বাংলাদেশের জলদুর্গ

সূর্যাস্তের একটু আগে কিংবা পরে কফির মগ হাতে নিয়ে সন্ধ্যাযাপনের শহুরে দিনলিপি; শাওয়ার না থাকলে বালতি থেকে পানি তুলে গোসল করতে গেলেও লাগে মগ— ইতিহাসের ‘মগ’ জলদস্যুদের সঙ্গে এর দুস্তর ফারাক। আজকের উত্তপ্ত আরাকানের রক্তাক্ত জনপদে আদিবাসী রোহিঙ্গা জাতিসত্তার প্রতিটি কান্নার সঙ্গে মিশে আছে যে রাখাইনদের নাম, ইতিহাসে মগদের অবস্থানও ঠিক তেমনি পাশবিক, বর্বর ও নৃশংস। সপ্তপয়কর চন্দ্রাবতীর অমর স্রষ্টা আলাওল কিংবা লোরচন্দ্রানী আর সতীময়নার রূপকার দৌলত কাজীকে মিলিয়ে আরকান আর মগদের একীভূত করার সুযোগ নেই। প্রত্নতাত্ত্বিক চর্চা ও মধ্যযুগের অধ্যয়ন আমাদের সামনে সে সুযোগ রাখেনি।

এত জনপদ থাকতে মগরা বাংলার দিকেই হামলে পড়ল কেন? তারা এত দেশ থাকতে কেবল বাংলার জনপদে আক্রমণ, লুণ্ঠন, খুন ও ধর্ষণ করে বিপর্যস্ত করার চেষ্টাই-বা চালিয়েছে কেন? এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর একটাই, তা হলো ভৌগোলিক কারণ। আর পর্তুগিজ জলদস্যুরা সমুদ্রপথে এ জনপদের দিকে পা রাখত। তারা দাস ব্যবসার জন্য সহজ মোকাম বানিয়ে ফেলেছিল আরাকানকে। সেখান থেকে তারা সহজেই মগদের ধরে আনা নারী-পুরুষ ও শিশুকে নিয়ে গিয়ে ইউরোপের নানা দেশে বিক্রি করত। দীনেশ চন্দ্র সেন তার বৃহত্ বঙ্গে বর্ণনা করেছেন, ‘মগদস্যুরা পর্তুগিজদিগের সঙ্গে যোগ দিয়া দেশে যে অরাজকতা সৃষ্টি করিয়াছিল তাহা অতি ভয়াবহ। তাহাদের স্পর্শদোষে অনেক ব্রাহ্মণ পরিবার এখনও পতিত হইয়া আছেন। বিক্রমপুরের মগ-ব্রাহ্মণদের সংখ্যা নিতান্ত অল্প নহে। মগ ও পর্তুগীজদের ঔরসজাত অনেক সন্তানে এখনও বঙ্গদেশ পরিপূর্ণ। ফিরিঙ্গিদের সংখ্যা চট্টগ্রাম, খুলনা ও ২৪ পরগনার উপকূলে, নোয়াখালীতে, হাতিয়া ও সন্দ্বীপে, বরিশালে, গুণসাখালী, চাপলি, নিশানবাড়ী, মউধোবি, খাপড়াভাঙ্গা, মগপাড়া প্রভৃতি স্থানে অগণিত। ঢাকায় ফিরিঙ্গিবাজারে, তাহা ছাড়া কক্সবাজারে ও সুন্দরবনের হরিণঘাটার মোহনায় অনেক দুস্থ ফিরিঙ্গি বাস করিতেছে।’ এ থেকে মোগল-পূর্ব বাংলায় মগদের দৌরাত্ম্যের ঘটনা স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব।

ধাওয়া থেকে ধাওনী শব্দটি এসে থাকতে পারে। হিংস্র ও বর্বর মগদের তাণ্ডব রুখতে স্বাধীন সুলতানি আমল থেকে শুরু করে বারভূঁইয়া সময়কালে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখেন মোগলদের নিয়োগকৃত সেনানায়ক ইসলাম খান চিশতি। বাংলার সুবাদার হিসেবে ইসলাম খান চিশতি দায়িত্ব গ্রহণ করেন সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে। সময়কালটা খুব সম্ভবত ১৬১০ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে। তিনি সুবা বাংলার রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করার পাশাপাশি ফিরিঙ্গি, আরাকানের মগ, দিনেমার, ফরাসি ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আক্রমণ রুখতে জলপথ নিরাপদকরণে সক্রিয় হয়েছিলেন। এসব জলদস্যুর বেশির ভাগ তখন ঢাকার উপকণ্ঠে আক্রমণ ও লুটতরাজ করত। তারা অপকর্ম সেরে বেশির ভাগ সময়ে নদীপথে পালিয়ে যেত। অন্যদিকে বাংলার নদ-নদীবেষ্টিত ভৌগোলিক প্রতিবেশ অশ্বারোহী বাহিনী নির্ভর মোগলদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে দেখা দিয়েছিল। একটা পর্যায়ে কুশলী সেনানায়ক ইসলাম খান বুঝে গিয়েছিলেন, এসব জলদস্যুকে রুখতে হলে নদীপথ নিরাপদ করার বিকল্প নেই।

সম্রাট আকবরের সময়ে বাংলায় নৌবাহিনী প্রেরণের যে কাজ শুরু হয়েছিল, তা মূলত পূর্ণতা পায় ইসলাম খানের মাধ্যমে। আকবর জলপথের নিরাপত্তার জন্য তিনি যে বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার প্রধান ছিলেন মীর-ই-বহর তথা নৌ অধ্যক্ষ। অতীতে মোগলদের নানা ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সবার আগে জলপথ নিরাপদ করতে সচেষ্ট হন ইসলাম খান। তিনি সবার আগে ঢাকার নিরাপত্তায় কোনো ফাঁকফোকর রাখতে চাননি। তিনি এ সময় যে উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তার মধ্যে জলদুর্গের চিহ্ন হিসেবে টিকে আছে মুন্সীগঞ্জ এবং নারায়ণগঞ্জে নির্মিত তিনটি দুর্গ— সোনাকান্দা, ইদ্রাকপুর এবং হাজিগঞ্জের ধ্বংসাবশেষ।

মগ সন্ত্রাসীদের দমন করতে বাংলার যে জলদুর্গ নির্মাণ করা হয়েছিল, তার মধ্যে সবার আগে আসে ইদ্রাকপুর দুর্গটির নাম। বর্তমান ঢাকা থেকে প্রায় ১৫ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে মুন্সীগঞ্জ জেলা সদরের ইছামতী নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত এটি। মুন্সীগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিস এবং মুন্সীগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমির কাছাকাছি এর অবস্থান। নির্মাণকালে ইছামতি নদী দুর্গের পাশ দিয়ে বয়ে যেত বলে গবেষকদের দাবি। তবে এখন নদীটি অনেক পূর্বদিকে সরে গেছে। নদী মরে গিয়ে বালুচরে পরিণত হওয়ার পর সেখানে এমনভাবে শহর বিস্তার লাভ করছে, তাতে অতীত চিহ্ন প্রায় বিলুপ্ত। অন্তত সেখানকার বর্তমান অবস্থা থেকে বোঝার উপায় নেই এককালে দুর্গটি ঠিক এখানেই নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছিল। বাংলার প্রাচীন স্থাপনার তালিকার তথ্য অনুসারে এটি সম্রাট আওরঙ্গজেব নির্মাণ করেছিলন। তবে প্রচলিত তথ্যমতে, বাংলার সুবাদার মীর জুমলা ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে মগ জলদস্যুদের প্রতিহত করতেই দুর্গটি নির্মাণ করেছিলেন। ইসলাম খানের ঢাকা আগমনের পর পর থেকে মগ ধাওনী কতটা সক্রিয় হয়েছিল, এ দুর্গটি নির্মাণের পর তা স্পষ্ট হয়েছে।

গঠন কাঠামো পর্যালোচনা করে কেউ কেউ দাবি করেন, ইদ্রাকপুরের দুর্গটি সতেরো শতকের মধ্যভাগে তৈরি করা হয়েছিল। এখানে নির্মাণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে পোড়া ইট। এখানে পাথরের ব্যবহার তেমন নেই বললেই চলে। প্রধান প্রবেশ পথের ভেতর দিকে উপরের অংশে দরজা আটকে রাখার জন্য খিলানের প্রায় উত্থানরেখা বরাবর ছিদ্রযুক্ত দুই খণ্ড পাথর সংযোজন করতে দেখা যায়। খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে, নারায়ণগঞ্জে নির্মিত হাজীগঞ্জ দুর্গ এবং সোনাকান্দা দুর্গেও এমন পাথর ব্যবহার করতে দেখা গেছে। আয়তাকারে নির্মিত দুর্গটি পূর্ব ও পশ্চিম দুই ভাগে বিভক্ত। পশ্চিম অংশটি আয়তনে অপেক্ষাকৃত বড় আর উত্তর-দক্ষিণে এটি গাঠনিকভাবে অপেক্ষাকৃত প্রলম্বিত। তবে ইদ্রাকপুর দুর্গের সীমানাপ্রাচীর ভূমি থেকে খুব একটা উঁচু নয়। হিসাব করলে দেখা যায়, সোনাকান্দা কিংবা হাজীগঞ্জ দুর্গের থেকে অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতার প্রাচীর রয়েছে দুর্গটির। প্রাচীরের শীর্ষে শরছিদ্র তথা মার্লন থাকলেও দেয়ালে তেমন বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত কোনো ফোকর চোখে পড়ে না। এখানে কেবল প্রতিটি মার্লনের মাঝবরাবর একটি এবং দুটি মার্লনের মাঝখানে উপর-নিচে দুটি সরু ছিদ্র দৃষ্টিগোচর হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকদের ধারণা, এ ছিদ্র দিয়েই আগত মগদস্যুদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হতো। এখান থেকে তাদের ওপর তীর নিক্ষেপ করা গেছে কিনা, তা নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই। তবে এখান থেকে বাইরে শত্রুর আনাগোনা বোঝামাত্র ওয়াচ টাওয়ার থেকে কামান দাগা হতো বলে মনে করেন কেউ কেউ।

ইদ্রাকপুর দুর্গের চার কোণে যে চারটি ফাঁকা উন্মুক্ত বুরুজ রয়েছে, সেখান থেকেই মগ ধাওনীর সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে কামানের গোলা নিক্ষেপ করা হয়েছে। সাতটি বিশালাকৃতির ছিদ্রযুক্ত বুরুজ ভূমি থেকে ৪ দশমিক ৬০ মিটার উপরে অবস্থিত এবং এর ব্যাস ৫ দশমিক ৫০ মিটার। প্রতিটি কোনার বুরুজে ১৬টি করে মার্লন ফলক রয়েছে। এ বুরুজের অন্যতম কাজ ছিল— নির্মাণকে মজবুত করা থেকে শুরু করে কামানের গোলা নিক্ষেপের পাশাপাশি বাইরের অবস্থান পর্যবেক্ষণ। উত্তর দিকে রয়েছে দুর্গের পশ্চিমাংশের উঠানে পা রাখার একমাত্র পথটি। একটি প্রক্ষিপ্ত আয়তাকার প্যানেল দিয়ে প্রবেশপথটি নির্মিত। মোগল স্থাপত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে এ স্থাপনাও চতুর্কেন্দ্রিক খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার নিয়ে গঠিত। তবে প্রবেশপথের দুপাশে আটকোনা নিরেট বুরুজ রয়েছে। প্রবেশপথের শীর্ষদেশেও বিশেষ ছিদ্রযুক্ত মার্লন রয়েছে। তবে ইদ্রাকপুর দুর্গের প্রবেশপথটি সোনাকান্দা, হাজীগঞ্জ কিংবা লালবাগ প্রাসাদ দুর্গের মতো উঁচু নয়।

একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, ইদ্রাকপুর দুর্গের পূর্বাংশটি অসম আয়তাকার। অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতার প্রাচীরবেষ্টিত এ অংশের মাঝখানে রয়েছে বৃত্তাকার প্লাটফর্ম। এখানকার মার্লন হাজীগঞ্জ কিংবা সোনাকান্দা দুর্গের মতো ফাঁকা খিলানযুক্ত নয়। এখানে দেখা যায় মার্লনের মাঝবরাবর  ভেতরের দিকে একটি ছিদ্র এবং তার মধ্য দিয়ে আরো চারটি ছিদ্র করা হয়েছে। মগরা নদীপথে ঢাকার দিকে এগিয়ে আসতে চেষ্টা চালালে এ ছিদ্রগুলো দিয়ে তাদের ওপর সরাসরি কামানের গোলা নিক্ষেপের ব্যবস্থা ছিল এখান থেকে। প্লাটফর্মটি এমনভাবে তৈরি যে, কেবল ওপর থেকেই শত্রুর ওপর আক্রমণ করা যায়। আগেকার দিনে হয়তো প্রাচীর আরো উঁচু ছিল। তবে বর্তমানে বালি জমে ভরাট হওয়ায় তাকে বেশ নিচু মনে হয়। অন্যদিকে ইদ্রাকপুর দুর্গের পূর্বাংশের উত্তর-পূর্ব কোণের বুরুজের অভ্যন্তরে তিনটি ক্ষুদ্র কুলুঙ্গি রয়েছে। মাঝখানের কুলুঙ্গিটি আয়তাকার প্যানেলের মধ্যে নির্মিত এবং পাশের দুটি থেকে বড়। এমন কুলুঙ্গি সাধারণত মসজিদের মিহরাব তথা কিবলা নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা যায়। তবে স্থানস্বল্পতার কথা বিবেচনা করে ধরে নেয়া যেতে পারে, কেবল দিকনির্দেশক হিসেবেও এখানে এমন মিহরাব নির্মাণ করা হয়ে থাকতে পারে। যাহোক, অন্যসব মোগল স্থাপনার মতো এই ইদ্রাকপুর দুর্গও পলেস্তারা দিয়ে ঢাকা। প্রায় পুরোপুরি সামরিক স্থাপত্যের আদলে তৈরি বলে এখানে তেমন কোনো অলঙ্করণ চোখে পড়ে না বললেই চলে। তবে এর ছিদ্রযুক্ত মার্লনই অনেকাংশে দেয়ালের সৌন্দর্যবর্ধনে উপযুক্ত ভূমিকা রেখেছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানার কদম রসুল পৌরসভার দুই নম্বর ওয়ার্ডের সোনাবিবি রোডের পাশে সোনাকান্দায় অবস্থিত। এনায়েতনগর নামে অনেক ক্ষেত্রে পরিচিত এই এলাকাটা শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বতীরে অবস্থিত। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এর প্রকৃত অবস্থান ছিল শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্রের অতীত সঙ্গমস্থলের কাছাকাছি। বর্তমানে শীতলক্ষ্যা অনেক পশ্চিমে সরে গেছে বলে আদি অবস্থান শনাক্ত করা বেশ কঠিন। সোনাকান্দা দুর্গের আশপাশে অনেক আবাসিক ভবন গড়ে ওঠায় এর গাঠনিক বিন্যাস শনাক্ত করাও বেশ কঠিন একটি কাজ। যে কয়েকবার এখানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে, আমরা দেখেছি স্থানীয় অধিবাসীরা একে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে সোনাকান্দা কেল্লা নামে।

লোককথা ও গাথা থেকে যে ইতিহাস সূত্রের দেখা মেলে, সেখানে মূল বাস্তবতা বেশ জটিল হয়ে গেছে। বাস্তবে সোনাকান্দা দুর্গের নামকরণ সম্পর্কে উপযুক্ত ও প্রমাণসিদ্ধ তথ্য তেমন পাওয়া যায় না। ঈসা খাঁর স্ত্রী তার অনুপস্থিতিতে মোগল আক্রমণ থেকে এ দুর্গ রক্ষা করতে না পেরে কান্নাকাটি করেছিলেন খুব। সোনা বিবির কান্না থেকে এর নাম হয়েছে সোনাকান্দা। এ ধরনের অদ্ভুতুড়ে কল্পকাহিনী আমরা লোকমুখে শুনেছি বেশ। তবে তার সপক্ষে উপযুক্ত কোনো দলিল নেই বললেই চলে। একইভাবে নির্মাতা ও নির্মাণ তারিখ নিয়েও রয়েছে অনেক সন্দেহের অবকাশ। ইদ্রাকপুরের মতো সোনাকান্দা দুর্গের সঙ্গে কোনো শিলালিপির দেখা মেলেনি। ফলে এর নির্মাণ তরিখ ও নির্মাতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। পোড়া ইটের দ্বারা নির্মিত দুর্গটির প্রধান প্রবেশদ্বারের ভিত নির্মাণে এবং দরজা আটকে রাখার জন্য প্রধান ফটকের খিলানের উত্থান রেখার উপরাংশে পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। বেশ বড় আকারের এ দুর্গ উত্তর-দক্ষিণে লম্বা বড় আঙ্গিনা এবং পশ্চিমাংশে বড় আকারের পাটাতন নিয়ে গঠিত। দুর্গটির উত্তর-দক্ষিণের দীর্ঘায়িত অংশের আয়তন ৮৬ দশমিক ৫৬  বা ৫৭ মিটার। ইটের তৈরি দেয়ালের পুরত্ব ১ দশমিক শূন্য ৬ মিটার এবং উচ্চতা ৩ দশমিক শূন্য ৫ মিটার। দুর্গের চার কোণে চারটি ফাঁপা এবং উন্মুক্ত বুরুজ রয়েছে। উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের বুরুজ দুটি উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বেও বুরুজ থেকে বেশ বড়। তবে এর বড় বুরুজগুলোর ব্যাস ৬ দশমিক ৮ মিটার এবং ছোট বুরুজগুলোর ব্যাস ৪ দশমিক ২৬ মিটার। বুরুজগুলোর ফাঁকা অংশে পৌঁছানোর জন্য ২ দশমিক ৫ মিটার চওড়া রাস্তা আছে। দুর্গ জরিপকালে গিয়ে দেখেছি, বুরুজগুলোর ভেতরে নিচের অংশ পাশের সমতল অংশ থেকে একটু উঁচু। কিন্তু অল্প কিছুদিন আগে বেড়াতে গিয়ে দেখেছি, ওই মেঝের মতো কাঠামো প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।

সোনাকান্দা দুর্গের উত্তর প্রাচীরের মাঝখানে একটি সুদৃশ্য প্রবেশপথ রয়েছে, যেখানে মোগল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য মেনে একটি চতুর্কেন্দ্রিক খিলান দৃষ্টিগোচর হয়। প্রবেশপথের উপরের অংশ অর্ধগম্বুজ আকৃতির এবং একটি ফ্রেমের মধ্যে গ্রোথিত। অন্যসব মোগল স্থাপত্যের মতো এটিও একটুখানি সামনের দিকে প্রক্ষিপ্ত। প্রবেশ তোরণটি ৫ দশমিক ৫ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছে তার দুপাশের দেয়ালে কিছু ক্ষুদ্রাকৃতির কুলুঙ্গিসহ। এখানে দুর্গের দরজা বন্ধ করার পর সেটাতে ঠেস দেয়ার জন্য ব্যবহূত বিশেষ খিল ঢোকাতে দুটি বিশেষ ছিদ্রও রয়েছে। এদিকে দুর্গের পশ্চিম প্রাচীর ঘেঁষে একটি গোলাকার বেদি চোখে পড়েছে আমার। একটু খেয়াল করে মনে হয়েছে, এটি পশ্চিম দেয়ালের মাঝখানে নয়, বরং সামান্য উত্তর দিকে সরিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। খুব সম্ভব মগ জলদস্যুদের আক্রমণ যখন বেড়ে গিয়েছিল, তখন অনেক কাছাকাছি থেকে কামানের গোলা নিক্ষেপ করতে হয়েছে। এজন্যই হয়তো নদীর ঠিক তীরে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এখানে বসানো দূরপাল্লার কামান থেকে গোলা নিক্ষেপ করে জলযান নিয়ে আক্রমণ চালানো  দস্যুদের প্রতিহত করা গেছে বেশ ভালোভাবেই। এদিকে মোগল স্থাপত্যরীতি মেনে তৈরি সোনাকান্দা দুর্গটির বাইরের দেয়াল পলেস্তারায় ঢাকা। প্রবেশপথের দুপাশে সামান্য ভেতরে ঢুকানো আয়তাকার প্যানেল, প্রধান প্রবেশপথের স্প্যান্ড্রেলে অঙ্কিত ফ্রেস্কো নকশা আর দেয়ালের শীর্ষের মার্লনগুলো বাদ দিলে তেমন অলঙ্করণ নেই বললে চলে। তবে এর বৃত্তাকার বেদির বাইরের দিকের দেয়ালের উপরিভাগে অনেকটা দড়ির মতো নকশা করা হয়েছে।

দোলাই বুড়িগঙ্গা নদীতীরে অবস্থিত হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী নগরী ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে নারায়ণগঞ্জ জেলা। এখানে শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে সোনাকান্দা দুর্গের ঠিক উল্টো দিকেই শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গার সঙ্গমস্থলে গড়ে উঠেছে হাজীগঞ্জ দুর্গ। বলতে গেলে মগ ধাওনী সফল করে তুলতে বিশেষ মোগল রীতির যে গুরুত্বপূর্ণ তিন স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা, সেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই হাজীগঞ্জ দুর্গ। বর্তমানে জেলা প্রশাসকের বাসভবন এবং হাজীগঞ্জ ফায়ার সর্ভিস অফিসের মধ্যবর্তী স্থানে এর অবস্থান। নির্মাণের সময় নদী এর পাশ দিয়ে বয়ে গেলেও বর্তমানে নদী অনেকটা দক্ষিণ দিকে সরে গেছে। বেড়াতে গিয়ে দেখেছি, নদী ও দুর্গের মাঝখানে এখন গড়ে উঠেছে পাকা রাস্তা। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ভবন ঘিরে আছে এ গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ স্থাপনাটিকে।

কাকডাকা ভোরে মিরপুর থেকে দিশারী পরিবহনের বাসে চেপে বসেছিলাম। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছে যাই গুলিস্তান। তার পর বন্ধন পরিবহনে উঠে আধাঘণ্টা ব্যবধানে গিয়ে নামি নারায়ণগঞ্জ চাষাঢ়ার মোড়ে। এর পর রিকশা নিয়ে সহজেই পৌঁছে যাই দুর্গস্থলে। অবাক হয়ে লক্ষ করি, এ দুুর্গের নাম ‘হাজীগঞ্জ’ হওয়ার পেছনে উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্য নেই বললেই চলে। এদিকে একসময় নারায়ণগঞ্জের পূর্বাংশের নাম ছিল খিজিরপুর, যার সঙ্গে মিল রেখে একে খিজিরপুর দুর্গ বলেও চিহ্নিত করতে দেখা গেছে অনেককে। পোড়া ইটের তৈরি এ দুর্গটিতেও ইদ্রাকপুর ও সোনাকান্দার মতো প্রধান প্রবেশপথের খিলানের উত্থানরেখার সামান্য উপরাংশে দরজা আটকে রাখার জন্য এবং ভিতে পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানীয় লোকজন তাদের প্রয়োজনে কাজে লাগাতে এসব পাথর থেকে অনেকগুলো খুলে নিয়ে গেছে। চারপাশ ঘুরে দেখে আমার কাছে অনেকটা বেনজিনের রাসায়নিক গঠন তথা ষড়ভুজাকার বলেই মনে হয়েছে দুর্গটিকে। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক আহমদ হাসান দানি তো বটেই, পরবর্তীকালে আ ক ম যাকারিয়াও এ দুর্গকে পেন্টাগন তথা পঞ্চভুজাকার বলে দাবি করেছেন। পুরো স্থাপনাটি এমনভাবে তৈরি, যেখানে দিক নির্দেশ করাটা বেশ কঠিন। বিশেষ করে দুর্গের ভেতরে ঢুকলে মনে হয় কেমন এক দিগ্ভ্রান্ত অনুভূতি। এখানেও কামানের গোলা নিক্ষেপের কয়েকটি মঞ্চ আকৃতির কাঠামো রয়েছে। দুর্গের উত্তর দিকে অবস্থিত একমাত্র প্রবেশপথটি সোনাকান্দা দুর্গের মতো জাঁকজমকপূর্ণ নয়। তবে মোগল স্থাপত্যরীতি অনুসরণ করে এটাতেও ব্যবহার করা হয়েছে চতুর্কেন্দ্রিক খিলান। অন্যগুলোর মতো পলেস্তারায় ঢাকা এই হাজীগঞ্জ দুর্গেও খুব একটা অলঙ্করণ চোখে পড়ে না। মগ ধাওনী কার্যকর করতে শুধু সামরিক প্রয়োজনেই এটি নির্মিত বলেই হয়তো অলঙ্করণে তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি।

সোনাকান্দা ও ইদ্রাকপুরের মতো হাজীগঞ্জ দুর্গের ক্ষেত্রেও তেমন কোনো লিপি চোখে পড়েনি। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র ঘেঁটে দেখতে গিয়ে চোখে পড়ে মুন্সি রহমান আলী তায়েশের বিবরণ। তিনি উল্লেখ করেছেন, এ দুর্গ আনুমানিক ১০৭৩ হিজরি সনের দিকে তথা ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করা হয়েছিল। মুন্সি সাহেবের পথ অনুসরণ করে সৈয়দ আওলাদ হাসান বলেছেন,  দুর্গটি মীর জুমলার আমলে নির্মাণ করা হয়। তবে ঢাকা পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট গ্রন্থের সূত্র থেকে দেখা যাচ্ছে, মীর জুমলার সময়েই (১৬৬০-১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে) মগ ও হার্মাদ জলদস্যুদের ঠেকাতে তৈরি করা হয় দুর্গটি। বাংলায় দস্যুবৃত্তি দমন করতে মগ ধাওনী যখন সক্রিয় হয়, তখনই নারায়ণগঞ্জের বন্দরে সোনাকান্দা, মুন্সীগঞ্জের ইদ্রাকপুর ও খিজিরপুরে হাজীগঞ্জ দুর্গ নির্মাণ করা হয়েছিল বলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকদের দাবি।

বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক আহমদ হাসান দানি ও তাইফুরের মতে, মীর জুমলা নারায়ণগঞ্জের খিজিরপুরে দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। বিশেষত আহমদ হাসান দানি মনে করেন, সুবাদার ইসলাম খানের ঢাকায় মোগল আধিপত্য বিস্তারের অল্পদিন ব্যবধানে এখানে গড়ে ওঠে খিজিরপুর দুর্গটি। এদিকে মির্জা নাথন তার বিখ্যাত বাহারিস্তান ই গায়েবিতে উল্লেখ করেছেন খিজিরপুরে একটি রাজকীয় ঘাঁটি স্থাপনের কথা। মির্জা নাথন খিজিরপুর মসজিদে তার বিশাল সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর এবং তোপখানার কাছাকাছি একটি হস্তীশালা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সেখানে শক্তিশালী দুর্গের অবস্থান দাবি করেছেন। বিখ্যাত আকবরনামা গ্রন্থের সূত্র বিশ্লেষণ করতে গেলে দেখা যায়, মোগলপূর্ব সময়কালে খিজিরপুরের কাছে গঙ্গা নদীর দুই তীরে যখন মোগল রাজকীয় ঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছিল, সেখানেও শক্তিশালী দুর্গের অস্তিত্ব ছিল। তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যে কয়েকটি যুদ্ধে সোনারগাঁ মোগলদের অধিকারে আসে।

বাংলার ইতিহাস বিশেষ করে সুলতানি বাংলার ইতিহাসে কিংবদন্তি গবেষক অধ্যাপক ড. আবদুল করিমের দাবি সুলতানি আমলেই নারায়ণগঞ্জের অদূরে খিজিরপুরে একটি দুর্গ নির্মাণ করা হয়। তবে প্রয়োজনের খাতিরে ইসলাম খান চিশতি, মীর জুমলা ও শায়েস্তা খান এ দুর্গ সংস্কার ও আধুনিকায়নে হাত দিয়েছিলেন। সোনাকান্দা ও ইদ্রাকপুর দুর্গের গাঠনিক বৈশিষ্ট্য মোগল হওয়ায়, দাবি করা হচ্ছে এগুলো মোগল সমকালীন। আহমেদ হাসান দানি এবং অধ্যাপক ড. আবদুল করিমের অভিমত বিশ্লেষণের পাশাপাশি অধ্যাপক ড. একেএম শাহনাওয়াজের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করে আমার মনে হয়েছে, দস্যুবৃত্তি প্রতিরোধে তিন স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তাবেষ্টনী নিশ্চিতকরণই জলদুর্গ তিনটি নির্মাণের মূল কারণ। দীনেশ চন্দ্র সেনের বৃহত্ বঙ্গ থেকে উদ্ধৃত করলে প্রাচীনকালেও মগ ও তত্সংশ্লিষ্ট জনপদ থেকে দস্যুদের আনাগোনা ছিল বাংলার এই জনপদে। পরবর্তীকালে তাদের প্রতিরোধে একটি প্রচলিত শব্দবন্ধ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ‘মগ ধাওনী’। আর মগ ধাওনী তথা মগ দস্যুদের ধাওয়া দিয়ে বাংলার জনপদ নিরাপদ রাখতে সোনাকান্দা, ইদ্রাকপুর ও হাজীগঞ্জ দুর্গের ভূমিকা ছিল বেশ গুরুত্ববহ।

(Visited 84 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *