বিস্মৃত স্মৃতির পাতায় আমাদের আইয়ুব স্যার

অধ্যাপক আইয়ুব খান, একটি নাম অনেকগুলো স্মৃতি। স্যারের চলে যাওয়ার দেখতে দেখতে প্রায় এক দশক এবং একমাস হতে যাচ্ছে আজ। অনেক না বলা গল্পের এক এক সারাংশও বলা যায় তাঁকে। স্যার অন্য সবার মত সহজে ছবি তুলতে চাইতেন না। এমনকি ক্যামেরা তাক করাটা টের পেলে পর্যন্ত ধমক দিয়ে নিষেধ করতেন। পরে বিরক্ত হয়ে বলতেন সবাই শুনবে, অর্ণব কথা শুনে না। ও ছবি তুলবেই, খেয়ে দেয়ে কাজ নাই ওর হাতে ক্যামেরা দিয়েছে কে? পাশ থেকে একজন ভুল শুধরে দেয়! বলে স্যার, ক্যামেরাটা ওরই।

একটি গবেষণা প্রকল্পে কিছুদিন কাজ করতে গিয়ে স্যারের শত নিষেধ উপেক্ষা করে অনেক ছবি তুলেছি। কিন্ত তখন কি কল্পনা করতে পেরেছি আমাদের চিরচেনা হাসিখুশি আইয়ুব খান স্যার সবাইকে ফাঁকি দিয়ে হুট করে নিজেই একদিন দেয়ালে টাঙ্গানো ছবি হয়ে যাবেন। ক্লাসের পড়ালেখার বাইরে প্রজেক্টের কাজে দিনের বেশিক্ষণ ডুবে থাকতে হতো। প্রতিবেদন প্রস্তুতিতে প্রয়োজনীয় লেখালিখি আমি আর দীপু ভাই বেশিরভাগ করতাম। আর সেই কাজে তদারকি করতেন আইয়্যুব স্যার।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সবাই লাঞ্চ আওয়ারের অনেক আগেই গায়েব। ওদিকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে গেলেও আমি কিংবা দীপু ভাই টেবিল ছেড়ে ওঠার পাত্র ছিলাম না। বাড়িতে থাকলে আমার মা কিংবা বড় চাচাকে যেমন ধমকাতে দেখি প্রিয় অধ্যাপক আইয়ুব স্যার তার থেকে আলাদা ছিলেন না। তিনি আমাদের দেরি দেখে নিজেও দাঁড়িয়ে যেতেন। বলতে চল একসঙ্গে লাঞ্চে যাই। অন্তত আমাদের সবাইকে না নিয়ে তিনি খাওয়ার টেবিলে বসতে চাইতেন না।

জুনের তপ্ত দুপুর। রুমে এসি চললেও প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান খান তথা আমাদের ফিজু স্যার দরদর করে ঘামছেন। তাঁর সহকারী জনৈক গরিলাদর্শী জাম্ববান লোকটিও ঘেমে নেয়ে একাকার। দীপু ভাই কোন কাজে সার্ভে অফিসে গিয়েছেন। ওদিকে বহুবার ডাকার পরেও আমি লাঞ্চে যাইনি। পাঁচ-সাতটা বই খুলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুতির কাজ করছি। আমার এই কাণ্ড দেখে আইয়ুব স্যার চরম বিরক্তিভরে বললেন “অর্ণবের সারাদিন এসব বইপত্তর নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি আর ছবি তোলা এটা ছাড়া আর কোনো কাজ নাই। কেউ ওরে কিছু কাজ দিক যাতে এগুলো বাদ দেয়”।

ভয় কিংবা স্যারের প্রতি সীমাহীন শ্রদ্ধা যাই হোক লাফ দিয়ে উঠলাম কাজ ছেড়ে। কোনোরকমে খেয়ে শেষ ওয়াক্তে যোহর সেরে যখন টেবিলে বসলাম কি মনে করে স্যার বলে উঠলেন—‘কাজগুলো হিসেব রেখে করো। সমৃদ্ধির খাতা দ্রুত ভরে গেলে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে আসে বিদায়ের সময়। সবকিছুতে এতো তাড়াহুড়া করতে নাই। আর এতো কাজ তোমাকে একা করতে হবে তারও কোনো অর্থ নাই”।

এখনও অখণ্ড অবসর পেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যে সুখস্মৃতি কিংবা স্মৃতিকাতর মুহুর্তগুলোকে মনে করি সেখানে আইয়ুব স্যার রয়েছেন অনেকটা জায়গা জুড়ে। বার বার মনে হয় — ‘কে জানতো স্যার নিজের দ্রুত চলে যাওয়ার কথাটাই আকার ইঙ্গিতে বারংবার বুঝিয়ে দিতে চাইতেন। আমরা সেগুলো হয়তো বুঝেও বুঝিনি’।

জেরার্ড ডায়মন্ডের ‘Guns, Germs, and Steel’ কয়েকবার পড়া হয়েছে, তবে তখনও আমি গানস অ্যান্ড রোজেসের (Guns N’ Roses) নভেম্বর রেইন গানটা সেভাবে শুনিনি। শুনেও কি লাভ!! বৃষ্টিটা হয়েছিল অক্টোবরে। কিছু না বলে কয়ে ঐদিনে হঠাৎ বৃষ্টি। ভিজে চুপচুপে হয়ে বাসায় ফিরে গুগলে সার্চ দিয়ে একটু জানার চেষ্টা করেছিলাম অক্টোবর মাসের বৃষ্টি নিয়ে। কিন্ত তখনই কাকতালীয়ভাবে পেয়ে যাই নভেম্বর রেইন শীর্ষক গানটা। একে নভেম্বর মাস নিয়ে গান তারপর আবার কেমন যেন। তাই প্রথমে আগ্রহ নিয়ে শোনার মতো কিছু মনে হয়নি। কিন্ত গানটার অদ্ভুত সুন্দর লিরিক্সে চোখ পড়ে যায়। এরপর দুই তিনবার লিরিক্স মিলিয়ে শোনা আর বোঝার চেষ্টা করি।

পরিস্থিতি সুবিধার ছিল না। ঐদিন রাতেই আমার প্রচণ্ড জ্বর আসে। সকালে ছোট ভাই নাসিরের ফোনে যখন শুনলাম স্যার অনেক অসুস্থ, মিরপুর ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে ভর্তি। নিজের শারিরীক অসুস্থতার সঙ্গে যুদ্ধ করে সনি হল থেকে হার্ট ফাউন্ডেশন অবধি যেতেও বেশ ধকল নিতে হয়। তাড়াহুড়ো করে ফোন করি রুদ্র দা। দাদা তখন রওনা দিলেও এসে পৌঁছাতে পারেনি। হাসপাতালে গিয়ে যা দেখলাম এবং শুনলাম বুঝতে বাকি ছিল না ভয়ানক কোনো সংবাদ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।

একটু পর পর বিভিন্ন জনের ফোন। সরোজ আর শাহিলের কান্নাভেজা চোখ আর জারার আমতা আমতে কিছু জানতে চাওয়ার চেষ্টা এখনও ভাবতে গেলে মনে কাঁটা দিয়ে ওঠে। আর সেভাবেই পার হয়ে গিয়েছিল পুরোটা দিন। তারপর ধীরে ধীরে অবস্থার আরও অবনতি হয়। কাছে থাকা অনেকেই বুঝতে পারছেন সময় শেষ হয়ে আসছে। তবুও মানুষ চেষ্টা করে যায় শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে। সবাই প্রাণপণে প্রার্থনা করছে প্রিয়মুখ আইয়ুব খান সুস্থ হয়ে ফিরে আসুন।

২০১১ সালে অমঙ্গলের এই ঘটনার দিনটি ভুলক্রমে ছিল মঙ্গলবার এবং সেদিন অক্টোবরের ২৫ তারিখ। বিকালের দিকে জ্বর বেশি হওয়ায় আমি পুর্ণিমা রেস্টুরেন্টের সামনে মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। দুই ছোট ভাই ধরাধরি করে বাসায় রেখে এল। এরপর সন্ধার দিকে ঘুমিয়ে উঠতে উঠতে রাত সাড়ে নয়টা। প্রচণ্ড জ্বলছে দুই চোখ, সেইসঙ্গে নতুন যন্ত্রনা শ্বাসকষ্ট। তখন বাসা থেকে নিচে নামার শক্তি ছিল না। এমন সময় খুব সম্ভবত রাত সাড়ে দশটার দিকেই এক ছোট ভাই ফোন দিয়ে জানালো আইয়ুব স্যার আর নেই।

হিসেব করে দেখলাম পঞ্চাশ বছর হওয়ার বছর তিনেক আগেই তিনি চলে গিয়েছেন সবাইকে ছেড়ে। তবে তিনি ছিলেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে একমাত্র প্রাচীন শিলালিপি, ফলক ও প্রাচীন মুদ্রালিপির গবেষক। একজন প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক ও ইতিহাসবিদ হিসেবে তার অনেক লেখা দেশ বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশ হয়েছিল এই অল্প সময়েই। শিক্ষার্থীদের জন্য সহজবোধ্য একটি বাংলার ইতিহাস গ্রন্থও লিখে গিয়েছেন তিনি। এই গ্রন্থটির চাহিদা থাকায় অল্পদিনে বাজার থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্ত স্যার পরে অজ্ঞাত কারণে বইটি পুনঃমুদ্রণের উদ্যোগ নিতে পারেননি।

যাঁরা এই লেখা পড়েই স্যারের সম্পর্কে জানতে পারছেন তাঁদের জন্য কিছু কথা বলে রাখা ভাল। মৃত্যুর প্রায়  বছর খানেক পূর্বে ছিনতাইকারীদের গুলিতে আহত হয়েছিলেন স্যার। দীর্ঘদিন রোগভোগের পর অবশেষে সবেমাত্র বিভাগে ক্লাস নেয়া শুরু করেছিলেন তিনি। এরপর মৃত্যুর মাত্র কিছুদিন পূর্বেই তিনি বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এরপর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৫ অক্টোবর, মঙ্গলবার রাত ১০:৩০টায় ঢাকায় হার্ট ফাউণ্ডেশন হাসপাতালে তিনি দুনিয়া ছেড়ে চলে যান।
স্যার মওলানা ভাসানির স্মৃতিধন্য টাঙ্গাইলের মানুষ। ১৯৬৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এ জেলার কালিহাতী উপজেলায় তাঁর জন্ম। কালিহাতির পাইকরা ইউনিয়নের গোলরা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এরপর ১৯৭৯ সালে সেখানকার আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস এস সি পাস করেন তিনি। ১৯৮১ সালে সরকারী সাদাত কলেজ থেকে এইচ এস সি পাস করেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিকের পাট চুকিয়ে আইয়ুব খান উচ্চতর শিক্ষার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন আমাদের সবার প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনার্স এবং মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন তিনি। এতো ভাল ফলাফল থাকার পাশাপাশি গবেষণার অভিজ্ঞতা থাকলেও তাঁকে শুরুর দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে দেওয়া হয়নি। তিনি প্রথম দিকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কিছুদিন আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের দায়িত্ব নিয়ে সেখানে কর্মরত ছিলেন। তারপর বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পেরিয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। খুব সম্ভবত মোস্তাফিজুর রহমান খান স্যারের একান্ত চেষ্টায় নানা ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে ১৯৯৬ সালে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করতে পেরেছিলেন।

পরিশ্রমী মানুষ আইয়ুব খান প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে যোগদানের পর বসে থাকে আয়েশী সময় পার করেননি। তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হওয়ার পর গবেষণাকে ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। শুরুর দিকে সংস্কৃত ভাষা সেভাবে পারতেন না। স্যার আমার কাছে গল্প করেছেন অনেক কষ্ট করে সংস্কৃত শেখার জন্য নানা প্রচেষ্টার কথা। তিনি কিভাবে ধরে ধরে একটা একটা করে প্রাচীন লিপিমালার পাঠোদ্ধার করতেন সেই গল্পগুলো নিয়ে লিখতে থাকলে একটা বিশাল কলেবরের বই হয়ে যাবে। একজন প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক ও ইতিহাসবিদ হিসেবে তাঁর অনেক লেখা দেশ বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন সেমিনারে মূল্যবান গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। পাশাপাশি জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়াতেও তাঁর রচিত প্রবন্ধের সংখ্যা নিতান্ত হাতে গোণা নয়, বরঞ্চ বেশ কয়েকটি।

প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের কিংবদন্তী গবেষক আহমেদ হাসান দানী স্যারকে আইয়ুব স্যার আদর্শ মানতেন। উনি যখন দানী স্যারকে নিয়ে গল্প করতেন মনে হয় আনন্দে তাঁর চোখ মুখ উজ্জল হয়ে গিয়েছে। প্রসঙ্গ বলে রাখা ভাল আমার গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক শাহনাওয়াজ স্যারের ক্ষেত্রেও এই একই বিষয় খেয়াল করি। উনিও যখন আহমেদ হাসান দানী, শামসুদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক আব্দুল করিম, এ কে এম ইয়াকুব আলীদের নাম উচ্চারণ করেন সেখানে আজও আইয়ুব স্যারের চোখে দেখা সেই মুগ্ধতা নতুন করে দেখতে পাই।

অনেকে নানারকম কথাবার্তা বলতে পারে। কিংবা ঐ সময়ের অপ্রতুল সুযোগে তাঁর করা গবেষণা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারে। তবে তাঁর একজন ছাত্র এবং গবেষণা সহকারী হিসেবে আমি বলতে পারে ‘একজন নিবেদিতপ্রাণ গবেষক হিসেবেই তিনি প্রাচীন বাংলার লিপিমালা নিয়ে গবেষণা করেছেন। বাংলাদেশ ও ভারতের প্রাচীন ভাষার উপর তার বেশ দখল ছিল। তিনি  বিশেষত মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন আমলের লিপিমালা ও তামার পাতে খোদাই করে লিখিত ভূমিদানপত্র বা তাম্রশাসন নিয়ে গবেষণা করে গিয়েছেন’।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে পড়ালেখা করলেও কম্পিউটার গ্রাফিক্স এবং মানচিত্রায়নে আমার উল্লেখযোগ্য দক্ষতা ছিল। স্যার এই বিষয়টিকে গবেষণার জন্য অনেক বড় সুযোগ হিসেবে দেখতেন। তিনি আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন পুরাতন অস্পষ্ট লিপির ছবিগুলোকে নতুনভাবে ডিজিটাইজ করার জন্য। ভেক্টর রেখাচিত্র অঙ্কন ও কম্পিটার গ্রাফিক্স এর সাহায্যে তিনি প্রাচীন লিপিমালাকে আক্ষরিকভাবে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। পরবর্তীকালে অনেকে একই কাজ করলেও এ অভিনব পদ্ধতি তাঁরই আবিষ্কৃত।

গ্রাফিক্স ও রেখাচিত্র ব্যবহারের এই পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে তিনি দুর্বোধ্য প্রাচীন লিপিমালাকে অনেক সহজ করে নতুন প্রজন্মের গবেষকদের বাংলার লিপিমালার প্রতি আগ্রহী করে  তোলেন। তিনি একাধারে ব্রাহ্মী, খরোষ্ঠী, ও সংস্কৃত ভাষার বেশ কিছু আদিরূপ গবেষণা করেন। গবেষণার ক্ষেত্রে প্রত্নলেখবিদ্যা বা লিপির বিবর্তনকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করেন। পাশাপাশি লিপিতে উল্লিখিত নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তথ্যও বিশ্লেষণমূলক লেখার মাধ্যমে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন।

স্যারের লেখা নিবন্ধ, তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভ কিংবা তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পর্কে আমরা যারা খবর রাখি তাঁর গবেষক জীবন নিয়ে অনেক কথাই বলতে পারি। সেগুলোর বাইরে কিছু স্মৃতিচারণ করা যাক। অনার্স প্রথম বর্ষের ঘটনা হবে। আমাদের বাংলার ইতিহাসের প্রাচীন যুগ পড়াতেন স্যার। দুরন্ত উপস্থাপনার সঙ্গে প্রাঞ্জল উচ্চারণে আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মত বসে থাকতাম তাঁর ক্লাসে। তিনি গৌড়েশ্বর শশাঙ্ক যখন পড়াতেন মনে হয় রোটাস গড়ের সেই গিরিলিপি কিংবা এগরা তাম্রশাসন পকেটে করে নিয়ে এসেছেন। ব্ল্যাকবোর্ডের উপর ধপাধপ সিল পড়তো। তিনি হাসতে হাসতে বলতেন ‘শ্রী শ্রী মহাসামন্ত শশাঙ্ক দেবস্য’। তারপর আমাদের বোঝার সুবিধার জন্য বলতেন ‘শশাঙ্ক দেবস্য মানে কি জানো!! এটা মানে শশাঙ্কের’।

আইয়ুব স্যার এক ক্লাসে প্রাচীন বাংলার জনপদ নিয়ে পড়াচ্ছিলেন। বঙ্গ জনপদ নিয়ে পড়াতে গিয়ে তিনি পড়ালেন বৌধায়নের কর্মসূত্রে উল্লেখ করা আছে ‘বঙ্গ’ জনপদের নাম। এরপর নানা গল্প আর আলোচনায় হারিয়ে যাওয়ার পালা। আমি এখনও চোখ বন্ধ করলেও শুনতে নাই সেই শব্দ। কারণ আমি এর আগে অধ্যাপক আবদুল মমিন চৌধুরীর একটা নিবন্ধে পড়েছিলাম এটা বৌধায়নের ধর্মসূত্রে উল্লেখিত হওয়ার কথা। ক্লাসের মধ্যেই বেয়াক্কেলের মত বলা শুরু করলাম স্যার এটা ধর্ম কিংবা কর্ম নয় দ্রাবিড়সূত্র হবে। আমার বিশ্বাস ইগো প্রব্লেমওয়ালা কোনো শিক্ষক হলে তখন আমাকে ক্লাস থেকে ঘাড় ধরে বের করে দেয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু পরম শ্রদ্ধেয় আইয়ুব খান স্যার এটা করেননি। তিনি উপরন্তু আমাকে প্রশ্ন করলেন তুমি কি বৌধায়নের নাম জানো। আমি ক্লাসের শেষে এটা নিয়ে কথা বলব।

স্পষ্ট মনে পড়ছে ক্লাসের পর কিভাবে আইয়্যুব স্যার প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় ব্যয় করেছিলেন এই ধর্মসূত্র আর কর্মসূত্রের জট ছাড়াতে। তবে এই সময় নষ্ট করার আগে আইয়ুব স্যার নিশ্চিত হয়ে নিয়েছিলেন তার শ্রম কাজে আসবে তো। তিনি প্রথমেই প্রশ্ন করলেন বৌধায়ন সম্পর্কে। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে আমি গণিতবিদ হিসেবে বৌধায়নের ভূমিকা উল্লেখ করে বলেছিলাম তিনি পীথাগোরাসের আগে ঐ উপপাদ্যের সমাধান করেছিলেন। পাশাপাশি বৌধায়ন সূত্রের ৬ টি ভাগের কথাও সরাসরি বলেছিলাম এভাবে- শ্রুত সূত্র, কর্মসূত্র, দ্রাবিড়সূত্র, গৃহ্য সূত্র, ধর্মসূত্র এবং শুল্ব সূত্র। বিরক্ত না হয়ে স্যার ঘণ্টা ধরে বসে ছিলেন। এগুলো নিয়ে কথা বলা আর শোনার জন্য।

অনেকক্ষণ আলোচনা শেষে তিনি আর কথা বাড়াননি, বরং একে একে বর্ণনা করেছিলেন কিভাবে বৌধায়নের কোন লেখাগুলো বাংলার ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাজীবন শেষ করে নিজেও আজ শিক্ষক। আর ক্লাস নিতে গিয়ে ঐ প্রাচীন বাংলার ইতিহাস কোর্সটা শিক্ষার্থীদের আমিই পড়াই। জনপদ বিষয়ক ক্লাস নিতে গিয়ে স্মৃতিতে ঝলমলে অক্ষরে চোখের সামনে ভেসে ওঠে আইয়ুব স্যারের সঙ্গে ঐ সুন্দর বিকেলে ঘণ্টাধরে আলোচনার কথা। আমার আর বই পড়তে হয় না। ঝলমলে সেই স্মৃতিকে সাক্ষী রেখে একের পর এক বলতে থাকি ইতিহাসের গল্প। আর শিক্ষার্থীদের সামনে পরম শ্রদ্ধাভরে আইয়ুব স্যারের নামটি নিতেও ভুল হয় না।

আইয়ুব স্যারের জোর প্রচেষ্টার কারণেই হয়তো ভরদুপুরে কোনোরকম খেয়ে দেয়ে শিক্ষক-ছাত্র একসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ছুটতাম সংস্কৃত শিখতে। তারপর ক্লাস শেষে ফেরার পথে প্রাচীন বাংলার ইতিহাস নিয়ে কত গল্প, কত আলোচনা। ঐ সব বর্ণিল দুপুরের এতো রঙে রঙিন সুন্দর গল্পগুলোও মনে হয় আরেক ইতিহাস। কিংবা ঘরে ফেরার তাড়ায় থাকা পাখিদের ডানায় ভর করে আসা ঐসব সুন্দর সন্ধ্যাকে রংধনু রঙ মাখিয়ে দেওয়া ইতিহাসের গল্প এত সহজে ভোলা যায় কি? আর হয়তো এজন্যই আমি ইতিহাস আর প্রত্নতত্ত্বকে এতো ভালবাসি।

বাংলাদেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীর মনে একটা বদ্ধমূল ধারনা প্রতিষ্ঠিত। তারা মনে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে যারা ক্লাসের ফার্স্ট হয় তাদের প্রায় প্রত্যেকে বাই ডিফল্ট আকাইম্যা বলদ, বিশ্রি রকমের তেলবাজ এবং ভাদাইম্যা। লজ্জ্বার বিষয় হলেও সত্য, অজ্ঞাত কারণে আমি আমার ক্লাসে ফার্স্ট হলেও জুনিয়ররা এটা মানতে চাইত না। কেউ কেউ তো বলেই বসতো এই ফার্স্ট হতে গেলে যেমন তেলবাজ হওয়া লাগে, যতটা হুজুর হুজুর করা লাগে ঐটা আপনার সঙ্গে মানায় না। এই বিশেষ ধারণা থেকেই অনুমান করা যায় দেশের মেধাবীরা কতটা প্রতারিত, নিগৃহীত এবং নিষ্পেষিত।

আইয়ুব খান স্যার ক্লাসে ভাল রেজাল্ট করার ক্ষেত্রে আমার পথিকৃৎ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি বারংবার বলেছেন ‘অর্ণব একটা কথা মনে রাখবা সেটা আমাদের নষ্ট সিস্টেম। সেখানে তুমি যতোই পড়ো কিংবা জানো কোনো লাভ নাই। এখানে টিকে থাকতে গেলে, নিজের কথা বলতে গেলে ক্লাসে প্রথম হতেই হবে। নাহলে তুমি যে প্রতিবাদ করো, সেভাবে কথা বলো তোমার শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবথেকে অগুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসে পরিণত হবে’।

আমার মনে পড়ে স্যার আমাকে শিখিয়েছিলেন ইতিহাস বিষয়ে বেশি নম্বর পাওয়ার জন্য একটা সহজ প্রশ্নের উত্তরকে কিভাবে দশাসই সাইজ এবং উপস্থাপনযোগ্য করে তুলতে হয়। তারপর থেকে ইতিহাসের কোনো বিষয়ে আমার কোনো রকম সমস্যার মুখে পড়তে হয়নি। বাংলাদেশের জন্য লজ্জার বিষয় হলেও সত্য এখানে স্মার্ট এবং জনপ্রিয় শিক্ষার্থীর বৈশিষ্ট্য হতে হবে কে কতটা আর্টিস্টিক ওয়েতে তার শিক্ষককে অটিস্টিক প্রমাণ করতে পারে তার উপর। কিন্ত আইয়ুব খান স্যার স্রোতের বিপরীতে চলা মানুষ হওয়ায় সিংহভাগ শিক্ষার্থী কোনোদিন তাঁর ব্যাপারে নেতিবাচক ছিল না।

লজ্জ্বাজনক হলেও সত্য সম্মানিত শিক্ষকরা তাঁদের নিয়োগগত দুর্বলতা, পাঠাভ্যাসের অভাব আর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈরী আচরণের মধ্যে দিয়ে গালি খাওয়ার অবস্থানটা অর্জন করেছেন। কোনোভাবেই তাদের সঙ্গে এ বেয়াদপির পুরো দায়ভার ক্ষিপ্ত শিক্ষার্থীদের উপর বর্তায় না। প্রসঙ্গত, বলে রাখা যায় শিক্ষকদের পিতৃপরিচয় তুলে গালি দেয়া বেয়াদপশ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থীরও এমন প্রিয় শিক্ষক আছে যার সে পারলে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। খুব সম্ভবত এই বিরল প্রকৃতির শিক্ষকদের মধ্যে আইয়ুব খান স্যার ছিলেন অগ্রগন্য। মেধাবী থেকে দুর্বল সব শিক্ষার্থীই এক নিঃশ্বাসে স্যারকে সম্মান করতো।

এখনও ভেবে চমকে উঠি এই কথা ভেবে যে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে যখন ভর্তি হয়েছিলাম প্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক ড. আইয়ুব খান স্যার বলেছিলেন ‘এই বিভাগ ছেড়ে অন্য কোনো বিভাগে পড়ার জন্য চলে যাও। দিনের পর দিন তুমি এখানে বিরক্ত হবে। তারপর একদিন হতাশাগ্রস্ত শিক্ষার্থীর খাতায় নাম লেখাবে। মনে হবে তোমার জীবন পুরোপুরি ব্যর্থ’। আমিস্যারকে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলাম ‘কেনো’? স্যার সমধিক ক্ষিপ্ত হয়ে উত্তর দিয়েছিলেন ‘তোমার এতো কেনোর উত্তর নাই। এই কেনো কেনো করো বলেই এই বিভাগে তোমার মতো শিক্ষার্থীর পড়ার প্রয়োজন নাই। তোমার এতো প্রশ্ন আসে কোত্থেকে? সবাই কি মনে করো মন থেকে এত প্রশ্ন প্রত্যাশা করবে? আর তুমি প্রশ্ন করলেই কেনো ভাবো যে সবাই তার উত্তর দিতে বাধ্য। অন্যদিকে তোমার এত প্রশ্নের সব উত্তর অন্যদের জানা থাকবে কেনো? জানা থাকলেই তারা উত্তর দিবে কেনো’?

পরিস্থিতি হালকা করার জন্য আমি স্যারকে উত্তরে বলেছিলাম, ‘স্যার আমি উত্তর পাওয়ার আগেই আপনি কয়েকটা কেনো অলরেডি বলে ফেলেছেন। খেয়াল করে দেখেন স্যার এই বিশ্ব এমনি কিছু কেনোর উপরেই টিকে আছে’। স্যার একটু হেসে বলেছিলেন, ‘রুমের জানালা দরজা আটকাও, ফ্যান বন্ধ করো। রুদ্র (রুদ্র প্রতাপ সমাদ্দার) মনে হয় বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি বাসার দিকে এগোতে চাই’। আজ মনে হয় স্যার ভবিষ্যতদ্রষ্টা হিসেবে বুঝেছিলেন ‘ঐ বিভাগে আমার মতো শিক্ষকেরও কোনো দরকার নাই, আর তাঁর পরবর্তী মহারথীরা সেটা প্রমাণ করে গিয়েছেন পরম দায়িত্ব এবং সতর্ককতার সঙ্গে। তারা আমার নিজ বিভাগে শিক্ষক হওয়ার পথটানে কাঁটা বেছানোর কাজটা বেশ দায়িত্ব নিয়েই করেছেন বলা যায়’।

কল্পনার চোখে দেখা কোনো প্রচলিত জীবনালেখ্য কিংবা হৎআকর্ষী উপন্যাস নয়, একজন আটপৌরে জীবনে অভ্যস্থ অনেক অসাধারণ মনের সাধারণ মানুষ ছিলেন আমাদের আইয়ুব স্যার। প্রিয় মানুষের জীবনী লিখতে গিয়ে মানুষ ভুল করে সেই জীবনকে দেখে হয়তো বাইনোকুলার কিংবা মাইক্রোস্কোপের নিচে। বারংবার নানা ঐন্দ্রজালিক ঘূর্ণিপাকে জড়ানো এক জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখতে দেখতে আমি স্যারকে খুঁজে দেখেছি আমার জীবনের কালাইডোস্কোপের ফাঁকফোকর দিয়ে। এখানে কোনো আপাত-বাস্তবের নেপথ্যে বহমান খরস্রোতা নদীর প্রবাহ নয়, বরঞ্চ ধমনী-শিরায় বহমান রক্তস্রোতই আমার আলেখ্য। একজন প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক কিংবা ইতিহাসের শিক্ষক-শিক্ষার্থী হিসেবে আমার জীবনের প্রতি রক্তস্রোত আর হৃদস্পন্দনে মিশে আছে প্রিয় অধ্যাপকের স্মৃতিগুলো। তার থেকে একঝলক সবার সঙ্গে ইনিয়ে-বিনিয়ে বিনিময় করার যদি অপরাধ হয় ক্ষমা করবেন প্রিয় পাঠক।

(Visited 2 times, 2 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *