সুমন ভাইয়ের হারারি পাঠ

গেলো বছর ম্যানচেস্টার এয়ারপোর্ট এ অপেক্ষা করতেছি বেলফাস্ট এর ফ্লাইট ধরার জন্য। হাতে যেহেতু সময় আছে তাই বই এর দোকানে গিয়ে বই-পত্র হাতাচ্ছি। একটা বই পছন্দ হলো: আমাদের এখানকার নর্থ সী বা উত্তর সাগর কিভাবে ইউরোপের ইতিহাস ও জাতি গঠনে ভূমিকা রেখেছে সেই বিষয়ে লেখা। বইটা নিয়ে দাম চুকাতে যাবো, হটাৎ ‘স্যাপিয়েন্স’ বইটার উপরে নজর গেলো। হাতে নিয়ে পিছনের কভার পড়া শুরু করলাম। তার পরে ভিতরের প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা! ব্যাস! সর্বনাশ হয়ে গেলো! চোখ থেকে সরাতে পারছি না। সহজ ভাষায়, কৌতুকের মাধ্যমে নোয়া হারারি আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ৭০ হাজার বছর আগের মানব-সভ্যতার উন্মেষকালে। ফ্লাইট ডিলে হলে একটা পিজার দোকানে বসে পড়া শুরু করে দিলাম, গোগ্রাসে গিলছি পৃষ্ঠার পরে পৃষ্ঠা। প্লেনে বসে, প্লেন থেকে নেমে বসে, বাস থেকে এসে বাসায় থামাথামি নাই।

কিভাবে আমরা গুহা ছেড়ে, শিকারির জীবন পিছনে ফেলে কৃষিকাজ শুরু করলাম, কৃষিজাত উদ্বৃত্ত আমাদের চিরকালীন ক্ষুধার সমাধান না করে কিভাবে গড়ে তুললো নগর, রাষ্ট্র, রাজনীতি, রাজা, সম্রাট, সাম্রাজ্য।. মানবজীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত সব বিষয়: টাকা পয়সা, অর্থনীতি, যুদ্ধ, ধর্ম, নীতিবোধ, রাজনীতি, সমাজের আকৃতি সংজ্ঞা কিভাবে আবির্ভুত হলো, আস্তে আস্তে বদলে গেলো পৃথিবীর চিত্র। কিসের মোহে আমরা শিকারির সরল নিষ্কন্টক, নির্মোহ জীবন ছেড়ে এই জটিল জীবনের পথে আসলাম, সুখের আশায়, স্বাছন্দের মিথ্যা প্রতিশ্রূতিতে গুহা ছেড়ে নগর প্রতিষ্ঠা করলাম, কিন্তু আদতে সুখ মিললো না! মানুষের সভ্যতার বিরাট ক্যানভাস এই ছোট ৪০০ পাতার বইতে হারারি তুলে এনেছে, তা না পড়লে জীবনের অনেকটাই অপূর্ণ থেকে যেত আমার।

হারারি তরুণ লেকচারার। অক্সফোর্ড এর ইতিহাসের ছাত্র ছিলো। তার পরবর্তী বই কবে বের হবে তার জন্য চাতক পাখির মতন অপেক্ষায় ছিলাম। গত সেপ্টেম্বর এ লন্ডনে গেছি এক কাজে, ফেরার পথে ট্রেন স্টেশন এ দেখি হারারির দ্বিতীয় বই ”হোমো দিউস ” এর বিজ্ঞাপন। গ্যাটউইক এয়ারপোর্ট এর বই এর স্টল থেকে কিনে পড়তে পড়তে লাইন এ এসে দাঁড়িয়েছি, এমন নেশাউদ্ৰেক-কারী। এই বইটি আগের বইয়ের খানিকটা এক্সটেনশন, তবে ফোকাস করেছে আমরা মানুষ কোথায় যাচ্ছি।

এতো যন্ত্রনির্ভরশীলতা আমাদের কে এক যন্ত্র মানবে পরিণত করে ফেলছে? মানবিক অনুভূতি, আবেগ, বিবেক সব গণিতের ফর্মুলাতে ফেলে আমাদের কে কেউ যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে এক অদ্ভুত গন্তব্যে? ছেলেবেলাতে সেবা প্রকাশনীর ক্লাসিক, থ্রিলার, তিন গোয়েন্দা পেলে যেমন নাওয়া-খাওয়া ভুলে যেতাম, তেমনটা অনেকদিন বোধ করিনাই। হারারির বই আমাকে সেই শৈশবের মুগ্ধতার দিনে নিয়ে গিয়েছিলো। যারা মানব ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী, কিন্তু গুরুগম্ভীর বিরক্তিকর বই পড়তে চাননা (আমিও), তাদের জন্য এই দুইটি বই অবশ্য পাঠ্য। এমন সুখপাঠ্য বই সচারচর মিলে না।

শাহনাওয়াজ স্যারের সঙ্গে ইতিহাসের আগ্রহী পাঠক সুমন ভাই এবং আমি

এই বই পড়ার পর আমার অনুভূতিও ছিল অভিন্ন। তাই সুমন ভাইয়ের পোস্ট সরাসরি নথিভুক্ত করে রাখলাম।

(Visited 39 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *