সাব্বা তাহিরের ‘অ্যান অ্যাম্বার ইন দ্য অ্যাশেজ’

লেখক-লেখিকার মনস্তত্ত্বের প্রাথমিক প্রতিফলন লক্ষ করা যায় তাদের একেবারে গোড়ার দিকের রচনায়। আর শুরুর উপন্যাস হিসেবে ‘অ্যান অ্যাম্বার ইন দ্য অ্যাশেজ’ লেখিকা সাব্বা তাহিরকেও পরিচয় করিয়ে দেয় বৈকি। এখানে লেখিকা দেখিয়েছেন, একটি সমাজ কীভাবে দাসত্বের শেকলে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে। কীভাবে মানুষ সামাজিকতার নামে তার স্বাভাবিক সুকুমার বৃত্তিগুলো হারিয়ে ধীরে ধীরে সমাজের বাতাবরণে এক অসামাজিক কীটতুল্য সত্তায় পরিণত হয়। সমাজ কীভাবে একেকটি আইন তৈরি করে, কীভাবে পথ করে দেয় সে আইন ভেঙে প্রথাবিরোধী কাজে লিপ্ত হতে। তাহির এখানে সামাজিক ভ্রষ্টাচারের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান গ্রহণ না করে দেখাতে চেয়েছেন, সমাজে চলমান নানা বিপত্তিকর পরিস্থিতি কীভাবে মানুষকে জীবনের গতিপথ থেকে ছিটকে দিতে পারে। একটি বিশুদ্ধ ভালোবাসার দাবি কীভাবে আবেগের ব্যর্থ প্রতিফল আর নিয়তির করুণার সামনে খাবি খেয়ে মরে, তিনি এটাও বেশ স্পষ্টভাবেই তুলে ধরেছেন।

  দাসত্ব-নিষ্পেষণের অকথিত কথন সাব্বা তাহিরের ‘অ্যান অ্যাম্বার ইন দ্য অ্যাশেজ’

ভয়াবহ সামাজিক নিয়তির উপস্থাপন করতে গিয়ে এখানে কাহিনীর এক পর্যায়ে এসে দেখা গেছে, অন্যের অপরাধে চোখ উপড়ে ফেলা হচ্ছে নিরপরাধে। এমনকি শাস্তি হিসেবে জ্বলন্ত অঙ্গারে হাত ঝলসে দেয়া থেকে শুরু করে বুকের ওপর স্বাক্ষর করার মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটছে। এমনকি শিক্ষার্থীদের শায়েস্তা করার জন্য উপর্যুপরি ধর্ষণের হুমকি পর্যন্ত দিচ্ছে জনৈক ইনস্ট্রাক্টর; যা ঘটছে অনেকটা প্রশাসনের জ্ঞাতসারেই। আর এখানে প্রকৃত অর্থে একটি বিশাল নিপীড়ক সাম্রাজ্যের অন্তস্থিত স্থিরচিত্রের উপস্থাপন করতে দেখা গেছে শৈল্পিক পরিসর থেকে। এখানে মানুষ তার পৈশাচিক মনোবৃত্তির বহিঃপ্রকাশে কীভাবে অন্যের ক্ষতি থেকে উল্লাস করে, কীভাবে অন্যকে বিপদাপন্ন করে আত্মপ্রসাদ লাভ করে, তাও চিত্রিত হয়েছে বিভিন্ন আঙ্গিকে।

তাহিরের কৃতিত্ব তিনি এখানে দেখাতে পেরেছেন, এ অত্যাচারী সাম্রাজ্যের হর্তাকর্তারাও কীভাবে সময়ের গ্রাসে বিপদাপন্ন হতে পারে। দিনের পর দিন নির্যাতনের শিকার হয়ে শিক্ষার্থীদের অনেকেই একটা সময়ে গিয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। শাস্তি থেকে শুরু করে আরো নানা ক্ষেত্রে তাদের ভয়ভীতির বালাই পর্যন্ত থাকছে না। তারা একটা পর্যায়ে এসে শিখছে প্রতিবাদ করতে। আর এ প্রতিবাদ কোনো স্বাভাবিক প্রতিবাদ নয়, সেখানে স্পষ্ট হচ্ছে স্যাডিজম। তারা জীবনের নানা পদে ঠোকর খেতে খেতে একটা পর্যায়ে আত্মপ্রকাশ করছে একেকজন চিহ্নিত সাইকোপ্যাথ হিসেবে আর তাদের সামনে পড়ে ভালোমতো শায়েস্ত হতে হচ্ছে ইনস্ট্রাক্টরদের অনেককে। একটি সফল গ্রন্থ হিসেবে ‘অ্যান অ্যাম্বার ইন দ্য অ্যাশেজ’-এর কৃতিত্ব এখানেই যে, পুরো কাহিনী পড়ে কাউকেই নিরাপদ মনে হয়নি। আর শেষ পর্যন্ত অপকর্মে জড়িত সবাইকে নিজ নিজ কাজের জন্য শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে।

অদ্ভুতুড়ে কাহিনীর মধ্যে ‘অ্যান অ্যাম্বার ইন দ্য অ্যাশেজ’-এ বর্ণিত ভালোবাসার কাহিনীকেও আমার কাছে মনে হয়েছে কেমন যেন উত্কট, আদিভৌতিক ও আজগুবি, যা একটি ত্রিভুজ প্রেমের গল্প। এখানে ইলিয়াসকে দেখা গেছে লাইয়ার প্রেমে পড়তে, যে নিজের সৌন্দর্য নিয়ে ততটা সচেতন নয় বলে প্রেমিকের ধারণা। সব মিলিয়ে ইলিয়াসের ভালোবাসার আকুতি ভাষা পেয়েছে অনেকটা এভাবে, ‘ঞযব রিহফ ঢ়ঁষষং ধঃ যবত্ যধরত্ ধমধরহ, ধহফ ও পধঃপয যবত্ ংপবহঃ— ষরশব ভত্ঁরঃ ধহফ ংঁমধত্.’। ঠিক তার পর আসে কিনান, যার দুর্ধর্ষ আচরণ পুরো কাহিনীকেই পাল্টে দেয় ভিন্ন খাতে। বলতে গেলে লাইয়া আর ইলিয়াসের কাহিনী যেভাবে রোমাঞ্চ আর শিহরণ জাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল, কিনানের আগমন সেখানে যুক্ত করে এক হিংস্র রুক্ষতা।

প্রথম দিকে এক বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে ব্ল্যাকক্লিফ প্রতিষ্ঠা করা হলেও তা কাজ করতে থাকে সম্রাটের বিশেষ বাহিনী তৈরির নিমিত্তে। মাস্ক নামে পরিচিত এ বাহিনী সবসময় একটা রুপালি মাস্ক পরে থাকে। লম্বা সময় ধরে এটা মুখে থাকার কারণে একসময় এটা তাদের চামড়ার সাথে লেগে যায়, যেন এ ধাতুটা তাদের দ্বিতীয় চামড়া। অদ্ভুত বিষয়, ইলিয়াসের মাস্ক তার মুখের চামড়ার সাথে মানায়নি, যদিও আর দু’দিন বাদেই তার শিক্ষালাভ শেষ হবে। বাঁকা চোখে তাকালেও ক্লাসের সেরা ছাত্র ইলিয়াসকে কিছু বলে সাধ্য কার। পাশাপাশি কারো বিশ্বাস করার উপায় নেই, ব্ল্যাকক্লিফের সেরা এ ছাত্র চাইছে এখান থেকে মুক্তি। তার মধ্যে আছে মানবতা, যে কিছুতেই অহেতুক মানবহত্যা মেনে নিতে পারেনি। আর ১৪ বছর ধরে পাওয়া শিক্ষায় তাকে এটাই বোঝানো হয়েছে যে, হত্যা-জিঘাংসাই জীবন, এটাই সর্বজনীন।

পেছনে অগণিত ব্ল্যাকগার্ড ছুটে আসার ভীতির মধ্যেও পালানোর অপেক্ষায় থাকা ইলিয়াস আর সবকিছু হারিয়ে বসা লাইয়ার প্রেম শেষ পর্যন্ত কি পরিণতি পাবে? শেষ পর্যন্ত ইলিয়াস কি পারবে তার ইচ্ছা পূরণ করতে। সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে পাঠককে পড়ে শেষ করতে হবে রুদ্ধশ্বাস কাহিনীর এ উপন্যাস। এদিকে যেদিন ইলিয়াসের ব্ল্যাকক্লিফ ছেড়ে পালানোর কথা, সেদিন সকালেই কেইন জানিয়েছে নতুন সম্রাট নির্বাচনের সময়। এগিয়ে খবর চাউর হয় নতুন সম্রাট তার বাহিনী নিয়ে আসছে ব্ল্যাকক্লিফকে ধ্বংস করতে। এসব কৌতূহলোদ্দীপক কাহিনীতে ভরপুর বইটি আগ্রহী পাঠক পারেন এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করতে। আমার মনে হয়েছে, প্রথম উপন্যাস হলেও সাব্বা তাহিরকে এমন কিছু বলতে চাননি, যা তথ্যের চাপে পাঠকের মাথায় চাপ সৃষ্টি করে, বরং বর্ণনার সরলতা ও প্রাঞ্জল্য বইটিকে করেছে অনন্য।

(Visited 20 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *