আহমদ শরীফের টিনের চশমায় দেখা অন্য নজরুল

বোধশক্তিহীন আবেগী ধার্মিকদের ‘নাস্তিক’ নামের প্রচারণার আড়ালে বাংলাদেশে দুটি লোকের সাহিত্যকেন্দ্রিক যথেচ্ছাচার সবসময় আড়ালে চাপা পড়ে গেছে। দ্বিতীয়জন যদি সেক্ষেত্রে গালিবাজ হুমায়ূন আজাদ হয়ে থাকে, তবে প্রথমজন অবশ্যই অধ্যাপক আহমদ শরীফ। চরম বুুদ্ধিবৃত্তিক ঝুঁকি নিয়েও একটা সত্য কথা বলা উচিত আর তা হচ্ছে ‘আহমদ শরীফকে একটি বিশেষ শ্রেণির লাগাতার প্রচার, তার বিরোধীগোষ্ঠীর অপপ্রচার আর আমাদের মতো পাঠকের কুপমণ্ডুকতার কারণেই টিকটিকির বদলে ডাইনোসর হিসেবে চিনতে হয়েছে’। 
 
নিজ আহারের পাত্রে মলত্যাগ করা কিছু মানুষের নিকৃষ্ট আচরণের মধ্যে জঘন্যতম। সেদিক থেকে হিসেব করলে এই ভদ্রলোক আহমদ শরীফ হয়তো সামনের সারিতে থাকে। ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত ‘নজরুল অধ্যাপক পদে’ যোগ দেন এবং ১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ঐ পদে কর্মরত ছিলেন। কিন্ত যত রাজ্যির হাবলামি তিনি খুব সম্ভবত করে গেছেন এই নজরুলকে নিয়ে।
 
আমি বাংলা সাহিত্যের লোক নই। তবে ঔপনিবেশিক থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধপূর্ব বাংলার সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ মনে হওয়াতে আহমদ শরীফের অনেকগুলো বই আস্তে আস্তে সময় নিয়ে পড়েছি। বিশেষ করে নজরুল প্রশ্নে আহমদ শরীফের ভুতুড়ে বিশ্লেষণ দেখে সত্যিই অবাক হয়েছি। বিশেষত, তিনি পড়েছেন কিংবা পড়েন নাই, কিন্তু লিখেছেন মনের মাধুরী মিশিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় ফাঁকিবাজ ছাত্রছাত্রীরা যেভাবে পরীক্ষার আনকমন প্রশ্নের উত্তরগুলো লিখে নজরুল নিয়ে অধ্যাপক শরীফের বিশ্লেষণ ক্ষেত্রবিশেষে তেমনি শিশুতোষ।
 
তার লেখা প্রবন্ধের মধ্যে নজরুল মানস, যুগন্ধর কবি নজরুল, নজরুলের কাব্য প্রেরণার উৎস, নজরুলের কাব্য সাধনার লক্ষ্য, নজরুল ইসলাম : এক বিরূপ পাঠকের দৃষ্টিতে, নজরুল-কাব্যে প্রেম, নজরুল ইসলামের ধর্ম, নজরুল সমীক্ষা : অন্য নিরিখে কিংবা নজরুল কাব্যে বীর ও বীর্যপ্রতীক শীর্ষক প্রবন্ধগুলো পড়ার পর এগুলোকে আমার কাছে নিছক কমেডি মনে হয়েছে। সুক্ষ্ম বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা করলে যে কেউ বুঝতে পারবেন এখানে কিভাবে নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম ও তার জীবনদর্শনকে নিয়ে ডাঙ্গুলি খেলা হয়েছে।
 
কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গদ্যধর্মী রচনায় যে বিদ্রোহের সুর সেটাকে শরীফ সাহেব অবহেলা করেছেন ‘অতৃপ্তি’ শিরোনামে। তিনি অনেকটা বেহায়ার মতো বলেছেন নজরুলের তৃপ্তি নেই কিছুতেই, স্বস্তি নেই কোথাও। পাশাপাশি অনেকটা ফুঁ দিয়ে বুক ফুলিয়ে তথাকথিত অতৃপ্তির উৎস খুঁজে নিজের খেলায় নিজে নিজে হাততালি দিয়েছেন। অধ্যাপক শরীফ নিজেই বলেছেন কোনো ঋজু একক কারণে প্রায় কিছুই ঘটে না; তাই কারণ বলতে কারণ-পরম্পরা বুঝতে হবে; এবং সে-কারণ সন্ধান কিংবা আবিষ্কারও কোনো একহারা বিদ্যার কাজ নয়। কিন্ত নজরুলকে বোঝার ক্ষেত্রে তিনি চলেছেন উল্টোপথে-উল্টোরথে।
 
ঔপনিবেশিকতার কষাঘাত দেশকালের পরিমণ্ডলে থেকে নানা জটিল সমীকরণের মুখোমুখি করেছিল নজরুলকে। এই বিষয়গুলোকে বোঝার জন্য উপনিবেশকালীন বাংলা ও ভারতবর্ষের আর্থ-সামাজিক রূপান্তর তথা সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসে সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রকৃত সত্যানুসন্ধান না করে আহমদ শরীফ চোখে লাগিয়ে নিয়েছেন এক নোংরা পুঁতিগন্ধময় ইসলামোফোবিয়ার চশমা। তিনি ঘটন-অঘটনের কারণ-ক্রিয়ার ঘাত-প্রতিঘাত থেকে নিজ দর্শনকে নজরুলের ঘাড়ের উপর পোষা বান্দরের মতো তুলে দিয়ে দায়মুক্ত হয়েছেন।
 
কবি নজরুলের মনোজগত বিশ্লেষণ করতে গেলে তার কবিতা থেকে খেয়ালখুশি মতো দুইটা লাইন তুলে দিলেই হবে না। এক্ষেত্রে তার সক্ষমতা, চিন্তাধারা ও সামাজিক সাপেক্ষিকতার তুলনামূলক বিশ্লেষণ আবশ্যক হয়ে দেখা দেয়। ফলে অধ্যাপক শরীপের কলমে কবি নজরুলের মনোজগৎ নিয়ে যে বিশ্লেষণ করা হয়েছে পুরোপুরি পক্ষপাতদুষ্টতা ও বিশ্লেষকের নিজস্ব ধারণার মুখাপেক্ষী। তিনি নজরুলের জীবনকে নজরুলের আঙ্গিকে না দেখে তারই জীবনের নানা ঘটনা ও তৎসমের বাস্তবতার নিরিখে ঘেঁটে ঘুটে আস্তে আস্তে তাল পাকিয়ে ছেড়েছেন।
 
আহমদ শরীফ নিঃসন্দেহে বড় গবেষক, বিশালাকৃতির সমালোচক ও কারও কারও হিসেবে তাদের ঘরানার পয়গম্বরতূল্য। কিন্তু তিনি তাঁর ঘরানার পয়গম্বর হিসেবে ইসলামোফোবিয়ার যে পয়গাম ফেরি করেছেন তা পাঠক কিংবা সমালোচকদের চোখে দেখা নজরুলের সাহিত্যকে অনেকটা উল্টো ধারায় বিশ্লেষণ করেছে। তিনি কাজী নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক মতাদর্শ আলোচনা করতে গিয়ে খেই হারিয়ে চান্সমতো নিজের দু’কথা সেখানেও ভরে দিয়েছেন। তত্ত্বগত ক্ষেত্রে এমন ভরে দেয়ার প্রবণতা দূষণীয় হলেও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ নয়। তবে তথ্যগত ক্ষেত্রে এহেন প্রচেষ্টা বিশ্লেষণী নিক্তিতে অবশ্যই ভ্রষ্টাচারের শামিল।
 
নজরুলের কবিতার বড় বৈশিষ্ট্য এর বহুমুখীতা। কিন্তু আহমদ শরীফ যখনই নজরুলকে নিয়ে দুলাইন লিখেছেন সেখানে বেছে বেছে দেখেছেন কোথায় ইসলাম প্রসঙ্গ এসেছে। তিনি তাঁর চোখে লাগানো টিনের চশমায় দেখে এগুলোকে খারিজ করার জন্য উন্মাদ হয়ে গেছেন। অন্যদিকে নজরুলের কবি স্বভাবে শক্তিপূজার প্রসঙ্গ এবং প্রেম-তৃষ্ণা নিয়ে যে আলোচনা তাতে আরও ঘি, তেল, চন্দন ও ধূপ-ধুনো লাগিয়ে আরাধনা করেছেন তিনি। নাহলে তিনি কিভাবে নির্লজ্জের মতো দাবি করলেন নজরুল দার্শনিক ছিলেন না ? 
ধর্মকেন্দ্রিক যে ট্যাবু বাংলাদেশে বিদ্যমান তার থেকেও শতকোটিগুণ নিকৃষ্ট ট্যাবু এদেশের সাহিত্যাঙ্গণে প্রচলিত। যদি না নাই হতো, নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও সাহিত্যচর্চার বাইরে তার ব্যক্তিজীবন নিয়ে আহমদ শরীফ যে যথেচ্ছাচার করেছন কিংবা কবীর চৌধুরী বিদেশী বেস্টসেলার কালজয়ী বইগুলো অনুবাদের নামে আড়ষ্ট শব্দভাণ্ডারের যে আবর্জনাস্তূপ দাঁড় করিয়েছেন সেগুলো নিয়ে কেউ না কেউ কথা বলতো।
 
বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব কাউকে বিচার করতে গেলে তার সক্ষমতা, যোগ্যতা, প্রজ্ঞা আর প্রচলিত জ্ঞানকাঠামোতে অবদান থেকে সূত্র খোঁজা। আর এই খোঁজ করতে গিয়ে প্রতিটি পদে পদে আহমেদ শরীফের যথেচ্ছাচার গভীর চিন্তার পাঠকদের বিরক্ত ও বিব্রত করতে বাধ্য। অন্তত নজরুল প্রশ্নে আহমদ শরীফ যা লিখে গেছেন সেখানে বিশ্লেষণী শক্তি ও প্রজ্ঞা তো বটেই, তথ্যগত নির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্রে সততারও বিশাল ঘাটতি দৃশ্যমান। আর হয়তো জন্যই তিনি বলতে পেরেছেন ‘তাঁকে (নজরুলকে) মানবতার কবি বলাও ভুল। কিংবা নির্বোধের মতো তিনি বলে গেছেন ‘নজরুলকে কোনোভাবেই বিদ্রোহী বলা চলে না। কেননা সুব্যবস্থা ও ন্যায়ের বিরুদ্ধাচারণ যে করে সেই বিদ্রোহী’। এ ধরণের লাইনগুলো আসলে কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে বিভ্রান্তকর তথ্যই দেয়নি, উপরন্ত একজন গবেষক হিসেবে আহমদ শরীফের অবস্থান আমাদের কাছে আরও ভালভাবে স্পষ্ট করেছে। 
 
যাই হোক বাংলাদেশে বসে নজরুল চর্চার ক্ষেত্রে জোর করে ‘ইসলামী রেনেসাঁর কবি’ কিংবা ‘সেকুলার কবি’ বানানোর চেষ্টা করা। সবথেকে বড় লজ্জা যারা ধার্মিক তারা নজরুলকে মনে করেন অলি আউলিয়া। কেউ কেউ তার সেকুলার চিন্তায়ও বেশ বিরক্ত। তাদের চিন্তা নজরুল যেহেতু তাদের প্রিয় কবি, তারা যেহেতু নজরুলকে ধারণ করতে চায় তাই নজরুলের সবকিছু হতে হবে একান্তই তাদের মনের মতো। একইভাবে নজরুলের সাহিত্যকর্মের উপর থেকে পরবর্তীকালের ইসলামী আছর দূর করতে গিয়ে কেউ কেউ অতি বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন, যাদের পুরোধা আহমদ শরীফ। সবথেকে লজ্জাজনক বিষয় হয়ে উঠেছে বর্ণনাগত মারপ্যাঁচ। এখানে তাঁদের হিসেবে তত্ত্বগত বিবৃতি যাই হোক তথ্যগত বিচ্যুতি থাকলে সেটা অন্যায় ও এবং গবেষকের শিষ্টাচার সম্পর্কিত। তার থেকেও আমি মনে করি নজরুলকে নজরুল হয়েই থাকতে দিন? তাকে জোর করে মুসলিম রেনেসাঁর কবি বানানোর প্রয়োজন নাই। একইভাবে ইসলামোফোবিয়ার তীব্র বেদনা মাথায় নিয়ে তাকে কান ধরে সেকুলার কবি বানানোর চেষ্টাটাও নজিরবিহীন ও দু:খজনক।
(Visited 387 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *