আত্মচিন্তা কিংবা আমার বাবার গল্প

আত্ম-উন্নয়নমূলক বই পড়া আর ইংরেজী শিক্ষা এই দুইটা জিনিসকেই জীবনে সবথেকে কম গুরুত্ব দিয়েছি। অন্যদিকে বড়রা আত্মউন্নয়নে তথা জ্ঞান দেয়ার জন্য যা বলতেন বেছে বেছে ঠিক তার উল্টোটাই করেছি। কারণ প্রচলিত ধারার শিক্ষা কিংবা মানুষে উদ্দিষ্ট জীবন উন্নয়নে আমি কখনও আস্থা রাখতে পারিনি।
শৈশবে প্রায় পুরোটা সময় পার করেছি আমার দাদার সঙ্গে। আরও ভাল করে বললে মসজিদ থেকে শুরু করে এলাকায় বুড়োদের আড্ডা দেওয়ার মাচা আর বিকেলে পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতা পড়ার আয়োজন। এর বাইরে তেমন কিছু করার সুযোগও আমার জন্য সেভাবে হয়ে ওঠেনি।
অন্যদিকে সমবয়সী ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সেখাবে মেশা দূরে থাক কথা বলার সুযোগও কম হয়েছে। তার বিপরীতে দাদার সামাজিক অবস্থানের বদৌলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, স্কুল ও কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, সাবেক সচিব, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা কিংবা অনেক ধনী ব্যক্তি থেকে শুরু করে হতদরিদ্র অনেক মানুষের শেষ জীবন খুব কাছে থেকে দেখেছি।
তাদের প্রত্যেককে দেখেই আমার মনে হয়েছিল এদের থেকে দুঃখী আর কেউ নাই। তাহলে সারাজীবন এতো পড়ালেখা করে, রাজা উজির মেরে, হাতি ঘোড়ায় চেপে উনাদের অর্জনটা কি? একজন মূর্খ মানুষেরও অভিযোগ তার ছেলের বউ তাকে দেখে না। তার বিপরীতে একজন উচ্চ শিক্ষিত মানুষও গলার স্বরটা খাদে নামিয়ে যা বলে সেটার সারমর্মও তথৈবচ।
একদিন এক মুরুব্বির কথা প্রায় পুরোটা শুনে ফেলেছিলাম। তাকে স্পষ্ট প্রশ্নও করেছিলাম আপনি যে চাচির ব্যাপারে এই কথা বলছেন গত পরশু আপনার মেয়ের শশুরও এই একই কথা বলেছেন। তাহলে আপনাদের ছেলে আর মেয়েরা এমন কেনো? তারা কেনো আপনাদের দেখে না, খোঁজ নেয় না? উনি আমার প্রশ্নের উত্তর দেন নাই। উপরন্ত দাদার কাছে নালিশ দিলেও দাদা তাকে পাত্তা দেননি।
বলা বাহুল্য এই পৃথিবীতে একজন মাত্র মানুষ ছিলেন তিনি আমার দাদা। তিনি সবকিছুতে যাই হোক অন্তত সেখানে আমার কোনো দোষ খুঁজে পেতেন না। আমার নামে কেউ নালিশ দিলে দাদা উল্টো তার চৌদ্দ গোষ্ঠীর পিণ্ডি চটকে দিতেন। গালমন্দ থেকে শুরু করে গোষ্ঠী নিপাত করে ছাড়তেন। তাই তাঁর কাছে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা, আর দেয়ালে মাথা ঠুকে মরা ছিল সমান।
আজন্মের শ্বাসকষ্টের রোগী হওয়াতে ধুলাবালি থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখতে চেষ্টা করতেন দাদা। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে বৃষ্টিতে ভেজার কথা কল্পনাও করতে পারিনি। সারাটা সময় গ্রামে বাস করলেও সবথেকে ভয় পেতাম প্যাচপেচে কাদা। তারপর দাদা মারা গেলেন। অল্পদিনের ব্যবধানে আব্বাও চলে গেলেন।
পারতপক্ষে তখন থেকে পুরোপুরি একা হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্ত শতশত মানুষের খুব কাছে থেকে দেখা জীবন আর শেষ বেলার ঘ্যানঘ্যান প্যান প্যান আমারও কানে বাজত। তাই আমার কাছে সাফল্য বলতে নিজের মতো করে বাঁচতে পারার বাইরে আর কিছু ছিল না। আমার পরিবারে এবং নিকটাত্মীয়দের মধ্যে কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ছিল। এগুলোর আচরণ আর মানুষের সঙ্গে আলগা ভাব নেওয়া দেখে আমি ওদের সম্মান করা দূরে থাক স্বাভাবিক মানুষ হিসেবেই মনে করিনি।
অসুস্থতাসহ নানা কারণে আমি একটু খাপছাড়া চলতাম বলে আমার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় সবথেকে বেশি বাধার সৃষ্টি করেছিল এই হারামিগুলোই। এক বুড়ো জানোয়ার বড় নোংরামিটি করেছিল আমার আব্বার মৃত্যুর দিন রাতে। সে বলেছিল সদ্য প্রয়াত আব্বার মতো আমিও চরম শ্বাসকষ্টের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছি। তাছাড়া পরিবারে সবার বড় বলে দায়িত্বও আছে।
তার হিসেবে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ারই দরকার নাই। আমার উচিত এডওয়ার্ড কলেজে এসে ইংরেজিতে পড়া। তাহলে নাকি ভাল একটা চাকরি পাওয়া যাবে। আমি যে ইতিহাস-প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে পড়ছি তাতে পড়লে চৌকিদার, পিওন দারোয়ানের চাকরিও পাওয়া সম্ভব হবে না।
মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন তুলনামূলক অসুস্থ সদ্য বাপ হারানো ছেলে কিংবা মেয়ে যে কেউ হলে তখন প্রচণ্ড কান্নায় ভেঙ্গে পড়তো। কিংবা সে যদি ঢঙ্গী আর অভিমানী হতো গিয়ে বিষ খেতো কিংবা বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতো। এগুলোর কোনো প্রবণতা আমার মধ্যে বিন্দুমাত্র ছিল না। তাই বলে কি আমি প্রতিবাদ করিনি। আমি কি তার কথা চুপচাপ শুনেছিলাম।
একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক যাকে দেখলে অন্য অনেক অধ্যাপকের হাঁটু কাঁপে এবং অবশ্যই তিনি আমার মরহুম আব্বার থেকেও অন্তত ত্রিশ বছরের সিনিয়র তার সম্মানও আমি রাখি নি। উপস্থিত প্রায় ত্রিশজন মানুষের সামনে তাকে বলেছিলাম ‘এই শুয়োরের বাচ্চা আমার জীবনে আমি ঠেলা গাড়ি চালাই কিংবা টয়লেট ক্লিন করি নাকি সন্ত্রাসী করে বেড়াই সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেওয়ার তুই কে?’
একটু আগে গুনগুণ করে সায় দিতে থাকা অনেক আত্মীয় এবং উপস্থিত সবাই এবার পুরো স্তব্ধ হয়ে গেল। অল্প সময়ের ব্যবধানে পুরো উঠোন ফাঁকা হয়ে গেল। আসলে প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে কিংবা মেয়ে বিশেষ করে বড় ছেলে আর মেয়ের জীবন ধ্বংসের পেছনে এমন কিছু শুয়োরের বাচ্চা হাত থাকে। কিন্ত তারা এতোটাই নম্র, বিনয়ী আর ভদ্র যে শুয়োরের বাচ্চাদের স্বনামে ডাকতে পারে না।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে আমি কি কাজটা ভাল করেছিলাম? অবশ্যই কাজটা সঠিক হয়নি। কিন্ত সে সময়ের বিচারে এর থেকে ভাল কিছু আমার জন্য করারও ছিল না। কিন্ত তখন আমার জন্য সবথেকে জরুরি ছিল সিদ্ধান্তহীনতায় না ভুগে কঠিন এবং বিপত্তিকর হলেও একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া। আর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিতে গিয়ে এমনভাবেই ভাবা উচিত বলে আমি মনে করি।
আজ তিনজন এলাকার ছোটভাই অনেক আক্ষেপ করে বলল ‘রূপপুর পরমাণু কেন্দ্রে যেসব লেবার কাজ করছে তাদের বেতন ৫০ হাজার টাকার উপরে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে কি করলাম’। আমি তাদের বললাম তোরা চাইলে এখনও এই লেবার হিসেবেই সেখানে কাজ করতে পারিস। তোদের কে বলেছে ঢাকায় থেকে নামমাত্র বেতনে কুকুর শেয়ালের জীবন যাপন করতে?
তারা ক্ষেপে গেল চরম। আসলে সমস্যাটা ওদের না, একেবারে শৈশব থেকেই উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এদের এই অমানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। তারা মনে একরকম শ্রেষ্ঠত্বের মানসিক দাসত্বে বন্দী থাকে। তারা নিজের বাইরে অন্য মানুষকে অনেক ছোট করে দেখতে পছন্দ করে।
তারা কৃষিকাজ থেকে শুরু করে গৃহস্থালী সব কাজকে ছোট করে দেখে। তাই বেশিরভাগ পরিবারের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া দোপেয়ে জানোয়ার ছেলে তার বাবার হাত থেকে টান দিয়ে বাজারের ব্যাগ নেয় না। তেমনিভাবে জানোয়ার মেয়ে তার মায়ের গৃহস্থালী কাজে তাকে সাহায্য করে না।
বেলাশেষে সন্তান জন্মদান করাটা হয় তাদের জন্য অভিশাপ যা তাদের অবস্থানকে দাস-দাসীর পর্যায়ে নিয়ে যায়। একবার এই দাসত্বের শেকলে জড়ালে তারা শেষ অবধি একমাত্র মৃত্যুবাদে মুক্তি পায় না। অন্যের মেয়ের দোষ দেওয়া সহজ তাই সব শশুর শাশুড়ি তার পুত্রবধুর ব্যাপারে অভিযোগ করে। কিন্ত বাইরে থেকে বিয়ে করে আনা অন্যের মেয়ের পাশাপাশি তাদের নিজের ছেলেও সমানভাবে দোষী এই কথাটা স্বীকার করার সৎসাহস কারও থাকে না।
বড় হলে ষাঁড় কিংবা পাঁঠার বিচি পোক্ত হয়। আর মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের সন্তানের সিংহভাগ ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয় বেয়াক্কেলপনা। তারা হাতে পায়ে একটু বেড়ে উঠার পাশাপাশি শরীরে থলথলে গোস্ত লাগলে তখন থেকেই নিজেদের স্বাধীন মনে করে। তারা ভাবে সবকিছুতেই তাদের ইচ্ছামতো চলার অধিকার আছে কিন্ত টাকাটা নিতে হবে বাপ-মায়ের কাছ থেকে। তাই বিয়ের আগে কিংবা পরে এসব ছেলে কিংবা মেয়ে প্রায় সবার কাছে মা-বাবা হয়ে ওঠেন এটিএম কার্ডের মতো।
তাদের মা-বাবা থেকে জড়বস্তুবৎ এটিএম কার্ডে পরিণত হওয়ার জন্য তারা নিজেরাই দায়ী। কারণ গুরুত্বপূর্ণ সময়টা তারা পার করেছেন অর্থ উপার্জনে। আর সন্তানের ভবিষ্যত বলতে শিক্ষার বদলে সঞ্চিত অর্থকেই বুঝেছেন বেশি। তারা সন্তান কোন বিষয়ে পড়তে সেটার সঙ্গেও অর্থ উপার্জনের সুযোগকে গুলিয়ে ফেলেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। ফলে ঘাড় ধরে সন্তানের তীব্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে ডাক্তারি কিংবা প্রকৌশলবিদ্যায় ভর্তি হতে বাধ্য করেন।
মানুষের এমন অদ্ভুত দ্বৈত চরিত্র মাঝে মাঝে আমাকে অনেক ভাবায়। গত মাসখানেক ধরে আমার জীবনের সবথেকে প্রিয় মানুষগুলোর কেউ আমার কাছে নাই। আমার দাদা আর আব্বা চলে গেছেন চিরতরে, ঢাকা থেকে আসার পর বড় চাচা দূরে, আমার প্রিয় শিক্ষকের সঙ্গেও দেখা হয়না মাস চারেকের বেশি। মায়ের সঙ্গে থাকলেও আমার প্রিয় বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার সুযোগ কম।
সবকিছুর উর্ধ্বে আমার প্রিয়তমা স্ত্রী আর একমাত্র সন্তানের থেকেও দূরে আছি মাসখানেকের বেশি সময় ধরে। এতে করে বুঝতে পারছি মানুষ তার জীবনের জঘন্য সত্যগুলো তখন বলে যখন চরম একাকীত্ম তাকে কুরে কুরে খায়। কিংবা সে বিশ্রিরকম নেশাগ্রস্ত হয়ে জীবনের সব যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে চায়।
একজন মুসলিম এবং বিবেকবান মানুষ হিসেবে নেশাগ্রস্ত হয়ে জীবনযন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাওয়ার সুযোগ নাই। তাছাড়া আলহামদুলিল্লাহ আমার জীবনে কোনো যন্ত্রণাও নাই। আছে কিছুটা একাকীত্ব যা আমি অনেকটা উপভোগও করি কোনো বইপত্র পড়া কিংবা সৃষ্টিশীল কাজের মধ্য দিয়ে।
পরিশ্রমের ফলে এখন রাত্রিশেষে ফজরের পর পর ঘুমাতেও পারি বেশ। তারপরেও এসব কথা লিখছি কেনো? লিখছি এজন্য যে এর থেকে কেউ যদি বিন্দুমাত্র শিক্ষা নিতে পারে, কিংবা কিছু না হোক একটুখানি সাহস পায়!! তার থেকেও বড় কথা নিজ জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার মতো সততা তাদের মাঝে জন্ম নেয়।
যেমন, পুরোটা সেশন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পর চাকরি না পেলে তারা মা বাপের দোষ না দেয়। এক দশক প্রেম করার পর বিয়ে কথা উঠলে মা-বাবা মেনে নেবে না এমন কুত্তামিমার্কা কথা না বলে। কিংবা প্রেমিকার চাকরি নাই তাই কোনো বড়লোক টাকলু বেটার হাত না ধরে।
তারপর ঐ টাকলু বেটা তার সুন্দরী স্ত্রীকে সন্দেহ করলে মেয়েটা যেন কম্বল মুড়ি দিয়ে প্রতিরোধযুদ্ধের নামান্তে সাবেক প্রেমিককে বাবু খাইছো না করে। ভাল কিংবা খারাপ। রাত কিংবা দিন। আলো কিংবা অন্ধকার এর থেকে একটাকে বেছে নেওয়ার মতো সাহস যেন জন্ম নেয় তাদের মাঝে। আমার ধারণা অনেকে এটা থেকে বিরক্ত হবে, কেউ কেউ সাহস পাবে। যারা শৈশব থেকে সাহসী তারা আরও প্রাণিত হবে। আর কারও কাছে ফাও প্যাঁচাল মনে হলে তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন সহজেই।
শৈশব থেকে একটা জীবনের সংগ্রাম অনেক কিছু শিখিয়েছে। তাই কোনোদিন শিব খেরার বই আমাকে পড়তে হয়নি। আমি জয়ের জন্য লড়তাম ঠিকই, কিন্ত প্রতিদিন প্রস্ততি নিয়ে রাখতাম যেকোনো মুহুর্তে পরাজিত হওয়ার। তেমনি কোনো ইংরেজি শিক্ষার বই কিংবা শিক্ষকের কাছে ইংরেজি শিখতে যাইনি। এমনকি এখনও ইংরেজিকে সাধারণ একটা ভাষা হিসেবেই দেখি এর বেশি কিছু না। তবে যদি আগ্রহ নিয়ে অন্য কোনো ভাষা শিখতাম তা নিঃসন্দেহে আরবি, স্প্যানিশ, ফারসি কিংবা জার্মান। যার কোনোটাই আমি পারিনা।
গভীর রাতের নীরবতা তছনছ করে যেই গানগুলা বাজতে থাকলে কাজে মন বসে, একাগ্রতা আসে। গোলাম আলীর এই গানটা হয়তো তেমনই। মাঝে মাঝেই রাত দুটোর পর গানটা শুনতে দেখতাম আব্বাকে। চুপচাপ ওয়েস্টার্ন বই পড়তেন আর ক্যাসেট প্লেয়ারে বাজতো গুলাম আলী কিংবা মেহেদি হাসানের গান। আব্বা পঙ্কজ উদাসের গান কেনো যেন সহ্য করতে পারতেন্না, কিন্ত আমার ভাল লাগতো।
রূপ কুমার রাথোর সবে গান গাওয়া শুরু করেছেন। তার একটা অডিও টেপ আমাদের বাড়িতে ছিল। কিন্ত আব্বার ধমকের ভয়ে বাজাতে পারতাম না। পড়ালেখা কিংবা অন্য যাই হোক আমিও রাত জাগতাম সেই স্কুল জীবন থেকেই। মাঝে মাঝে আব্বা ডাকতেন, ডেকে নানা কথা বললেও জেগে আছি কেনো এই প্রশ্ন করেন নাই।
অনেকে আব্বাকে বারবার সতর্ক করেছে তোর বড় ছেলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সে বাজে ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা দেয়, গাঁজাখোরদের সঙ্গে বেড়ায়, পাকশী ঘাটে গিয়ে মারামরি করে আসছে আব্বা তাদের কথা কানেও তোলেননি কোনোদিন। মনে পড়ে সেদিনের গল্প যেদিন কে একজন আব্বাকে বলেছিল তোর ছেলে এস এস সিও পাস করবে না। আব্বা সেদিন তাকে বলেছিল ‘আমার ছেলে এস এস সি ফেল করুক, আর পিএইচডি করুক তোর কি? নিজের বাড়ি যা গিয়ে নিজের ছেলেমেয়ের দিকে খেয়াল দে, দেখ আবার পালিয়ে না যায়’।
সময় পাল্টে গেছে। আব্বার এমন বিভ্রান্তিকর কিন্ত সত্য কথাগুলো অনেক মনে পড়ে। একদিন বকুলতলায় বসে আব্বা রামধোলাই দিলেন কমরেড জসীম মণ্ডলকে। তাই দেখে রবিউল হুজুর এগিয়ে এসে একটু হাততালি দেওয়ার চেষ্টা করতেই তাকে বললেন তুমি থামো রবিউল। জসিম ভাই আর তোমার ধান্দা একই। তোমরা চ্যাংড়া ছেলেমেয়েদের বিভ্রান্ত করো। সেদিক থেকে জসিম ভাইকে কম লোক পাত্তা দেয়, তোমাদের পেছনে বেশি লোক আছে।
আব্বার শোনা গানগুলো একটা সময় বিশ্রি লাগতো। মনে হতো এইসব হাউমাউ খাউ শুনে আব্বা কি মজা পান। বিশেষ করে মেহেদি হাসান, নুসরত ফতেহ আলী খান, গুলাম আলী, মোহাম্মদ রফি কিংবা মুকেশের গান। তবে লতা মুঙ্গেশকর, কিশোর কুমার আর জগজিৎ শিঙের গান আমারও ভাল লাগতো। যাই হোক এখন ধীরে ধীরে আব্বার শোনা গানগুলো নতুন করে শুনছি। বিরক্তি তো লাগেই না, বরঞ্চ বেশ ভাল লাগছে বর্তমান সময়ে যে কারও চেয়ে।
(Visited 8 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *