অসময়ের দিনলিপিতে লকডাউন

পড়ালেখার জন্য ইচ্ছা লাগে সময় লাগে না। আগ্রহ থাকলে পড়াও যায়, পাতার পর পাতা লেখা যায়। বিশাল কাজ আর দুশ্চিন্তার বোঝা মাথায় নিয়েও পড়া লেখা দুটোই যায়। অন্যদিকে সবরকম সুবিধা থাকার পরেও পড়া কঠিন যদি আগ্রহ কিংবা ইচ্ছা কোনোটাই না থাকে।
জীবনের সবথেকে ভয়াবহ সময় পার করেছি যখন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক ইন্টারভিউ দিতাম তখন। ঐ সময়ে সেখানে ইন্টারভিউ দিয়ে আসার সময়েও বাসের মধ্যে বসে পড়েছি। এমনকি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট স্ট্যান্ডে বাসের অপেক্ষায় থেকে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের দ্যা সান অলসো রাইজেজ শেষ করেছি।
একটা বই অনুবাদ করছিলাম মাস তিনেক আগে। মশারীর মধ্যে ল্যাপটপে বেশিক্ষণ লিখলে ঘাড় বেথা করে। প্রচণ্ড শীত আর মশা উপেক্ষা করে বসলাম ডেক্সটপে। এরপর যেভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লিখলাম সেটা আরেক ইতিহাস।
ছোট ভাইয়ের বাইকের হেলমেট নিয়ে মাথায় দিলাম। ফুলহাতা জামা প্যান্ট আর জুতোমোজা পরে টেবিলে বসলাম। আর এভাবেই সকাল পর্ন্ত লিখলাম। কিন্ত অনেক দিন যেদিন ইচ্ছা থাকে না যেদিন অতি শান্তিতে ঘুম এসে যায়, লেখাপড়া হয় না।
পারিবারিক ভ্যাজাল মধ্যবিত্ত পরিবারের নিত্যসঙ্গী। এরা বাইরের কারও পুঙ্গি বাজায়, এর ওর গুহ্যদ্বারে কাঠি করে নাহলে নিজেই নিজ গুহ্যদ্বারে অঙ্গুলি করে কেনো দুর্গন্ধ এটা বরে চিৎকার দেয়। আর আমার পরিবারও এর উর্ধে নয়। সত্য বলতে এসব পারিবারিক দুরাবস্থা আর গেঞ্জাম আমার পড়ায় কোনোসময ব্যাঘাত করে নাই।
দেখা গেল আমার মা পাশের বাসার কোনো চাচির কিংবা আমার বউয়ের পিণ্ডি চটকাচ্ছে। কিংবা খালাদের সঙ্গে এর ওর গোষ্টী নিপাত করছে। কিংবা আমাদের পাশের বাসার কোনো গেঞ্জাম এসে সুন্দর করে ছুঁয়ে গেছে আমাদের পরিবারকেও। মজার ব্যাপার এগুলো আমাকে কখনও ছুয়ে যায় না, যেতে পারেও না।
এক দুর সম্পর্কের আত্মীয়া মারা গেলেন। নাকি কান্না হল্লা কিংবা মাতম ভালই চলছিল। সামাজিক দায়িত্ব কিংবা হৃদয়ের টান যে কারণেই হোক গেলাম উনাকে দেখতে। প্রবল আবেগ নিয়ে কান্না করা মানুষগুলো আস্তে আস্তে পাতলা হতে থাকলেন রাত নয়টার পর থেকে। এরপর রাত এগারোটা বাজতে আর কেউ নাই।
পরিবারের সবাই কমবেশি জানেন আমি রাত জাগি। যথারীতি শবদেহ প্রহরার দায়িত্ব বর্তায় আমার উপরে। একটু আগে মরহুমের যে সন্তান মাটিতে চিতল মাছের মতো তড়পাতে তড়পাতে কান্না করছিলেন তিনিও সুখনিদ্রা গেলেন। বাস্তব অর্থে বিশাল খোলা বারান্দায় ঐ একটা শবদেহ আর আমি বাদে আর কেউ নাই।
আমি মনে মনে এটাই চাইছিলাম। কারণ মৃতদেহের পাশে বসে মানুষ তিলাওয়াত করে কিংবা দোয়া পড়ে। আমি জামার মধ্যে করে নিয়ে গেছি হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের স্টেলা বইটার সেবার অনুবাদ।
এই বইটার প্রচ্ছদও খুব একটা লোকসম্মুখে প্রদর্শনযোগ্য নয়। তাই একটা মলাট দিয়ে নিয়ে গেছি। মনে মনে ভাবছি সবাই চলে গেলে আমি বইটা পড়তে শুরু করবো। যথারীতি গল্প পড়তে পড়তে একটা জানালা দিয়ে ঘড়ির দিকে উঁকি দিলাম। রাত দেড়টা পার। আরেকটু পর এভাবে সোয়া দুইটা। হঠাৎ মৃতদেহটা নড়ে উঠলো ।
খুব সম্ভবত ওয়াদাবা জিম্বি নামে এক আদিবাসী লোকের গল্পের মধ্যে এতোটাই ডুবে গেছি মনে নেই আমার পাশে যিনি আছেন তিনি মরহুম আমাদের মতো জীবিত কেউ নন। তিনি হঠাৎ নড়ে উঠে হাতে ভর দিয়ে বসার চেষ্টা করছেন। আমি তাকে ধরে বসালাম।
তারপর ঐ (মৃত) ব্যক্তি পানি চাইলো দিলাম। তার খিদে পেয়েছে এটা বলতে ঘরে ঢুকে পাউরুটি আর কলা এনে দিলাম। তারপর সে বলল ঘুম পাচ্ছে। তাকে নিয়ে গিয়ে তার কক্ষেই শুইয়ে দিয়ে আসলাম। এরপর আবার মন দিলাম গল্পের বইতে।
পুরো বাড়িতে বসার জন্য বারান্দায় একটা চেয়ার ছাড়া কিছুই ছিল না। হঠাৎ ভোরের দিকে ঘুম পেল। শোয়ার কোনো জায়গা না থাকায় মৃতজ্ঞান করা মানুষটি বারান্দায় যে মাদুরে শুয়েছিলেন সেখানে শুয়ে পড়লাম। তারপর মশার থেকে বাঁচতে তাকে ঢাকার চাদরটা মুড়ি দিয়ে ঠিক ওখানেই ঘুমিয়ে পড়লাম।
ফজরের আযানের কিছু আগে পুরো এলাকা আবার সক্রিয় হয়ে উঠলো। হয়তো অনেক দূর দূরান্তে খবর চলে গেছে। অনেকেই বয়স্ক ভদ্রলোককে শেষ বার দেখার জন্য দূর দূরান্ত থেকে রওনা দিয়েছেন। পরদিন বাদ জুম্মা তাাঁর জানাজা এবং দাফনও ঘোষণা হয়ে গেছে। ফলে সেখানে জনসমাগম হওয়াটা স্বাভাবিকই ছিল।
তবে ভেতরে বাইরে এতোবড় চমক দেখার জন্য কেউ অপেক্ষা করেনি। বাইরে থেকে মানুষ এসে ডাকায় দরজা খুলেছে একজন। তারপর লাশকে তার বিছানায় আমারে ঘুমাতে দেখে সে ভয়ে দিয়েছে দৌড়। এদিকে বাইরে থেকে আসা লোকটা দেখে আমি তার জায়গায় ঘুমাচ্ছি। ফলে ভয়াবহ একটা পরিস্থিতি।
যাইহোক ঐ ভয়াবহ ঘটনার পর আরও পাঁচ বছরের মতো উনি বেঁচে ছিলেন। সত্যিই যখন উনি মারা গেলেন সেদিন আমার অনার্স সেকেন্ড ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষা থাকায় আসতে পারিনি। তবে আজও ভুলিনি উনার প্রথম দফা মরে যাওয়ার সেই ঘটনা। ভাবলাম স্মৃতি বিভ্রমের আগেই সবার সঙ্গে শেয়ার করে রাখি।
পারিবারিক নানা ঝামেলায় এখনও ক্রান্তিকাল চলে জীবনে। অসহ্য শ্বাসকষ্ট কিংবা পরিবারের আলতু ফালতু বিষয়ে সৃষ্ট অশান্তি থেকে দূরের থাকার জন্য আমি একটা কাজই করি। সেটা যা ইচ্ছে হয় মনের সুখে লিখে যাচ্ছি কিংবা কোনো বই পড়ছি। আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভাল আছি। কারণ অনাহার-অর্ধাহারে না থেকে একটা দিন পার করে দেওয়ার নামই ভাল থাকা। এর বেশি আর কি চাই!?!
জীবনের অশান্তি তাড়াতে চান !! বই পড়ুন। যা মনে আসে লিখুন। কিছু না পারেন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিন। না পারলে ডায়েরি নিয়ে বসুন। যা মন চায় লিখুন। কিংবা যে বই ভাল লাগে সেটা পড়ুন। এর পেছনে কোনো কারণ না রেখে শুধুই পড়ুন। দেখবেন মনটা কেমন ফুরফুরে হয়ে গেছে। আজ জনৈক ব্যক্তি শ্রদ্ধেয় কাজী মাহমুদুল হক ভাইকে প্রশ্ন করেছে এত পড়েন কখন। উনি এর উত্তর দেননি হয়তো ইচ্ছে করেই। উনার পক্ষ থেকে আমি এতোবড় একটা লিখা লিখে দিলাম।
মহামারীর ইতিহাস পর্যালোচনা করে আমি শুরু থেকে বারংবার লকডাউনের বিপক্ষে বলেছিলাম। সিকি তত্ত্বজ্ঞান আর আধেক বিজ্ঞান জানা ফাপরবাজ বাঙালি এটাকে বলেছিল অর্বাচিনের প্রলাপ কিংবা অনর্থক প্রলেতারিয়েত আচরণ।
খেয়াল করুন হে খচ্চর পাতিবুর্জোয়া শহুরে ধড়িবাজ। আপনার পকেট ভর্তি টাকা থাকরেও খুলিতে বুদ্ধি নাই। লকডাউন হলে দেশের গরীব মানুষ না খেয়ে মরার দিকে এগিয়ে যাবে কিংবা আভ্যন্তরীন সাপ্লাই চেইনগুলি ধ্বসে পড়বে এতে আপনার মাথা বেথা নাও থাকতে পারে।
তবে সারাদিনের ঘরবন্দী মানুষ অনর্থক বাড়তি স্ট্রেস-ডিপ্রেশনে ভুগবে। তার থেকেও বড় বিপদ হবে রোদে না যাওয়ায় ভিটামিন ডি ডেফিসিয়েন্সির মহামারী শুরু হবে জঘন্যভাবে। এটা সুস্থ স্বাভাবিক মানুষদেও নানাবিধ রোগে আক্রান্ত করবে।
যত বড়লোকই হোন না কেনো আপনি লকডাউন হলে আপনার আয় কমে যাবেই যাবে। ফলে আপনার হাউজহোল্ড ফুড সিকউরিটি ডায়েটারি ডাইভার্সিটি ও নিউট্রিশনাল স্টেইটাসের ওপর প্রভাব ফেলবে বলে লিখেছেন পুষ্টিবিদ Muhammad Sajal । তার আরও আশঙ্কা এতে করে মানুষের ফিজিক্যাল এক্টিভিটি কমে যাওয়ায় বহু মানুষ নতুন করে এনসিডিতে আক্রান্ত হবে, যা মৃত্যুর হার বাড়াবে।
তাই গরীব মরবে আমরা হাজার বছর দুনিয়ায় বেঁচে থেকে ভেড়েন্ডা ভাজবো এমন চিন্তা বাদ দিন। লকডাউন ধনী কিংবা গরীব কারও মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। এতে ক্ষতি সবারই হয়। তাদের ক্ষতিটা সরাসরি বলে দৃশ্যমান। আর আপনার ক্ষতিটা আরও ভয়ানক এবং দীর্ঘমেয়াদি যা সরাসরি দৃশ্যমান হচ্ছে না বলে জানেন না।
অনেক যন্ত্রণায় Taifur Rahman এর চারটি লাইন দিয়ে শেষ করছি…
পাখিরা মরে গেলে
উল্টানো রিকশার মতো
চিৎ হয়ে দেখে
ক্ষুধার্ত নীল আকাশ।
(Visited 34 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *