মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি এলে পুরো জাতি নতুন করে ভাবার অবকাশ পায় নিজেকে, নিজের চারপাশ আর মুখের ভাষা নিয়ে। এ সময়টাতেই তাই গাড়ির নেমপ্লেট ইংরেজি থেকে বদলে বাংলা করার চেষ্টা করেন কেউ কেউ, রাস্তার পাশের দোকানপাটের ইংরেজি সাইনবোর্ড সরানোর চেষ্টাও করা হয় কোথাও কোথাও। অনেকে খুঁজে দেখেন কোথায় মাতৃভাষার ভুল বানান রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বেশ জোরালো হচ্ছে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের বিষয়টি। বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় দৈনিক সম্প্রতি তাদের প্রথম পাতায় বিশেষ প্রতিবেদন করেছে মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষার সংকট নিয়ে। এখানে উচ্চশিক্ষায় ব্যবহার উপযোগী বাংলা পাঠ্য বইয়ের সংকট তীব্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে- ‘জানা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো কিছু বিষয়ে বাজারে যৎসামান্য বাংলা বইয়ের হদিস মেলে। তবে মেডিকেল কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের পুরোপুরিই ইংরেজি বইয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। আর সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন নতুন বিষয়ের শিক্ষার্থীদের কাছেও ইংরেজি বইয়ের বিকল্প তৈরি হয়নি।’ এই প্রতিবেদন তৈরির সময় প্রতিবেদক হয়তো কলা ও মানবিক অনুষদের বিষয়টি আমলে নিতে পারেননি। প্রতিবেদনটিতে মানদণ্ড হিসেব ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক অনুষদের বইগুলোকে। সরাসরি ই-বুক কিংবা পাইরেসি হয়ে আসা বইগুলো বাংলাদেশের বাজারে সহজলভ্য বলে অনেকে এই বিষয়গুলোতে ইংরেজি বইয়ের বিকল্প খোঁজার চেষ্টাও তেমন করেনি। অন্যদিকে ইংরেজি থেকে সরাসরি লিখে দেয়ার সুযোগ থাকায় অনেকে মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের কথা চিন্তা করছেন না। তবে বিজ্ঞানভিত্তিক বইগুলো শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন সামনে রেখে সেভাবে বাংলায় অনূদিত হয়নি বলে সেখানেও এক রকম সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বেশিরভাগ শিক্ষার্থী পড়ালেখা করেন মাতৃভাষা বাংলায়। স্কুলজীবন থেকে শুরু করে কলেজ তথা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত তাদের শিক্ষার মাধ্যম থাকে সহজ, সরল ও সাবলীল। কিন্তু এ শিক্ষার্থীরা যখন উচ্চশিক্ষায় আসেন তখন বাংলা ভাষায় রচিত বই নিয়ে চরম সংকটে পড়তে হয় তাদের। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মূলত দুই ধরনের সংকটের মুখে পড়তে হয়। বাংলাদেশে বাংলা মাধ্যমের পাশাপাশি ইংরেজি মাধ্যমে অনেক প্রতিষ্ঠান মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠ দান করে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল পাস করার পর শিক্ষার্থীরা আরেকটি বড় রকমের সংকটের মুখে পড়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভর্তি পদ্ধতির কারণে। বেশিরভাগ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন- বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ কিংবা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে থাকে বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে। সেখানে ভর্তি পরীক্ষায় যে ধরনের প্রশ্ন করা হয় তাতে বাংলা সাহিত্য থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক নানা বিষয়ের আধিপত্য লক্ষ করা যায়। এই বিষয়গুলো ইংরেজি মাধ্যমে পাস করা শিক্ষার্থীদের পাঠক্রমে সেভাবে যুক্ত না থাকায় ভর্তি পরীক্ষায় নানারকম সমস্যার মুখে পড়তে হয় তাদের। বিশেষ করে কলা ও মানবিক অনুষদের বিভিন্ন বিষয়ে সাধারণ এবং বাংলা থেকে যে প্রশ্নগুলো থাকে এর বেশিরভাগ উত্তর দেয়ার সুযোগ থাকে না তাদের। এর ফলে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা থেকে ছিটকে পড়ে। বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে দুর্বলতা থাকলেও তারা অন্য বিষয়গুলোতে নিজ আগ্রহ, দক্ষতা ও আন্তরিকতার চিহ্ন রেখে বিভিন্ন পরীক্ষার বৈতরণী পার হয়ে যেতে পারে। ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা একমাত্র ইংরেজি ভাষাটুকু কোনোক্রমে শিখতে পারলেও ইংরেজি সাহিত্য সম্পর্কেও তেমন জ্ঞানলাভের সুযোগ পায় না। এমনি বিষয়গুলোকে আমলে নিলে সমস্যাটা অনেকাংশে দ্বিমুখী রূপ ধারণ করে।

প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী যখন মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ শেষ করে, ফলাফল প্রকাশের দিন সবাই চরম উচ্ছ্বসিত থাকলেও ততধিক অনিশ্চয়তায় আরেকটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসতে দেখা যায়। এই অশ্চিয়তা এবং প্রশ্নটি- ‘এরা কোথায় যাবে?’। প্রতিবছর উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাদের আবেদন করার যোগ্যতা আছে তারা প্রায় সবাই প্রথমবারের মতো হুমড়ি খেয়ে পড়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দোরগোড়ায়। সেখানকার ভর্তি পরীক্ষার কষ্টসাধ্য প্রায় অসাধ্য দুর্গম পথে হেঁটে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভর্তি পরীক্ষায় কেউ কেউ টিকেও যায়। এখান থেকে যারা বাদ পড়ে তারা অর্থবিত্তের বিচারে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। যাদের অভিভাবকের প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থকড়ি আছে তারা গিয়ে ভর্তি হয় বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর বাইরে বাকিদের পথ চলতে হয় ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ অধিভুক্ত কলেজগুলোর সঙ্গে। পাবলিক থেকে শুরু করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ প্রতিটি ক্ষেত্রে ভাষাকেন্দ্রিক একটি জটিলতা দেখা যায়। বিশেষ করে স্কুল-কলেজে বাংলায় পড়ালেখা করা ছেলেমেয়েরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ বিষয় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি বিষয় ইংরেজিতে পড়তে বাধ্য হয়। কেউ কেউ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারলেও শেষ পর্যন্ত অকূল পাথারে পড়তে হয় বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকে। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আবার ইংরেজিকে বাড়াবাড়ির পর্যায়ে নিয়ে যায়। সেখানে ওইসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দুর্বল শব্দভাণ্ডার এবং কষ্ট করে ইংরেজদের মতো উচ্চারণের চেষ্টা অনেকের জন্য হাস্যরসের খোরাক হয়ে পড়ে। তাদের অবস্থা শেষ পর্যন্ত হয় ‘স্কুল মাস্টার কা কুত্তা, না ঘার কা, না স্কুল কা’। অর্থাৎ এরা না শিখতে পারে ইংরেজি ভাষা, না শেখা হয় বৈষয়িক পাঠ। ফলে প্রাকৃতিক নিয়মে মুখস্থবিদ্যার ওপর ভর করে একটা সময় স্নাতক-স্নাতকোত্তরের সনদ হাতে বের হলেও এদের চোখের জল-নাকের জলে এক হতে হয়। অন্তত কথিত চাকরির বাজারে একের পর এক মর্যাদা লুণ্ঠিত হওয়ার পর জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা চলে আসে অনেকের।

আপাতদৃষ্টিতে মাতৃভাষা বাংলায় উচ্চশিক্ষার গ্রন্থ প্রণয়ন অনেকে কঠিন বলে মনে করেন। তবে বাস্তবে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে সেগুলো প্রমাণ করেছে মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষা বেশ কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। যেমন, মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কথা বলতে গেলে একটি নাম সমার্থক হয়ে গেছে, তিনি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। আমরা যারা ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব কিংবা ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির শিক্ষার্থী তারা চোখ বন্ধ করে আবদুল করিম স্যারের বাংলার ইতিহাস (সুলতানি ও মোগল আমল) কিংবা একেএম শাহনাওয়াজ স্যারের বিশ্ব সভ্যতা, ইতিহাস ও ঐতিহাসিক, ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসের কথা বলতে পারি। অধ্যাপক সৈয়দ মাহমুদুল হাসান, এবিএম হোসেন কিংবা অধ্যাপক একেএম ইয়াকুব আলীর বইগুলো পড়লে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা শিক্ষার্থীদের আর কোনো বই হাতে না নিলেও চলে। আমরা ওপরে বর্ণিত নন্দিত লেখক এবং শিক্ষকদের বাইরে আরও অন্তত কয়েক ডজন নাম উল্লেখ করতে পারি যারা উচ্চশিক্ষাকে মাতৃভাষায় প্রদানের জন্য অবারিত করেছেন। তবে অনেকে অবাক হয়ে বলবেন, শুধুই কি কলা ও মানবিক বিষয়ের শিক্ষকরা এদিক থেকে এগিয়ে গেছেন? উত্তরটা হ্যাঁসূচক হলেও রয়েছে কিছু ব্যতিক্রম। যেমন বিজ্ঞান লেখক ও বুয়েটের তড়িৎকৌশলের শিক্ষক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী মার্কিন মুলুকের নামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করার পরেও চেষ্টা করে যাচ্ছেন নতুন প্রজন্মকে মাতৃভাষা বাংলায় বিজ্ঞান শেখাতে। উচ্চশিক্ষায় যদি বাংলা ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করা যায় তবে দেশজুড়ে হয়তো ফারসীমের মতো আরও অনেক শিক্ষক বেরিয়ে আসবেন যারা স্ব স্ব বিষয়ে বাংলা গ্রন্থ প্রণয়ন করতে পারেন। সুতরাং শুধু আবেগ এবং আন্দোলন নয়, আমাদের সামনে থাকা উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিতে হবে। পাশাপাশি বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে অবারিত করতে হবে। তবেই স্লোগানে কিংবা গানে গানে নয়, কাজের ক্ষেত্রেও বাংলাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা সম্ভব হবে।

(Visited 108 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *