যে মিথ্যাচারকে আমরা ইতিহাস বলে মেনে নিয়েছি

শ্রমিকদের সঙ্গে ইতিহাস এবং প্রত্নতত্ত্বের মত মিথ্যাচার আর কোন কিছুতে নেই। এই দুটি বিষয় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পাঠদান শুরু তো পরের কথা সেই হেরোডোটাসের যুগ থেকে শ্রমিকদের সঙ্গে মিথ্যাচার করে আসছে। এক অর্থে ইতিহাস বিষয়টি শ্রমিকদের অর্জন নিয়ে যতটা মিথ্যাচার করেছে পৃথিবীর আর কোথাও অতটা মিথ্যাচার নেই।
 
যেমন ধরুন, পানিপথের যুদ্ধে বাবর জয়লাভ করেন। চিন্তা করে দেখেন বাবর কি কোনো অসুর ছিল সে একই ইবরাহীম লোদীর সব সৈন্যকে কতল করে কাতল মাছের মতো জয়লাভ করেছে? কিংবা সবাই জানে তাজমহল নির্মাণ করেছেন সম্রাট শাহজাহান। ভাবা যায় শাহজাহান যখন হেরেমে বসে বসে হাওয়া খাইছে ঠিক তখন লাখ লাখ শ্রমিক গলদঘর্ম হয়ে তাজমহল তৈরি করেছে।
 
হাজার কবিতা বেকার সবই তা। তার কথা কেউ বলে না !! সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা। নচিকেতার অনেক সাহস। তিনি তার প্রেমিকা নীলাঞ্জনার নাম বলে দিয়েছিলেন। আমরা ইতিহাস গবেষকরা হয় ভীরু কাপুরুষ নয়তো বেয়াক্কেল। আমরা কখনও বলিনা এতজন শ্রমিক, এত বছরের শ্রমে সম্রাট শাহজাহানের আর্থিক সুবিধা নিয়ে তাজমহল নির্মাণ করেছেন।
 
এসব কারণেই ঐসব সাবঅলটার্ন ইতিহাসচর্চা, মার্ক্সবাদী ইতিহাস, নারীবাদী ইতিহাস কিংবা কার্যকারণ ইতিহাসচর্চার মত তত্ত্বকথা আমায় টানে না। আমি শুধু একটা প্রশ্ন করে যাই আমার ইতিহাসে আমি কোথায়? আমার দেশে শুধু শাসক এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা বাস করে না। এখানে আমি যেমন আছি, আছেন আমার মত আরও হাজারও মানুষ।
 
খেয়াল করে দেখুন গুপ্তযুগের ইতিহাস শুধুই কি সম্রাটরা বাস করতেন। হুসেনশাহী যুগ বলতে শুধুই কি আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (১৪৯৪-১৫১৯), নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহ (১৫১৯-১৫৩৩), দ্বিতীয় আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ (১৫৩৩), গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৫৩৩-১৫৩৮) বলে শেষ করে দেয়া যায়। তখনকার দিনে এই চারজন বাদে অন্যকোনো মানুষ কি বাস করেন নাই?
 
কি ভয়ানক কথা! ইলিয়াসশাহী যুগের কথাই ধরা যাক। এই সময়কাল বলতে সবাই বলে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৩৫৮), সিকান্দার শাহ (১৩৫৮-১৩৯০), গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (১৩৮৯-১৪১০), সাইফউদ্দিন হামজা শাহ (১৪১০-১৪১২ ) কিংবা মুহাম্মদ শাহ বিন হামজা শাহের (শাসনকাল ১৪১৩ খ্রিষ্টাব্দ) কথা। কাকতালীয়ভাবে এই সময়েও কোনো সাধারণ মানুষ বাংলায় বাস করেনি, তাদের সেখানে বাস না করা নিয়ে কেউ প্রশ্নও করে না।
 
এতকিছু বাদ দেয়া যাক। আমাদের জাতীয় সংসদ ভবন কে নির্মাণ করেছেন। সবাই চোখ বন্ধ করে বলে বসে লুই আই কানের কথা। বায়তুল মোকারম মসজিদ এটা কে নির্মাণ করেছেন? বাঙ্গালী মুখস্থ বলে দেয় থারিয়ানি সাহেবের কথা। ঠিক যেভাবে তারা অসভ্যের মত বলে আসছে ষাট গম্বুজ মসজিদ নির্মাণ করেছেন উলুঘ খান জাহান আলী। কিন্তু তারা এটা ভাবে না যে খলিফাতাবাদের একজন শাসক যাই হোক রাজমিস্ত্রী ছিলেন না।
 
সামাজিক সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো নিয়ে যতই চিন্তা করা যায় অতীতকন্দ্রীক মিথ্যাচারগুলো আরও স্পষ্ট হয়। এজন্য ইতিহাস বলতে আমার কাছে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসই প্রতিক্ষেত্রে গুরুত্ব পায়। রাজনৈতিক ইতিহাসে আমার আগ্রহ কম, একঅর্থে নাই বললেই চলে। তবুও শিলালিপি তাম্রশাসন থেকে যেগুলার পাঠোদ্ধার করছি বিরক্তি ভরে দেখছি সেখানে সাংস্কৃতিক তথ্য খুব সামান্য, সবখানে রাজনৈতিক ইতিহাস দূরে থাক রাজস্তুতির ছড়াছড়ি।
(Visited 27 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *