যে প্রশ্নের কোনো উত্তর হয়না !?!

শৈশবের দস্যিপনা নিয়ে যার ডায়েরির প্রতিটি পাতা যত সমৃদ্ধ তার ভবিষ্যত নাকি সেখানে দেখেই বলে দেয়া যায়। কেউ কেউ বলেন আগামীতে কার দৌড় কতটুকু সেটা স্টার্টিং মার্ক থেকে অনুমান করে নিতে হয়। এখনকার বিষয়টা ভিন্ন, কাঁধে বইয়ের বোঝা, সোজা হয়ে দাঁড়ানোটাই বড় কষ্টের কাজ যে শিশুর জন্য।মনোদৈনিক নিপীড়নের বাইরে ‘পাশের বাসার আন্টির ভেংচি কাটা কিংবা মায়েদের এ প্লাস প্রাপ্তির অদম্য ইচ্ছায়’ মরে যাচ্ছে শিশুতোষ যত সাধ আহলাদ। প্রাথমিক থেকেই ‘সৃজনশীল শিক্ষপদ্ধতি’ নামের ধংসাত্মক পরিকল্পননায় বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর কাছে শৈশবের সব রঙ ধুয়ে মুছে জনৈক শিক্ষাবিদের গোঁফের মতো ফকফকা সাদা হয়ে যাচ্ছে।তবে কিছু মানুষ সব সময় থাকেন যাঁরা চলেন উল্টোপথে-উল্টো রথে। তিনি তাঁর প্রাথমিকের একেবারে গোড়ার ধাপে, অর্থাৎ ক্লাস ওয়ান পড়ুয়া ছেলেকে এইসব এ প্লাস উত্তাপের বাইরে রাখতে চেয়েছেন। নিজ সন্তানের প্রতি পিতৃসুলভ দায়ভার নিয়ে ‘পাশের বাসার আন্টির মুখে ঝাঁটা মেরে’ কিছু না হোক অন্তত শিশুর বেঁচে থাকার স্বাধীন পরিবেশ ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টায় লিপ্ত তাঁরা। ফলে ক্লাসের চাপ, পাশের পাশের ভাবীর টিটকিরি দূরে থাক শিশুর মায়ের নানা আকাঙ্খার লোভ এই শিশুর উপরে কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’ এই লাইনগুলো হয়েছে জানা, ঐ শিশুর সরল কিছু প্রশ্নের মুখে পড়ে।

প্রথম শিশুটির বাবা একজন নামকরা কৃষিবিদ। তিনি তাঁর কনফারেন্সের প্রয়োজনে দেশের বাইরে যাবেন। শুরু থেকে বাবার কাছে থেকে বড় হওয়া বাচ্চা কিছুতেই তাকে ছেড়ে একা থাকবে না। এটা বুঝতে পেরে সন্তানের জন্যও ভিসা করেছেন। তাঁর স্ত্রীর কাছে অফিসকে অনেক বড় মনে হওয়াতে চার বছরের শিশু সন্তানকে সঙ্গে নিয়েই নেদারল্যান্ড গেলেন ভদ্রলোক। কনফারেন্স শেষ করে মেয়েকে নিয়ে নিয়ে নানা স্থানে বেড়িয়ে তারপর দেশে ফিরবেন, এমনটাই পরিকল্পনা। এক পার্কে জনৈক বুড়োবুড়ির সঙ্গে তার খাতির হয়ে যায়। সেই খাতির এতোটা দূর পৌঁছায় যে মাস চারেক পর শুধু ঐ বাবা মেয়েটিকে দেখতে বুড়োবুড়ি বাংলাদেশের ভিসা করে বসে। তারা দীর্ঘ ১৫-২০ দিন বাংলাদেশে ছিলেন শুধুমাত্র তাদের ‘গ্র্যান্ডপা’ আর ‘গ্র্যান্ডমা’ ডাকা বাচ্চাটার প্রতি মায়া থেকে। ‘পাশের বাসার ভাবী’ আর ‘নচ্ছার আন্টিকূল’ এটা সহজে নিতে পারেনি। তারা বলেছে এই মেয়ের লেখা পড়া হবে না। ‘আমার ছেলে গিটার বাজায়’, ‘আমার মেয়ে এ প্লাস পাইছে’, ‘আমার মেয়ে ছবি আঁকে’, ‘আমার মেয়ে গান শিখছে’।

একদিন বিকালে উনার বাসায় বেড়াতে গেছি। ভাবী অফিস থেকে বাসায় এলেন। সঙ্গে পাল ধরে ঢুকলেন আরও কয়েকজন যাদের দেখে বিরক্ত হওয়ার যথেষ্ঠ কারণ ছিল। বিরক্ত হলেও উনাদের সম্মান রাখতে একই টেবিলে বসলাম। প্রসঙ্গত বলা যায় তাঁদের তিনজনের সঙ্গে নিজ নিজ বাচ্চারা ছিল। ভাল রেজাল্ট আর অহংকারে তাদের কারও পা মাটিতে পড়ে না। চান্স বুঝে সবাই কটাক্ষ করছে বাচ্চা মেয়েটিকে। পরে জানতে পেরেছে আমি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, অনেক ভাল রেজাল্ট নিয়ে পাস করেছি এবং লেখালিখির সঙ্গে শৈশব থেকেই যুক্ত্। শেষ অবধি তাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলো কিভাবে নিজের বাচ্চাকে বড় করে মেলে ধরা যায়। আমি বিরক্ত হলেও তাদের কথার কোনো উত্তর দেইনি, তবে পুরোটা শুনেছিও।

পরিস্থিতি বদলে যায় হঠাৎ কোনো এক কোণা থেকে একটা তেলাপোকা বের হলে। বাচ্চাগুলো তো বটেই, তাদের মায়েরাও পারলে দৌড়ে পালায় এমন অবস্থা। মনে মনে ভাবছিলাম এবার আমার ওঠা লাগবে। আমাকে অবাক করে দিয়ে পাশের চেয়ারে বসা ঐ গবেষক ভাইয়ের বাচ্চাটার দিকে। সে ছোট্ট চামচ দিয়ে বাপের কাপ থেকে একটু করে কফি তুলে খাচ্ছিল। তার খুব পছন্দ কিন্তু মায়ের নিষেধ। কিন্তু বাপ তার মেয়ের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেয় বলে সে প্রতি সন্ধ্যায় বাপের কাপ থেকেই চামচ দিয়ে একটু আধটু তুলে খায়। মাঝে মাঝে চান্স পেলে চুমুকও দেয়। হঠাৎ সে তার বাপকে বলে ‘আব্বু আমি একটু যাই’। বাবার কাছ থেকে চোখের ইশারায় অনুমতি পাওয়ার মাত্র ২০ সেকেন্ডের মাথায় ঝাড়ুর এক বাড়িতে তেলাপোকা বেচারার জান শেষ, ডাইনিং টেবিল থেকে একটা টিস্যু নিয়ে সেটাকে ধরে ডাস্টবিনে ফেলে বেসিন থেকে হাত ধুয়ে আবার বাপের কোলে উঠে বসতে সে দুই মিনিটও সময় নেয়নি।

আমার বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি। শুধু বাচ্চাটা তার বাপের কাছে জানতে চাইলো ‘আব্বু সব ঠিক আছে তো’। ভাই তার মেয়েকে বোঝাচ্ছেন ‘আম্মু তুমি একে মেরে ঠিক করোনি, ওকে তাড়িয়ে দিলেই পারতে’। মেয়েও ছেড়ে দেয়ার পাত্র নয়। সে বলছে ‘আব্বু তোমার কথা শুনে একটাকে ছেড়ে দিয়েছিলাম গত পরশু, ও গিয়ে বুয়ার কাঁথার মধ্যে ঢুকেছে। এরপর বুয়া ভয়ে অনেক্ষণ চিৎকার দিয়ে কান্না করেছে।’ যাই হোক সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যখন সবাই যার যার যায়গায় বসলো কারও মুখে দিকে তাকানোর অবস্থা নাই। মনে হচ্ছে এক একজন কারগিল ফেরত যোদ্ধা। প্রায় প্রত্যেকেই ঘেমে নেয়ে একাকার। তারা ভাইয়াকে বললো আপনার মেয়ে তো ডেঞ্জারাস, এটা কিভাবে করলো সে। ভাইয়া আস্তে করে হাসি দিলেন, কোনও কথা না বলে প্রায় ঠাণ্ডা হয়ে আসা কফিতে চুমুক দিলেন। আমিও হাঁটতে হাঁটতে তার রিডিং রুমের দিকে রওনা দিলাম।

ডাইনিং টেবিল ছেড়ে যাওয়ার আগে পেছন ফিরে তাকিয়ে বললাম, আমার কাছে করা আপনাদের সব প্রশ্নের উত্তর আপনারাই দিয়ে দিয়েছেন। সেটা ‘কনফিডেন্স’। দেখলেন তো বাবুর কতো সাহস। আর আপনারা এতক্ষণ যারা নিজ সন্তানকে মাথায় নিয়ে অন্যকে ছোট করার খেলাধুলা করছিলেন জেনে রাখুন ‘ভবিষ্যতে লড়তে হবে বাঘ সিংহের সঙ্গে, সেখানে তেলাপোকা দেখে যারা ভয় পায় তাদের পরিস্থিতি কেমন হবে সেটা বোঝার জন্য কি গণক হওয়ার দরকার আছে’। সঙ্গে আমার খুব প্রিয় একজন শিক্ষকের বক্তব্যও চান্সে কোনোরকম কপিরাইট ছাড়াই ঝেড়ে দিলাম। বললাম আমার খুব প্রিয় একজন লেখক এবং শিক্ষকের স্ত্রী তাঁকে কটাক্ষ করে বলেছিলেন ‘তোর ছেলে তো প্যাড়াবাড়ির ভূত হচ্ছে দিনে দিনে’। উনিও হাঁসিমুখে উত্তর দিয়েছিলেন ‘আমি সেটাই চাই, না হলে সামনের যে সময় সেখানে অন্যের ঘাড় মটকাতে হবে না’।

এবার প্যাড়াবাড়ির ভূতের গল্প। পূর্ববণিত ঐ বাচ্চা, আমার মেয়ে জাওয়াতা এবং প্যাড়াবাড়ির ভূতখ্যাত এই বাচ্চাটার নামের অনেক মিল। সুন্দর শীতের সকালে ঘুম ভেঙ্গে সে খালিপায়ে পায়চারি করে বেড়াচ্ছে নিজ বাসার ভেতরে। তার বাবার ঘুম ভাঙ্গলেও তখনও কম্বল থেকে বের হতে ইচ্ছে করেনা এমন অলসতার সঙ্গে লড়ছেন। হঠাৎ তার মা চিৎকার দিয়ে ওঠেন ‘আব্বু তুমি এভাবে খালি পায়ে হাঁটছো ক্যান, এজন্যও তো তোমার গলা ভেঙ্গে গেছে’। এরপর সে কোনো উত্তর দেয়নি পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে সেখান থেকে পাশের রুমে চলে যায়। নাস্তার আগে বারংবার ডাকার পরেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। মা-বাবা দুজনে দৌড়ে গিয়ে দেখলেন সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে খুব মন দিয়ে গলা পরীক্ষা করছে। তারপর মা বাপকে একসঙ্গে দেখে আয়নায চোখ রেখেইসাবলীল ভঙ্গিতে প্রশ্ন করে ‘আম্মু তুমি আমার গলা ভেঙ্গে গেছে বললে, কই আমি তো দেখছি গলার সব ঠিকঠাকই আছে’।

বেড়ালের করোনা হয় না !?!

সম্প্রতি করোনাকালে, কেনো এক বিকেলে ঐ বাচ্চাটাই তার বাপের সঙ্গে বাইরে বের হয়েছে। গেটের মুখ থেকে একটা বেড়াল হয়ে হাঁটাহাঁটি করছে। তার প্রশ্ন ‘আব্বু বিড়ালের করোনা হয় না’। বাপ তাকে তখনকার মতো বোঝাতে পেরেছেন ভাগ্যিস ঐ দস্যি ছেলে জানতো না যে নিউইয়র্ক চিড়িয়াখানার এক বাঘেরও করোনা হয়েছে। বাসায় ফিরে রান্নার সময় ডিম ফাটানোর কথা বলে আরেকদফা ফেঁসে যেতে হয়। বাচ্চটা তার বাবাকে প্রশ্ন করে ‘আব্বু তুমি ভুল বললে, ডিম তো ফাটায় না, ডিম ভাঙ্গে। ফাটানো মানে ক্র্যাক হওয়া। ডিম ফাটিয়ে সেটাকে খাওয়া যাবে না, এটাকে ভাঙ্গতেই হবে’। শেষ অবধি বাপের কাছে দস্যি ছেলের এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। ঠিক যেমন বাবা অনেক আগ্রহ নিয়ে তার এক বন্ধুর ছবি দেখাচ্ছে ছেলেকে। বাবার প্রশ্ন ‘দেখো তো এটা কার ছবি’। ছেলে সবকিছু ছেড়ে পাল্টা প্রশ্ন করে বসে ‘আব্বু উনার মুখে মাস্ক নাই কেনো? ভদ্রলোক আবারও বিব্রত, অনেকটা অসহায় আত্মসমর্পণ করেন বাচ্চা ছেলের কাছে।

সত্যি বলতে এমন অনেক প্রশ্ন আমাদের শৈশবেও ছিল, যে প্রশ্নের আসলে কোনো উত্তর নেই। আর এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মতো উদার অভিভাবক কিংবা শিক্ষক সবার ভাগ্যে জোটে না। যেমনটা আমার ভাগ্যভালো দাদার মতো শিক্ষক পেয়েছিলাম শৈশবে। যদিও অনেক লজ্জাজনক আর অপমানের তবুও গল্পটা দিয়েই লেখাটা শেষ করতে চাই। আমার স্কুল জীবনে বাইরের জগতের বড় কিছু বলতে এলাকার হওয়া ফুরফুরা শরীফের বিশাল ঈসালে সওয়াবের কথা মনে পড়ে প্রচুর। জিলাপী থেকে শুরু করে নানা পদের বই, এমনকি হুমায়ূন আহমেদের বইও সেখানে পাওয়া যেত। সব ধরণের বইই তারা চটের উপর বিছিয়ে বিক্রি করতো। ফলে এই ঈসালে সওয়াবের প্রতি আমার একটা  অন্যরকম আগ্রহ থাকতো। বাড়ি থেকে বেশ দূরে হওয়ার পাশাপাশি প্রচুর ভিড় ভাট্টার কারণে একা একা সেখানে পরিবার থেকে যেতে দিতো না। কিন্তু আমার কেনো যেন প্রতিদিন ওখানে গিয়ে ভিড়ভাট্টার বিচিত্র সব আয়োজন দেখতে মন চাইতো।বিশেষ করে হকারদের মজমাগুলো দেখলে এখনও আমি শৈশবের সেই দুর্নিবার আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে যাই, চুপচাপ দূর থেকে দেখি লোকগুলোর সম্মোহনী শক্তি। এতবড় ডিগ্রিধারী প্রফেসরের ক্লাসে সবাই ঘুমিয়ে যায়, অথচ একজন ক্লাস ফাইভ ফেল হকার কিভাবে সবাইকে ধরে রাখে? এ প্রশ্নের উত্তর বিগত এক যুগে পাইনি।

হকারের মজমা দেখার লোভ কিংবা চটের উপর বিছানো বইগুলো থেকে উল্টেপাল্টে নতুন কিছু খোঁজার আগ্রহ যাই হোক স্কুল পালিয়ে চলে গেলাম ঈসালে সওয়াবে। সেদিনকার মজমা ছিল একটু অন্যরকম জিনিসের। তবুও ডায়েরির পাতায় লিখে রাখা লাইনগুলো ভুলতে পারিনি— ‘কালো পাহাড়ী গুরুমা খাসি এনে তাকে একশত একদিন পরিষ্কার কাঁঠাল পাতার সঙ্গে পারদ আর কর্পূরের পানি খাওয়াবেন। তার শনি মঙ্গলবারে শরীয়াহ মোতাবেক জবাই করে হাড্ডিছাড়া শুধু মাংস বরই কাঠের চুলায় অল্প আঁচে সারাদিন জ্বাল দিবেন। এরপর তাতে একশত একরকম ভেষজ গাছ যুক্ত করলেও আপনিও পারবেন এই বিশেষ হালুয়া তৈরি করতে। আপনারা সবাই এত কষ্ট করতে পারবেন না তাই আমরা এটা তৈরি করে এনেছি। যারা দীর্ঘদিনের বিবাহিত কিন্তু বউয়ের কাছে যাইতে ভয় পান। কি মিয়া ভাই, ভাবী কি লাত্থি মাইরা খাট থেকে ফালায় দেয় আপনারে। এই সালসা এক ফাইল নিয়ে যান, এটা আপনাদের জন্যই’।

মুখ লুকিয়ে অনেকে হাসলেও কেউ কথা বলেনি। আমি বাইরে থেকে এটা শুনে ভিড়ের মধ্যে কারো ঠ্যাঙের মাঝখান দিয়ে মাথা ঢুকিকয়ে দিলাম। সবাই এত মন দিয়ে হকারের জোঁকের তেল বিষয়ক বক্তব্য শুনছে আমার মতো চিনেজোঁকের দিকে তাদের খেয়াল করার কথা না। ওয়াজের মধ্যে হুজুররা যেভাবে বলেন চিল্লায় কন ঠিক্কিনা, হকার সাহেব এবার শ্রোতা দর্শকদের দিকে এগিয়ে আসলেন। সবার মধ্যে পিনপতন নীরবতা। আমি ভিড় ঠেলে মজমার ত্রিপলের উপর উঠে হকারের চ্যালার থেকে মাইক নিয়ে হকারের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম ‘আচ্ছা চাচা এই যে বললেল বউ লাত্থি মাইরা খাট থেকে ফ্যালায় দেয়, এটা কেনো দেয়’। পুরো উপস্থিত জনতার দৃষ্টি এবার আমার দিকে। ভাবখানা এমন আমি তাদের সবার কিডনি খুলে নিয়ে চোরাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছি কিংবা পূর্বপুরুষের সব সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছি। যাই হোক এরপর আমাকে আর কিছুই করতে হয়নি, যা করার জনগণ করেছে। তারা আমাদের চ্যাংদোলা করে তুলে দিয়ে ভিড়ের বাইরে বের করে কানদুটো মলে দিয়ে বলেছে ‘বেয়াদপ, তুমি অমুক চাচার ছেলে না, দাঁড়াও আজ তোমার বাপকে বলবো এই বাঁদরামোর কথা’।

কাঁদতে কাঁদতে সেখান থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য হাঁটা ধরলাম। এলাকার এক চাচা আমাকে দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। উনি ধরে নিয়ে সাইকেলে তুলে বললেন ‘বাবা তুমি এই ভিড়ের মধ্যে একা কি করো? এখান থেকে ছেলেধরা ধরে নিয়ে যাবে তো’। আমারে চোখ তখনও ভেজা, ভদ্রলোক তো বোঝেন নাই ভিড় থেকে ভয় পেয়ে চোখ ভেজেনি, কানমলা খেয়ে এবং মজমায় প্রশ্ন করে অপমানিত হয়ে কাঁদতে হয়েছে। যাই হোক পাকশী পেপার মিলের সাঁকো পার হয়ে উনি সাইকেল থেকে নামলেন। আমাকে বললেন ‘বাবা দাঁড়াও, আমি মুতে আসি’। উনি যথারীতি প্রস্রাব সেরে একটা ইঁটের টুকরা হাতে নিয়ে কুলুপ করছেন। কুলুপকরণ শেষে উনি সাইকেলে উঠতে যাবেন, আমার প্রশ্ন ‘চাচা আপনি প্রস্রাবের পর এটা কি করলেন’। উনি বললেন ‘এটা কুলুপ, এটা করা সওয়াবের কাজ’। আমি আবার প্রশ্ন করি, ‘চাচা ইঁটের টুকরাটা দিয়ে কি আপনি নুনুর মাথায় ঘসা দিচ্ছিলেন? এভাবে প্রতিদিন ঘষতে থাকলে একদিন তো আপনার নুনু ছোট হয়ে যাবে। তখন কি ঈসালে সওয়াবের ওখান থেকে হালুয়া আর সালসা কিনে খাবেন’। ভদ্রলোক নিরুত্তাপ মাথা নিচু করে থাকলেও আমি মনে মনে বুজে নিয়েছিলাম এভাবে ইঁট ঘসেই সবার নুনু ছোট হয়ে যায়, তারপর তারা ঈসালে সওয়াবে গিয়ে ওষুধ কিনে খায়। তবে মনে প্রশ্ন থেকে যায় ওরা আমাকে ওখান থেকে বের করে দিল ক্যান? আর জোর খাটিয়ে ওখান থেকে বের করে অতো জোরে কান মলেই বা দিতে হবে ক্যান? সত্যি বলতে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে পেরিয়ে গেছে আমার জীবনের অনেকটা বছর। ভয়ে প্রশ্ন করিনি আর কাউকে। ভয় যদি কানমলা খেতে হয় আবার। কিংবা যদি কেউ জেনে যায় আমি স্কুল পালিয়ে ঈসালে সওয়াবে গেছিলাম…….

(Visited 66 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *