‘ইনকিলাব-ই-জেনসি’

ইরানের নাম লিখতে গিয়েই প্রথমে উল্লেখ করতে দেখা যায় ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান’। আর সেখানকার চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে নাটক, গান আর সাহিত্য সবখানে এর ছাপ স্পষ্ট। তবে বিধিনিষেধের মধ্যেই সেখানে ঘটে গেছে বিশেষ শিল্প-সাহিত্যিক অন্তর্ভুক্তি। বিপ্লব-পরবর্তী ইরানের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও সাহিত্যিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে বেশ। অন্তত পিটার অ্যাগেলটন ও রিচার্ড পার্কার সম্পাদিত ‘Routledge Handbook of Sexuality, Health and Rights’ গ্রন্থে পারদিস মাহদাবি একটি নিবন্ধ প্রকাশ করার পর বিষয়টি আরো জোরালো হয়ে উঠতে দেখা যায়। ‘Passionate Uprisings: Young People, Sexuality and Politics in Post-Revolutionary Iran’ শীর্ষক নিবন্ধটি বিপ্লবোত্তর ইরানের শিল্পকর্ম, সাহিত্য ও নানা ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন হয়েছে, তার একটা সারসংক্ষেপ বলা চলে। একটা বিধিনিষেধের মধ্যে থেকেও ইরানের মতো দেশগুলোয় যেমন সাহিত্যিক বিকাশ ঘটেছে, সেটাকেই এক অর্থে ‘ইনকিলাব-ই-জেনসি’ নামে সংজ্ঞায়িত করার একটা চল দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে।

ফরাসি বিপ্লবোত্তরকালে কিংবা বিপ্লবের সময়ে সেখানকার শিল্প-সাহিত্যে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে দেখা গিয়েছিল বুর্জোয়া বিদ্বেষ ও শ্রমিক অভ্যুত্থান সম্পর্কিত নানা বিষয়। পাশাপাশি সোভিয়েত ইউনিয়নের শিকলের মধ্যে থেকে পুঁজিবাদ ও তত্সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলাটা বেশ কঠিন ছিল। আমরা জেলখানার নোট বইয়ে আন্তেনিও গ্রামসিকে যেভাবে নিত্যনতুন শব্দবন্ধে সাম্যবাদের মর্মবাণী নিয়ে কথা বলতে দেখেছি, ইরানের সাহিত্যিক বিপ্লবকে কিছুটা মেলানো যাবে তার সঙ্গে। বলতে গেলে দেশটির শিল্পী, সাহিত্যিক, চলচ্চিত্রকর্মী, গীতিকার ও গায়ক-বাদক-নতর্করা প্রজাতান্তিক নিয়মের কঠোরতার মধ্যে থেকেই বিকাশ ঘটিয়েছেন নিজ নিজ প্রতিভা। একটা পর্যায়ে এসে দেখা যাচ্ছে, বিধিনিষেধের থেকে আগ্রহ আর উদ্দেশ্য মুখ্য হয়েছে। প্রতিটি শিল্প এগিয়ে গেছে নিজ গতিতে। এদিক থেকে চিন্তা করলে সহজেই ধরে নেয়া যায়, ‘ইনকিলাব-ই-জেনসি’ একটি কাঠামোবদ্ধ গণ্ডির মধ্যে থেকেই এগিয়েছে।

তেহরানের জালাল-ই-আহমাদ এক্সপ্রেসওয়ের নামকরণের ঘটনাটি কমবেশি অনেকেরই অজানা নয়। ‘ঘার্বজাদেগি’ তথা ‘পশ্চিমাদূষণ’ শীর্ষক বিশেষ গ্রন্থের জন্যই তার নাম সাহিত্য ইতিহাসে সুবিদিত। তিনি এ বইয়ের জন্য যেমন বিশ্বব্যাপী সুনাম কুড়িয়েছেন, তেমনি এর জন্য তাকে হেনস্তাও হতে হয়েছে বেশ। বিশেষ করে সরকারি বিধিনিষেধ থেকে শুরু করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আসা নানা নিষেধাজ্ঞার খড়্গ তার কর্মকাণ্ড থামিয়ে দিয়েছিল বেশ কয়েকবার। এর পরও ইরানের নানা স্থানে নিষিদ্ধ বই বিক্রি হচ্ছে দেদার। অনেক বইয়ের দোকান বিশ্বের নানা দেশ থেকে বই যেমন আমদানি করছে, এর বাইরে ইরানে যে বই বিক্রির রীতি নেই, সেগুলোও বিক্রি করছে নিজের মতো করে। এতে অন্তত বই লেখালেখি নিয়ে সেখানে যে পরিবেশ, তা কিছুটা হলেও বদলেছে। এভাবে বই বিক্রি কিংবা পাঠ করার জন্য নানা ধরনের শাস্তির সম্মুখীন হতেও দেখা গেছে অনেককে। তবে বই বাজেয়াপ্তকরণ, ধরপাকড় কিংবা জরিমানার পরও থেমে নেই ইরানের ‘ইনকিলাব-ই-জেনসি’, বরং তা নতুন গতি পেয়েছে দিনের পর দিন।

গত বছরের ভ্যালেন্টাইনস ডের পর থেকে ইরারেন সাহিত্যাঙ্গনে একটা বড় পরিবর্তনের ঝড় বয়ে গেছে। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে রোমাঞ্চকে একটা পণ্য মনে করায় ইরান সেখানে বাদ সেধেছে। তাদের হিসাবে রোমাঞ্চের বৈধ-অবৈধ দিক রয়েছে। ইরানের সাহিত্যের শাখা হিসেবে রোমাঞ্চ বেশ জনপ্রিয় থাকলেও সেটাকে ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে সম্প্রতি। ইরানের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কোনো বইয়ে ‘চুমু’, ‘মদ’, ‘প্রেমিক’ কিংবা ‘পাস্তা’র মতো খাবারের নাম থাকলে সেটাকে পর্যন্ত একটা নজরদারির মধ্যে আনতে চাইছে। তবে নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি মানুষের স্বভাবজাত আকর্ষণ থাকে দুর্নিবার। আর ইরানে এ ঘটনাটাই ঘটেছে এবার নতুন করে। তারা এ ধরনের গ্রন্থালোচনা শোনামাত্র সেগুলোর দিকে ঝুঁকছে। ওপরে উল্লেখকৃত শব্দগুলো কোনো একটা জায়গায় বিশেষভাবে ব্যবহার করা হয়েছে জানামাত্র সে বইগুলোর বিক্রিবাট্টা বেড়ে গেছে বহুগুণ। তাই লেখকরাও সুযোগ বুঝে এ ধরনের বই লিখছেন বেশি। আর প্রকাশকদের আগ্রহ ও ক্রেতাদের কেনাকাটার ঝোঁক তার সঙ্গে একীভূত হওয়ায় নতুন করে গতি পাচ্ছে ইরানের সাহিত্য।

রোমান্টিক কবিতা লেখায় ইরান তথা পারস্যের রয়েছে বহু বছরের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। বিখ্যাত দুই কবি হাফিজ ও শেখ সাদী যে সিরাজ শহরে সমাহিত, সেখানে রচিত হয়েছে এমন অনেক কবিতা। কেবল রোমান্টিক কবিতার বিশ্বব্যাপী খ্যাতি থেকেই সিরাজ শহরকে বলা হয়ে থাকে ‘সিটি অব লাভ’। এখনকার দিনেও সিরাজে বেড়াতে গেলে অনেকের মুখে দুর্দান্ত রোমান্টিক কবিতা শুনে কেউ অবাক হবেন না। এমন অনেকের মুখে মুখে প্রচলিত কিছু কবিতা, যেগুলো প্রচলিত আইনের পক্ষে যায় না, সেগুলোকেই সংকলন করেছিলেন ফরুখ ফারুখজাদ। তার কবিতা ইরানে তেমন সাড়া না পেলেও পরবর্তীকালে হয়েছিল বিশ্বনন্দিত। নিযামীর বিখ্যাত লায়লা-মজনুর গল্প কিংবা সাদেঘ হিদায়াতের বিশ্বনন্দিত অন্ধ পেঁচার কথকতা ইরানের সাহিত্যে রোমাঞ্চের অবস্থান মনে করিয়ে দেয়ার জন্য এখনো যথেষ্ট।

সম্প্রতি ইরানের সাহিত্যে নতুন একটি ধারার বিকাশ ঘটেছে। এখানে রোমান্টিক নভেলগুলোর পাশাপাশি সেগুলো হয়ে উঠেছে সেলফ হেল্প বুক। ইরানের নানা স্থানে যে রোমান্টিক নভেলগুলো বেশি বিক্রি হচ্ছে, সেগুলো রোমান্টিকতার বাইরে একটা উপদেশ দিয়ে শেষ হচ্ছে। এ উপদেশ ও কাহিনীর পরিক্রমা সেগুলোকে যেমন বিক্রির বৈধতা দিচ্ছে, তেমনি এগুলো সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে ইরানি সাহিত্যকে। ইরানের নানা স্থানে এখন যে বইগুলো বিক্রি হচ্ছে ধুন্ধুমার, তার সঙ্গে মেলানো যায় ব্রাজিলের নন্দিত লেখক পাওলো কোয়েলহোর বইগুলোকে। পুরো বই রোমাঞ্চ আর সাসপেন্সে ভরপুর। তাই এসব ঘটনার ঘনঘটায় ভর করে পাঠক গোগ্রাসে পড়ে ফেলছে পুরো বই। তবে তার শেষে থাকছে বিশেষ উপদেশ। ঠিক যেমন পাওলো কোয়েলহোর বেশির ভাগ বইয়ের সব ঘটনা শেষ করতে গিয়ে সুকৌশলে পিউরিটান ক্যাথলিক মতবাদকে প্রমোট করতে দেখা যায়। একসময়ের হিপ্পি থেকে পরবর্তীকালে খ্রিস্ট ধর্মে পুরোপুরি অনুরক্ত কোয়েলহো ব্রাজিলের সাহিত্যকে যেমন বিশ্বজনীন একটা রূপ দিয়েছেন কাঠামোর বাইরে থেকে বিশেষ কাঠামোয় টেনে এনে। আর ইরানের সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য ঠিক তার বিপরীত। ইরানের লেখকরা সাহিত্য লিখছেন বিশেষ কাঠামোর মধ্যে থেকে। তবে বর্ণনার প্রয়োজনে তারা আর কোনো সীমা মানছেন না শেষ পর্যন্ত। ইরানের বেশির ভাগ বইয়ে দেখা যাচ্ছে ‘লাভ ট্রায়াঙ্গল’ কিংবা ‘অবৈধ প্রেমের সম্পর্ক’ উঠে আসছে নানাভাবে। তবে এগুলোর পরিণতি যে খুব একটা ভালো নয়, সেটা ঘটনা ও কাহিনীর মধ্য দিয়ে বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে পরিশেষে। ফলে সেগুলোকে একটা কাঠামোর মধ্যে থেকে বিশ্বজনীন হয়ে ওঠার সুযোগ মিলছে।

পশ্চিমা সাহিত্য যেখানে যৌনতাকে সর্বজনীন করে তুলেছে এবং পরিবারের বাইরে যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো বৈধ-অবৈধ বাধা রাখেনি। ইরানের সাহিত্য ঠিক তার বিপরীতে গিয়ে বিয়ের এবং তার পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে প্রেম, সেটাকেই শুধু বৈধ করছে। এর বাইরে লেখক তার ইচ্ছে-খুশি প্রেমের সম্পর্ককে নিয়ে আসছেন উপন্যাসে। তবে শেষ পর্যন্ত কাহিনীর পরিণতি দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হচ্ছে, এ ধরনের সম্পর্ক সামাজিকতা ও জীবনের জন্য মোটেও সুখপ্রদ নয়। আমরা ভ্লাদিমির নাবাকভের উপন্যাস ললিতার উদাহরণ দিতে পারি। সেখানে অল্প বয়সী একটা মেয়ের প্রেমে পড়ে জনৈক ব্যক্তি। পরে শুধু ওই মেয়েকে পটানোর জন্য সে একই সঙ্গে মেয়ের মায়ের সঙ্গে পর্যন্ত প্রেম শুরু করে। শেষ পর্যন্ত মা ও মেয়ে দুজনই তার লালসার বলি হয়। এ ধরনের উপন্যাস ইরানের বাস্তবতায় চিন্তা করাও অসম্ভব। কিন্তু অনেক লেখক সুকৌশলে এ ধরনের ঘটনার অবতারণা করছেন তাদের উপন্যাসে। তবে শেষ পর্যন্ত এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ, সেটাও কাহিনীর পরিক্রমায় নিয়ে আসছেন বেশ দক্ষতার সঙ্গে। পশ্চিমের উপন্যাসে ভালোবাসাকে সমাজ, পরিবার, ধর্ম, রাষ্ট্র এমনকি সবকিছুর ঊর্ধ্বে নিয়ে দেখানো হয়। আর ইরান সেখানে পরিবার ও রাষ্ট্রকে রেখেছে কেন্দ্রে। এখানে ভালোবাসা শুধু একটি বাহন, যা পরিবার কিংবা রাষ্ট্রকে করেছে অনেক মহিমান্বিত ও গৌরবের এক প্রতিষ্ঠান।

কিছুদিন আগে ভারতের নন্দিত শিল্পী কৃষ্ণকুমার কুন্নাথ একটি গান গেয়েছিলেন। সেখানে একটি লাইন ছিল ‘কোই ভি অ্যায়সা লামহা নেহি হ্যায়, জিসমে মেরে তু হোতা নেহি হ্যায়, ম্যায় সো ভি যাউ রাতোমে, লেকিন তু হ্যায় পে মুঝমে সোতা নেহি হ্যায়।’ এ ধরনের গান পশ্চিম থেকে পূর্ব, উত্তর থেকে দক্ষিণ বিশ্বের সব প্রান্তে সমান জনপ্রিয়। কিন্তু ইরানের বিখ্যাত লেখক ফাত্তানেহ হাজ সৈয়দ জাভেদি যে ‘বামদাদ-ই-খোমার’ লিখেছেন, তার মর্মবাণী অনেকটা এমন হলেও কাঠামোবদ্ধতার কারণে তাকে শেষ করতে হয়েছে নেতিবাচক পরিণতিতে। কৃষ্ণকুমার কুন্নাথের গানে প্রেয়সীর প্রতি বলতে দেখা যাচ্ছে, ‘এমন কোনো মুহূর্ত নেই, যখন প্রিয়তমাকে মনে পড়ে না। হয়তো রাতের বেঘোর ঘুমে দুনিয়ার সবকিছু ভুলে থাকা যায়, শুধু তাকে ঘিরেই জেগে থাকে কিছু স্মৃতি।’ এ ধরনের কোনো লাইন ইরানের কবিতায় এলে হয়তো শেষে যোগ করে দিতে হতো বিশেষ নেতিবাচক কিছু শব্দবন্ধ। অন্তত এতে এমন বাঁধভাঙা প্রেমকে যাই হোক ইতিবাচক নয়, বরং নেতিবাচক হিসেবে উপস্থাপনের বিকল্প ছিল না। ইরানে প্রেম আর বিয়ে একে অন্যের পরিপূরক নয়, বরং সমার্থক। এখানে ক্লাস, স্ট্যাটাস, পরিবেশ-পরিস্থিতি এগুলো কোনো ব্যাপার নয়, সব ধরনের বিয়েকেই উত্সাহিত করতে দেখা যায়।

বিশ্বের অন্য দেশে যুবক-যুবতীর পরিচয় থেকে কাছে আসা, তার পর প্রেম আর নানা সমস্যা নিয়ে যেমন কল্পকথা এগিয়ে যায়, ইরান তার বিরুদ্ধ স্রোতে গিয়ে গল্পের শুরুটাই করছে বিয়ে থেকে। তাই এখানকার যেসব রোমান্টিক উপন্যাস, সেখানে সবকিছু থাকলেও তা আদতে হয়ে উঠতে পেরেছে তাদের হিসেবে অনেক সামাজিক। অন্য সব উপন্যাসে যেমন সেক্সুয়াল ডিজায়ার আস্তে আস্তে কেন্দ্রে চলে আসে, ইরানের উপন্যাস সেখানে পারিবারিক সম্পর্ক, আত্মীয়তার বন্ধন, স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব আর অনুরাগ কেন্দ্রে এসেছে। আর তার সমার্থক হিসেবে যৌনতাকে আস্তে আস্তে একপাশে সরিয়ে দেয়া হয়েছে সুকৌশলে। ‘বামদাদ-ই-খোমার’-এর পাশাপাশি আমরা নাহিদ পেঝভাকের বিখ্যাত ‘শাব-ই-শারাব’-এর কথা বলতে পারি। এখানে কাঠামোবদ্ধতা মাথায় রেখেই ঘটনার ঘনঘটায় লেখকের মধ্যে একটু নতুন কিছু নিয়ে আসার প্রাণান্ত চেষ্টা ছিল বরাবর। বলতে গেলে এমন কাঠামোবদ্ধতার দায়ই লেখককে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় একদম অন্য রকম কিছু করার সুযোগ দিয়েছে।

আশির দশকের পর থেকে ইরানের উপন্যাস নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রচলিত একটি মতামত হচ্ছে ‘হাঙ্গার ফর রোমাঞ্চ’। সম্প্রতি এ অবয়বে আসতে দেখা যাচ্ছে বিশেষ বদল। দুই দশকের খরা কাটিয়ে তারা এক অর্থে নতুনভাবে পথচলা শুরু করেছে। ইরান বিপ্লবের পর যারা জন্মেছে, তারা অন্তত এখনকার ইরানি উপন্যাসগুলোর বর্ণনাক্রম আর ভাষা দেখে শিউরে উঠলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। আর এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো, ইরানে যে উপন্যাসগুলো এখন লেখা হচ্ছে, তার ৪৫ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে গ্রাহক থাকছেন উঠতি বয়সের নারীরা। তারা নিজের জীবন, সমাজ ও ধর্ম সম্পর্কে সচেতন। তারা দেশের প্রচলিত রীতির বাইরে না গিয়েও সাহিত্য রস আস্বাদন থেকে বঞ্চিত হতে অন্তত রাজি নন কোনোভাবেই। আর এদিক থেকেই যৌনতা ও রোমাঞ্চ ইরানের সাহিত্যে যে অবস্থান করে নিয়েছে, সেটাই পথ দেখাচ্ছে ‘ইনকিলাব-ই-জেনসি’কে।

ইরানের শিল্পকলা ও সাহিত্য যে বদলে যাচ্ছে, সেটা বোঝার জন্য শাহরাম খোশরাভির বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Precarious Lives: Waiting and Hope in Iran’ পড়ে দেখতে পারেন যে কেউ। একটু স্মরণ করা যেতে পারে মুসলিমবিশ্বের শিল্পকলার কথা। ইসলামে প্রাণিচিত্র অঙ্কন নিষিদ্ধ, তবে তা শিল্পীদের তুলিতে আর নিষিদ্ধ থাকেনি। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকরা দেখেছেন, তোঘরা লিপির ক্ষেত্রে কীভাবে আল কোরআনের আয়াত কীভাবে ক্যালিগ্রাফির মধ্য দিয়ে সুন্দর একটা প্রাণী অবয়ব পেয়েছে। কিংবা একটা বকের প্রতিচিত্র কীভাবে তুলির আঁচড়ে দুর্দান্ত ক্যালিগ্রাফি হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত ইরানের এ ব্যতিক্রমী শিল্পকলার বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করা যেতে পারে অনেকটাই পশ্চিমের সঙ্গে উল্টোপথে, কিঞ্চিত উল্টোরথেও। পশ্চিমের পিউরিটান লেখকরা কাঠামোর বাইরে থেকে কাহিনীকে টেনে এনে বিশেষ কাঠামোয় ফেলেছেন। আর সাহিত্যের প্রয়োজনে ইরানের লেখকরা কাঠামোর মধ্যে থেকেই প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন তাদের লেখনীকে একটা বিশ্বজনীন রূপ দিতে। বলতে গেলে ইরানের সাহিত্যে যৌনতার যে নয়া ধারণা তথা ‘ইনকিলাব-ই-জেনসি’, এর বিকাশ ঘটেছে এভাবেই।

(Visited 28 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *