যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ানমার নীতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা

সামরিক সরকার ক্ষমতা আঁকড়ে থাকায় দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা, গণতন্ত্রের অপমৃত্যু, রোহিঙ্গা আদিবাসীদের নির্বিচারে হত্যা, এমনকি নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া আর পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান— এ বিষয়গুলো পর পর বলতে থাকলে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের মানুষ বুঝে নিতে পারবে আলোচনা করা হচ্ছে মিয়ানমার নিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতির যে অবনমন ঘটেছে, অনেক ক্ষেত্রে তা গাজা উপত্যকা, নাইজেরিয়া কিংবা সুদানের শরণার্থী শিবিরগুলোর সঙ্গে তুলনীয়। পার্শ্ববর্তী দেশের আক্রমণে ওই দেশগুলোয় মানবাধিকার পরিস্থতির অবনমন ঘটলেও মিয়ানমারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশটির সামরিক সরকার শুধু গণতান্ত্রিক সরকার পদ্ধতি বিনষ্ট করেই ক্ষান্ত হয়নি, উপরন্তু মৌলবাদী বৌদ্ধদের উসকানিতে প্ররোচিত হয়ে লিপ্ত হয়েছে নির্বিচার গণহত্যায়।

মিয়ানমারের এ সংঘাতময় পরিস্থিতি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর নিরাপত্তাও বিঘ্নিত করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্ব পাচ্ছে দেশটির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি। এমন এক অচলাবস্থার মধ্যে মিয়ানমার সফর করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। আসিয়ান দেশগুলোর পূর্ব-এশীয় সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি মিয়ানমারে আসেন। বিশ্বের সর্ববৃহত্ অর্থনীতির দেশ হিসেবে চীনের উত্থান-পরবর্তীকালে পূর্ব-এশিয়ার দেশগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কংগ্রেসের ইউটোপীয় সমাজতান্ত্রিক ধারা টপকে গিয়ে নরেন্দ্র মোদির নিওলিবারেল ভারতের চিন্তা এখন বহুমুখী। আর তাদের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় উদ্ভূত ঘটনাপ্রবাহের বাইরে নয় আমাদের বাংলাদেশও। তাই বারাক ওবামার এবারের মিয়ানমার সফর বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ বৈদেশিক নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক দিনগুলোয় রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ড এবং বাংলাদেশে পুশইনের ঘটনা এর পর কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।

বারাক ওবামা মিয়ানমারে অবস্থানকালে দেশটির অভ্যন্তরীণ নীতির সমালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। বিভিন্ন দিক থেকে বিচার করলে তা মিয়ানমারের সামরিক জান্তা কিংবা উগ্র মৌলবাদী বৌদ্ধ সম্প্রদায় কারো জন্যই ইতিবাচক নয়। উপরন্তু এর মাধ্যমে মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে অনেক চাপের মুখেই পড়তে হয়েছে। বারাক ওবামা তার এবারের সফরে প্রথমত বিরোধী নেতা নোবেল বিজয়ী অং সান সু চির নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণে চাপ দিয়েছেন। এবং রোহিঙ্গাদের ওপর আক্রমণ বন্ধ করে তাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিতে জোর তাগিদ দিয়েছেন মিয়ানমার সরকারকে। এদিক থেকে দেখলে রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ড ও গণতন্ত্র বিনষ্টকারী মিয়ানমার সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সমর্থন দেয়া হয়নি। বিশেষ করে নৈতিক অবস্থানে চীনের সঙ্গে অতিরিক্ত সখ্য হেতু মিয়ানমার নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত মেলে।

২০১৬ নাগাদ মিয়ানমারে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। এর আগে অং সান সুু চি রাষ্ট্রীয়ভাবে বিরোধী দলের নেতা পর্যন্ত নন। ফলে বাইরের দেশের কোনো নেতা দেশটি সফরে এলে তিনি কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে পড়েন না। তবু বারাক ওবামা মিয়ানমার সফরে এসে সৌজন্য সাক্ষাতের উদ্দেশে অং সান সু চির বাসায় গেছেন। সবচেয়ে অবাক বিষয়, সেখানে বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলন পর্যন্ত করেছেন। এর থেকে মিয়ানমারের বর্তমান সামরিক সরকারের অতিরিক্ত চীন প্রীতি এবং গণতন্ত্রবিমুখতাকে যুক্তরাষ্ট্র যে সমর্থন করে না, তা স্পষ্ট হয়েছে। তারা সংবিধানের ধুয়ো তুলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি করেছে। তারা বলতে চাইছে, সংবিধানের ৫৮(এফ) ধারা অনুযায়ী সন্তান বা স্বামী-স্ত্রী বিদেশী নাগরিক হলে তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট পদের জন্য অযোগ্য। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ঘোর আপত্তি জানিয়েছে।

সু চির বিষয়টি চিন্তায় স্থান দিয়ে করা এ সংবিধানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অনাস্থার কথাটি স্পষ্ট করেছেন ওবামা। বিশেষ করে বলে রাখা ভালো, অং সান সু চির স্বামী যেমন ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক, তেমনি তার ছেলেও। মৃত স্বামীর কথা বাদ দিলেও শুধু ছেলের নাগরিকত্বের কারণে আগামী নির্বাচনে সু চির অংশগ্রহণ হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত। বিশেষ করে বর্তমান সংবিধান অক্ষুণ্ন থাকলে এবারের নির্বাচনেও প্রার্থী হতে পারবেন না সু চি। আর সেটাকে যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই সমর্থন করবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ওবামা। এবারের মিয়ানমার সফরে আইনটির কঠোর সমালোচনা করে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংস্কার জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, শুধু একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সবার প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন হলে যুক্তরাষ্ট্রকে তারা বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে সঙ্গে পাবে। দেশটির উদ্দেশ্যমূলকভাবে রচিত সংবিধান পরিবর্তনে বিরোধী নেতা অং সান সু চির আন্দোলনেও নৈতিক সমর্থন দিয়েছেন ওবামা।

রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ড, বৌদ্ধ মৌলবাদ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থেকে শুরু করে নোবেলজয়ী সু চির ভবিষ্যত্ নিয়ে দীর্ঘদিন থেকেই উদ্বিগ্ন বিশ্বনেতারা। এবারের সফরে তাদের সঙ্গে একাত্ম হলেন মার্কিন নেতা বারাক ওবামা। বলতে গেলে মিয়ানমার ইস্যুতে তিনি অনেক স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন অন্য যে কোনো দেশের রাজনৈতিক নেতাদের তুলনায়। তিনি বক্তব্যের মাধ্যমে মিয়ানমার ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান কী, তা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে সু চির সঙ্গে বৈঠকের পর ওবামা বলেন, কারো সন্তানের নাগরিকত্ব কোনোভাবেই তার রাজনৈতিক ভবিষ্যেক প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে না। এক্ষেত্রে মিয়ানমারের সামরিক সরকার যে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে, তা নিতান্তই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, দমনমূলক ও নৈতিকতা বিবর্জিত। তিনি এ সংকট আশু উত্তরণের প্রয়োজনে সংবিধান পর্যন্ত সংশোধনের পক্ষপাতী। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো, অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) ১৯৯০ সালের নির্বাচনে বড় জয় পায়। তবে সামরিক সরকার সেবার তাদের ক্ষমতায় যেতে দেয়নি। ফলে এবারে অনাগত নির্বাচনের ভবিষ্যত্ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।

প্রথমত. সামরিক সরকার সু চিকে নানা কৌশল অবলম্বন করে নির্বাচনের বাইরে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে। এক্ষেত্রে তারা যদি সফল হতে পারে তাহলে মিয়ানমারের গণতন্ত্র এবং সু চির রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ দুটোতেই ঘোর অন্ধকার। তবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ পেতে চলমান সংবিধানের ধারা সংশোধনে যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সু চি, সেখানে বৈদেশিক প্রভাবে সফল হলেও হতে পারেন। তবে মিয়ানমারের বর্তমান পক্ষপাতদুষ্ট, অনৈতিক ও অগণতান্ত্রিক সরকারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠেয় নির্বাচন নিয়ে তেমন আশার আলো দেখছেন না আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকরা। জনসমর্থন নিয়ে সু চি যদিও ক্ষমতার দৌড়ে উতরে যান, সেক্ষেত্রে ১৯৯০-এর মতো সামরিক প্রতিবন্ধকতা উপস্থিত হবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? তবে বিশ্বনেতারা চাইছেন আগামী নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন ইস্যুতে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার ওপর চাপ প্রয়োগের নীতি অনুসরণ করতে।

মিয়ানমারের বর্তমান সামরিক জান্তা বৌদ্ধ মৌলবাদের পক্ষাবলম্বন করতে গিয়ে রোহিঙ্গা আদিবাসীদের ওপর নির্যাতন ও বর্বরতার যে নজির স্থাপন করেছে, তা বিশ্বব্যাপী ঘৃণা ও ধিক্কারের জন্ম দিয়েছে। নোবেলজয়ী রাজনৈতিক নেত্রী সু চি নির্বাচন সামনে রেখে এ ইস্যুতে সামরিক জান্তার ওপর বড় আঘাত হানতে চাইছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন পাওয়ার পর সু চি মিয়ানমারে শান্তি ফিরিয়ে আনতে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে সু চি রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নাগরিকত্ব দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘ বিরতিতে হলেও সেখানকার মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনেরও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন তিনি।

দীর্ঘদিন থেকে আদিবাসী রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নির্মূল অভিযান চালিয়ে আসছে মিয়ানমার সরকার। ২০১২ সালে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চরম দমননীতি চালালেও পশ্চিমা বিশ্ব নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু এবার বারাক ওবামার সফরের পর থেকে পরিস্থিতি পাল্টে সুবাতাস বইতে শুরু করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে এ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণ হোক আর না-ই হোক, অন্তত অং সান সু চির রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ নিয়ে চিন্তিত যুক্তরাষ্ট্র। এক্ষেত্রে নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী হতে পারে নির্বাচনে জয়ের ক্ষেত্রে সু চির তুরুপের তাস। আর কিছু না হোক, অন্তত এ কারণে পশ্চিমা বিশ্ব রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার সুরে সুর মেলাবে, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এদিকে সু চির আসন্ন নির্বাচন প্রস্তুতিতে সামরিক জান্তার ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে রোহিঙ্গা ইস্যু আরো সামনে আসবে বলেই অনুমান করছেন বিশ্লেষকরা।

পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, মিয়ানমারের এক রাখাইন রাজ্যেই বাস করছে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা আদিবাসী। মিয়ানমার সরকার দীর্ঘদিন ধরে তাদের নাগরিক বলে অস্বীকার করার পাশাপাশি এবারের আদমশুমারিতে পর্যন্ত ঠাঁই দেয়নি। ফলে যে কোনো দিক থেকে সুযোগ এলে লুফে নেয়ার জন্য প্রস্তুত তারা। এক্ষেত্রে তাদের দুর্বলতার সুযোগ নিতে চাইবেন সু চি। সামরিক জান্তার চাপে তিনি নিজেও খুব একটা ভালো নেই। এ অবস্থায় পশ্চিমা বিশ্বের চাপে সু চির দাবিতে একাত্ম হয়ে সামরিক সরকার যদি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়, সেটা আশার কথা। অন্তত সু চি ক্ষমতায় আসার চেষ্টায় জাতিগত নির্মূলাভিযানের বিরুদ্ধে যদি অবস্থান নেন, সেটাও অনেক আশার কথা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য। এখন বিশ্ববাসীর দৃষ্টি মিয়ানমারের নির্বাচনপূর্ব রাজনীতির দিকে। বিশেষ করে এ নির্বাচন উপলক্ষেও যদি রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরিয়ে দেয় সামরিক জান্তা, তাতে দীর্ঘদিনের অশান্তি ও অনিশ্চয়তার অবসান হবে। কিন্তু এগুলো নিতান্তই অনুমান আর বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। এক্ষেত্রে মিয়ানমারের রাজনীতি কিংবা রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যত্ নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট মন্তব্য করতে এখনো অপেক্ষা করতে হবে অনেক দিন।

(Visited 20 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *