শিক্ষায় ভ্যাট, পে-স্কেল ও আন্দোলনের যৌক্তিকতা

নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের একাংশের বাঁধভাঙা উল্লাস, বামদলগুলোর শ্রেণীভেদ দূরীকরণের দাবিতে প্রেস ক্লাবের সামনে কর্মসূচি আর শিক্ষকদের স্বতন্ত্র পে-স্কেলের দাবি একসঙ্গেই উঠেছে। প্রত্যেকে পক্ষে বিপক্ষে বলতে পারেন, তবে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা সাংস্কৃতিক সংবাদের দিকে যদি দৃষ্টি দেয়া যায়, তবে ঘুরে ফিরে এ বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা মিলবে সুন্দরভাবেই। বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ফি-বেতনে ভ্যাট আরোপ এবং শিক্ষকদের বেতন কাঠামো ও মর্যাদার প্রশ্নে বলা যায় দেশ এখন উত্তাল।

যে যা-ই বলুক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্দোলন অনেক দিক থেকেই যৌক্তিক। বিশেষ করে মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকদের মানসম্মানের প্রশ্ন যেখানে উঠেছে, সেখানে একটু উচ্চবাচ্য করা অনেক দিক থেকে যৌক্তিক। লালফিতার দৌরাত্ম্যে নাকাল জাতি বেতাল ভঙ্গিমায় দেখছে সরকারি আমলাদের ক্ষমতা ও অর্থযোগের উল্লম্ফন। তাদের এহেন সরব আগমন সত্যি আমাদের আশাবাদী করে। তারা দাবি করছেন নতুন পে-স্কেল শিক্ষকদের পেটে এবং পিঠে দু’দিকেই লাথি মেরেছে অর্থাত্ বেতন-সম্মান দুটোই পড়তির দিকে। বর্তমান অর্থমন্ত্রীর উক্তি উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢেলেছে। তিনি কোনো যুক্তির ধার না ধেরে বিবেক থেকে আবেগকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। বলেছেন, শিক্ষকদের নাকি জ্ঞান-বুদ্ধি কম, তাই এ আন্দোলন। দেশের শিক্ষক মহোদয়, আপনাদের ভাগ্য ভালো, তিনি সরাসরি রাবিশ কিংবা খবিশ বলে সম্বোধন করেননি, শুকরিয়া আদায় করুন।

বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন থেকে হতাশার কালো মেঘ সরছে না বহুদিন থেকে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা কোথাও আস্থার সংকট কাটেনি, বরং বেড়েছে দুর্বিপাক। শিশু-শিক্ষার ক্ষেত্র থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসেও একই চিত্র, শিক্ষকরা সব বোঝেন ও বোঝান, তবে পাঠদানে আগ্রহ কম। একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার শেষ ধাপ অবধি শিক্ষকদের আদর্শগত বৈরিতা, স্বার্থান্বেষী ভাব, দলীয় আধিপত্য বিস্তারের অপচেষ্টা, প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ, সন্তান থেকে শুরু করে পরিবারের অযোগ্য সদস্যদের চাকরিতে নিয়োগ, ছাত্র সংগঠনের আধিপত্য বিস্তারের নোংরামিতে সম্পৃক্ত হয়ে পড়া, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে দুর্বৃত্তায়ন, শ্রেণীকক্ষে পাঠদান না করে বাইরের কোনো কাজে যুক্ত থাকা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পক্ষপাতমূলক আচরণ করা, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে সিন্ডিকেট তৈরি ও দুর্নীতি, পাঠদান ছেড়ে প্রকল্পনির্ভর হয়ে পড়া, শিক্ষার্থীদের বসিয়ে রেখেও যথাসময়ে ক্লাসে না আসা, যৌন নিপীড়ন ইত্যাদি শিক্ষকদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ দেখে গুমরে কাঁদছে দেশবাসী। এমন পরিস্থিতিতে উপযুক্ত সম্মানের দাবিতে যখন শিক্ষকরা মাঠে নেমেছেন, তখন পরিস্থিতি হয়ে গেছে এমন ‘অরাজকতার রাজ্য, কেউ করে না নিজ কার্য, কে করিবে কাহার বিচার’।

আমি মনে করি, একজন দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তি হিসেবে বর্তমান সরকারের মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সম্মানিত শিক্ষকদের নিয়ে যে কথা বলেছেন, তা অগ্রহণযোগ্য ও অনভিপ্রেত এও মেনে নিচ্ছি যে, বেতন কমিশনের রিপোর্ট এবং সচিব কমিটির সুপারিশমালা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন কাঠামোটিতে যা যুক্ত করেছে, তা নিঃসন্দেহে হতাশার। সেখানে সিলেকশন গ্রেড বাদ দিলে সপ্তম বেতন কাঠামোর তুলনায় দুই ধাপ নিচে পদায়ন করা হয়েছে সম্মানিত শিক্ষকদের।

অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোয় গ্রেড-১ আর আগে বসানো হয়েছে আরো দুটি গ্রেড, যেখানে সম্মানিত অধ্যাপকদের ছাপিয়ে মুখ্য সচিব/মন্ত্রিপরিষদ সচিব আর সিনিয়র সচিবের উত্থান কখনো কাম্য ছিল না। এক্ষেত্রে বেতন ধরা হয়েছে যথাক্রমে ৯০ হাজার ও ৮৪ হাজার টাকা; যার পর পদায়িত এবং অপদায়িত সচিবদের বেতন যথাক্রমে ৭৮ হাজার ও ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিকে বেতন কাঠামোয় সিনিয়র সচিবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেকশন গ্রেড অধ্যাপকদের মতো বেতন উত্তোলন করতে পারলেও বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকদের ক্ষেত্রে সিলেকশন গ্রেড উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। আর পদমর্যাদা নির্ধারণ করা হয়েছে ওএসডি সচিবদের। এ হিসাবে অধ্যাপকরা বেতন পাবেন ৭৫ হাজার টাকা। এ হিসেবেই পদায়ন করে অন্য অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক এবং প্রভাষক।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এই গ্রেড অবনমনের পক্ষে অনেকে অনেক যুক্তি দেখালেও সেটা শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকে না। হয়তো শিক্ষকদের অমনোযোগী অবস্থান, ক্লাস না নেয়া কিংবা বাইরের প্রজেক্ট-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে যুক্ত থাকার অজুহাত তোলা হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিন্তু দুই ধরনেরই আছেন। কেউ কেউ শুধু শিক্ষার্থীদের পেছনে সর্বস্ব উত্সর্গ করে ছাড়েন, তেমনি কেউ কেউ রয়েছেন যতটুকু ফাঁকি দেয়া যায় তার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। তাই দু-একজনের ক্লাস না নেয়ার ব্যাপারটাকে সামনে এনে যে অজুহাত আমলাদের তরফ থেকে দেখানো হয়েছে, সেটা অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন। হ্যাঁ, দলীয়-পারিবারিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত দুর্বৃত্ত শিক্ষকদের প্রমোশন দ্রুত হয়, তারা শিক্ষার্থীদের তৈরি করা অ্যাসাইনমেন্ট চুরি করে গবেষণা প্রবন্ধ বানাচ্ছেন, ক্লাস নিচ্ছেন না। এ ঘটনা যতটা ঠিক, তার চেয়ে ঢের ঠিক কিছু শিক্ষক আছেন, যারা দেশের ভেতরে-বাইরে উপযুক্ত গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি নিচ্ছেন। আর নিয়ম মেনেই পাচ্ছেন প্রমোশন। এক্ষেত্রে সাধারণীকরণ করে সবাইকে দোষারোপ করার সুযোগ নেই।

লজ্জার বিষয় হলেও সত্য, এক-আধজন বেপারি শিক্ষকের নাম তুলে চিত্কার চেঁচামেচি হচ্ছে এখন। কিন্তু কেউ কি ভেবে দেখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মাত্র ১ শতাংশ গবেষণা বরাদ্দ নামান্তরে একজন সিনিয়র প্রফেসরের ১ হাজার ৫০০ টাকা গবেষণা ভাতায় কী করে গবেষণা সম্ভব? একটু মজা করে বললে, গবেষণা দূরে থাক, এই টাকায় হারিয়ে যাওয়া গরু খুঁজে বের করাও সম্ভব না। বলে রাখা ভালো, একজন থিসিস শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র ৪ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকে, যেখানে গবেষণার জন্য নির্ভর করতে হয় নিজের পকেটের উপরেই। তাই এ প্রতিবন্ধকতা জয় করে কেউ যে নামমাত্র গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন, সেটাও অপার বিস্ময়। সবচেয়ে বড় কথা, যাদের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম হচ্ছে, যাদের খুঁটির জোর দেখিয়ে কিছু শিক্ষক ফাঁকিবাজি করছেন, তারাই আবার বড় গলায় চিত্কার চেঁচামেচি করছেন যে, শিক্ষকদের মান অবনমন ঠিক আছে। বলতে গেলে, এত দিন রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিরা শিক্ষকদের জামা-গেঞ্জি-কলার ধরে টেনেছিলেন; এখন আমলারা সম্মানিত শিক্ষকদের কাছা ধরে টান দিতে শুরু করেছেন; যুক্তিও দেখাচ্ছেন সপক্ষে। কিন্তু কেন?

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়ার অজুহাতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন কমানোর দাবিটা অযৌক্তিক ও বিভ্রান্তিকর। কারণ সব শিক্ষক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতে পারেন না, অনেকে পারলেও ইগো প্রব্লেমের কারণে নেন না। ৬-১০ শতাংশ শিক্ষকের অতিরিক্ত আয়ের দায় নিয়ে বাকিদের বেতন কমানো হবে কেন? দুর্নীতির টাকাকে যে দেশে ‘স্পিড মানি আর নট ব্রাইব’ বলে স্বয়ং অর্থমন্ত্রী হালাল করে দিয়েছেন, সে দেশে অধ্যাপকের সংখ্যা কত হবে, সেটা যদি আমলারা একটা কথায় হালাল করে দিতে চান; তবে লজ্জায় মাথা কাটা যায় না। অন্যদিকে অনর্থক করারোপ করে শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যাহত করার যে চেষ্টা, সেটার প্রতিবাদ করতে গিয়েও ভাষা হারাতে হয় বারবার।

এগুলো থেকে স্পষ্ট হয়েছে, অষ্টম বেতন কাঠামো জাতির জন্য কোনো আশার কথা বলে না। অন্তত এর সঙ্গে গভীর উত্কণ্ঠা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজস্ব আয় বৃদ্ধির সুপারিশ করাকে; যা নামান্তরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষা থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার দিকে ঠেলে দেয়ার নামান্তর। আর ঝেড়ে কাশলে সেশন চার্জ, ভর্তি ফরম, ভর্তি ফি, মাসিক বেতন, পরীক্ষা ফি, লাইব্রেরি ফি, হল ভাড়া, সব ধরনের প্রণোদনা বাতিল, আবাসন খরচ বৃদ্ধি এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। কিছু সংখ্যক শিক্ষকের দায় নিয়ে যেহেতু সবাইকে দোষারোপ করা হচ্ছে, সেহেতু তাদের সঠিক পথে আনলেই হয়। দাবি করা হচ্ছে, শিক্ষকরা ক্লাস নিতে চান না। এক্ষেত্রে উপযুক্ত হাজিরা পদ্ধতি থাকলে তারা অবশ্যই ক্লাস নেবেন।

অর্থমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট অনেকে সিনিয়র শিক্ষকদের সংখ্যা বৃদ্ধির কথা বলেছেন, কিন্তু প্রশাসনে এ অবস্থা আরো ভয়াবহ। ৬ মে প্রশাসনে সর্বশেষ পদোন্নতির পর দেখা গেছে, উপসচিবের ৮৩০টি পদের বিপরীতে ১ হাজার ৬২৩ জন, যুগ্ম সচিবের ৪৩০টি পদের বিপরীতে ১ হাজার ১৬৬ জন, অতিরিক্ত সচিবের ১০৭টি পদের বিপরীতে ৪৫৭ জন কর্মরত। অফিসে গিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে তাদের অনীহাও চোখে পড়ার মতো। এমন অনেক সচিব রয়েছেন, যারা বছরের বেশির ভাগ সময় দফতরে পদধূলি দিতেই ভুলে যান। এদিকে শিক্ষার্থীদের ক্লাস না করার জন্য যে অ্যাটেনডেন্স মার্কিং রয়েছে, তেমনি শিক্ষকদের বেতন নিশ্চিত করতে ফিংগার প্রিন্ট অ্যাটেনডেন্স সিস্টেম চালু করা হোক। কিংবা সরকার চাইলে একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে পাঞ্চকার্ড সিস্টেমে শিক্ষকরা ক্লাস নিচ্ছেন, এটা নিশ্চিত করতে পারে। অন্তত এসব অজুহাত বাদ দিয়ে সরকার শিক্ষকদের উপযুক্ত মর্যাদায় আসীন করে ক্লাস-পরীক্ষা নেয়ার বাস্তব পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। এখানে প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছার। অ্যাটেনডেন্স পাঞ্চিং সিস্টেম চালুর বিরুদ্ধে কোনো শিক্ষক কথা বললে তাকে হঠকারী হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। কিছু শিক্ষকের ফাঁকিবাজির দায় সবাই নেবে কেন? তাদের হঠকারিতার দায়ে সবার বেতন স্কেল ও সম্মান অবনমনের যুক্তি নিরর্থক, হাস্যকর ও নজিরবিহীন। একইভাবে মনে রাখতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, সেখানে অনর্থক করারোপ করে শিক্ষার চেয়ে বাণিজ্যকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার প্রবণতা কখনই কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না।

(Visited 18 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *