শুনে ইদ্রিস, শ্যামল, লোকমান আর বিজয় ওরাও পলিথিনের বদলে কাগজের ঠোঙ্গায় ফল বিক্রি শুরু করেছে। কিন্তু এই শ্লা ফরিদ ব্যাটা বরিশাইল্যা সে কারো কথা শুনে না।

তখনও শিক্ষক হিসেবে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করতে পারিনি। বণিক বার্তায় সম্পাদকীয় বিভাগে চাকরি করি। একদিন লাঞ্চে গিয়েছিলাম কারওয়ানবাজারের স্টার কাবাবে। নিজে থেকে উচ্ছিষ্ট ফেলার জন্য ছোট্ট একটা বাটি চেয়ে নিলাম। তারপর খাওয়া শেষে টেবিলে পড়া অল্প একটু মাংসের ঝোল টিস্যু দিয়ে মুছে প্লেটটা টান দিয়ে সাইডে রাখলাম। পাশের টেবিল থেকে জনৈক ভদ্রলোক (?) কটাক্ষ করে বললেন, ‘দেখছেন কত্তবড় বোকা োদা নিজে টাকা দিয়ে খায় আবার টেবিল পরিষ্কার করছে’। আমি উঠে গিয়ে ঐ লোকরে চরম বেইজ্জতি করছিলাম সেদিন। তারপর সুন্দরভাবে ক্ষমা চেয়ে বুঝিয়ে শুনিয়ে উঠে এসেছিলাম। অদ্ভুত ব্যাপার হলেও সত্য ঐ ভদ্রলোকের সঙ্গে আরেকটা রেস্টুরেন্টে দেখা হয়েছিলো। তিনি স্ব-পরিবারে খেতে এসেছিলেন সন্ধ্যার দিকে। আমি সেখানে এসেছি কিনা সেটা উনি খেয়াল করেন নাই। কিন্তু খাওয়ার সময় সতর্কভাবে সব ময়লা আলাদা একটা বাটিতেই রাখছিলেন। আর খাওয়া শেষে আমার মত একইভাবে হাতমোছা টিস্যুটা দিয়ে দ্বিতীয় দফায় টেবিল মুছে তারপর সেটা প্লেটে ফেললেন। সত্যি বলতে এই দৃশ্য দেখার ভালোলাগা আজীবন ভুলবার নয়।

গলিপথে রিকশায় চড়ে যেতে গেলে যেকোনো সময় জ্যামে পড়তে হয়। একটা সময় অলস বসে থাকতাম। পরে বিরক্ত বিব্রত হয়ে নেমে পড়তে শুরু করি। তারপর মোড়ে গিয়ে চিল্লাচিল্লি শুরু করতাম। সেখানে সামনে দাড়িয়ে একপাশের যানবাহন আটকে অন্যপাশ ফাঁকা করার দায়িত্ব গায়ে পড়ে পালন করতাম। একটা পর্যায় দেখি খুব অল্প সময়েই রাস্তা ফাঁকা হয়ে যেত। আর অবাক বিষয় হচ্ছে দুই এটা প্রাইভেটকারের মালিক বেজন্মা বাদে প্রায় প্রত্যেকেই এই সময় যা বলা হয় সব কথা মেনে চলে। তবে এভাবে রাস্তায় নেমে পড়ার পর অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বেশকিছু সাঙ্গপাঙ্গ জুটে যায় প্রায় প্রতিটিবার। আমার পাশাপাশি এইসব অচেনা সহকর্মীদের দাপটে তারাও কিছু বলার সাহস পায় না। আমি নিজেও বিশ্বাস করি এটা কোনো সমাধান নয়, তবে বিপর্যয় এড়াতে আমরা একটু আগ্রহী হয়ে ট্রাফিক পুলিশের পাশে দাঁড়াতে পারি। তাতে তারাও যেমন ভরসা পায়, অন্যদিকে আইন ভঙ্গকারি লোকগুলো অন্তত লজ্জা পেয়ে হলেও সুপথে ফিরতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা আমরা সবাই তো বদল চাই, বড় বড় বদল যদি নাই পারি একটু ছোট কাজ দিয়েই শুরুটা হোক না।

অনেকে মনে করবেন এভাবে শুরু করে বিশাল কিছু করে ফেলেছি। আমি ঘোড়ার ডিমটাও করতে পারিনি। বরঞ্চ গাজীপুর যাওয়ার পর আমি নিজেই বাধ্য হয়ে এখন পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার করি। অন্তত বড় একটা ডাস্টবিনের পলিথিন ব্যবহার করা লাগে। তবে সতর্কতার সঙ্গে রাত বারোটার পর যখন সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বাজারের আবর্জনা পরিষ্কার করতে আসে তাদের হাতে দিয়ে আসি। এর পেছনে অবশ্য অন্য উদ্দেশ্য আছে, আমি দেখার চেষ্টা করি পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জীবনের কঠিনতম বাস্তবতাগুলো।অনেকে মনে করতে পারে মাস্টার মানুষ টেকাটুকা নাই, তাই ময়লা ফেলার ৮০ টাকা বাঁচাচ্ছে। আদতে ঐ সময় সময় ময়লা ফেলতে গিয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের  যে টাকার মুড়ি-চানাচুর আর চা খাওয়াাইছি তা দিয়ে তিন-চার মাসের বিল হয়ে উল্টে যায়। একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী তো প্রায় রোজ বলে ‘স্যার আপনার আসতে হবে না আমি বারোটার দিকেই যাবো, আপনি ময়লা আমার কাছে দিয়ে দিয়েন গাড়িতে করে নিয়ে আসব’।

কোনো সিস্টেম বদলাতে গেলে আগে বদলাতে হয় নিজেকে। কিন্তু সিস্টেমের মধ্যে যে ফাঁকফোকর আগে সেগুলো গলে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টার বিকল্প থাকে না। রাতভর পড়ালেখা করে আমার ঘুমাতে বেশিরভাগ দিন ফজর হয়ে যায়। ফলে সাত সকালে যখন আবর্জনা নিতে আসে তখন আমি গভীর ঘুমে থাকি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো কাজ থাকলে বেরিয়ে যাই। ফলে বাধ্য হয়েই আমার শর্টকাট রাস্তা খুঁজতে হয়। সত্যি বলতে কিছু কিছু শর্টকাট রাস্তার কাজেও অনেক দীর্ঘমেয়াদী সুফলের সুযোগ থাকে। কিন্তু আমরা কি সেগুলো খোঁজার চেষ্টা করি? মনে হয় মাঝে মাঝে করি, কিন্তু সেটার পরিমাাণ এতোই কম যে দীর্ঘমেয়াদের দুর্ভাবনায় শুধু দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। আর আমাদের আশার প্রদীপের দীপশিখা ক্রমশ ফিকে থেকে ঢিমে তালে হারিয়ে যাচ্ছে।

(Visited 23 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *