স্বপ্নকর্কট

বাইরে লিসানের গলা শোনা যায়। চোখ মুছতে মুছতে মুখের ওপর থেকে চাদর সরায় সে। অস্ফুটে বলে ওঠে সার্টিফাইড মাটিখোদক এতো দ্রুত মাটির নিচে যাবি বলেই কি সব কাজে তাড়াহুড়ো করতি? ওঠ ওরে শয়তান ওঠ ! এখনও কত কাজ বাকি রয়ে গেছে। তুই না পানাম নগরের থ্রিডি মডেল বানাবি আমাদের সঙ্গে নিয়ে। পুরো বাংলাদেশের আর্কিওলজিক্যাল এটলাস বানাবি। এগুলো কে করবে ? ওঠ ! তুই না শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহকে নিয়ে সুলতান সুলাইমানের মত সিরিয়াল বানাবি। পাশ থেকে চেঁচিয়ে ওঠে জাহিদ। স্টেথো হাতে একজন এগিয়ে আসে। ডাক্তার হলেও আসলে সে আরিফের আরেক বন্ধু বুরহান। কান্নাভেজা লাল চোখে সে লিসানের দিকে তাকায়। খাম ছিঁড়ে বের করে কম্পিউটার থেকে খুলে আনা একটা হার্ডডিক্স। একজনের নাম লেখা। সঙ্গে ছোট্ট এক লাইনের চিঠি। ইংরেজিতে লেখা। Check [D] Drive, If possible try to fulfill my unfinished dream, I believe you are the only one who can do it.।
স্কুল জীবনের দুই বন্ধু আরিফ আর লিসান। লম্বাচুলো আবদুল কালামকে তাদের কতটা পছন্দ ছিলো সেটা বলা যাবে না। তবে অজ্ঞাতসারে তাদের মধ্যেও জন্ম নিয়েছে সাদাচুলো একটা ভূত। সে তাদের খালি চিন্তা করায় আর ঘুম কেড়ে নেয়। এপিজে আবদুল কালাম। ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি। অনেক স্বপ্নপূরণের সারথি। আর মানুষকে একটা কুমন্ত্রণা দিয়ে গেছেন। স্বপ্ন নাকি তা যেটা মানুষ ঘুমিয়ে দেখে না। বরং যে ইচ্ছাশক্তি মানুষকে ঘুমোতে দেয় সেটাই নাকি স্বপ্ন। অদ্ভুত ব্যাপার হলেও সত্য লিসানের স্বপ্ন সে একটা পাহাড় বানাবে। আরিফ দেখতে চায় মাটির নিচে কি আছে। লিসান ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগিয়ে তার বাবার কয়েক প্যাকেট ভিজিটিং কার্ড দিয়ে সুন্দর কাঠামো বানায়। নির্ঘুম রাত শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই ভেঙ্গে পড়ে সেই ঘর।
আরিফ একটু অন্যরকম। চুপিসারে কিচেন থেকে খুন্তি কিংবা গোয়াল থেকে নিড়ানি নিয়ে রাতদুপুরে বাগানে রওনা দেয়। তার অদ্ভুত ইচ্ছা মাটি খুঁড়ে দেখতে চায় নিচে কি আছে। এরজন্য বাবার কাছে রামধোলাই খেয়েছে। সারারাত জেগে থাকায় ক্লাসরুমে ঘুমিয়ে পড়ে সবার হাসির খোরাক হয়েছে। তবুও সে দমেনি। এভাবে দেখতে দেখতে এসএসসি, এইসএসসি পার। লিসান দুর্দান্ত রেজাল্ট করে মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক উৎরে যায়। বন্ধুত্বে ফাটল ধরে দুজনের। পাহাড় সমান স্বপ্ন নিয়ে লিসান ভর্তি হয়ে যায় বুয়েটে। যথারীতি স্থাপত্যবিদ্যায়। আরিফ উল্টো রথে উল্টো পথে চলা বন্ধ করেনি। সে সবাইকে চমকে দিয়ে ভর্তি হয়ে যায় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে। শ্রেণি পাঠ্যের বাইরে একগাদা বইয়ের পাঠ মাথায় গিজগিজ করত যার। ফল যাই হোক শিক্ষক শিক্ষার্থী সবাই একবাক্যে স্বীকার করত যার মত প্রাণিবিদ্যা রসায়ন খুব কম ছেলেমেয়েই বোঝে। তার ঠিকানা হবে যেকোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ প্রাণিবিদ্যা কিংবা রসায়ন বিভাগেই। অন্যদিকে স্কুল থেকেই পরিষ্কার বাংলা কিংবা ইংরেজি বানিয়ে লেখায় তার জুড়ি ছিল না। তাই বাংলা কিংবা ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হলেও মেনে নিতে কষ্ট হত না কারও। তাই বলে প্রত্নতত্ত্ব ! অবিশ্বাস্য। আজগুবি ! অদ্ভুত !
জীবন হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে ঠিক শেষ ধাপে এসে হোঁচট খায় লিসান এবং আরিফ দুজনেই। দেখতে দেখতে একটা দশক পার হতে গেছে। স্বপ্ন দেখা যেখানে স্বপ্না নামের কোনো বারবণিতাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখাত হয়ে তারপর আত্নহনন করার মত। সেখানে তারা দুজনই স্বপ্ন দেখেছে ভালো কিছু করার। পাপের শাস্তি ভোগ করতেই হবে তাদের। বাবার ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বানানো ঘর ভেঙ্গে গেলে ঘুমিয়ে পড়ত লিসান। এবারেও সে আর্কিটেক্ট হওয়ার পর এমবিএ করে। নামী ফার্মে চাকরী জুটিয়ে বিয়েও করে ফেলেছে। ফলে তার স্বপ্ন ভঙ্গের পরও নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে আগের মতই।
একগুঁয়ে স্বভাবের আরিফ জয় পরাজয় মান অভিমান থেকে অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে গুরুত্ব দিয়েছে আজন্ম। রামধোলাই খেয়েও দিনের পর দিন চান্স পেলেই মাটি খুঁড়ে পার করে দেয়া শৈশব এখনও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। প্রত্নতত্ত্ব পড়েই তার শান্তি নেই, পড়াতেও চায়। চাকরি-বাকরি, জীবন আগ্রহ আর সমাজ সবকিছুর দিকে মধ্যাঙ্গুলি দেখিয়ে এখনও মুখ গুঁজে থাকে সে বইয়ের পাতায়। আর এভাবেই পার হয়ে গেছে ৩-৪ টা বছর। অনেকগুলো স্বাক্ষাতকারে সবার থেকে যোগ্য হয়েও ছিটকে পড়ার যন্ত্রণায় বেসামাল হয়ে পড়ে সে। আস্তে আস্তে জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মায়। মাসের পর মাস নির্ঘুম রাত পার করে জীবনকে ঠেলে নিয়ে আসে প্রান্তিকে। ফাইনাল পরীক্ষার আগের রাতেও সাহসে ভর দিয়ে সিনেমা দেখা। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হাতে নিয়ে পিকনিক মুডে খাতা ভাঁজ করতে লিখায় হাত দেয়া আরিফ এখন অন্য মানুষ। কালের অভিঘাত সিডাটিভের ঘেরাটোপে আটকে ফেলেছে তার জীবন।
শীত আসি আসি করছে। স্টাডি রুমে অস্থির পায়চারি করতে করতে হঠাৎ মাথা ধরে আসে। ভোরের দিকে ড্রইং রুমের ডিভানে বসে একটু রেস্ট নিতে গিয়ে ঘুমিয়েই পড়ে সে। হঠাৎ স্বপ্নে নিজেকে আবিষ্কার করে একটা নামী হসপিটালে। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা কার উদ্দেশ্য নয়। মাথা ব্যাথার চিকিৎসা করাত গিয়ে তার ব্রেইন ক্যান্সার ধরা পড়েছে। ইতং বিতং নানা ভাবনার মধ্যেই হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায়। সত্যি মাথাটা আধামণ ভারি লাগছে। সোজা কয়েকটা পেইনকিলার গিলে আবার কম্পিউটারের সামনে বসে। সকাল হয়ে যায়। অন্যদিনের মত আজ ভরদুপুর পর্যন্ত ঘুমায়ও নি সে। প্রচণ্ড মাথা ব্যাথা নিয়ে সারাদিন অফিসের কাজে তেমন মন দিতে পারেনি। সিডাটিভ নিতে হয়নি। এমনিই সে বেশ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছে আজ। আবার স্বপ্ন দেখে। তার চারপাশে অনেকগুলো প্রিয়মুখ ঘুর ঘুর করছে। যারা সদ্য কিংবা বেশ আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আরিফ দেখতে পায় তার বিভাগের খুব প্রিয় এক শিক্ষক এ. খান স্যারকে। সন্ত্রাসীদের কাছে গুলি খেয়ে আহত হয়েছিলেন তিনি। লাখ বিশেক টাকা খোয়া যাওয়ার পাশাপাশি হাঁটুর জখম নিয়ে বেশ ভুগেছিলেন। তারপর হঠাৎ স্ট্রোক করে মারা গেছেন তিনি।
আরিফ স্পষ্ট শুনতে পায়। স্যার তাকে বলছেন, ধর্মপালের খালিমপুর তাম্রশাসনে কতগুলো এলাকার নাম বলা আছে। দেখো ঐ ভোজ, মৎস্য, করু, যদু, যবন, অবন্তী এতগুলো এলাকা নাকি সে দখল করেছিল। আরে ধর্মপালের যদি এতো এলাকা দখল করার ক্ষমতাই থাকে তবে ত্রিপক্ষ সংঘর্ষের সময় সে লেজ গুটিয়ে পালালো কেনো?
জাদুঘরের মধ্যে র্যাখকে রাখতে গিয়ে অসাবধানতাবশত হাতে বাড়ি লেগে পাশ থেকে নৈহাটী তাম্রশাসন পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। থাবা দিয়ে ধরে ফেলে আরিফ। এমনি সময় ঘুম ভাঙ্গে। তার হাতে আইপ্যাড। কোথায় তাম্রশাসন, কোথায় কি? শুধু প্রচণ্ড মাথা ব্যাথায় সে বুঝছে মাথার উপরে ফ্যানটা ঘুরছে না। টিউব লাইটে চারদিক আলো হয়ে থাকলেও তার দুচোখে ঘোর অন্ধকার। সারারাত আর ঘুম হয়নি। সকালে ডাক্তারের চেম্বারে যেতে হয় সত্যি সত্যিই। ওষুধ কিনে বাসায় এসে আর অফিস যেতেও ইচ্ছে করছে না। সপ্তাহ খানেক রেস্ট নেয়ার বৃথা চেষ্টায় শুধু বেড়েছে মাথা ব্যাথাটা। এবার ডাক্তার গুরুতর কিছুর সন্দেহ করেন।
পরীক্ষা নিরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত ঐ স্বপ্নে দেখা ব্রেইন ক্যান্সারই ধরা পড়ে। শল্যবিদ্যার ভাষ্যে জীবন সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে দ্রুত। ডাক্তার মুখ কাচুমাচু করে আশেপাশের সবাইকে বিদায় ঘণ্টা বেজে যাওয়ার সংবাদটা দিতে চাইলেও বাধা দেয় আরিফ। তার সামনে অনেক কাজ। সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে এমন কিছু করে রেখে যেতে হবে যাতে তার মায়ের অন্তত বাকি জীবন চলতে গেলে কারও কাছে হাত না পাততে হয়। দেড় ডজনের উপরে তার লেখা বই। এগুলোর রয়্যালিটির উপযুক্ত হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে। অন্তত তার অবর্তমানে কেউ যেন মাকে ঠকাতে না পারে।
কিন্তু জানাজানি হয়ে হয় সংবাদটা। বিরক্তিকর সব বন্ধুবান্ধব আর আশপাশের মানুষ ঘিরে ধরে তাকে। এর জন্য সে নিজেও কম দায়ী নয়। প্রত্নতত্ত্ব পড়ানোর সাধ পূরণ হোক না আর হোক অন্তত হাজার দশেক মানুষ তাকে একনামে চিনে। লেখালেখি আর চাকরী হেতু তার হাতে টাকা ছিলো দেদার। নেশা করা কিংবা কোনো বাজে অভ্যাস না থাকায় দুইহাতে টাকা উড়িয়েও মাসের শেষ দিন পর্যন্ত অভাব কি জিনিস তার দরজায় পা রাখেনি। ফলে কিছু না হোক অন্তত অকর্মা শুভাকাঙ্খীর সংখ্যা তার যেকোনো রাজনৈতিক নেতার চেয়েও ঢের বেশি। বন্ধু-বান্ধব, লেখক, সাংবাদিক, পুলিশসহ তার পরিচিতদের সবাই চাইছে একটা ফান্ড রাইজ করে চিকিৎসা করাতে যাতে আরিফে ঘোর আপত্তি। তার একই প্রশ্ন বেঁচে থেকে কি লাভ? হটাৎ বন্ধুদের থেকে শুরু করে শিক্ষকদের অনেকেই শেষবারের মত দেখতে আসেন তাকে। বিশ্রিভাবে সমবেদনা জানাতে চাইছে সবাই। বিরক্তিভরে একবার সবার দিকে চাইল আরিফ। মাথা ব্যাথাটা আরও বেড়েছে। আস্তে আস্তে মুখের পর সাদা চাদরটা টেনে নিল সে। সত্যি বলতে মুখ দেখাতে আর ইচ্ছে করছে না কাউকে।
আইপ্যাডটা হাতে ধরা। তখনও হাজার খানেক বই সেখানে ইন্সটল করা লাইট ই-পাব ফর্মেটে। রুমে ওয়াইফাইও আছে। তবু ভালো লাগছে না। খুব মিস করছে সে তার থরে থরে বই সাজানো স্টাডি রুমটাকে। মাকে মনে পড়ছে খুব। হঠাৎ ইচ্ছে হয় হেডফোনটা কানে লাগিয়ে গান শোনার। কিন্তু ডাক্তার-নার্সরা সেটা করতে দেবে না। আরিফ স্পষ্ট বুঝতে পারছে তার সময় শেষ হয়ে আসছে। শিক্ষকতার জন্য সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পর পর পাঁচ-সাতটা সাক্ষাতকারে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বার তিনেক সত্যি তার মরে যেতে ইচ্ছে করেছে খুব। কিন্তু মৃত্যুকে খুব কাছে থেকে দেখতে পেয়ে কেমন যেন অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়েছে। টেবিলের দিকে হাত বাড়িয়ে দেখতে পায় র‍্যাপিং পেপারে মোড়ানো একটা খাম। উপরে প্রাপকের ঠিকানায় তার নাম লেখা। প্রেরক, পেঙ্গুইন বুকস। ঠিকানাটাও স্পষ্ট Herengracht 418-2, 1017 BZ Amsterdam, Netherlands,  penguin.co.uk। প্যাকেটটা আনমনে ছিঁড়তে ছিঁড়তে বালিশে হেলান দেয়।
ঠিক ফযরের আযানের সময়টাতে কাউকে না জানিয়ে নিশ্চুপ বিদায় নেয় আরিফ। বরাবরের মত চিৎ হয়ে শোয়া। মাথাটা পশ্চিম দিকে হেলানো। অনেকটাই স্বভাবসিদ্ধ হাসিমুখ। বন্ধ দুচোখ দেখে কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় তা আর কোনোদিন খুলবে না। শেষ দিনগুলোতে খোলা জানালা থেকে চোখ মেলে ভাবলেশহীনভাবে সে তাকিয়ে থাকত পাশের ভবনে। এটা একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ভবন। ঠিক আরিফের রুমটার সঙ্গের রুমেই ক্লাস হয়।
যখন কেউ থাকে না। চুপ করে পর্দা সরিয়ে সে চেয়ে থাকে ক্লাসরুমের দিকে, অস্ফুটে অনেক কথা মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়েও থেমে যেত, শুধু টপ টপ করে কয়েক ফোঁটা অশ্রু ঝরে ভিজিয়ে দিত সাদা চাদর। শেষ বার কি মনে করে জানালা খুলে রেখেছিলো সে? যদি ক্লাসের শুরুতে যে কেউ খেয়াল করে দেখবে তাদের দিকেই চেয়ে আছে কোনও ব্যর্থ মানুষের অসহায় এক জোড়া চোখ। দিনরাত কিবোর্ডে ঝড় তোলা হাতদুটো বুকের ওপর। হাতে ধরা তার সদ্য প্রকাশিত বই Bangladesh Archaeology: A Brief Introduction. সন্ধার পর প্যাকেট ছিঁড়ে এটাই বের করেছিলো সে। তখন কি জানত সময় এতদ্রুত ফুরিয়ে যাবে।

(Visited 34 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *