চারদিকের মৃত্যুমিছিল দেখে

কেউ ইহলোক ত্যাগ করলে তার সংবাদ শুনে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়ে আমরা অনেকেই মনে করি মৃত ব্যক্তির জন্য বিশাল কোনো দোয়া করে দিলাম। দুনিয়াতে সে ঈমানদার হোক আর অর্গ্যানিক ডাঙ্গুলি খেলা লোক কিংবা সুদখোর-ঘুষখোর হোক তার সব কিছু ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল আমাদের এই এক দোয়ার মাধ্যমে। ভুল করে কোনো হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কিংবা ইহুদির মৃত্যু সংবাদ শুনে আমাদের কাউকে এই দোয়া পড়তে দেখলে অনেকে তার ঠিকুজি কুষ্ঠি উদ্ধার করে ছেড়েছেন এমনটাও হয়েছে।

একইভাবে অনেক গ্রামে তর্ক হয় লাশ কবরে শোয়ানোর জন্য কোন দিক থেকে নামতে হবে, নামাতে হবে কিংবা নেমে কিভাবে লাফ দিয়ে কবরের গর্ত থেকে উঠতে হবে তা নিয়ে। সেখানে তর্ক জমে ‘মিনহা খালাকনাকুম, ওয়া ফীহা নুয়ীদুকুম, ওয়া মিনহা নুখরীজুকুম তারাতান উখরা’। গেঞ্জাম লেগে যায় এই দোয়া লোকে চিৎকার দিয়ে কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়বে, সে কি লাশের ডানপাশে থাকবে নাকি বামপাশে থাকবে? সে দাঁড়ালে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়াবে নাকি সোজা সাপ্টা কোনোদিকে থাকলেই হবে?

যাই হোক আমরাদের জেনে রাখা ভাল ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ আসলে সূরা আল বাকারার ১৫৬ নং আয়াতের একাংশ যেখানে পুরো আয়াত হচ্ছে (ٱلَّذِينَ إِذَ أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌۭ قَالُوا۟ إِنَّا لِلَّٰهِ وَإِنَّ إِلَيْهِ رَاجِعُونَ )। যার অর্থ দাঁড়ায় ‘তারা (মুমিনরা) কোনো মুসিবতে অক্রান্ত হলে বলে, আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয় আল্লাহর কাছেই ফিরে যাব। কারও মৃত্যু সংবাদ শোনার পর আসলে এটা তাদের জন্য দোয়া করা নয়, বরং নিজের মৃত্যুকে স্মরণ করা এবং অন্যায় ও পাপকাজ থেকে দূরে সরে থাকার উদ্দেশ্যে ঐ মুহুর্তকে স্মরণের চেষ্টা করা।

অন্যদিকে সূরা ত্বহার ৫৫ নং আয়াত থেকে  আমরা পড়ি (مِنْهَا خَلَقْنَاكُمْ وَفِيهَا نُعِيدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أُخ)   ‘মিনহা খালাকনাকুম, ওয়া ফীহা নুয়ীদুকুম, ওয়া মিনহা নুখরীজুকুম তারাতান উখরা’। এর সরল অর্থ দাঁড়ায় মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, মাটিতেই আমি তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেব এবং মাটি থেকেই তোমাদেরকে পুনরায় বের করে আনব। আমরা এর অর্থ না বুঝে পুরো মাথা গরম করে ফেলি। মনে করি কত বিশাল একটা দোয়া করা হচ্ছে মৃত ব্যক্তির জন্য। অনেক হুজুরকে দেখা গেল তারা এটা নিয়ে আবার নানাবিধ ফতোয়া দিচ্ছেন। এটা কেন পড়া বিদআত, পড়লে কি হবে, না পড়লে কি হবে? সবথেকে বড় কথা কুরআনের একটা আয়াত কেউ পড়লে তাতে সমস্যা কোথায়? আপনারা ফতোয়াবাজি না করে এর সুন্দর একটা বাংলা অর্থ বলে দিতে পারেন না?

হুজুর থেকে শুরু করে ইসলামোফোবিক খচ্চরগুলোর একই সমস্যা। তারা ইচ্ছে অনিচ্ছেয়, সজ্ঞানে-অজ্ঞানে “ফতোয়া’ কে উচ্চারণ করেন “ফতুয়া”। কি আজব ব্যাপার যে জিনিস গায়ে দেয় সেটাকে নিয়ে আমরা কি করবো? আমি ফেসবুকের অতি ধার্মিক কিংবা বেহায়া নাস্তিকদের তথ্য কপচানিতে আগে বিরক্ত হতাম, তারপর কিছুদিন মজা পেতাম। এখন শুধু ওদের ভাবভঙ্গি দেখলে এড়িয়ে চলি। কারণ বেহায়াদের সঙ্গে কথা বলা মানে নিজেকে ওদের লেভেলে নামিয়ে আনা। আর মূর্খের সঙ্গে তর্ক করার বিপদ হচ্ছে ওরা আপনাকে নিজের লেভেলে নামিয়ে নেবে ঝগড়াঝাটির মাধ্যমে, তারপর ওদের ছ্যাবলামির অভিজ্ঞতার কাছে আপনি বাধ্যতামূলকভাবে পরাজিত হবে।

গ্রামের কেউ মারা গেলে দুইটা ঘটনা আমাকে খুব অবাক করেছে। একটা হচ্ছে ‘সুর করে কান্না করা’, অন্যটা ‘সুরে সুরে ঢুলে ঢুলে গানের মতো করে কুরআন তিলাওয়াত করা’। আমি খালাম্মা, ফুফু কিংবা বড় আপাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি কোনো মাখরাজের ধার না ধেরে যে তিলাওয়াত উনারা বেশিরভাগ করেন তাতে সওয়াব নাকি গুনাহ কি হয়, সেটা কার উপর বর্তায় সত্যিই চিন্তার বিষয়। এরপর কান্না!!! তাজ্জব হয়ে যাই একটু আগে যার বাবা মারা গিয়েছে সেই মেয়ে কিভাবে গানের সুরে ‘আমার বাবা আমার অমুক রঙের জামা কিনে দিয়েছিল রে বু’ কিংবা তার স্ত্রী ‘ওরে তোরা জানিস না, হামার ছোলের বাপ মাগুর মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাতি চাইছিলি’, ওরে আম্বিয়া তুই শোন ‘আশরাফ বউ পালায়া লিকি করতি গিছিলি, তারপর এই মানুষটা কত চেষ্টা করি আশরাফের বউরে ফিরায়া আনছে রে বাপ…’ ‘ওরে রে রে আমারে বড় বড় সাগর কলা কে আইনা খাওয়াবে রে….’।

এই ধরণের কান্না দেখে একদিন হাসি আসছিল, পরে বাইরে আসলাম। রাস্তায় দেখলাম টুটুলের বউ সেখানে তার ছাগলকে খাওয়াচ্ছে। একটু পরপর একটা ছোট লাঠি দিয়ে ছাগলকে ঠ্যাঙ্গাচ্ছে আর বলছে ‘ওরে শালার বরকি তাড়াতাড়ি খায়ে লে, নার্গিসের ভাতার মরেছে, আমার কান্তি যাওয়া লাগবি’। বেস্ট সেলার লেখক রবিন শর্মা আর নাম পাননি, তার বইয়ের নাম দিয়েছেন- ‘Who Will Cry When you Die?’। আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল রবিন শর্মাকে কান ধরে নিয়ে এসে বলি- ‘ব্যাটা তুই আগে মইরা দেখা, তারপর প্রয়োজনে কাঁদার জন্য টুটুলের বউকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হবে’। কিন্তু ঐ কথাও আর বলা হয়নি আমার, উল্টো ‘Who Will Cry When you Die? Life Lessons from the Monk Who Sold His Ferrari’ শীর্ষক দীর্ঘ নামের বইয়ের লেখকের দীর্ঘায়ু হয়েছে।

(Visited 67 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *