গোলাম মুরশিদের স্বপ্নে দেখা ল্যাংড়া নজরুল

কাজী নজরুল ইসলাম এক কিংবদন্তীর নাম। তবে আমার কাছে তাঁর সাহিত্য ও সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কিত জ্ঞান একেবারেই অপ্রতুল। ভাষাগত জটিলতাসহ আরও নানা কারণে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম নিয়ে আমার পড়ালেখা একেবারে বিগিনার লেভেলের। আর যে বিষয়ে কম জানি কিংবা একেবারেই জানি না সে বিষয়ে কথা বলা আমার মোটেও পছন্দ নয়। সে কারণেই হয়তো কাজী নজরুল ইসলাম নিয়ে আমি কোথাও পক্ষে বিপক্ষে তেমন কিছু বলি না।
তবে গোলাম মুরশিদের নজরুল-জীবনী বইটা পড়ে শেষ করার পর বিরক্তির শেষ সীমায় চলে গিয়েছিলাম। শুধু অবাক হয়েছিলাম একই লোক হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির নামে দেশের ইতিহাসকে খেলে দিল। সেই সঙ্গে একটা আইক্কাঅলা বাঁশ হাতে নিয়ে কিভাবে অভিন্ন দেশের জাতীয় কবির গুহ্যদ্বারে ভরে দিল। শুধু বাঁশটা ভরে দিয়ে চুপ থাকলে হইতো। সে জাতীয় কবির গুহ্যদ্বারে বাঁশটা ঢুকিয়ে মনের সুখে দীর্ঘক্ষণ লাড়াচাড়াও করেছে যতক্ষণ ক্লান্তি না আসে, ঠিক ততক্ষণ।
কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা হাতে থাকার পাশাপাশি সাহিত্য সম্পাদকদের তেল মারতে পারলে মরার দেশে যে কেউ বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। ইতিহাস নিয়ে গোলাম মুরশিদের হাস্যকর লেখাগুলো পড়ার পর একথাই বারংবার মনে হয়েছে। সবথেকে বড় কথা নিজের মনের কথা সুন্দর করে গুছিয়ে লেখার অধিকার কমবেশি সবার আছে। কিন্ত সেটাকে ইতিহাস হিসেবে পরিচয় করে দিয়ে তার উপর বোনাস হিসেবে বাহবা নিতে গেলে বিপদ অনেক। চরম লজ্জাজনক হিসেবে গোলাম মুরশিদ তাঁর হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি বইতে একাজই করেছিলেন।
‘আশার ছলনে ভুলি’ কিংবা ‘আধুনিকতার অভিঘাতে বঙ্গরমণী’ বইগুলো যখন পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম ভাগ্যগুণে একজন লেখকের লেখা পড়ার সুযোগ পেলাম। বিশেষ করে ‘আশার ছলে ভুলি’ লিখতে গিয়ে গোলাম মুরশিদ যে প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন ঠিক তার উল্টো কাজটাই করেছেন ‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত : নজরুল-জীবনী’ লিখতে গিয়ে। মনে হয়েছে তিনি জেনে বুঝে নজরুলের পিন্ডি চটকে তার ইজ্জত মারার জন্যই কুকর্মে লিপ্ত হয়েছেন।
কোনো গর্দভ, কাঠবলদ ও অর্বাচিন লেখক এমন কাজ করলে মনে হতো তিনি না জেনে, না বুঝে এই কাজ করেছেন। কিন্ত গোলাম মুরশিদের মতো একজন সুলেখক যিনি তাঁর হাতে মাইকের মধূসুদনকে জীবন্ত করেছেন ‘আশার ছলনে ভুলি’ লেখার মধ্য দিয়ে। তিনি কিভাবে ভুল করে -‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত : নজরুল-জীবনী’ শীর্ষক বিভ্রান্তিকর রচনা তৈরি করতে গেলেন। তিনি কার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এমন ছাইপাশ রচনা করে নিজের সম্মান নিজেই ভূ-লুণ্ঠিত করতে গেলেন সে ব্যাপারে ভাবনা-চিন্তার অবকাশ রয়েছে।
যাঁরা খোঁজ খবর রাখেন কমবেশি জেনে থাকবেন নজরুল-জীবনী নিয়ে লেখা তাঁর গবেষণাধর্মী বইটি -‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত : নজরুল-জীবনী’ সম্প্রতি আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেছিল। কিন্ত কেন এই পুরস্কার লাভ করেছিল সে বিষয়ে ভাবনা-চিন্তার প্রয়োজন রয়েছে।
মুরশিদ যাই লিখে যান না কেনো তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নজরুল ইসলাম বাংলা-ভাষাভাষিদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন কবি। নাতিদীর্ঘ লেখালেখির জীবনে তিনি যতো না লেখা নিয়ে আলোচিত ছিলেন, তারচেয়ে বেশি আলোচিত ছিলেন বর্ণাঢ্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে। তার এই বৈচিত্র্যময় জীবনকে সবাই যার যার জায়গা থেকে দেখেছে। আর সর্বনাশটা সেখানে।
খেয়াল করুন তিনি মুসলিম কিন্ত কালী সাধনা নিয়ে লিখেছেন, সন্তানের নাম রেখেছেন কৃষ্ণ মুহম্মদ। বিয়েও করেছিলেন হিন্দু নারীকেই। অনেকটাই তারছেঁড়া এই বিপ্লবী কবির জীবনযাপনও তাঁর সাহিত্যকর্মের মতোই বৈচিত্র্যময়-বর্ণাঢ্য। তিনি দেশের জন্য জেলের ঘানি টেনেছেন, দিনের পর দিন প্রায় না খেয়ে থেকেছেন অর্থাভাবে। এমনকি ভেগে গেছেন বিয়ের আসর থেকেও। এই কবিকে অত সহজভাবে দেখার সুযোগ কম। কিন্ত সেটাই করা হয় বেশি বেশি।
গায়ের জোরে নজরুলকে অনেকে অনেকভাবে উপস্থাপন করে। মুরশিদ তার বাইরে যেতে পারেন নাই। হুজুরেরা জোর করে নজরুলকে মুসলিম কবি বানায়, সেক্যুলার লোকজন তাকে সেক্যুলার বানায় কেউ কেউ তাকে বলে বসে নাস্তিক এক কালী উপাসক। কিন্ত তাদের সবার আলোচনায় উপেক্ষিত থাকেন একটা সত্তা.. সেটা ‘কবি নজরুল’।
‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় কবি বলেছেন যে, হিন্দুরা তাঁকে বলে ‘পাত-নেড়ে’ আর মুসলমানরা বলে ‘কাফের’। আস্তিকরা তাঁকে ভাবে তিনি নাস্তিক, আর কেউ তাঁকে বিবেচনা করে কনফুশিয়াস-পন্থী ব’লে। স্বরাজ্য দলের লোকেরা ভাবে তিনি স্বরাজ্য দলের বিরোধী, আর যারা স্বরাজী নয়, তারা তাঁকে বলে স্বরাজী। পুরুষরা মনে করে তিনি নারী-ঘেঁষা, নারীরা মনে করে তিনি নারী-বিদ্বেষী।’ এই কথাগুলো প্রচার করে গোলাম মুরশিদকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে বেশিরভাগ পত্রিকায়। কিন্ত তারা সব কথার বাইরে গোলাম মুরশিদ কি বলতে চাইছেন সে ব্যাপারে কিছু লিখেন নাই।
গোলাম মুরশিদ এতদিন কাগজ-কলমে যুদ্ধ করে কি পেলেন!!!!!!! ‘তিনি নজরুল সম্পর্কে আসলে কি পেলেন সে ব্যাপারে নিজেও কনফিউজড। ভেবেছিলেন লেখা শুরু করে দেই, তারপর সবকিছু আলুঘণ্টের মতো ঘুটা দিলে বেলা শেষে কিছু একটা পেয়ে যাব। আর সেটাই জগাখিঁচুড়ি হিসেবেই এই বইটার অবতারণা’।
এই বইয়ের ব্যাপারে কোনো নেগেটিভ রিভিউ নাই কেনো? সহজ উত্তর এই বই লোকজন পড়লে তবেই তো নেগেটিভ রিভিউ দেবে। সবথেকে বড় কথা যারা পড়েছে তারা কোনো না কোনো কারণে মুরশিদ শুনেই মুগ্ধ। এ মুগ্ধতা পীরের প্রতি তার মুরিদদের মুগ্ধতার থেকেও বেশি। আর যারা গোলাম মুরশিদকে অপছন্দ করেন,তারা নাম শুনেই এটাকে খচ্চার খাতায় ফেলে দিয়েছেন। ফলে তারা এটা নিয়ে আলোচনাও করেন নাই।
তাহলে আমার উপলদ্ধি কি!!! সহজ কথায় বলব… ‘ভাই আমার সময় এবং টাকা দুটোই জলে গেছে। তারপর এই বইটা পড়ে এতবড় একটা পোস্ট লিখছি এটাও বড় অপচয়। তাই এই বই পড়ে নষ্ট করার মতো সময় না থাকলে এটাকে এড়িয়ে যাওয়াই ভাল। নার্গিসের বিয়ের আসর থেকে নজরুল পালিয়ে গিয়েছিলেন নাকি ঘরজামাই থাকার ভয়ে পরে আর সংসার টিকেনি… কোনটা সত্যি!!!! এই ভেজাল নিয়ে ক্যাচাল করার আগে প্রিয় পাঠক আপনিই দৌড়ে পালান। এত ফাউ প্যাচাল দিয়ে আমাদের কি কাজ!!!!! কারণ এই বইতে গোলাম মুরশিদ যা লিখেছেন পড়লে মনে হয় তিনি তাঁর স্বপ্নে এক ল্যাঙড়া নজরুলকে দেখেছেন। তারপর তার এক ঠ্যাঙ বাদ দিয়ে বিশালাকৃতির তথ্যনির্ভর গরুর রচনা লিখে দায় শেষ করেছেন।
(Visited 9 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *