হিংসুক নিন্দুক জানুক কেনো বেস্ট সেলার!

টেলিফিল্মের কান ধরে টেনে লম্বা করে সেটাকে হলে দেখানোর ছবি বলে দাবি করা হলো। বড় বড় বিলবোর্ডে কিংবা সিনেমার ঐতিহ্যবাহী পোস্টারে ওসব সিনেমা নামের লম্বা টেলিফিল্মের প্রচার তেমন দেখা যায়নি। আস্তে আস্তে বাঙালি হলবিমুখ হয়ে গেল দুটি কারণে। প্রথমত, নষ্ট দর্শক টানার অভিপ্রায়ে মূল চলচ্চিত্রে কাটপিস ঢোকানো। দ্বিতীয়ত, সিনেমা দেখতে এসে টেলিফিল্মকে গায়ের জোরে টানাটানি করার বৃথা চেষ্টা দেখতে দর্শকের অরুচি।

নির্মাতা, পরিচালক, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে অভিনেতা, অভিনেত্রী, নায়ক-নায়িকা এবং অন্য কুশীলব সবই নির্ধারিত। এরাই আবার বছর শেষে পুরষ্কার প্রদান করে। ফলে দেখা গেল এক ভুতুড়ে উল্টোরথে চলা। আগে ভাল চলচ্চিত্র দর্শকনন্দিত হলে সেটাকে পুরষ্কার দেয়া হতো। এখন পুরষ্কার সামনে রেখে চলচ্চিত্র তৈরি করা হয়। এখানে পরিচালকরা জেনে গেছেন তারা যদি চলচ্চিত্রের নামে ফালতু কোনো বিষয়ও টেনেটুনু দু-ঘণ্টা পার করতে পারেন তবে সেটা পুরষ্কার পাবে। ফলে এক পর্যায়ে অকালমৃত্যু ঘটে যায় বাংলাদেশী বাংলা চলচ্চিত্রের।

এরপর আসি বইয়ের ব্যাপারে। গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল টাইপের কিছু লোক মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলে নিজেদের লেখক বলে দাবি করে। তারা আদৌ কতটা লিখতে পারত সেটা তাদের চামচা, সহকারী এবং নিজেরা বাদে অন্যদের পক্ষে বলা কঠিন। তাই আমাদের শৈশবে সেবা প্রকাশনীর বাইরে লেখক বলতে সুনীল-সমরেশ-শীর্ষেন্দুবাদে বাংলাদেশে লিখছেন, বিখ্যাত হয়েছেন কিংবা মনের ভাললাগা থেকে পড়া যায় এমন কোনো লেখক চোখে পড়েনি। আমরা তখন এমন কোনো বড় ভাইকে চিনতে পারিনি যারা তাদের পূর্বসূরীদের গুণগান করে আমাদের এসব তথ্য জানাবেন যাতে আমরাও পড়তে পারি।

তখন লেখক দাবিদার কিছু প্রাণি আজিজ সুপার মার্কেটের চিপায় বসে বিড়ি ফুঁকতো, এর ওর দেয়া টাকায় সস্তায় বাংলা মদ গিলত,  এর ওর কাছ থেকে টাকা ধার করে কোনোমতে চলত, ধারের টাকা ফেরত দেয়ার ভয়ে চলাচলের গণ্ডি সীমিত রেখে  নিজেরা যা মন চায় তাই লিখত। অন্যদিকে তারা নিজেদের লেখা নিয়ে খুব হতাশ ছিল। তাদের বড় ক্ষোভ দেশের মানুষ কেনো তাদের লেখা পড়ছে না। সবাই পড়লে, তাদের বই কিনলে তারা আরও আরামে চলতে পারত, আজিজের চিপায় বসে বিড়ি ফুঁকার বাইরে সোনারগাঁতে বসে মাল টানতেও পারত।

অবাক ঐ নষ্ট সময়ে হঠাৎ এক ভিন্নস্রোতের যাত্রী হিসেবে উত্থান কিংবা আবির্ভাব হুমায়ূন আহমেদের। তিনি দেখিয়েছেন লেখক কিভাবে হতে হয়, আর লেখক কাকে বলে। একজন ব্যাটসম্যান বিরাট কোহলী যেমন যেকোনো দলের বিপক্ষে ভারতের জন্য যথেষ্ঠ। উনি বাংলাদেশের লেখককূলের জন্য তাই হয়েছিলেন। এটা আজিজ মার্কেটনির্ভর লেখক দাবিদার মানুষগুলোর সহ্য হয়নি। তাদের মধ্য থেকে এক ছোটলোক  হুমায়ূন আহমেদকে বললেন এই লোক নাকি অপন্যাসিক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের জনৈক  শিক্ষক তিনিও নামের আগে লেখক বসাতে পছন্দ করেন। এই ভদ্রলোক লিখতে পারেন আর নাই পারেন দেশের মানুষের ধর্মানুভূতিতে সুড়সুড়ি দিয়ে সফল হলেন।  কিন্তু কারো স্রষ্টা আর ধর্মকে গালি দিয়ে নাস্তিক সাজা যতটা সহজ লেখক হওয়া ততটা না। তিনিও বাংলাদেশের আপামর পাঠকের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বললেন- ইতর প্রাণি প্রসব করে বেশি। কিন্তু উনি বেমালুম ভুলে গেলেন এই কথা বলতে গেলে রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের চেয়ে বড় ইতর প্রাণি বাংলা সাহিত্যে কেউ নেই। কারণ উনারা দুইজন যা প্রসব করেছেন ঐ নাস্তিক পদবীধারী লেখক দাবিদার অধ্যাপক তার তিন জিন্দেগী এক করেও প্রসব করতে পারেন নাই।

তাদের হিংসা আর পাঠকের ভালবাসার বিপরীতে আয়ু কমে গেল। দুর্ভাগ্য আমাদের অমর কথাশিল্পী হুমায়ূন পরলোকে চলে গেলেন বড্ড অসময়ে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর দেখা গেল জীবিত হুমায়ূন থেকে মৃত হুমায়ূন সত্যি আরও শক্তিশালী। নাসির আলী মামুন ভাইয়ের তোলা হুমায়ূনের বিশাল একটা ছবির সামনে দাঁড়ানো ঐ কিশোর কিংবা বইমেলায় অন্যপ্রকাশের সামনে দাঁড়িয়ে অবিরাম অশ্রু ঝরানো কিশোরীর দিকে তাকালে বোঝা যায় হুমায়ূন কে ছিলেন, তার বিয়োগে আমরা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত।

এরপর কয়েকটি বছর যেতে না যেতেই বোঝা গেল প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। আমি তুলনা করতে চাইনা। কারণ প্রত্যেকে নিজের মত। সে হিসেবে অন্যরকম এক ভাবালুতায় পূর্ণ, আবেগী মনের না বলা কথা পাঠক খুঁজে পেতে শুরু করে আমাদের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞানের বড় ভাই Sadat Hossain এর কলমে। একটা ক্যামেরা ঘাড়ে করে বিভিন্ন স্থানে ছবি তুলে বেড়ানো অপেক্ষাকৃত ছোটখাট গড়নের সাদাতকে নিয়ে কারো মাথাব্যাথা ছিল না। বরং নির্দিষ্ট বিরতিতে তার ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করা দেখে ছেলেবুড়ো সবাই কমবেশি আপ্লূত ছিল। তারা বলত সাদাত বড্ড ভাল ছেলে, ভদ্র ছেলে। বিলাসী গল্পে প্রিয় লেখক শরৎবাবু বলেছিলেন, ‘ওরে লুচি খা, পাঁঠার মাংস খা, পিঠা খা ভাত খেয়ে মরতে গেলি কেনো? এখানেও ভাবটা অমন তুই বেটা ছবি তোল, গিটার নিয়ে গান গা, ঢাউস সাইজের উপন্যাস লিখে মরতে গেলি কেনো? আর লিখে মরতেই যখন গেলি অমন চিল্রাপাল্লা করে মরিস ক্যান। ইয়ে মানে, তুই কে হে দুইদিনের  ছোকরা, কি ছাইপাস লিখিস! তোর বই এত্ত বিক্রি হয় ক্যান’।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের মূর্খরা হয় দুই রকম। প্রথম শ্রেণির মূর্খ মানুষগুলো বিদ্যাশিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। উনাদের অক্ষরজ্ঞান না থাকায় কিছু না হোক অন্তত হিংসা করেন না। দ্বিতীয় শ্রেণির মূর্খদের নিয়ে সমস্যা বেশি। এরা লেখাপড়া না করলেও সনদধারী। মনে প্রচুর অহমবোধ আর পাণ্ডিত্যের পোশাক নিয়ে থাকা তাদের প্রিয় অভ্যস কিংবা শখ দুটোই। এই শ্রেণি আবার ছড়ি ঘোরাতে শুরু করলো। ঠিক ওভাবে, যেভাবে গ্রামের কন্যাদায়গ্রস্ত বাবারা কিংবা হতাশাগ্রস্ত মুরুব্বিরা বলে বেলায় ‘অমুকের  মেয়ে কিংবা ছেলের বউয়ের চরিত্র ভালা না, মাথায় কাপড় দেয় না, কেমন ঢ্যাং ঢ্যাং কইরা চলে। ব্যাস দ্বিতীয় শ্রেণির মূর্খরা শুরু করে দিল সমালোচনা। তারা নিজেরা দুই লাইন লিখতে গেলে কলম কিংবা কিবোর্ড দুটোকেই ভেঙ্গে ফেলে এমন অবস্থা, কিন্তু সমালোচনা ক্ষেত্রে কয়েক কাঠি সরেস ও সৌকর্যের দাবিদার।

লেখার মান থেকে ‍মুদ্রণ কিংবা সংস্করণ, এরা সবক্ষেত্রে বিরক্তির ছাপ খুঁজে পায়। লেখার মান সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে বইয়ের কন্টেন্ট পড়তে হয়। কিন্তু এদের অতটুকু ধৈর্য কিংবা পাঠক শিষ্টাচার নাই। তাই সংস্করণ কিংবা মুদ্রণ নিয়ে কথা বলার সুযোগ থাকাতে এবার কাজ সহজ হয়ে গেছে তাদের। শুধু বই উল্টে প্রথম পাতা পেছনের অংশ দেখে তাদের সমালোচনা শুরু হয়ে গেছে মুদ্রণ নিয়ে। কি নিষ্পাপ প্রশ্ন তাদের ‘মেলার প্রথম দিনেই তৃতীয় মুদ্রণ, আরে ব্যাটা মুদ্রণ কি হাতের মোয়া নাকি?’ সত্যি বলতে এদের বইয়ের মুদ্রণ, সংস্করণ এবং ছাপাখানা সম্পর্কে নুন্যতম সাধারণ জ্ঞান নাই। কারণ একটা বইকে ঠিক মেলার আগেই বের হতে হবে কেনো? আগেও তো ছাপা হতে পারে। আর সেই ছাপা হওয়া সংস্করণ কিংবা মুদ্রণের পুরোটা শেষ হওয়া তো স্বাভাবিক যা তারা মানতে পারে না।

Kingkor Ahsan নামে অন্য লেখক শুনলাম টিভিসির মত করে বইয়ের বিজ্ঞাপন বানাচ্ছেন। তিনি ‘পৃথিবী বইয়ের হোক’ শ্লোগানে এক অর্থে বৈপ্লবিক একটা কাজ করছেন। এটা নিয়েও কত বিরক্তি কতজনের। তারা বলছে এটা নাকি লির্লজ্জ আত্মপ্রচার। কালচক্র এবং দিবানিশি নামে দুটো দুর্দান্ত উপন্যাস লিখেছেন Abdullah Al Imran। এই লেখককে আজ অবধি দেখিওনি। তবে এটা নিয়ে কথা বলছিলাম কয়েকজন মিলে। বলতে গেলে সাহিত্যনির্ভর আড্ডার মত চলছিল সেখানে। জনৈক লেখক নামধারী ব্যক্তি তেড়ে এলেন হা রে রে রে করে। তাঁর সোজা সাপ্টা কথা কয় টাকা খেয়েছেন। আমি উত্তরে বললাম আমাদের প্রজন্মকে আপনারা গালি দেন, বলেন আমরা কিছু করি না, এরা কিছু একটা তো করছে তাই বললাম। আমি বললাম আপনারা সমালোচনা করছেন এটা ভাল। কিন্তু ভুলেও আমাদের প্রজন্মকে অথর্ব বলবেন না। ইতিহাস প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে আমি সেই ছাত্রাবস্থা থেকে লিখে যাচ্ছি। এটার দায় সম্পূর্ণ আমার তাই দাবি নিয়ে সে প্রসঙ্গে বলতে পারি।

আপনাদের কথা মেনে নিয়ে বলছি ধরেন সাদাত হোসাইন ছাইপাশ লিখছে। তবুও তার অন্দরমহল, মানবজনম, আরশিনগর, নিঃসঙ্গ নক্ষত্র কিংবা নির্বাসন যেটাই হোক সবগুলো বই যতক্ষণ হাতে ছিল সময়টা মন্দ কাটেনি। আপনাদের হিসেবে কিঙ্কর আহসান দু’টাকার লেখক। কিন্তু আমি যখন তার কাঠের শরীর, মধ্যবিত্ত, রাজতন্ত্র, মখমলি মাফলার, মকবরা, স্বর্ণভূমি, কিসসাপূরাণ কিংবা রঙিলা কিতাব খুলেছিলাম ঐ সময়গুলো নিঃসন্দেহে রঙিন ছিল। এদিকে ইমরানকে আপনি চেনেন না, আমিও চিনি না। তবে একজন ইতিহাস গবেষক এবং পাঠক হিসেবে দায় নিয়ে বলছি তার কালচক্র ও দিবানিশি কালোত্তীর্ণ সৃষ্টি হতে বাধ্য।

লজ্জার মাথা খেয়ে সমালোচনা করার আগে ভাবুন নিশ্চয় কোনো না কোনো কারণে আজকের আয়মান সাদিকের উত্থান। তার স্টুডেন্ট হ্যাকস কিংবা ভাল্লাগে না নিশ্চয় কোনো বিশেষ কারণে সুপার ডুপার হিট। আরিফ আজাদকে আপনারা আলোচনার টেবিলে  স্থান দিতে নারাজ। তবুও প্যারাডক্সিকাল সাজিদ, আরজ আলী কিংবা প্রথম বইয়ের সিক্যুয়াল নিয়ে সে শীর্ষ লেখকের স্থান দখল করেছে। ঝংকার মাহবুব কিংবা শামীর মোস্তাজিদকে খাটো করে যতোই দেখেন আপনার পাত্তা নাই, তার বইই বেস্ট সেলার । এ বিষয়গুলো থেকে আমরা যতদিন কুপমণ্ডুকতা ত্যাগ করতে না পারব হিংসা, নিন্দা, বিদ্বেষ, কুৎসা, অপপ্রচার আর মনোবীকলনের পীড়ন থামবে না।

(Visited 48 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *