২০১৭ তে ইউরো কেন পতনের মুখে পড়েছিল?

ইউরোপের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো যাচ্ছে না। গেল বছরই দেখা গেছে কীভাবে তাদের জিডিপি হঠাৎ করে পড়ে গেছে। কেউ কেউ স্পেনের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করতে পারেন। তবে সেখানে যা-ই হোক, অন্তত বেকারত্বের পরিমাণ বেড়ে গেছে বহুগুণ। হতাশার প্রহর দীর্ঘায়িত হয়েছে, যখন দেখা যায় যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়েছে আরো বহুগুণে। অর্ধদশক ধরে এ অবস্থা থেকে তারা বিশেষ করে উত্তরণ ঘটাতে পারেনি। একইভাবে গ্রিসের মন্দাভাব কাটেনি। গত বছর পুরো ইউরোজোনে প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে গত ২০০৫ থেকে ২০১৫ সালের প্রবৃদ্ধি পর্যন্ত বিশেষ উন্নয়ন দৃষ্টিগোচর হয়নি। ইতিহাস আলোচকরা এক্ষেত্রে এরই মধ্যে দাবি শুরু করেছেন যে, গত কয়েক বছরে যেভাবে ধারাবাহিক দরপতন ঘটেছে, আগে কখনো এ অবস্থা সৃষ্টি হয়নি। বিশেষ করে এমন অবস্থা চলতে থাকলে বছরখানেকের মধ্যে আগের সব অবস্থা ছাড়িয়ে আরো বড় কোনো অচলাবস্থার সৃষ্টি হতে পারে।

২০০২ সালের দিকে প্রথম ইউরোর প্রবর্তন করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৯ সালের দিক থেকেই এটা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। এক্ষেত্রে ২০০৮ সালে এসে গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইসিস দেখা দিলে এর থেকে বের হয়ে আসার যে চিন্তা, তা এখন ধীরে ধীরে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদরা এখন ভাবতে শুরু করেছেন আগামী বছরখানেকের মধ্যেই একটা বিশ্রি পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যাতে করে মুদ্রা হিসেবে অনিশ্চিত হয়ে পড়বে ইউরোর ভবিষ্যৎ। বিশেষ করে ২০১০ সালের মধ্যে ইউরো-সম্পর্কিত সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছিল। পরে ধীরে ধীরে গ্রিস, স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালে এর অশুভ পরিণতি তীব্র থেকে তীব্রতর অবস্থায় রূপ নেয়। তাই অনেক দেশ মুদ্রা হিসেবে ইউরো সম্পর্কিত সব অনিশ্চয়তা দূর করতে একেই মুদ্রাতালিকা থেকে ছেঁটে ফেলার চিন্তা করছে।

গত বছর থেকে ইউরোজোনে বিশ্রি রকমের ঘাটতি দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। এক্ষেত্রে জিডিপির মান নেমে গেছে ৩ শতাংশ, ঋণের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ শতাংশ। পাশাপাশি ২ শতাংশের উপরে চলে গেছে মুদ্রাস্ফীতির চলমান অবস্থান। এর পরও বাজার ব্যবস্থায় তাদের প্রভাব সেভাবে পড়েনি। এক্ষেত্রে কেউ কেউ দাবি করছেন প্রবৃদ্ধি ও স্থিতাবস্থা ধরে রাখতে মুদ্রা হিসেবে ইউরো থেকে বের হয়ে আসার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে কিছু সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচার কিংবা মোটাদাগে কিছু সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধান করার সুযোগ নেই। পাশাপাশি যে দেশগুলো বিপন্ন অবস্থায় পড়েছে, তা থেকে আলাদা করতে গেলে পুরো অবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। অন্যদিকে আয়ারল্যান্ড কিংবা স্পেনের মতো দেশগুলো তাদের সারপ্লাস ক্রাইসিস সময় পার করছে। এ ক্রাইসিস তথা সংকট মূলত সৃষ্টি হয়েছে ঘাটতি ও ঋণ থেকে। এর বাইরে আরো অনেক বিষয় আগে থেকে চিহ্নিত করা গেলেও সেগুলো থেকে উত্তরণের তেমন কোনো প্রচেষ্টা এখনো লক্ষ করা যায়নি।

আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন মুদ্রার যে প্রয়োজন একটা পর্যায়ে দেখা দিয়েছিল, এখন তার সময়ের বিচারে গুরুত্ব হারিয়েছে। এর বদলে প্রত্যেকে নিজ নিজ মুদ্রা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চাইছে। বিশেষ করে অভিন্ন মুদ্রার সময়টায় দেখা গেছে কেউ কেউ অনেক ধনী হয়েছে, যারা দরিদ্র ছিল, তারা ক্রমাগত দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়েছে। অন্যদিকে একজনের আর্থিক দুর্বলতার বোঝা অন্যজন বইতে এখন নারাজ। তবে সাধারণ অর্থে বলতে গেলে এটাই ইউরোজোনের আর্থিক অবস্থার স্বাভাবিক চালচিত্র। এক্ষেত্রে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নানা দিক থেকে তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটিয়ে ফেলতে পারলেও তার দুস্তর প্রভাব পড়ছে আর্থিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর। এক্ষেত্রে বর্তমানে নানা জটিলতা থেকে মুক্তিলাভ যেমন কঠিন হয়ে পড়েছে, তেমনি বিভিন্ন দেশের আর্থিক ভবিষ্যৎ হয়ে পড়ছে অনিশ্চিত।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ইউরোপের বেশির ভাগ দেশের আর্থিক ভবিষ্যৎ চিন্তা করে তাদের মুদ্রা ও অর্থব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে তাদের প্রায় প্রতিটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থা একই রকম বলে নতুন কিছু সেভাবে প্রয়োগ করা বেশ কঠিন একটা কাজ। পাশাপাশি তাদের মুদ্রাও যদি হয় অভিন্ন, তার থেকে নতুনত্ব নিয়ে আসা হবে বেশ বড় চ্যালেঞ্জ। অন্তত এক্সচেঞ্জ এবং ইন্টারেস্ট রেটের কথা চিন্তা করতে গেলে তাদের এ সমস্যা থেকে উত্তরণ হয়ে যাবে বেশ কঠিন। অন্তত ব্যাংকিং খাতরে এ সমস্যা তাদের আরো বড় ধরনের ঝামেলার মুখোমুখি করবে। উল্টো তাদের বিনিয়োগ কমে যাবে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে বেকারত্বের মতো সমস্যাগুলোও।

আর্থিক নানা সমস্যার পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে দেখা দিচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিত সব দৈন্য, যা ইউরোপের ভবিষ্যেক ঠেলে দিচ্ছে এক অনিশ্চিতের পথে। এক্ষেত্রে মুদ্রানীতির ফলে সৃষ্ট সমস্যাগুলো প্রণোদিত করছে আয়বৈষম্য বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে। সেই ১৯৯০ সালের দিকে যে আর্থিক নীতি গৃহীত হয়েছিল, তা থেকে উত্তরণে কোনো উপযুক্ত ব্যবস্থা এখনো নিতে পারেনি দেশগুলো। তাই এর পর ইউরোপের অর্থনীতির অবস্থা কী হতে পারে, তা বিশ্বের নন্দিত অর্থনীতিবিদরা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছেন। অন্তত তারা ভবিষ্যৎ ইউরোপের আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত চলকগুলো সহজেই শনাক্ত করতে পেরেছেন, যার ওপর নির্ভর করে এর ট্রেড ডেফিসিট কিংবা ঋণ সমস্যার স্বরূপ উদ্ঘাটন খুব একটা কঠিন নয়।

গ্রিস, স্পেন কিংবা পর্তুগালের রাজনীতিতে গণতন্ত্রচর্চার বড় রকমের ঘাটতি রয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের দেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা আছেন, তাদের সামনে একমাত্র জার্মানির বশ্যতা স্বীকার করে নেয়া বাদে আর কোনো পথ খোলা নেই। এক্ষেত্রে দেশগুলোর জনগণ ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঢুকে পড়েছে ইউরোজোনে। তবে তার বোঝা বইতে হচ্ছে প্রত্যেককেই। প্রত্যেকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে যে বোঝা বইতে বাধ্য হচ্ছে, সেটাই বাজিয়ে দিয়েছে ইউরোর মৃত্যুঘণ্টা। অন্তত নানা দিক থেকে তাদের ওপর যে চাপ, তা থেকে মুক্তির প্রচেষ্টা হিসেবেই ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ ইউরোজোন থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

একের পর এক সংকট উপস্থিত হওয়ায়ই ইউরোপ এখন পরিবর্তনপ্রত্যাশী। কিন্তু তাদের সামনে পরিবর্তনের জন্য খুব বেশি পথ উন্মুক্ত নেই। এক্ষেত্রে তাদের ওপর একটি সিস্টেম চেপে বসেছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য তাদের যা করা উচিত, সেক্ষেত্রে নির্ধারিত পথের সংখ্যাও বেশ সীমিত হয়ে পড়েছে। দিনের পর দিন তাদের বেকারত্ব বৃদ্ধির বিপরীতে তেমনভাবে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। ফলে তাদের অর্থনীতির ক্ষেত্রে যে ঈপ্সিত মুক্তির প্রত্যাশা করা হচ্ছে, শেষ অবধি সেটাও সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে বড় সমস্যা, ইউরোপ তার নীতিনির্ধারণী জটিলতা এড়াতে পারেনি। তারা দীর্ঘদিন ধরে যে নিয়মের ঘেরাটোপে আবদ্ধ, তা থেকে মুক্তি পাওয়াটাও তাদের জন্য বড় একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিচ্ছে দিনের পর দিন। ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক প্রেসিডেন্ট মারিও দ্রাঘি এ ব্যাপারে তার মতামত ব্যক্ত করেছেন, যেখানে মার্কেট পার্টিসিপেন্টরা গুরুত্ব পেয়েছেন নানা দিক থেকে।

এক্ষেত্রে খেয়াল রাখা প্রয়োজন যে, মার্কেট ফোর্স পুরোপুরি জড়িত রাজনীতির সঙ্গে। এক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে যারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, তারা এই ভেবে খুশি হতে পারেন যে, তাদের রাজনৈতিক অধিকার অন্তত পণ্ড হয়ে যায়নি। তারা হ্যাঁ কিংবা না বলতে যে ভোটটা দিতে পেরেছেন, সেটাও রাজনৈতিক অধিকারের গুরুত্ববহন করে। এর পরও তারা অন্তত মনে করতে পারছেন যে, ২০১৭ সাল ইউরোজোনের জন্য একটি পরিবর্তনের বছর হয়ে আসতে পারে।

শুধু একটি কারেন্সি সিস্টেমকে টিকিয়ে রাখার জন্য ইউরোপের মধ্যে যে মানের রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজন ছিল, তার ঈপ্সিত মানটা এখন ধরে রাখা যায়নি। ফলে পরিবর্তন অনেকটাই আসন্ন। একই হারে বেকারত্ব বৃদ্ধি থেকে শুরু করে আরো নানা আনুষঙ্গিকতায় এখন অনেকটা নাজেহাল পরিস্থিতির শিকার ইউরোপের অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থা। তবে ইউরোজোনের যে ব্যর্থতা, এ থেকে উত্তরণ বেশ কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের আশা করাটাও হবে ভুল। অন্তত শুরুতে ইউরোজোন প্রতিষ্ঠায় যে আশাবাদ লক্ষ করা গেছে, সময়ের আবর্তে সেটা আর ধোপে টেকেনি। পাশাপাশি এটা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে ইউরোপের গণতন্ত্রমনা মানুষকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক জোসেফ স্টিগলিটজ এর লেখা ফরচুন ম্যাগাজিন থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।

(Visited 12 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *