আনিসুল হকের কান্না

হুমায়ূন আহমেদ খুব সম্ভবত লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বিপন্ন দৃশ্যের একটা হচ্ছে, বয়স্ক একজন মানুষের কান্নার দৃশ্য। তা যে কারণেই হোক।’ এর আগে প্রথম আলোয় পড়েছিলাম, ‘মেসি, নেইমার ও মির্জা ফখরুলের কান্না’। সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক  মেসির কান্না নিয়ে লিখেছিলেন। কোপা আমেরিকার ফাইনালে আর্জেন্টিনার হারের পর মেসি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন।  রিও অলিম্পিকে ফুটবলের সোনা জয়ের পর কান্না থামাতে পারছিলেন না ব্রাজিল অধিনায়ক। সে সময়ে প্রথম আলো অনলাইনে তিনি লিখেছিলেন, ‘নেইমারের কান্না, মেসির কান্না। তারপর তিনি লিখেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কান্না নিয়ে। সবার কান্না নিয়ে এতো চিন্তিত এই মানুষটি আজ কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন। তাই তার কান্না নিয়ে আজ লিখতে হচ্ছে।

ফেসবুকে কোনো এক সাংবাদিকের শেয়ার থেকে হঠাৎই দেখলাম কাঁদছেন আনিসুল হক। দুষ্টু লোকের নানা কুকথায় ‘প’ আদ্যাক্ষরের বিশেষ শব্দ কিংবা অভব্য দৈনিক মতিকণ্ঠের ভাষায় মার্কেজে কারওয়ানখ্যাত আনিসুল হকের এই কান্না দেখে নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। চোখের পানি মুছতে গিয়ে দেখলাম ঐ ফেসবুকার লিখেছে, ‘সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টার একটু পরে সিএমএম আদালতে তোলা হয়েছে। তখন সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। আদালতে রিমান্ড আবেদনের শুনানি শুরু হয়েছে। এর আগে সকাল আটটার দিকে রোজিনা ইসলামকে শাহবাগ থানা থেকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে নেওয়া হয়। তখন বেশিরভাগ সাংবাদিক আন্দোলনে ব্যস্ত ছিলেন। এরই ফাঁকে একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেন আনিসুল।’

আনিসুল হক ও সকিব

আনিসুল হক কিছু না বললেও এক বিবৃতিতে তাঁর পত্রিকার সম্পাদক বলেন, ‘প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে এক আকস্মিক, অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে হেনস্তার শিকার হয়েছেন। এরপর মামলা দিয়ে তাঁকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। মাননীয় আদালত রিমান্ড নামঞ্জুর করলেও এ মুহূর্তে রোজিনা ইসলাম কারান্তরালে। এটা রোজিনা ইসলাম, তাঁর পরিবার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং দুর্নীতিবিরোধী নীতি ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে এক বিশাল আঘাত।’ সম্পাদক এতো কথা বললেও নীরব আনিসুল হক শুধু ভেসে গেছেন চোখের জলে।

বাংলাদেশে এসে পটল তোলা এক হাতির শোকে ন্যাকামি করা লোকগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নাকি কান্নার পক্ষে আনিসুল হক লিখেছিলেন ‘মানুষ কাঁদুক। ঝরা পালকের বেদনায় বেদনার্ত হোক, একটা হরিণের মৃত্যুতে কাঁদুক, শালিকের মৃত্যুতে কাঁদুক এবং মানুষের সুখে-দুখে সে চোখের জল ফেলুক। মানুষের জীবন যেন তার কাছে সবকিছুর চেয়েই বেশি মূল্যবান বলে মনে হয়!’

দুষ্ট ছেলের দল ‘প’ আদ্যাক্ষরের নামে যাই বলুক, মতিকণ্ঠ যতোই মার্কেজে কারওয়ান বাজার বলুক কিংবা অনেকে কাদা নিক্ষেপ করুক মানুষ হিসেবে কারওয়ান বাজারের আনিসুল হক সজ্জন হিসেবেই গণ্য। শিক্ষক মানুষ নাহলেও বুয়েট পাস করা সাংবাদিক, বামধারার রাজনীতিও করতেন। কাঁচাপাকা চুলে কলপ না করলেও তাঁর কথাবার্তা, বেশভূষা, চালচলনে একটা মার্জিত ভাব আছে।

ঈদের দিন আনিসুল হক (ছবি: ফেরিফাইড পেইজ)

আজকের পরিস্থিতিতে তাঁর কান্নাটা যে মেকি নয়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দুই বছর আগে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে ব্রাজিলের অধিনায়ক থিয়েগো সিলভা খেলা শুরুর আগে জাতীয় সংগীত বাজার সময় কেঁদেছিলেন। তারপর তাঁর দল যখন জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নিল, তখন এই সমালোচনাও হয়েছিল যে, যে অধিনায়ক খেলা শুরুর আগেই কাঁদেন, তাঁর দলের ছেলেরা কীভাবে খেলায় জিতবেন। একইভাবে সাকিব আল হাসান আর মাশরাফিও কান্না করেছিলেন একটা এশিয়া কাপের ট্রফি হাতছাড়া হওয়ায়। আজ আনিসুল হকের এই কান্নাও কি সেই রকমের বার্তা দেয় যে সাংবাদিকদের জন্য কোনো আশা নেই?

সম্পাদক মতিউর রহমান ১০ মে দেওয়া বিবৃতিতে বলেছেন ‘প্রথম আলো আইনের শাসনে বিশ্বাস করে। আদালতের মাধ্যমে রোজিনা ইসলাম ন্যায়বিচার পাবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। রোজিনা ইসলাম এবং তাঁর পরিবারের পাশে প্রথম আলো সব সময়ই থাকবে। ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের প্রতিবিধানে প্রথম আলো তার কর্তব্য ও ভূমিকা থেকে বিরত হবে না। আমরা রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, রোজিনার নিঃশর্ত মুক্তি এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে তাঁকে হেনস্তাকারীদের বিচার ও শাস্তি দাবি করছি।’ এর পরেও আনিসুল হকের কান্না করার আসলেই কি কোনো সুযোগ সৃষ্টি হয়ে  গেছে?

আনিসুল হকের কান্নার সঙ্গে তাঁর লেখালিখির ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা কতখানি কাজ করেছে, আর বর্তমান দুরবস্থা নিয়ে দুর্ভাবনা কতটা কাজ করেছে, আমরা তা নিয়ে গবেষণা করতে পারিনা। যদি করতে যাই লোকে ঝাঁটা নিয়ে তাড়া করবে।তবে মানুষের মনের আসল খবর তো আর আমরা বলতে পারব না। আনিসুল হকের কি এই কথাও মনে হয়েছে যে ভবিষ্যতে আমারও একটা বিপদে পড়তে হতে পারে। আমি নিজে যখন বিপদে পড়বো তখন কেউ আমার জন্য এমন সিঁড়ির উপর বসে একটা বিঁড়ি ধরিয়ে কান্না করবে তো!!!

অশ্রুজলে ভাসতে গিয়ে অতীত জীবনের অনেক স্মৃতি মনে পড়ছে আনিসুল হকের। তিনি হয়তো ভাবছেন প্রিয় জাফর ইকবাল ভাই কান্না আড়াল করতে বৃষ্টিতে ভিজেছিলেন। আজ আমার ভাগ্য খারাপ বৃষ্টিটা সময় মতো আসেনি। যদি আসতো তাহলে এতো ঝামেলা হতো না। যাই হোক পাওলো কোয়েলহো তো বলেছেনই ‘“So you must learn to follow your destiny, whatever it may be, with joy. As flowers grow, they show off their beauty and are appreciated by all; then, after they die, they leave their seeds so that others may continue God’s work.” ― Paulo Coelho, The Spy’

ড. মো. আদনান আরিফ সালিম:  প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাস গবেষক

(Visited 305 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *